তেভাগা আন্দোলন : ঐতিহাসিকদের মধ্যে তর্ক বিতর্ক

তেভাগা আন্দোলন : ঐতিহাসিকদের মধ্যে তর্ক বিতর্ক

- January 28, 2020
উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ দাবিতে বর্গাদার কৃষকরা জমিদার-জোতদারদের বিরুদ্ধে যে সংঘবদ্ধ সংগ্রামে লিপ্ত হয়, তা তেভাগা আন্দোলন নামে পরিচিত। তেভাগার আক্ষরিক অর্থ হল তিন ভাগ। ১৯৪৬ সালের নভেম্বর মাস থেকে ফসল তােলার মরসুমে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে (দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁও মহকুমা, রংপুরের নীলফামারী মহকুমা ও জলপাইগুড়ির দেবীগঞ্জ বােদা ও পচাগড় — তিনটি থানায়) প্রথম তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়। ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই তা দ্রুত ভাগচাষী-বর্গাদার ও টঙ্ক আন্দোলন রূপে ছড়িয়ে পড়ে মেদিনীপুর, খুলনা, ২৪ পরগণা, ময়মনসিংহ সহ এগারােটি জেলায়। ১৯৪৭ এর জানুয়ারি থেকেই বাংলার মােট উনিশটি জেলার ৬০ লক্ষ ভাগচাষী কোন না কোনভাবে তেভাগা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এখন প্রশ্ন হলাে — তেভাগা আন্দোলন, অর্থাৎ ভাগচাষীদের উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ অধিকারের দাবি ওই সময়েই কেন উঠলাে এবং কারাই বা সে আন্দোলন গড়ে তুললাে? গবেষক জ্ঞানব্রত ভট্টাচার্য এই আন্দোলনের দায় দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবেই অর্পণ করেছেন কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সভার উপর। তার মতে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তেভাগা আন্দোলন শুরু হবার দুমাস পূর্বেই (১৯৪৬ এর সেপ্টেম্বরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভার কাউন্সিল সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়) কৃষক আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।
তেভাগা আন্দোলনের সময় সােমনাথ হােড় আঁকা কৃষকদের চিত্র
জ্ঞানব্রত ভট্টাচার্য মতে, তেভাগা আন্দোলন ছিল "অ্যান অরগানাইজড রিভোল্ট বাই অ্যান অরগানাইজিং এজেন্সী।” ডঃ সুগত বসু তার গবেষণা গ্রন্থে এই অভিমতকেই সমর্থন জানিয়েছেন। জ্ঞানব্রত ভট্টাচার্য এবং ডঃ সুগত বসু উভয়েরই মত হলাে কৃষক সভা (বকলমে কমিউনিস্ট পাটি) এই আন্দোলন ভাগচাষীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল (যদিও সুগত বসু ১৯৪৬-১৯৪৭ এর ভাগচাষী আন্দোলনকে আদৌ কোন বিরাট ও ব্যাপক কৃষক সংগ্রাম মনে করেন না)। আঁদ্রে বেতেই তেভাগা আন্দোলন সম্পর্কে আরও বিরূপ মনােভাব প্রকাশ করেছেন। প্রথমত তিনি মনে করেন কমিউনিস্টদের এজেন্ট রূপে কৃষক সভা এমন একটি আন্দোলন কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল যা কৃষি সংক্রান্ত দাবি বা ভাগচাষীদের স্বার্থ রক্ষার অনুকুল ছিল না। দ্বিতীয়ত কৃষক সভা আদৌ একটি কৃষক সংগঠন নয়। আঁদ্রে বেতেই এর এই শেষ বক্তব্যটি একেবারেই গুরুত্বহীন। কৃষক সভার সাংগঠনিক কাঠামাে, সম্মেলনের দলিলপত্র, ১৯৩৬ সালের জন্মকাল থেকে তার ভূমিকা ও কার্যাবলী সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা আছে এমন কেউই তার সঙ্গে একমত হবেন না।

