Advertise

পটসডাম সম্মেলন কি এবং কেন অনুষ্ঠিত হয়েছিল?

রুজভেল্টের মৃত্যুর পরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সােভিয়েত রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নব নিযুক্ত প্রেসিডেন্ট হ্যারি টুম্যান রুমানিয়া ও পােল্যান্ডে সােভিয়েত নীতি লক্ষ্য করে এই ধারণা করেন যে, সােভিয়েত রাশিয়া ইয়াল্টা চুক্তির শর্তগুলি পালন করছে না। ইয়াল্টা চুক্তি সম্পাদনের পর স্বদেশে ফিরে এসে রুজভেল্ট আক্ষেপ করেন যে, রাশিয়া ইয়াল্টার সদিচ্ছার দাম দিচ্ছে না। ইতিমধ্যে রুজভেল্ট দেহত্যাগ করেন। মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি হ্যারি টুম্যান রাষ্ট্রপতির পদে বসেন। ১৯৪৫ খ্রীঃ ফেব্রুয়ারী মাসে ইয়াল্টা সম্মেলন এর চুক্তির সময়কাল হতে জুলাই মাস পর্যন্ত মার্শাল ষ্ট্যালিন এমন কতকগুলি কাজ করেন যে, তার ফলে পূর্ব-পশ্চিম সম্পর্কে ফাটল ধরে।
পটসডাম সম্মেলন কি এবং কেন অনুষ্ঠিত হয়েছিল
প্রথমত, পােল্যান্ডে লুবলিন সরকারকে লাল ফৌজের ছাতার নীচে শুধু আশ্রয় দেওয়া হয়নি, পােল্যান্ডে অ-কমিউনিষ্ট নেতাদের বন্দী করা হয়। স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার খর্বিত হয়। দ্বিতীয়ত, হাঙ্গেরীর কাছ থেকে সােভিয়েত রাশিয়া এক বিরাট অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবী করে এবং ১৯৪৪ খ্রীঃ মস্কোপন্থী কমিউনিষ্ট ইমরেনাগির মাধ্যমে ভূমিসংস্কার করা হয়, যাতে কমিউনিষ্টদের জনপ্রিয়তা বাড়ে। তৃতীয়ত, রুমানিয়ায় ১৯৪৪ সালে কমিউনিষ্ট পার্টির মাত্র ৪০০ সদস্য ছিল। ১৯৪৪ এর মার্চ মাসে রুশ মন্ত্রী ভিসিনিস্কির হস্তক্ষেপে কুমানিয়ায় কমিউনিষ্ট শাসন স্থাপিত হয়। চতুর্থত, বুলগেরিয়ায় লাল ফৌজ ঢােকার সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিষ্টরা ক্ষমতা দখল করে এবং অকমিউনিষ্টদের দমন করে। পঞ্চমত, চেকোশ্লোভাকিয়ায় কোয়ালিশন সরকার গঠিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলি কমিউনিষ্টরা অধিকার করে নেয়। ষষ্ঠতঃ, যুগােশ্লাভিয়াতে স্থানীয় কমিউনিষ্ট দল মার্শাল টিটোর নেতৃত্বে জার্মানদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে। ষ্ট্যালিন যুগােশ্লাভ কমিউনিষ্টদের নিজ পছন্দমত কমিউনিষ্ট শাসন গঠনের অধিকার দেন। সপ্তম, আলবানিয়ায় কমিউনিষ্ট গেরিলাগণ সরকার দখল করে নেয়। অষ্টমত, এছাড়া পূর্ব জার্মানী ও পূর্ব অষ্ট্রিয়া লাল ফৌজ দখল করায় এই স্থানগুলিতেও লাল ফৌজের ছত্রছায়ায় কমিউনিষ্ট শাসন গড়ে ওঠে।

