Advertise

তেভাগা আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা কি ছিল?

বাংলাদেশের ভাগচাষি বা বর্গাদার কৃষকেরা মালিকের জমি নিজ খরচে চাষ করত এবং উৎপন্ন ফসলের ১/২ অংশ মালিককে দিতে বাধ্য হত যা আধিয়ার প্রথা নামে পরিচিত। এই প্রথার বিরুদ্ধে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলার ভাগচাষিরা উৎপন্ন ফসলের ২/৩ অংশ বা তিনভাগের দুই ভাগ ফসল এবং নিজ খামারে ফসল তােলার দাবিতে যে আন্দোলন শুরু করে তা তেভাগা আন্দোলন নামে পরিচিত। তেভাগা আন্দোলন প্রথম শুরু হয় দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমার অন্তর্গত রামচন্দ্রপুর গ্রাম থেকে এবং ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ে রংপুর, ঢাকা, মালদহ, জলপাইগুড়ি, ২৪ পরগনা প্রভৃতি জেলায়। ইলা মিত্র রাজশাহীর নবাবগঞ্জ অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তিনি এজন্য জেল পর্যন্ত খেটেছেন।
তেভাগা আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা
বর্গাদারদের দাবী ছিল যে জমিতে আইন মাফিক অধিকার দিতে হবে। ফসল তিন ভাগে ভাগ করা হবে — একভাগ হবে চাষীর, একভাগ জোতদারের এবং তৃতীয়ভাগ চাষী পাবে খরচ বাবদ অর্থাৎ কৃষক পাবে ফসলের দুই তৃতীয়াংশ। ময়মনসিংহ, মালদা, দিনাজপুর, যশাের, চব্বিশ পরগণা, মেদিনীপুর প্রভৃতি অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়। কৃষকদের রণধ্বনি ছিল — "জান দেব তবু ধান দেব না।" জমির মালিকের সাহায্যে গ্রামে লাঠি আর বন্দুকধারী পুলিশ ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ সালে প্রথম পর্বে ধান কাটা নিয়ে লড়াই চলে। পুলিশের সঙ্গে মালিকপক্ষ গুন্ডা দিয়ে ফসল তােলা শুরু করে। ভাগচাষী বা বর্গাদার মাঠে নামলে লাঠি গুলি চলতে লাগল। ১৯৪৮-১৯৪৯ সালে দ্বিতীয় পর্বে যখন কৃষক নিজের গােলায় ধান তুলতে থাকে, তখন তার ধান লাঠি ও গুলির সাহায্যে কেড়ে নেওয়া হত এবং সেটা না পারলে ধানের গােলায় এবং কৃষকের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হত। গােলার ধান বাঁচাতে বহু কৃষক ও কৃষক বধুর প্রাণনাশ হয়েছিল।

মণিকুন্তলা সেন এই প্রসঙ্গে কৃষক মেয়েদের ভূমিকার চিত্র তার "সেদিনের কথা"য় তুলে ধরেছেন। প্রথম থেকেই এই ধরনের লড়াইতে কৃষক মেয়েরা দল বেঁধে পুরুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। গ্রামে পুলিশদের মধ্যে কৃষকদের নিশ্চিহ্ন করার একটা উন্মাদনা দেখা গিয়েছিল। মেয়েদের এবার সামনের সারিতে দাঁড়াতে হল। তাদের আদিম অস্ত্র — দা, বটি, ঝাটা, লঙ্কার গুড়ো প্রভূতি নিয়ে। পুলিশ আসছে জানতে পারলে মেয়েরাই শঙ্খধ্বনি করে গ্রামবাসীদের কাছে সংকেত পৌছে দিত এবং ছেলেরা জঙ্গলে আশ্রয় নিত। নেতাদের সঙ্গে যােগাযােগ বরাখার কাজটাও মেয়েরাই করত। মেয়েরা পুলিশের হাতে মুখােমুখি লড়াই করত, ধানের গোলায় আগুন লাগলে মেয়েরাই ঝাপিয়ে পড়ে নেভাত। তারা অত্যাচারিত হত এবং যা পেত তাই দিয়ে প্রত্যাঘাত করত। কিন্তু পুরুষদের সামনে আসতে দিত না। পুরুষদের না পাওয়ায় পুলিশ এবং গুন্ডা মেয়েদের উপর অকথ্য অত্যাচার করে।

স্বাধীনতা রিপাের্ট থেকে জানা যায় যে আন্দোলন চলাকালীন মেয়েদের উপর কিভাবে অত্যাচার করা হত। তাদের বাড়ী থেকে হিচড়ে টেনে আনা হত এবং নগ্ন করে বেত মারা হত। অনেক নারীকে শান্তি স্বরূপ ধর্ষণ করা হত। বিভিন্ন জায়গায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে মহিলা নারী বাহিনী তৈরী করে এবং অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের ঘেরাও ভেঙ্গে গ্রামে প্রবেশ করতে পারত না। বিমলা মাঝি মেদিনীপুর জেলায় নারীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন যে প্রথমে গ্রামের মহিলারা কথা বলতে পর্যন্ত ভয় পেত। কিন্তু আস্তে আস্তে ঘরের ভিতর থেকে প্রতিরোধ আন্দোলনে যােগ দিতে লাগল। বিমলা মাঝির নেতৃত্বে জোতদারদের ধানের গােলা নষ্ট করা হয় এবং নদীতে চলা ছোটো ছোটো স্টিমারগুলির কাছে ধান বিক্রি করে দেওয়া হত।

বর্গাদার চাষী বা কৃষক শ্রমিক মহিলারা সবচেয়ে বেশি শােষিত হত। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে একদিকে তারা ঘরে অত্যাচারিত হত এবং অপরদিকে জমিদার ও জোতদাররা তাদের শােষণ করত। ফলে আন্দোলনের সময় তাদের যােদ্ধা মনােভাব প্রকাশ পায়। তারা নারী বাহিনীর সাহায্যে ফসল বাঁচানাের উদ্দেশ্যে জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যােগদান করেছিল।