আবহবিকার বা বিচূর্ণীভবন - Weathering

- December 01, 2019
আবহবিকার (Weathering) শব্দটি এসেছে আবহাওয়া (Weather) থেকে। আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদানের প্রভাবে (যেমন উষ্ণতা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন গ্যাস) ভূপৃষ্ঠে কঠিন আবরণ ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে কিংবা গ্যাসীয় ও জলীয় উপাদানের প্রভাবে শিলা গঠনকারী খনিজগুলি রাসায়নিকভাবে বিয়ােজিত হয়ে ভঙ্গুর অবস্থায় ওই স্থানেই অবস্থান করার প্রাকৃতিক ঘটনাকেই বলা হয় আবহবিকার। আবহবিকারের ফলে কঠিন শিলাস্তর ভেঙে চুর্ণবিচূর্ণ ও বিয়োজিত হয় বলে আবহবিকারের অপর নাম বিচুর্ণীভবন। জলবায়ুর তারতম্য আবহবিকারের তারতম্য ঘটে। G.K. Gilbert সর্বপ্রথম আবহবিকার শব্দটি ব্যবহার করেন।
Weathering Image
আবহবিকার ও ক্ষয়ীভবন সম্পর্ক: ভূমিরূপ বিবর্তনে আবহবিকার ও ক্ষয়ীভবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করলেও এদুটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী প্রক্রিয়া, একে অন্যের পরিপূরক। আবহবিকার একটি স্থিতিশীল প্রক্রিয়া, কারণ চুর্ণবিচুর্ণ ও বিয়ােজিত বস্তুর স্থানচ্যুতি ঘটে না। আবহবিকারের ফলে ভূমিরূপ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। আবহবিকার ক্ষমীভবনকে ত্বরান্বিত করে। অপরদিকে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন ক্ষয়কারী শক্তির (নদী, বায়ুপ্রবাহ, হিমবাহ, সমুদ্রতরঙ্গ প্রভৃতি) ঘাত প্রতিঘাতে শিলাস্তরের চূর্ণীকরণ, বিয়ােজন ও স্থানচ্যুতিকরণের সম্মিলিত প্রক্রিয়াকে ক্ষয়ীভবন (Erosion) বলে। ক্ষয়ীভবনের সঙ্গে পদার্থের অপসারণ যুক্ত। আবহবিকার ক্ষয়ীভবনকে ত্বরান্বিত করে। শিলাস্তর যত বেশি আবহবিকারগ্রস্ত হয় ক্ষয়ীভবন তত দ্রুত হয়। আবার ক্ষয়ীভবনের ফলে শিলাস্তর উন্মুক্ত হলে তার ওপর পুনরায় আবহবিকার ঘটে।

নগ্নীভবন (Denudation): আবহবিকার, পুঞ্জিত স্খলন ও ক্ষয়ীভবন এই তিনটি ক্রিয়ার যৌথ প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের শিলাস্তর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। একেই নগ্নীভবন বলে। অতএব আবহবিকার + পুঞ্জিত স্খলন + ক্ষয়ীভবন = নগ্নীভবন।

আবহবিকার শ্রেণিবিভাগ: আবহবিকারকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।। যথা - (১) রাসায়নিক আবহবিকার (২) যান্ত্রিক আবহবিকার (৩) জৈবিক আবহবিকার।

(১) রাসায়নিক আবহবিকার (Chemical Weathering): শিলা গঠনকারী খনিজ বায়ুর গ্যাসীয় ও জলীয় উপাদানের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিয়ােজিত ও গৌণ খনিজ কণায় পরিণত হয়ে সেই স্থানেই অবস্থান করার ঘটনাকেই বলা হয় রাসায়নিক আবহবিকার। রাসায়নিক আবহবিকার কয়েকটি প্রক্রিয়ায় ঘটে। যেমন -

(i) কার্বনেশন (Carbonation) বা অঙ্গার যােজন: শিলা গঠনকারী খনিজের সঙ্গে জল ও কার্বন ডাই অক্সাইডের বিক্রিয়ায় ঘটা রাসায়নিক আবহবিকারকেই বলা হয় কার্বোনেশন বা
অঙ্গার যােজন। জল ও CO2 যুক্ত হয়ে কার্বনিক অ্যাসিড (H2CO3) সৃষ্টি করে, যা CaCO3 এর সঙ্গে বিক্রিয়া করে দুর্বল ক্যালসিয়াম বাই-কার্বনেটে পরিণত করে। H2O + CO2 = H2CO3, CaCO3 + H2CO3 = Ca(HC03)2

(ii) অক্সিডেশন (Oxidation) বা জারণ: শিলা গঠনকারী খনিজের সঙ্গে O2 ও জলের বিক্রিয়ার ঘটা রাসায়নিক আবহবিকারকে বলা হয় জারণ বা অক্সিডেশন। শিলা গঠনকারী ফেরাস অক্সাইড এই বিক্রিয়ায় ফেরিক অক্সাইডে পরিণত হয়, যা অপেক্ষাকৃত ভঙ্গুর। 4FeO + 3H2O + 02 → 2Fe2O3, 3H2O

