রাওলাট আইন কি ?

রাওলাট আইন কি ?

- January 18, 2020
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইনের দ্বারা ভারতীয় জনগণকে তুষ্ট করতে সচেষ্ট হয়, অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন ও গণঅসন্তোষ দমনের জন্যে প্রবর্তন করে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ রাওলাট আইন। বৈপ্লবিক কার্যকলাপের মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে বড়লাটের আইন সচিব সিডনি রাওলাটের সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। রাওলাট কমিটি কতগুলি সুপারিশ করে - (১) সন্দেহভাজন যে কোন ব্যক্তিকে বিনা পরােয়ানায় গ্রেপ্তার করা যাবে, (২) আটক ব্যক্তিকে বিনা বিচারে বন্দী রাখা যাবে, (৩) বিশেষ আদালতে তার বিচার হবে, (৪) ঐ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে অপীল করা যাবে না, (৫) সরকার বিরোধী যে কোন প্রচার দণ্ডনীয় বলে ঘােষণা করে।
এই প্রস্তাবগুলি বিল আকারে সরকার কেন্দ্রীয় আইনসভায় উপস্থিত করে। রাওলাট বিল নামে পরিচিত এই বিলের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় আইনসভায় সমস্ত বেসরকারী সদস্য তীব্র প্রতিবাদ জানান। যুক্তপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বেরার এবং বােম্বাই এর বিভিন্ন পত্রপত্রিকাগুলি বিশেষত, দি ইন্ডিয়ান সােসাল রিফর্মার, পাঞ্জাবের দি ট্রিবিউন, বাংলার অমৃতবাজার পত্রিকা এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করে। কেন্দ্রীয় আইনসভা থেকে মদনমােহন মালব্য, মহম্মদ আলি জিন্না, মাজাহার উল হক এবং মধ্যপ্রদেশের আইনসভা থেকে বি. ডি. মুকুল পদত্যাগ করেন। তেজবাহাদুর সাপ্রু সরকারের এহেন পদক্ষেপকে নীতিহীনভাবে ভ্রান্ত, অপ্রযোজ্য এবং সামান্যীকরণের দোষে দুষ্ট বলে অভিহিত করেন।

জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ শাসনকে শয়তানের রাজ্য বলে চিহ্নিত করে রাওলাট বিলকে নির্যাতনের প্রমাণ রূপে সমালােচনা করেন। গান্ধিজি এই আইনের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। রাওলাট সত্যাগ্রহ ছিল ভারতবর্ষে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রথম রাজনৈতিক ধর্মঘট। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এই আইনকে ‘অসহযােগ আন্দোলনের জনক' বলে অভিহিত করেছেন।

স্বৈরাচারী আমলাতন্ত্র এই আইন হাতে পেয়ে পাঞ্জাব অঞ্চলে প্রচণ্ডভাবে দমন চালাতে থাকে। গান্ধীজি এই আইনের সমালােচনা করে বলেন, “আপীল নেহি, দলিল নেহি, উকিল নেহি”। রাওলাট আইন পাশ হওয়ার সময় বড়লাটের আইন সভায় ভারতীয় সদস্য শঙ্কুরণ নায়ার ছিলেন যিনি একমাত্র এই আইনের বিরুদ্ধে ভােট দেন এবং প্রতিবাদে সদস্যপদ পরিত্যাগ করেন।

গান্ধীজি বলেন যে, “এই সেদিন পর্যন্ত ভারতবাসী খোলা মনে ইংরাজকে যুদ্ধ জয়ে সাহায্য করার পর, তাদের বিরুদ্ধে এরূপ দমনমূলক আইন পাশ করা লজ্জাজনক ঘটনা"। তিনি এই আইনের প্রতিবাদে ৬ই এপ্রিল, ১৯১৯ খ্রীঃ ভারতব্যাপী হরতাল ডাকেন। এই হরতাল সকল স্থানে অহিংসে ছিল না। কোন কোন স্থানে জনতা পুলিশে খণ্ডযুদ্ধ হয়।

রবীন্দ্রকুমারের মতে, গুজরাট, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের কিছু অংশ ছাড়া হরতাল ব্যর্থ হয়। বাংলায় দেশবন্ধু হরতাল পালনে উৎসাহ দেননি। রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে যতটা প্রতিবাদ দেখা দেয় তা জনসাধারণের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্যে, সরাসরি রাওলাট আইনের জন্যে নয়।

যাই হােক, মহাত্মা গান্ধী শেষ পর্যন্ত রাওলাট সত্যাগ্রহ প্রত্যাহার করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, যদি কংগ্রেস হরতাল ও সত্যাগ্রহ সমর্থন না করে তবে সর্বভারতীয় স্তরে সাফল্য পাওয়া কঠিন। তাছাড়া রাওলাট আইনের দমনমূলক নীতির শিকার হচ্ছিলেন প্রধানতঃ রাজনীতিকরা। এই কারণে রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে কংগ্রেসকে সামিল করার কথা গান্ধীজি ভাবেন।

রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে সত্যাগ্রহ জোরদার হয়। রাওলাট আইনের প্রতিবাদ করায় অমৃতসরের নেতা কিচলু ও সত্যপাল গ্রেপ্তার হন। গান্ধীজীকে দিল্লী ও পাঞ্জাবে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অমৃতসরের হলব্রিজের নিকট জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। সরকার সামরিক আইন জারি করে। রাওলাট আইনের প্রতিবাদে ও বৈশাখী দিবস উদযাপনে অসংখ্য জনতা পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যানে সমবেত হন, এবং ব্রিটিশ সেনাপতি ডায়ারের নির্দেশে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে ১৩ই এপ্রিল কুখ্যাত জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ১৯২২ সালে মার্চ মাসে রাওলাট আইন বাতিল করা হয়।