মােট কথা ইয়াল্টা চুক্তি কয়েক মাসের মধ্যেই পূর্ব জার্মানী সহ গােটা পূর্ব ইওরােপে রুশ তাবেদার কমিউনিষ্ট শাসন স্থাপিত হয়। এই সকল স্থানে রুশ লালফৌজ দখলদারী থাকায় কমিউনিষ্ট দলগুলি তার সুযােগ নিয়ে অ-কমিউনিষ্টদের উৎখাত করে দেয়। ইয়াল্টা চুক্তিতে আটলান্টিক চার্টারের ভাবধারা অনুযায়ী এই সকল স্থানে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের কোন ব্যবস্থা হয়নি। এর ফলে একদা যারা ইয়াল্টা চুক্তির ফলে আনন্দে আত্মহারা হয়, তারা এখন মুষড়ে পড়ে। রুজভেল্ট ইয়ান্টা চুক্তির পরিণাম দেখে অনুতপ্ত হন এবং জার্মানীতে ইঙ্গ-মার্কিন শান্তি চুক্তির শর্ত নমনীয় করতে সঙ্কল্প নেন। এজন্য ষ্ট্যালিন রুজভেল্টকে ভৎসনা করেন। রুজভেল্ট তদুত্তরে ষ্ট্যালিনকে আমেরিকার জার্মান নীতিকে “ন্যক্কারজনক ভ্রান্ত ব্যাখ্যা” বলে তিরস্কার করেন। এদিকে ইয়াল্টা চুক্তি অনুযায়ী জাপান আক্রমণের জন্যে রাশিয়া মাঞ্চুরিয়ায় সেনা সমাবেশ করে। কিন্তু মার্কিন সমরবিভাগ জাপানের হিরােসিমা ও নাগাসাকি শহরে এ্যাটম বােমা নিক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিলে, রাশিয়াকে আর জাপানের ভূখণ্ডে নামার সুযােগ দেওয়া হয়নি। এজন্য রুশ নেতারা বিরক্তি বােধ করেন। এইভাবে ইয়াল্টা চুক্তির অব্যবহিত পরেই পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে মন কষাকষি শুরু হয়। আপাততঃ প্রধান সমস্যাগুলি যথা জার্মানী ও তার মিত্রদেশের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন, ইওরােপের পুনর্গঠন প্রভৃতি সমস্যার সমাধানের জন্যে ১৯৪৫ সালে ১৭ জুলাই পটসডামের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