(iii) হাইড্রেশন (Hydration) বা জল যােজন: শিলা মধ্যস্থিত খনিজের সঙ্গে জল যুক্ত হলে খনিজ কণাগুলি আয়তনে বৃদ্ধি পায় ও নমনীয় হয়ে ওই স্থানেই অবস্থান করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় হাইড্রেশন বা জলযােজন। ক্যালসিয়াম সালফেটের সঙ্গে জল যুক্ত হয়ে জিপসামে পরিণত হয়। CaSO4 + 2H2O → CaSO4, 2H2O

(iv) হাইড্রোলিসিস (Hydrolysis) বা আর্দ্র বিশ্লেষণ: এই পদ্ধতিতে প্রথমে জল হাইড্রোজেন ও হাইড্রক্সিল আয়নে বিভাজিত হয়ে শিলাস্তরে রাসায়নিক আবহবিকার ঘটায়। ফেলসপারের এই প্রক্রিয়া কার্যকরী হওয়ায় সেটি অ্যালুমিনােসিলেসিক অ্যাসিড ও পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইডে পরিণত হয়। KAISi3O8 + HOH → HAISi3O8 + KOH

(v) সলিউশন (Solution) বা দ্রবণ: আম্লিক জলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অনেক খনিজ পদার্থ দ্রবীভূত হলে দ্রবণ প্রক্রিয়ায় আবহবিকার ঘটায়। যেমন — সৈন্ধব লবণের দ্রবণ।

(২) যান্ত্রিক আবহবিকার (Mechanical Weathering): আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদানের প্রভাবে কঠিন শিলাস্তর ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে সেই স্থানেই অবস্থান করলে, তখন সেই আবহবিকারকে বলা হয় যান্ত্রিক আবহবিকার। যান্ত্রিক আবহবিকারে শিলাচূর্ণবিচূর্ণ হয়, কিন্তু শিলা খনিজের কোনাে মৌলের পরিবর্তন ঘটে না। যান্ত্রিক আবহবিকার মূলত উষ্ণ মরু ও মরুপ্রায় জলবায়ু, সাভানা জলবায়ু এবং উচ্চ পার্বত্য ও শীতল জলবায়ু অঞ্চলে ঘটে। যান্ত্রিক আবহবিকারের প্রধান প্রক্রিয়াগুলি হল - (1) উষ্ণতার পরিবর্তন - উষ্ণতার পরিবর্তন প্রধানত তিনটি পদ্ধতিতে হয়। যথা (ক) পিণ্ড বিশরণ, (খ) শল্কমোচন, (গ) ক্ষুদ্রকণা বিশরণ, (2) তুষারের দ্বারা তুহিন খন্ডীকরণ, (3) ভারমুক্ত প্রসারণ ও (4) অন্যান্য প্রক্রিয়ায়।

(i) খণ্ড বা পিণ্ড বিশরণ: মরু অঞ্চলে উপরের ও নীচের শিলাস্তর সুর্যতাপে অসমভাবে প্রসারিত ও সংকুচিত হওয়ায় সীমারেখা বরাবর পীড়নজনিত কারণে শিলাস্তর ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে যায় ও ওই স্থানেই অবস্থান করে, একে পিন্ড বিশরণ বলে।

(ii) শল্কমোচন: সমসত্ত্ব শিলাগঠিত অঞ্চলে উপরের শিলাস্তর পেঁয়াজের খােসার ন্যায় উন্মােচিত হয়ে ভঙ্গুর অবস্থায় ওই স্থানেই থেকে গেলে তাকে শল্কমোচন বলে। এর প্রভাবে ভূমিভাগ গােলাকার আকৃতিবিশিষ্ট হয় বলে এর অপর নাম গােলাকৃতি আবহবিকার।

(iii) ক্ষুদ্রকণা বিশরণ: বিসমসত্ত্ব শিলার খনিজ কণা বিভিন্নভাবে প্রসারিত ও সংকুচিত হওয়ায় একসময় সশব্দে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্ষুদ্রকণা বিশরণ।

(iv) তুষারের দ্বারা তুহিন খন্ডীকরণ: উচ্চ অক্ষাংশে ও অধিক উচ্চতায় শিলাস্তরের ফাটলে সঞ্চিত জলরাশি রাত্রিকালে বরফে পরিণত হলে আয়তনে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেওয়ালে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি করে। আবার দিবাভাগে জলে পরিণত হলে চাপ হ্রাস পায়। ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধি ও হ্ৰাসজনিত কারণে একসময়ে ফাটলের শিলাস্তর ভেঙে যে আবহবিকার ঘটে তাকেই তুহিন খন্ডীকরণ প্রক্রিয়া বলে।

(v) ভারমুক্ত প্রসারণ: নীচের শিলাস্তর উপরের শিলাস্তরের কিংবা বিশাল বরফের চাপে সংকুচিত হতে থাকে। পরবর্তীকালে শিলাস্তর বা বরফ অপসারিত হলে চাপের হ্রাস ঘটে। চাপের এই হ্রাস-বৃদ্ধি জনিত কারণে ভারমুক্ত প্রসারণ প্রক্রিয়ায় যান্ত্রিক আবহবিকার ঘটে।