একইভাবে জলপাইগুড়িতে বর্গাদাররা নিজেরাই ঝাপিয়ে পড়েছিল মুসলমান জোতদারদের বিরুদ্ধে। দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ, কুশমণ্ডি ইটাহার থানা এলাকায় ভূজুটুভুর নেতৃত্বে তীর ধনুকধারী সাঁওতাল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তেভাগা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। কোনাে সাঁওতাল মাঝি বা গ্রামের মােড়লের নির্দেশের পরােয়া তারা করেনি। আদিবাসী গােষ্ঠী যে ভাগচাষী আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল তা তাদের রাজনৈতিক চেতনা বিকাশেরই পরিচায়ক। ডঃ পার্থ চ্যাটার্জী তাই যথার্থভাবেই বলেছেন, কোন ঐতিহ্যগত বা গােষ্ঠীগত আনুগত্য বা বন্ধনের দ্বারা নয়, শ্রেণীসার্থই কৃষক সমাজকে তাদের দাবি আদায়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল। খ্যাতনামা ঐতিহাসিক অধ্যাপক বিনয়ভূষণ চৌধুরী তার প্রবন্ধে জ্ঞানব্রত ভট্টাচার্য, ডঃ সুগত বসু ও আঁদ্রে বেতেই -র বক্তব্যসমূহ বাতিল করে দিয়ে বলেছেন কৃষক সভা হঠাৎ করে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ভাগচাষীদের উসকে দেয়নি। তার একটি অতীত সংগ্রামী ঐতিহ্য আছে। গবেষকদের দেখা উচিত ১৯৪৬-১৯৪৭ সালে কেন ভাগচাষী আন্দোলন বাংলায় এত ব্যাপক রূপ পরিগ্রহ করেছিল।

অধ্যাপক বিনয়ভূষণ চৌধুরী স্পষ্টভাবেই জ্ঞানব্রত ভট্টাচার্য -র প্রদত্ত সিদ্ধান্তকে খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে, কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য বা জনযুদ্ধ নীতির ক্ষত ঢাকার জন্য তেভাগা আন্দোলনের ডাক দিতে হয়েছিল, এই ধারণা সঠিক নয়। তার মতে — যুদ্ধ শেষ হয়েছিল ১৯৪৫ এর মে মাসে। তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৬ এর নভেম্বরে। সুতরাং এই দুই এর মধ্যে যােগাযােগ থাকার সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। জনযুদ্ধনীতি শহুরে মধ্যবিত্তদের একটি অংশকেই হয়তো কমিউনিস্টদের থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলাে, কিন্তু কৃষকদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।

যাইহােক অধিকাংশ ঐতিহাসিকই এবিষয়ে একমত যে, (১) তেভাগা আন্দোলন কমিউনিস্ট পার্টি বা কৃষকসভার দ্বারা ভাগচাষীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া কোন কার্যক্রম নয়। (২) কৃষক সমস্যা সংক্রান্ত বিষয় ও তার সমাধানই তেভাগা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ছিল। (৩) সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন না হলেও তেভাগা আন্দোলন শুরু করার পশ্চাতে কৃষক সমাজের নিজেদের পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ চাপ যথেষ্ট পরিমাণে ছিল। সুনীল সেন, ভবানী সেন, অবনী লাহিড়ী, কৃষ্ণবিনােদ রায়, সুশীল সেন প্রমুখ তৎকালীন কৃষকসভার নেতারা স্বীকার করেছেন যে, আন্দোলন শুরু করা ও পরিচালনার প্রশ্নে নেতৃত্বের মধ্যেই কিছু দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছিল।

তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত হওয়ার প্রশ্নে অপর বিতর্কটি হল 'সাম্প্রদায়িকতা'। সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থে আদ্রিয়েন কুপার অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, তেভাগা কৃষক আন্দোলন ছিল কার্যত মুসলিম পলিটিকস এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ভাগচাষী, বর্গাদারদের শ্রেণীভিত্তি যাইহােক না কেন তারা মূলত পরিচালিত হয়েছিল সাম্প্রদায়িক মনােভাবের দ্বারা। অর্থনৈতিক বা শ্রেণী স্বার্থে নয়, কৃষকরা ১৯৪৬-১৯৪৭ সালে পরিচালিত হয়েছে ধর্মীয় গােষ্ঠীরূপে। যেহেত সেসময় বাংলাদেশে মুসলমান ভাগচাষীরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং জমিদার-জোতদারদের মধ্যে হিন্দু ধর্মীয় গােষ্ঠীর লােকসংখ্যাই ছিল বেশি — এই কারণে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক চেতনার দ্বারাই তারা সংঘবদ্ধ হয়েছিল। হিন্দু জমিদার সাহা জোতদার — এই ধরনের ধ্বনিও মুসলমান ভাগচাষীদের আন্দোলনে নামতে প্ররােচিত করেছিল। অধ্যাপক ধনাগারে তার গবেষণায় ভাগচাষীদের এই গােষ্ঠীগত আনুগত্যের উপরেই অধিক জোর দিয়েছেন। তার মতে মুসলিম কৃষকেরা অধিক সংখ্যায় ক্রমশ মুসলিম লীগ রাজনীতি ও পাকিস্থান দাবির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল, ফলে কৃষক সভার পক্ষে কৃষকদের নিয়ে জোতদারদের বিরুদ্ধে শ্রেণী আন্দোলন গড়ে তুলতে অসুবিধার সৃষ্টি হয়।