পটসডাম সম্মেলনের সিদ্ধান্ত সমূহ: এই সম্মেলনে যুদ্ধকালীন নেতাদের মধ্যে একমাত্র ষ্ট্যালিন ছিলেন। চার্চিল নির্বাচনে পরাস্ত হওয়ায় এই সম্মেলন ত্যাগ করেন। তার স্থলে বিজয়ী শ্রমিকদলের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী সময় ক্লিমেন্ট এটলী যােগ দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মৃত্যু হওয়ায় তার পদের উত্তরাধিকারী রূপে হ্যারী টুম্যান পটসডাম সম্মেলনে যােগ দেন। এই সম্মেলনে গৃহীত নীতি গুলি হল আলোচনা করা হল।
(১) জার্মানীর সঙ্গে শান্তি চুক্তি রচনার ব্যাপারে ইঙ্গ মার্কিন নেতাদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত ঘােষণা করে যে, বিজয়ী শক্তিদের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সম্মেলনে শান্তি চুক্তির খসড়া রচনা করা হবে।
(২) পটসডাম সম্মেলনে জার্মানীকে আশ্বাস দেওয়া হয় যে, জার্মান জাতির স্বাধীনতা রক্ষা করা হবে।
(৩) জার্মানীর অনাৎসীকরণ, অসামরিকীকরণ, গণতান্ত্রিকরণ ও জার্মান শিল্প কোম্পানী বা কার্টেলগুলিকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই কথাগুলির ব্যাঞ্জনা বেশ ব্যাপক ছিল। (ক) অনাৎসীকরণের অর্থ ছিল জার্মানী থেকে নাৎসী সমবাদ, নাৎসী সংস্কৃতি, জাতিগত অহমিকাবােধ, নাৎসীবাদী ইতিহাস প্রভৃতি নির্মূল করা হবে। যাতে ভবিষ্যতে পুনরায় এই ক্ষতিকারক আদর্শবাদ জার্মানীতে শিকড় বিস্তার না করতে পারে। (খ) জার্মানীতে গণতান্ত্রিক মূল্যবােধ, সহনশীলতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব, অবাধ নির্বাচন, নাগরিক স্বাধীনতা প্রভৃতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। (গ) অসামরিকীকরণ অর্থাৎ জার্মানীকে নিরস্ত্র করা, সামরিক কলেজগুলিকে উৎখাত করা, অস্ত্রনির্মাণ কারখানাগুলি ভেঙে ফেলা হবে। (ঘ) অ-কার্টেলকরণ অর্থাৎ জার্মানীর দানবাকৃতি মূলধনীদের পরিচালিত বিবিধমুখী শিল্প কারখানাগুলিকে ধ্বংস করা হবে।
(৪) জার্মানীর পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নীতি ঘােষণা করা হয় এবং জার্মান সামরিক বাহিনী ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘােষণা করা হয়। জার্মানীতে ভবিষ্যতে কোন সমরাস্ত্র নির্মাণ করা নিষিদ্ধ করা হয়।
(৫) জার্মানীর সােভিয়েত অধিকৃত অঞ্চল থেকে শিল্পকেন্দ্র ও যন্ত্রপাতি রাশিয়াকে তুলে নিয়ে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ নিতে সম্মতি দেওয়া হয়।
(৬) পূর্ব প্রাশিয়ার একাংশ ও ডানজিগ বন্দর পােল্যান্ডকে এবং কোনিগসাস শহর রাশিয়াকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
(৭) জার্মানীকে মিত্রপক্ষের দখলদারী সেনার অধীনে রাখার জন্যে ৫টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। জার্মানীর পূর্বাংশ রাশিয়ার এবং পশ্চিমাংশ ব্রিটেন, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে রাখার ব্যবস্থা হয়। প্রতি অঞ্চল সেই অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত সেনাপতির শাসনে থাকে। চারজন সেনাপতি একত্রে মিত্রপক্ষীয় নিয়ন্ত্রণ পরিষদ গঠন করেন।
(৮) বার্লিন নগর যদিও সােভিয়েত এলাকার ভেতর ছিল, বার্লিনকে ৪ ভাগে ভাগ করে অধিকার করা হয়।
(৯) যতদিন না জার্মানীর সঙ্গে সন্ধি হয় ততদিন অস্থায়ীভাবে পােল-জার্মান ভৌগােলিক সীমানা ওডার-নাইসী নদী বরাবর ধার্য করা হয়।
(১০) পােল্যান্ডকে ডানজিগ, আপার ও লােয়ার সাইলেশিয়া, পূর্ব ব্র্যান্ডেনবার্গ, পােমির্যানিয়া এবং পূর্ব প্রাশিয়ার দক্ষিণ ভাগ দেওয়া হয়।
(১১) ফ্রান্সকে আলসাস-লােরেন দেওয়া হয়।
(১২) বেলজিয়াম ইউপেন ও ম্যালমেডি পায়।
(১৩) সুদেতান জেলা পুনরায় চেকোশ্লোভাকিয়াকে দেওয়া হয়।
(১৪) অস্ট্রিয়াকে দখলে রাখার জন্যে কয়েকটি সামরিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
(১৫) অস্ট্রিয়াকে জার্মানী থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়।

এইভাবে পটসডাম সম্মেলনের সমাপ্তি হয়। ফ্লেমিং এর মতে, পটসডাম সম্মেলনের বাহ্যিক মতৈক্যের আড়ালে লুকিয়েছিল ইঙ্গ-মার্কিন জোট বনাম রাশিয়ার গভীর মতানৈক্য। এর ফলে পটসডাম সম্মেলন থেকেই পূর্ব-পশ্চিম ঠাণ্ডা লড়াই প্রকাশ্যে এসে পড়ে। পরবর্তী পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সম্মেলনে শান্তি চুক্তি রচনার ক্ষেত্রে তীব্র মত বিরােধ দেখা দেয়। এই মত বিরােধের প্রধান ক্ষেত্র ছিল জার্মানী।