(vi) অন্যান্য প্রক্রিয়া: এছাড়াও কলয়েড উৎপাটন, আর্দ্রতার প্রভাব, জৈব যান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেও যান্ত্রিক আবহবিকার ঘটে।

Advertisement
(৩) জৈবিক আবহবিকার (Organic Weathering): জৈবিক কথাটি এসেছে জীবদেহ থেকে। উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রভাবে যখন শিলাস্তর ভেঙে চুর্ণবিচূর্ণ হয়ে কিংবা রাসায়নিকভাবে বিয়ােজিত হয়ে ভঙ্গুর অবস্থাপ্রাপ্ত হয়, তখন তাকে বলা হয় জৈবিক আবহবিকার। উৎস অনুসারে জৈবিক আবহবিকারের দুটি শ্রেণিবিভাগ করা যায়।

(i) উদ্ভিদ সৃষ্ট: প্রথমত, উদ্ভিদের শিকড় শিলাস্তরে প্রবেশ করে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে এবং দ্বিতীয়ত, উদ্ভিদের ডালপালা, পাতা, শিকড়ের পচনের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন অ্যাসিডের (হিউমিক, ল্যাকটিক) মাধ্যমে রাসায়নিক পদ্ধতিতে জৈবিক আবহবিকার ঘটায়।

(ii) প্রাণী সৃষ্ট: প্রথমত, শিলাস্তরে গর্তে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রাণী যেমন — কেঁচো, ইদুর, খরগােস, প্রেইরি কুকুর প্রভৃতি যান্ত্রিক পদ্ধতিতে এবং দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন মৃত প্রাণীর দেহ নিঃসৃত অ্যাসিড রাসায়নিকভাবে জৈবিক আবহবিকার ঘটাতে সাহায্য করে।

আবহবিকারের ফলাফল: (a) শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে রেগােলিথে পরিণত হয়। (b) চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ গঠনে সাহায্য করে। (c) শীতপ্রধান অঞ্চলে কৃষিকাজের সুবিধা হয়। (d) আবহবিকারের ফলে ক্ষয়ীভবন ঘটায়, ফলে নীচের শিলাস্তর উন্মােচিত হয়। (e) গ্রানাইট শিলাগঠিত অঞ্চলে গম্বুজাকৃতির পাহাড় গড়ে ওঠে। (f) এই প্রক্রিয়ায় শিলার খনিজ কণাগুলি দ্রবীভূত হওয়ায় উদ্ভিদের খাদ্য সংগ্রহ করা সুবিধা হয়। (g) মৃত্তিকা সৃষ্টি।

আবহবিকার ও মৃত্তিকার সৃষ্টি: মৃত্তিকার সৃষ্টি আবহবিকারের অবদান সর্বাধিক। যান্ত্রিক, রাসায়নিক ও জৈবিক আবহবিকারের ফলে আদি শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ ও বিয়ােজিত হয়ে মৃত্তিকা গঠনের মূল উপাদান (সোলাম, রেগােলিথ) সরবরাহ করে। এটি মৃত্তিক গঠনের প্রথম পর্ব ও অন্যতম শর্ত। পরবর্তী পর্যায়ে আণুবীক্ষণিক জীবকুল, মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষকে পচন ক্রিয়ার মাধ্যমে হিউমাসে পরিণত করে। একে হিউমিফিকেশেন বলে। হিউমাস গঠনের সাথে সাথে জটিল রাসায়নিক পদ্ধতিতে হিউমাস ও আবহবিকার জাত পদার্থ একত্রে নতুন নতুন খনিজের সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়াকে খনিজকরণ বলে। মাটি গঠনকারী প্রক্রিয়াগুলি চলাকালে মাটির উপরিস্তর থেকে এলুভিয়েশন পদ্ধতিতে দ্রবীভূত খনিজ ও অদ্রবীভূত মুক্ত মৌল মাটির নীচের স্তরে স্থানান্তরিত হয় এবং নিম্ন স্তরে Illuviation প্রক্রিয়ায় ওই সব পদার্থ আবদ্ধ হয়। এইভাবে আবহবিকার ও মাটি গঠন প্রক্রিয়ার যৌথ কার্যকলাপে মৃত্তিকা গঠিত হয়। সময়ের সাথে সাথে মৃত্তিকা উপাদানের রাসায়নিক ও ভৌত ধর্মের পরিবর্তন ঘটে এবং খনিজ ও জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ একপরিণত স্বল্প পুরু ভঙ্গুর স্তর ভূত্বকের উপরিভাগে গড়ে ওঠে যা উদ্ভিদ জন্মানাের অনুকুল। প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্টপৃথিবী পৃষ্ঠের এই স্তর মৃত্তিকা (Soil) নামে পরিচিত। [শিলা - আবহবিকার - রেগােলিথ + জৈব পদার্থ = মৃত্তিকা]
Advertisement