ইয়াল্টা সম্মেলন কি ?

ইয়াল্টা সম্মেলন কি ?

- January 12, 2020
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর পতন আসন্ন হলে, ইওরােপের পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সমাধানের জন্যে ১৯৪৫ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে তিন প্রধান রুজভেল্ট, চার্চিল ও ষ্ট্যালিন রাশিয়ার ক্রিমিয়া প্রদেশের ইয়াল্টা নগরীতে লিভাদিয়া প্রাসাদে সমবেত হন। এই তিন রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর ভাগ্য-নিয়ন্তা। তাদের সাহায্যের জন্যে ইয়াল্টায় বিভিন্ন পররাষ্ট্র মন্ত্রীরা যথা, মলােটাভ, ইডেন ও ষ্টোটােনাস আসেন। সামরিক বিষয়ে পরামর্শ দানের জন্যে রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সমর বিশারদরা আসেন। তাছাড়া রাষ্ট্রপ্রধানদের সেনাপতিগণ ও বহু বিশেষজ্ঞ, আইনবিদ ও কুটনীতিক, এই সম্মেলনে যােগ দেন। ফ্রেমিং নামক ঐতিহাসিকের মতে, ইয়ান্টা সম্মেলনে তিন রাষ্ট্রপ্রধান অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে আলােচনা করেন। রুজভেল্ট এই সময় ষ্ট্যালিনের প্রতি আস্থা দেখান। চার্চিল তার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থে বলেছেন যে, রুশ সরকার তাদের প্রতি অসাধারণ আতিথেয়তা ও সৌজন্য দেখান।
ইয়াল্টা সম্মেলন ১৯৪৫
জার্মানী সম্পর্কে চুক্তি: ইয়াল্টায় তিন রাষ্ট্রপ্রধান যুদ্ধোত্তর ইওরােপে এবং যুদ্ধমান জার্মানী সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন - যেহেতু জার্মানীর পতন আসন্ন হয়, সেহেতু জার্মানী সম্পর্কে স্থির হয় যে, জার্মানীর পতনের পর মিত্রশক্তি জার্মানীকে ৩টি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করে তিন শক্তির সেনাদল দ্বারা অধিকার করা হবে। এই তিন অঞ্চল ছিল রুশ, মার্কিন ও ব্রিটিশ অধিকৃত অঞ্চল। চার্চিল ও রুজভেল্টের অনুরােধে ষ্ট্যালিন রাজী হন যে, ফ্রান্সকেও জার্মানীর একটি অঞ্চল দেওয়া হবে। কিন্তু রাশিয়া শর্ত আরােপ করে যে, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকৃত অঞ্চল থেকে ফ্রান্সকে দেওয়া হবে। সােভিয়েত অধিকৃত অঞ্চল থেকে কোন স্থান ফ্রান্সকে দেওয়া হবে না। প্রতিটি অঞ্চলে একই প্রকার আইন ও শাসন প্রবর্তনের জন্যে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমিশন স্থাপিত হবে। এতে ৪টি শক্তি যথা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রতিনিধি থাকবে। জার্মানীকে নিরস্ত্রীকৃত, অনাৎসীকৃত, গণতান্ত্রীকৃত এবং একচেটিয়া মুনাফাভােগী কার্টেল মুক্ত করা হবে। সােভিয়েত নেতা ষ্ট্যালিন দাবী করেন যে, জার্মানীকে মিত্র শক্তির ক্ষয়ক্ষতির জন্যে ২০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং এর অর্ধাংশ রাশিয়া পাবে। চার্চিল ও রুজভেল্ট ক্ষতিপূরণ গ্রহণের সম্পর্কে নীতিগত সম্মতি দিলেও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সম্পর্কে আপত্তি জানান।

