Advertise

মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইন

মন্টেগু চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইনের পটভূমিকা: ব্রিটিশ সরকার ভারতে শাসন সংস্কারের জন্যে ১৯১৯ খ্রীঃ কাউন্সিল আইন বা মন্ট-ফোর্ড আইন পাশ করে। ভারত সচিব এডউইন মন্টেগু ও বড়লাট চেমসফোর্ড এই আইনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। এজন্য তাদের নাম অনুসারে এই আইনটিকে মন্টেগু চেমসফোর্ড বা মন্ট ফোর্ড আইন বলা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তৎকালীন পরিস্থিতি ব্রিটিশ সরকারকে ভারত সম্পর্কে চিরাচরিত নীতি ত্যাগ করে নতুন নীতি গ্রহণে প্ররােচিত করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা ভারত সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটায়।
মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারত ব্রিটিশ সরকারকে সাহায্য করে। স্বভাবতঃই ভারতীয় নেতারা এর প্রতিদানে স্বায়ত্বশাসন লাভের আশা করেন। এ সম্পর্কে বড়লাট চেমসফোর্ড ও ভারত সচিব চেম্বারলেইন মধ্যে আলাপ আলােচনা আরম্ভ হয়। ইতিমধ্যে মেসোপটেমিয়ার যুদ্ধে ভারত সরকারের শােচনীয় ব্যর্থতার জন্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তীব্র সমালােচনা হলে ভাবত সচিব চেম্বারলেইন পদত্যাগ করেন। এই পদে বসেন এডউইন মন্টেগু। ভারতের ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তখন ব্রিটেনের অনুকূলে ছিল না। জুডিথ ব্রাউনের মতে, ব্রিটিশ সেনা যুদ্ধের দরুন ভারত থেকে চলে আসায় ভারতবাসীদের সন্তুষ্ট রাখার দরকার দেখা দেয়। তাছাড়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির দরুন ভারতে অশান্তির আশঙ্কা দেখা দেয়। এদিকে হোমরুল আন্দোলন এর প্রভাবে জনমত জাগ্রত হলে ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র বাধ্য হয়ে নমনীয় মনােভাব গ্রহণ করে।

ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে হিন্দু মুসলিম ঐক্য স্থাপিত হলে ব্রিটিশ সরকারের ভেদনীতি আপাততঃ অকার্যকরী হয়। লক্ষ্ণৌ চুক্তি (১৯১৬ খ্রীঃ) দ্বারা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ পারস্পরিক বােঝাপড়ায় আসে। উভয় দল স্বায়ত্বশাসন লাভের জন্যে ব্রিটিশ বিরােধী আন্দোলনে সম্মত হয়। মুসলিম সম্প্রদায় এই সময় কয়েকটি বিশেষ কারণে ব্রিটিশ সরকারের ওপর অসন্তুষ্ট হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার বিপদে পড়েন। প্রথমতঃ তুরস্কের সুলতান ছিলেন মুসলিম জগতের ধর্মগুরু। তুর্কী ইতালী যুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার ইতালীর পক্ষ নিলে মুসলিম জগতে অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক জার্মানীর পক্ষ নিলে ব্রিটিশ সরকার তুর্কী সুলতানকে শক্র ঘােষণা করেন এবং তুর্কী সাম্রাজ্য ধ্বংসের উদ্যোগ নেন। এজন্য সুলতান বা খলিফাকে রক্ষার জন্যে খিলাফং আন্দোলন শুরু হয়। মুসলিম লীগ লক্ষৌ চুক্তির দ্বারা কংগ্রেসের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সমর্থন জানায়। হিন্দু মুসলিম ঐক্যের সম্ভাবনা দেখা দিলে ব্রিটিশের ভেদনীতি অচল হয়ে পড়ে। সরকার এজন্য কিছু সুযােগ সুবিধা দান করে ভারতীয় নেতাদের সমর্থন লাভের উদ্যোগ নেন। এই উদ্দেশ্যে ভারতীয় বীর সৈনিকদের এখন থেকে কিংসক্রস লাভের সুযােগ দেওয়া হয়। পি জি রবের মতে, বড়লাট চেমসফোর্ড নতুন ভারত সচিবকে জানান যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের উদার লক্ষ্য সম্পর্কে শীঘ্রই একটি ঘােষণার দ্বারা ভারতবাসীদের আশ্বস্ত করা দরকার।

উপরােক্ত কারণে ভারত সচিব মন্টেগু ১৯১৭ খ্রীঃ ২০শে আগষ্ট হাউস অফ কমন্সে একটি ঘােষণা দে। মন্টেগু বলেন যে, “এখন থেকে ভারত সম্পর্কে ইংলন্ডের কাজে নিযুক্ত সরকারের নীতি হবে ভারতে স্বায়ত্বশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলির ক্রমিক অগ্রগতি সাধন, যার ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত হলেও ভারতে দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার কাজে অগ্রগতি হবে”। মন্টেগুর ঘােষণা ভারতীয় নেতাদের মনে গভীর আশা সৃষ্টি করে। এরপরে মন্টেগু ভারত পরিভ্রমণে আসেন। মন্টেগু স্বদেশে ফেরার পর যখন আইনটির খসড়া রচনা করেন সেই সময় লণ্ডনের পত্রিকা “রাউন্ড টেবল” কে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর প্রভাবশালী সাংবাদিক ও রাজনীতিক মন্টেগুকে খসড়া রচনার পরামর্শ দেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন ফিলিপ কার, উইলিয়াম ডিউক ও লাওনেল কাটিস প্রভৃতি। তারা পরামর্শ দেন যে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে কিছু প্রশাসনিক ক্ষমতা না দিলে ক্ষতি হবে। রাউন্ড টেবলের সদস্যদের মত মন্টেগু গ্রহণ করেন। এইভাবে ১৯১৯ খ্রীঃ কাউন্সিল আইন বা মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইনটি পাশ হয়।

মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইনের বৈশিষ্ট্য: ব্রিটিশ পার্লামেন্টে যে ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন পাশ হয়েছিল তা মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইন নামে পরিচিত। মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইনের বৈশিষ্ট্য বা শর্তাবলী ছিল নিম্নরূপ -
১) ভারত সচিবের ক্ষমতা বাড়িয়ে ভারত সরকারের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করা হয়।
২) বড়লাটের শাসন পরিষদের ৮ জন সদস্যের মধ্যে ৩ জনকে ভারতীয় সদস্য হিসেবে বড়লাট মনােনয়নের অধিকার পান। এই সদস্যদের হাতে আইন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা প্রভৃতি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
৩) মন্টফোর্ড আইনে কেন্দ্র ও রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতা ভাগ করা হয়। বৈদেশিক নীতি, শুল্ক, মুদ্রা, দেশরক্ষা, দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন, যােগাযােগ, অর্থ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয় কেন্দ্রিয় সরকারের এক্তিয়ারে রাখা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলসরবরাহ, দুর্ভিক্ষ, ত্রাণ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা প্রভৃতি বিষয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদেশগুলির ওপর রাখা হয়।
৪) মন্টফোর্ড আইনে কেন্দ্রে দুইকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা গঠিত হয়। উচ্চকক্ষের নাম হয় কাউন্সিল অফ ষ্টেট এবং নিম্নকক্ষের নাম হয় কেন্দ্রীয় আইনসভা বা সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ এসেম্বলী।
৫) মন্টফোর্ড আইনে নির্বাচন বিষয়ক আইনে বলা হয় যে, সম্পত্তির ওপর আয়কর প্রদানের ভিত্তিতে ভােটাধিকার দান করা হয়। প্রদেশগুলির লােকসংখ্যার অনুপাতে সদস্য সংখ্যা স্থির না করে প্রদেশগুলির গুরুত্ব অনুযায়ী সদস্য পদের সংখ্যা স্থির করা হয়।
৬) যদি বড়লাট মনে করতেন, কোন বিল আইনসভার কক্ষে উত্থাপিত হলেও তা ভারতের শান্তি-শৃঙ্খলা বিপন্ন করতে পারত, তাহলে তিনি সেই বিল নাকচ করতে পারতেন। ভারতের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যে কোন আইনের প্রস্তাব, আইনসভায় পাশ না হলে বড়লাট অর্ডিন্যান্স দ্বারা তা বিধিবদ্ধ করতে পারতেন। এই অর্ডিন্যান্স ৬ মাস কাল কার্যকরী থাকত।
৭) প্রাদেশিক শাসনের ক্ষেত্রে ডায়ার্কি বা দ্বৈতশাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। প্রাদেশিক সরকারের হস্তগত বিষয়গুলিকে সংরক্ষিত এবং হস্তান্তরিত এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। সংরক্ষিত বিষয়গুলি যথা, ভূমি রাজস্ব, জলসেচ, দুর্ভিক্ষ, ত্রাণ, আইন-শৃঙ্খলা, শিল্প, সংবাদপত্র, সরকারি ঋণ গ্রহণ নীতি, পুলিশ প্রভৃতি স্বয়ং প্রাদেশিক গভর্ণরের হাতে ন্যস্ত হয়। হস্তান্তরিত বিষয়গুলি যথা জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বায়ত্বশাসন, কৃষি, মৎস্য চাষ, আবগারী, ধর্মীয় অনুদান, পাঠাগার প্রভৃতি মন্ত্রীসভার হাতে ন্যস্ত করা হয়। গভর্ণর তার মন্ত্রীসভার সাহায্যে হস্তান্তরিত বিষয়ের প্রশাসন পরিচালনা করবেন বলা হয়। এই মন্ত্রীরা প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচিত সদস্যদের মধ্য থেকে গভর্ণর দ্বারা নিযুক্ত হবেন বলা হয়। মন্ত্রীরা তাদের দপ্তরের কাজের জন্যে প্রাদেশিক আইনসভা ও গভর্ণরের কাছে দায়ী থাকবেন বলা হয়।

মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইনের মূল্যায়ন: মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইন ভারতীয়দের ন্যূনতম আশা আকাক্ষা পূরণ করতে পারেনি। কারণ — (ক) এই সংস্কার আইনে সরকারি প্রাধান্যকে নিয়ন্ত্রণের কোনাে ব্যবস্থা ছিল না। কারণ আইনসভার সিদ্ধান্তকে নাকচ করার অধিকার ছিল কেবলমাত্র বডােলাট ও ছেটোলাটের। (খ) ভােটের অধিকারকে এইরূপে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল যাতে কোনাে ভারতীয়ের গণতান্ত্রিক উদ্দেশ্য সফল না হয়। (গ) এই আইন সম্প্রদায়গত প্রতিনিধিত্বকে কেবল অন্তর্ভুক্তই করেনি তাকে আরও ব্যাপক করেছিল। (ঘ) বাল গঙ্গাধর তিলক আইনের সমালােচনা করে একে গ্রহণের অযােগ্য বলেছিলেন। জাতীয় কংগ্রেসের বম্বে অধিবেশনে একে অসন্তোষজনক, অপ্রচুর ও হতাশাজনক বলে সমালোচনা করেন।