শ্রেণীচেতনার স্থলে সাম্প্রদায়িক চেতনার কবলে বাংলার কৃষক সমাজের চলে যাওয়ার ধারণাকে পিটার কাস্টার্স নস্যাৎ করে দিয়েছেন। তার গবেষণায় তিনি বাংলার দরিদ্র-কৃষক, ভাগচাষী-বর্গাদার, ক্ষেতমজুরদের রাজনীতিক শ্রেণীসচেতনতাকে এবং সেই প্রসঙ্গে কৃষকসভার ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েই স্বীকার করেছেন। ১৯৪৬ সালে আগস্ট-সেপ্টেম্বর সাম্প্রদায়িকতার আগুন যে গ্রাম বাংলাকে তেমনভাবে স্পর্শ করতে পারেনি, কৃষক-সমাজের শ্রেণীচেতনাই তার কারণ বলে কাস্টার্স উল্লেখ করেছেন। তার মতে, তেভাগা আন্দোলন গ্রামবাংলায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে রুখে দিয়েছিল। প্রখ্যাত শিল্পী সােমনাথ হােড় তেভাগার দিনগুলিতে বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরেছিলেন। তার তেভাগার ডায়েরীতে তিনি বলেছেন, কৃষক সমাজের কাছে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ উভয়েই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কংগ্রেসকে হিন্দু আধিয়াররা এবং মুসলিম লীগকে মুসলিম আধিয়াররা নিজেদের শত্রু বলেই মনে করতাে।

Advertisement
অধ্যাপক বিনয়ভূষণ চৌধুরী মুসলিম ভাগচাষীদের উপর মুসলিম লীগ এর ব্যাপক প্রভাবের সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছেন। নানা তথ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, যেসব স্থানে কৃষক সভার সংগঠন দুর্বল কিংবা অনুপস্থিত সেখানেই কেবলমাত্র মুসলিম লীগের দ্বিজাতি তত্ত্ব সামান্যভাবে মুসলিম কৃষকদের প্রভাবিত করেছিল। অনেক স্থানে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বামপন্থী কর্মীরাও কৃষক সভা এবং কমিউনিস্ট কর্মীদের সঙ্গে কাজ করেছিল। যদিও এ বিষয়ে কোনাে সন্দেহই নেই যে, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একইভাবে তেভাগা আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য সাম্প্রদায়িক প্রচার চালিয়েছিল। বিশেষ করে কৃষক সভার বহু নেতা ও কর্মী সাক্ষ্য দিয়েছেন, কিভাবে মুসলিম লীগ মৌলানা-মৌলবীদের কাজে লাগিয়েছিল কৃষকদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক প্রচার চালানাের জন্য। এমনকি কৃষকসভার সঙ্গে যুক্ত মুসলিম কর্মীদের ধর্মচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হতাে এবং তারা প্রকৃত মুসলমান নয় বলেও প্রচার করা হতাে।

কিন্তু অধ্যাপক ধনাগারে কিংবা কুপারের গােষ্ঠীগত আনুগত্য বা সাম্প্রদায়িক চেতনার দাবি একেবারেই টেকে না। তা যদি হতাে তবে দিনাজপুরের রাজবংশী কৃষকেরা ক্ষত্রিয় সভার নির্দেশ শিরােধার্য করে রাজবংশী জোতদারদের বিরুদ্ধে কথা বলতো না। মনে রাখা উচিত, রাজবংশীদের অভিভাবক স্থানীয় ক্ষত্রিয় সভার (যারা জোতদারদের ক্রীড়নক ছিল) চোখ রাঙানিকে অগ্রাহ্য করেই ১৯৪৬ সালে নির্বাচনে প্রধানত রাজবংশী কৃষকেরাই কমিউনিস্ট প্রার্থী রূপনারায়ণ রায়কে জয়ী করেছিলেন। রণজিৎ গুহ যে স্বয়ংক্রিয় কৃষক আন্দোলনের কথা বলেছেন, উত্তরবঙ্গের তেভাগা কৃষক সংগ্রামে তার কিছু উদাহরণ বিদ্যমান।

সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নটিকে আর একরকমভাবে বলেছেন ডঃ অশােক মজুমদার। তার মতে, যেহেতু ভাগচাষীদের অধিকাংশই মুসলমান সেহেতু প্রথম দিকে সাম্প্রদায়িক স্বার্থেই মুসলিম লীগ তেভাগা আন্দোলনকে সমর্থন জুগিয়েছিল। কিন্তু যখন একটি শ্রেণী আন্দোলন রূপে তেভাগার আন্দোলন উত্তাল হয়ে উঠে তখনই লীগ সরকার আতঙ্কিত হয়ে 'বর্গাদার বিল ১৯৪৭' পাশ করে আন্দোলন দমনে কৌশল ও চরম পীড়নের আশ্রয় নেয়। কিন্তু মুসলিম লীগ যদি সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির উপাদানরূপে তেভাগা আন্দোলনকে দেখে থাকে, তবে সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শ্রেণী চেতনার অস্ত্র রূপেই তেভাগাকে দেখেছিলেন কৃষক সভার নেতৃত্ব। কুণাল চট্টোপাধ্যায় এই বিষয়ে কিছু অনুসন্ধান করেছেন। কৃষক সভার তৎকালীন সভাপতি কৃষ্ণবিনােদ রায়, দিনাজপুরের কৃষক নেতা ও পরবর্তীকালের অধ্যাপক সুনীল সেন এবং আরো অনেক প্রবীণ তেভাগা সংগঠকের মন্তব্য তুলে ধরে কুণাল দেখিয়েছেন যে, তেভাগা আন্দোলন গড়ে তােলার যে সিদ্ধান্ত কমিউনিস্ট পার্টি নিয়েছিল তার কয়েকটি কারণের অন্যতম হলাে কমিউনিস্ট পার্টি দাঙ্গা ঠেকাতে তেভাগাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। আর একজন গবেষক সত্যজিৎ দাশগুপ্ত গােয়েন্দা পুলিশ বিভাগের রিপাের্ট থেকে একই তথ্য তুলে ধরেছেন।

প্রখ্যাত সাংবাদিক নিখিল চক্রবর্তী যথার্থভাবেই লিখেছিলেন, “যদি কোনাে একটি উপাদান উত্তরবঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার আগুন প্রজ্জ্বলিত হওয়া এড়াতে সাহায্য করে থাকে, তবে তা হল অশিক্ষিত আধিয়ার (ভাগচাষী) দের এই লড়াই।" "বলাবাহুল্য শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, পূর্ববঙ্গের অনেকস্থানেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে হিন্দু মুসলিম কৃষক সমাজের যৌথ প্রতিরােধ গড়ে উঠেছিল, এর প্রমাণ ডিমলা থেকে নীলফামারির ঐতিহাসিক কৃষক নিছিল।"

কুণাল চট্টোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরােধের এমন কার্যকর অস্ত্র কেন কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৪৭ সালে এপ্রিল থেকে দাঙ্গা শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাখান করলেন। যে তেভাগার লড়াই ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসের দাঙ্গার কালিমা অনেকখানি মুছে দিতে পেরেছিল বলে মনে করা হয়, তা কি পারতাে না ১৯৪৭ সালের নােয়াখালির দাঙ্গাকে হটিয়ে দিতে? কৃষ্ণবিনােদ রায় বলেছেন, তা সম্ভব ছিল না, কারণ এপ্রিল ১৯৪৭ এর দাঙ্গার ফলে মুসলিম কৃষকেরা সর্বত্র আন্দোলন থেকে সরে যাচ্ছিলেন। ফলে নেতৃত্বকে তার দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টাতে হয়েছিল। অধ্যাপক বিনয়ভূষণ চৌধুরী এই মর্মান্তিক পরিণতির জন্য কমিউনিস্ট নেতৃত্বের অপরিণামদর্শী নীতিকে (যেমন পাকিস্তান দাবিকে সমর্থন) এবং কৃষকদের মধ্যে রাজনৈতিক শিক্ষা প্রদানের গাফিলতিকেই দায়ী করেছেন। কুণাল চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, উচ্চতম স্তরে নেতৃত্বই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছিল। তবে শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাই তেভাগা আন্দোলন প্রত্যাহারের একমাত্র কারণ, এটা মনে করা বােধহয় ঠিক নয়। সরকারী দমননীতির সামনে তেভাগ আন্দোলনকে আর এক পা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়ােজন ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের ঘােষণা। কৃষক সমাজ তার জন্য প্রস্তুত থাকলেও দ্বিধাগ্রস্থ পার্টি নেতৃত্ব নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেননি। সুমিত সরকার আক্ষেপ করেছেন, কৃষকদের হাতে লাঠির বদলে রাইফেল তুলে দেওয়া যায় নি বলে। সে পরিস্থিতি তখন ছিল কিনা তা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক রয়েছে।