মার্শাল পরিকল্পনা বলতে কি বোঝায় ?

- January 13, 2020
ট্রুম্যানের নীতির পরিপূরক ছিল মার্শাল পরিকল্পনা। মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব জেনারেল জর্জ মার্শাল ১৯৪৭ খ্রীঃ ৫ই জুন মার্শাল পরিকল্পনা হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় ঘােষণা করেন। মার্শাল বলেন যে, যেখানে দারিদ্র, হতাশা ও লােকসংখ্যা বেশী সেখানেই কমিউনিজম শাখা-প্রশাখা ছড়ায়। সুতরাং যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইওরােপের দারিদ্র দূর না করলে ইওরােপকে কমিউনিজমের হাত থেকে বাচানাে যাবে না। মার্শাল ইওরােপের যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশগুলিকে মার্কিন অর্থ সাহায্য দিতে প্রস্তাব দেন, যাতে সাহায্য প্রাপ্ত দেশগুলির অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ঘটে। যাতে তারা ব্যক্তিগত অথবা সমষ্টিগতভাবে কমিউনিজমের প্রসার রােধ করতে সক্ষম হয়।
১৯৪৭ সালে মার্শাল পরিকল্পনা
১৯৪৬-১৯৪৭ খ্রীঃ শীতকালে প্রচণ্ড শীত, বরফ পাতে ইওরােপের কৃষির প্রচুর ক্ষতি হয়। এই অর্থনৈতিক দুর্বিপাকের সুযােগে কমিউনিষ্টরা ধর্মঘট ও অন্তর্ঘাত চালায়। ইতালী ও ফ্রান্সের সরকার এর ফলে কমিউনিষ্টদের দখলে আসার সম্ভাবনা দেখা দেয়। মার্শাল আশঙ্কা করেন যে, এই অর্থনৈতিক ধ্বস বন্ধ করতে না পারলে ফ্রান্স ও ইতালী কমিউনিষ্টদের দখলে চলে যাবে। এমনকি ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে কমিউনিষ্টদের লাল বন্যা লন্ডনকে গ্রাস করবে।

মার্শাল পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তাব দেওয়া হয় যে — (১) সাহায্য গ্রহণকারী দেশগুলি একটি ইওরােপীয় অর্থনৈতিক সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত হবে যা O. E. E. C. নামে পরিচিত। (২) এই O. E. E. C. সদস্যভুক্ত দেশগুলি তাদের নিজস্ব সম্পদ এবং মার্শাল পরিকল্পনায় প্রাপ্ত সম্পদ পরস্পরের প্রয়ােজনে ব্যবহার করবে। (৩) যে সাহায্য আমেরিকা দিবে তা প্রত্যেক সদস্যের চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে দেওয়া হবে। (৪) আপাততঃ ১৯৪৮ খ্রীঃ এপ্রিল মাসে মার্কিন দেশ ৬ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দেয়। (৫) পরবর্তী বছরগুলিতে আরও সহায়তা বৃদ্ধি করা হয়। (৬) মার্শাল পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ইওরােপের স্থায়ী এবং সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন।

মার্শাল পরিকল্পনা পূর্ব পশ্চিম ঠাণ্ডা লড়াইয়ের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। এই পরিকল্পনা ইউরোপের সকল দেশের জন্যে খােলা ছিল। একমাত্র স্পেনকে এতে যােগ দিতে আহ্বান করা হয়নি। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী সাহায্য কিভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে তা আলােচনার জন্যে প্যারিসে ইউরোপীয় বৃহৎ শক্তিগুলির বিদেশমন্ত্রীদের এক বৈঠক ডাকেন। ব্রিটিশ ও ফরাসী মন্ত্রীদ্বয় এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে।

প্যারিসের সম্মেলনে রুশমন্ত্রী মলাটোভ অত্যন্ত তীব্রভাবে মার্শাল পরিকল্পনাকে আক্রমণ করেন। (১) তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানাবার আগে ব্রিটেন ও ফ্রান্স তার সঙ্গে আলােচনার দরকার বােধ করেনি। (২) এই পরিকল্পনাকে তিনি ডলার সাম্রাজ্যবাদ বলে সমালােচনা করেন। (৩) তিনি জানান যে, এই পরিকল্পনাতে রাশিয়া বা তার তাবেদার দেশগুলি কোনভাবে যােগ দিবে না। (৪) এই পরিকল্পনা গ্রহণ করলে গ্রহীতা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। (৫) শেষ পর্যন্ত মার্শাল পরিকল্পনাকে আমেরিকার নীরক্ত সাম্রাজ্যবাদ আখ্যা দিয়ে তিনি ক্রোধে সম্মেলন ত্যাগ করেন। ইওরােপে দাসত্বের দিন ঘনিয়ে এসেছে বলে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

ব্রিটেন, ফ্রান্স সহ ইওরােপের মােট ১৬টি (পর্তুগাল, সুইডেন, সুইজারল্যাণ্ড, তুরস্ক, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালী, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, লাক্সেমবার্গ, নরওয়ে,) দেশ মার্শাল পরিকল্পনায় যােগ দেয়। রাশিয়ার চাপে পূর্ব ইওরােপের ৮টি (আলবানিয়া, বুলগেরিয়া, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রুমানিয়া, যুগোস্লাভিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া) দেশ মার্শাল পরিকল্পনায় যােগদানে বিরত থাকে। ইওরোপ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে থাকে ট্রুম্যান নীতি ও মার্শাল পরিকল্পনা সমর্থনকারী ১৬টি দেশ। অপরদিকে রাশিয়া ও তার তাবেদার ৮টি দেশ। মার্শাল পরিকল্পনার পর বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও লাক্সেমবার্গ একত্রে ইউরােপীয় অর্থনৈতিক সহযােগিতা সংস্থা (EEC) গঠন করে। ১৯৪৮ খ্রীঃ মার্চ মাসে ব্রিটেন ও ফ্রান্স এতে যােগ দিয়ে ব্রাসেলস সন্ধি জোট গঠন করে। যাতে বলা হয় যে, ৫০ বছরের জন্যে স্বাক্ষরকারী দেশগুলি পারস্পরিক আত্মরক্ষা, সংস্কৃতি বিনিময় ও অর্থনৈতিক সহযােগিতার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হয়। তুরিন চুক্তি দ্বারা তুরস্ককেও এই শুল্ক জোটের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

১৯৪৮-১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইউরােপের আর্থিক পুনরুজ্জীবনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১২০০ কোটি মার্কিন ডলার মঞ্জুর করেছিল। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে মার্শাল পরিকল্পনার অবসান হয়। তবে মার্শাল পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সােভিয়েত রাশিয়া, পােল্যান্ড, পূর্ব জার্মানি প্রভৃতি সহযােগী রাষ্ট্রগুলিকে পুনর্গঠনের জন্য কমিউনিস্ট ইকনমিক ইউনিয়ন বা (Comccon) নামে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল।
Advertisement