পোল্যান্ড সম্পর্কে চুক্তি: জার্মানীর পতনের পর স্বাধীন পােল্যান্ড রাষ্ট্র গঠনের জন্যে তিন প্রধান একমত হন। (১) পােল্যান্ডের পূর্ব সীমান্ত অর্থাৎ রাশিয়া ও পােল্যান্ডের সীমান্ত কার্জন লাইন বরাবর রাখা হবে বলে স্থির হয়। এর ফলে প্রাক-যুদ্ধকালীন পােল্যান্ডের প্রায় ৪৭% রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়। (২) পােল্যান্ডের পূর্ব সীমান্ত অর্থাৎ জার্মানী ও পােল্যান্ড সীমান্ত ষ্ট্যালিন ওডার-নীসি রেখা বরাবর দাবী করেন। কিন্তু চার্চিল ও রুজভেল্ট এতে আপত্তি জানান। শেষ পর্যন্ত এই সীমান্তের প্রশ্নটি ভবিষ্যতের জন্যে মূলতুবী রাখা হয়। (৩) পােল্যান্ডে কোন প্রকার সরকার স্থাপিত হবে এ সম্পর্কে তিন প্রধানের কোন নির্দিষ্ট ঐক্যমত না হলেও, একথা স্থির হয় যে, পােল্যান্ডে অবাধ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পােল সরকার গঠিত হবে। সর্বসাধারণের ভােটাধিকারের ভিত্তিতে গােপন ভােট নেওয়া হবে। কিন্তু এর সঙ্গে ষ্ট্যালিন শর্ত জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, পােল্যান্ডে যে সরকার হবে তা সােভিয়েত রাশিয়ার প্রতি মিত্রভাবাপন্ন এবং সােভিয়েত রাশিয়ার পক্ষে গ্রহণযােগ্য হওয়া চাই। অপরদিকে চার্চিল শর্ত জোড়ার চেষ্টা করেন যে, ১৯৩৯ খ্রীঃ নাৎসী আক্রমণের সময় পােল্যান্ডের যে বৈধ সরকার উতখাৎ হয়ে লন্ডনে আশ্রয় নেয়, তাকে এই নির্বাচনে যােগদানের অধিকার দিতে হবে।

ইয়াল্টার ঘােষণাপত্র: তিন প্রধান ইয়াল্টার ঘােষণাপত্র দ্বারা, যে সকল দেশকে জার্মান অধিকার থেকে মুক্ত করা হবে সেই দেশগুলির পুনর্গঠনে মূলনীতি ব্যাখ্যা করেন। এই ঘােষণাপত্রে বলা হয় যে, (১) ইওরােপে যে সকল পরিবর্তন সাধন হবে তা আটলান্টিক সনদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে করা হবে। বলা বাহুল্য, আটলান্টিক সনদে বলা হয়েছিল যে, প্রতি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অক্ষুন্ন রাখা হবে। (২) এই ঘােষণাপত্রে আরও বলা হয় যে, অক্ষশক্তির মিত্র স্থানীয় দেশগুলির জনসাধারণকে আশ্বাস দেওয়া হয় যে, তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাবলীর গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাধান করা হবে। (৩) এই উদ্দেশ্যে তিন প্রধান আশ্বাস দেন যে, আত্মসমর্পণ করার পর এই দেশগুলিতে অন্তবর্তী সরকার গঠন করা হবে। স্বাধীন ও অবাধ গণতান্ত্রিক নির্বাচন দ্বারা এই দেশগুলির স্থায়ী সরকার গঠিত হলে তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে এবং তাদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্থাপিত হবে।

দূর প্রাচ্য যুদ্ধে রাশিয়ার যোগদান সম্পর্কে চুক্তি: দূর প্রাচ্য সম্পর্কে ব্রিটেন ও আমেরিকার সঙ্গে সােভিয়েত রাশিয়ার ইয়ান্টায় চুক্তি হয়। যেহেতু তখনও জাপান পূর্ণ উদ্যমে যুদ্ধ চালাচ্ছিল এবং জাপানের মূল ভূখণ্ডে মিত্র শক্তির সেনা নামার কোন ব্যবস্থা হয়নি, সেহেতু প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তার সমরনায়কদের পরামর্শ গ্রহণ করেন। জাপানের শক্তি এবং জাপানী সেনার আত্মরক্ষার ক্ষমতা লক্ষ্য করে মার্কিন সেনাপতিরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, (১) জাপানের শ্রেষ্ঠ স্থলসেনা মাঞ্চুরিয়ায় রাখা আছে। এই সেনাদলকে মাঞ্চুরিয়ায় আবদ্ধ রাখার জন্যে সােভিয়েত শক্তির সাহায্য দরকার। (২) জাপানে অবতরণের পর হাতাহাতি যুদ্ধে জাপানের অসংখ্য সেনার মােকাবিলার মত লােকবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেই। ব্রিটেনের সেনাদল ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্যস্ত থাকবে। সুতরাং জাপানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে হলে সােভিয়েত সামরিক শক্তির সাহায্য দরকার। তখনও পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আণবিক বােমা আসেনি। কাজেই জাপান দখলের জন্যে পদাতিক সেনার দরকার হয়।

