লক্ষ্ণৌ চুক্তি কি?

লক্ষ্ণৌ চুক্তি কি?

- February 04, 2020
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হবার সিদ্ধান্ত বাংলার মুসলিম সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। এই ক্ষোভ ক্রমে সর্বভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। সৈয়দ নবিউল্লাহ মুসলমানদের আত্মশক্তির আদর্শ অনুসরণের পরামর্শ দেন। এই সময়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ভারতীয় মুসলমানদের বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। ভারতীয় মুসলিম সমাজে সাম্রাজ্যবাদ বিরােধী চেতনা জাগ্রত হয়েছিল তুরস্ককে কেন্দ্র করে। বলকান যুদ্ধ ও তুরস্কের প্রতি অনুসৃত ব্রিটিশ নীতি ভারতীয় মুসলমানদের ক্রমে ব্রিটিশ বিরোধী করে তােলে। ইসলাম জগতের ধর্মগুরু তুরস্কের খলিফার বিরুদ্ধে তুরস্কের বিদ্রোহী অমুসলমান প্রজাদের ইংল্যাণ্ড সাহায্য করায় ভারতের মুসলমানরা ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। এই নূতন পরিস্থিতিতে মুসলমানরা হিন্দুদের সঙ্গে সঙঘবদ্ধভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানাের কথা বিবেচনা করতে থাকে।
লক্ষ্ণৌ চুক্তি ১৯১৬
বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগ নাগাদ মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ও সংগঠনে কিছু মৌলিক পরিবর্তন দেখা দেয় যার ফলে মুসলিম লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি প্রসারিত হয়। 'এলিট' নেতৃত্বের অবসান ঘটে এবং মুসলিম লীগ একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী পরিচালিত রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়। মৌলানা আজাদ, হাকিম আজমল এবং ডঃ আনসারির মতাে মুসলিম নেতৃবর্গ জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সহযােগিতা করতে অগ্রসর হন। মৌলানা মহম্মদ আলি, হাকিম আজমল খান এবং মজহর উল হক এই সময়ে যে আহরার আন্দোলন শুরু করেন, তা কংগ্রেসের চরমপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে একই ক্ষুরে বাঁধা ছিল। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ বেছে নিয়েছিলেন জাতিয়তাবাদী রাজনীতির পথ। এই সময়ে মহম্মদ আলি জিন্নাহ ও মহম্মদ আলির মতো নেতৃবর্গ মুসলিম লীগের রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেন। মুশিরুল হাসান দেখিয়েছেন যে এই সময়ে হালি, শিবলি, নােমান এবং মহম্মদ ইকবালের রচিত কবিতার অন্তনিহিত ব্রিটিশ বিরোধিতা কীভাবে মুসলিম নবীন প্রজন্মকে উদ্দীপ্ত করেছিল।

১৯১২ সালে মুসলিম লীগ কাউন্সিল লীগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নতুন প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগের নতুন সংবিধান গৃহীত হয়। ১৯১৩ সালেই মুসলিম লীগ স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্য অর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং হিন্দু মুসলিম আলাপ আলােচনার মাধ্যমে যৌথ কর্মসূচী গ্রহণের প্রস্তাব রাখে। কংগ্রেস ও লীগের পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে ১৯১৫ সালে বােম্বাইয়ে একই স্থানে দুই দলেরই অধিবেশন আহুত হয়। ইতিমধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনায় ব্রিটেনের তুরস্ক বিরােধী নীতি ভারতীয় মুসলমানদের ব্রিটিশ বিরূপতা আরাে বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে সামন্ততান্ত্রিক, এলিট নেতৃত্বও আলিগড়ের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার ফলে লীগের দৃষ্টিভঙ্গি চরমপন্থী হয়ে ওঠে। এই সময়ে মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করার আগ্রহ দেখা দেয়। এই আগ্রহের ফলেই ১৯১৬ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে লক্ষ্ণৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়

কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে লক্ষ্ণৌ চুক্তি সম্পাদনে বাল গঙ্গাধর তিলকের বিশেষ ভূমিকা ছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাফল্যের জন্য হিন্দু মুসলিম ঐক্য একান্ত আবশ্যক। হিন্দু মুসলিম ঐক্যেতার আগ্রহ এতােই আন্তরিক ছিল যে লক্ষ্ণৌ চুক্তিতে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা ও রয়তি সুবিধার দাবি মেনে নিতেও তার কোনও আপত্তি ছিল না।

লক্ষ্ণৌ চুক্তির মূল শর্ত গুলি হল - প্রথমতঃ, প্রত্যেক প্রাদেশিক আইনসভার মুসলিম সদস্য সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়। দ্বিতীয়তঃ, কেন্দ্রীয় আইন সভার মােট সদস্য সংখ্যার এক তৃতীয়াংশ হবেন মুসলমান। আরাে স্থির হয়, কংগ্রেস এবং লীগ যৌথভাবে সরকারের কাছে ইণ্ডিয়ান কাউন্সিলের বিলুপ্তি ও সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি জানাবে। সর্বোপরি, লীগ কংগ্রেসের স্বরাজ সংক্রান্ত আদর্শে সম্মতি জানায়।

লক্ষ্ণৌ চুক্তির গুরুত্ব: হিন্দু মুসলিম ঐক্যের ক্ষেত্রে লক্ষ্ণৌ চুক্তি এক দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত। কারণ এই চুক্তির মাধ্যমে ভারতের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল মিলিতভাবে সাম্রাজ্যবাদী সরকারের বিরােধিতায় অগ্রসর হয়েছিল। প্রমাণিত হয়েছিল, হিন্দু মুসলমানের মধ্যবর্তী ব্যবধান অলঙ্ঘনীয় নয়। কিন্তু গান্ধী এই চুক্তি সম্পর্কে বিশেষ আস্থাশীল ছিলেন না। তার মতে, লক্ষ্ণৌ চুক্তি ছিল ধনী শিক্ষিত হিন্দুর সঙ্গে ধনী শিক্ষিত মুসলমানের সমঝোতা বিশেষ। সাধারণ হিন্দু বা মুসলমানের সঙ্গে এই চুক্তির কোনও সম্পর্ক ছিল না। শুধু তাই নয়, এই চুক্তিতে গুরুত্ব আরােপ করা হয়েছিল উভয় সম্প্রদায়ের পৃথক অস্তিত্ব ও স্বতন্ত্র স্বার্থের উপর। রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন যে কংগ্রেস নেতৃবর্গ লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক গাঁটছড়া বাঁধার আশায় সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বকে পর্যন্ত স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এর ফলে ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ আরাে প্রশস্ত হয়েছিল। জুডিথ ব্রাউন লিখেছেন, মুসলিম লীগ সকল স্তরের ভারতীয় মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করে নি। কিন্তু তা হলেও এই ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে মহাত্মা গান্ধীর হাতে নূতন হাতিয়ার তুলে দিয়েছিল। বস্তুতঃ হিন্দু মুসলিম ঐক্যকেই আশ্রয় করে মহাত্মা গান্ধী অসহযােগ খিলাফৎ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।