Advertisement
এমতাবস্থায় ইয়াল্টা বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট অনুরােধ করেন যে, জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়াকে যােগ দিতে হবে। ষ্ট্যালিন এক্ষেত্রে প্রথমে রাশিয়ার যােগ দেওয়ার ব্যাপারে অনিচ্ছা প্রকাশ করে কারণ দেখান যে রাশিয়া রণক্লান্ত, রুশ জনমত আর যুদ্ধ চায় না। শেষ পর্যন্ত তিনি বলেন যে, যদি তার কয়েকটি শর্ত পূরণ করা হয় তবে তিনি জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যােগ দিবেন। রুজভেল্ট ষ্ট্যালিনের এই গোপন শর্তগুলি স্বীকার করে নেন। শর্তগুলিতে বলা হয় যে — (১) মঙ্গোলিয়ায় রাশিয়ার প্রাধান্য স্বীকৃত হবে। (২) কিউরাইল দ্বীপপুঞ্জে রাশিয়ার আধিপত্য স্বীকার করা হবে। (৩) শাখালিন দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ ভাগ রাশিয়াকে ছেড়ে দিতে হবে। (৪) মাঞ্চুরিয়ায় রুশসেনার অবস্থান স্বীকৃতি পাবে। (৫) দক্ষিণ মাঞ্চুরীয় রেলপথ, পাের্ট আর্থার, ডাইরেন বন্দরদ্বয় রুশ-চীন দ্বৈত নিয়ন্ত্রণে থাকবে। (৬) মাঞ্চুরিয়ার ওপর চীনের সার্বভৌম অধিকার রাশিয়া স্বীকার করবে। এই শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া দূর প্রাচ্যে জাপানের বিরুদ্ধে সেনা সমাবেশে রাজী হয়। জার্মানীর আত্মসমর্পণের তিন মাসের মধ্যে উপরােক্ত শর্ত সাপেক্ষে রাশিয়া জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যােগ দিতে রাজী হয়।

জাতিপুঞ্জ গঠনের সিদ্ধান্ত: ইয়াণ্টা বৈঠকে জাতিপুঞ্জ বা U. N. O গঠন সম্পর্কে ইঙ্গ-মার্কিন-রুশ মত বিনিময় হয়। ষ্ট্যালিন জাতিপুঞ্জে সােভিয়েত রাশিয়ার যােগদান সম্পর্কে শর্ত আরােপ করেন যে, জাতিপুঞ্জের জাতি গঠন সাধারণ সভায় সােভিয়েত রাশিয়া ছাড়া বাইলাে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের স্বতন্ত্র আসন ও ভােটাধিকার থাকবে। মার্শাল ষ্ট্যালিন এই দাবী দ্বারা সােভিয়েত স্বার্থ এবং জাতিপুঞ্জে সােভিয়েত গরিষ্ঠতা রক্ষার চেষ্টা করেন। রুজভেল্ট ও চার্চিল এই দাবি স্বীকার করে নেন।

ইয়াল্টা সম্মেলনের সমালোচনা: কিছুদিনের মধ্যে ইয়াল্টার উচ্চাশা ও আদর্শবাদ লুপ্ত হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিমী শক্তিগুলির মধ্য নগ্ন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও ঠান্ডা লড়াই যুদ্ধকালীন মিত্রতার পরিবেশকে কলুষিত করে। ইয়াল্টার অব্যবহিত পরেই রুজভেল্টের অকস্মাৎ মৃত্যু হয়। উপরাষ্ট্রপতি হ্যারী টুম্যান মার্কিন রাষ্ট্রপতি পদে বসেন। এদিকে ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচনে চার্চিল ও তার দল পরাস্ত হয়। শ্রমিক দলের জয়লাভের ফলে এই দলের নেতা ক্লেমেন্ট এটলী ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হন। এই দুই নেতা ছিলেন নবাগত এবং ষ্ট্যালিনের সঙ্গে তাদের কোন যােগাযােগ ও বােঝাপড়া ছিল না। ফলে নেতাদের মধ্যে আস্থার অভাব দেখা দেয়। এছাড়া রুজভেল্টের দূরপ্রাচ্য সম্পর্কীয় ইয়াল্টা শর্তগুলি মার্কিন কংগ্রেস, মার্কিন সেনাপতিমণ্ডলী বা পেন্টাগণের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এজন্য আমেরিকায় সমালােচনা করা হয় যে - “রুজভেল্ট ইয়াল্টায় ষ্ট্যালিনের নিকট আত্মসমর্পণ করেন।" ইয়াণ্টা চুক্তির কালি শুকাবার আগেই রুশ বিদেশমন্ত্রী ভিসিনিস্কির হস্তক্ষেপে রুমানিয়ার রাজা মাইকেল তার কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা বরখাস্ত করে রাশিয়ার মনােনীত কমিউনিষ্ট মন্ত্রীসভা গঠনে বাধ্য হন। সুতরাং ইয়াল্টা চুক্তির মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই এর বীজ নিহিত ছিল।