Sources of the British Constitution - ব্রিটিশ সংবিধানের উৎস সমূহ

- December 04, 2019
শাসনতন্ত্র কথাটি ব্রিটেনে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়। এই ব্যাপক অর্থে শাসনতন্ত্র বলতে লিখিত ও অলিখিত সকল নিয়মকানুনকেই বােঝায়। শাসনতন্ত্র কথাটি সাধারণত দুটি অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়। এক অর্থে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলী সংক্রান্ত মৌলিক নীতিগুলি লিপিবদ্ধ এক দলিল এবং নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রয়ােগযোগ্য নীতিগুলি বোঝায়। এই অর্থে শাসনতন্ত্র হল একটি দলিলে লিপিবদ্ধ দেশ শাসনের মৌলিক আইন, কিন্তু ব্রিটেনের শাসনতন্ত্র কথাটি অন্য অর্থে ব্যবহৃত হয়। ব্রিটেনে তথাকথিত লিখিত শাসনতন্ত্র নেই। হার্ভে ও বাথার-এর 'ব্রিটেনের শাসনতন্ত্র অলিখিত' একথা বলার চেয়ে 'ব্রিটেনে কোন লিখিত শাসনতন্ত্র নেই' বলার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। সেই কারণে ব্রিটেনের শাসনতন্ত্রের পরিপূর্ণ পরিচয় পেতে হলে বিভিন্ন সময়ের সনদ, চুক্তি, বিধিবদ্ধ আইন, বিচারের নজীর, প্রথাগত রাতিনাতি ও আচার ব্যবহার প্রভৃতির সমন্বয়ে গঠিত শাসনতন্ত্রের সামগ্রিক ধাপটি বিচার করতে হবে।

(১) শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি (Conventions): ব্রিটেনের শাসনতন্ত্রের সবচেয়ে উল্লেখ করবার বিষয় হল শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি। এই শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির দ্বারা শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারিত হয়। রাজার সঙ্গে মন্ত্রীদের সম্পর্ক, মন্ত্রীদের সঙ্গে পার্লামেন্টের সম্পর্ক, পার্লামেন্টের কার্যপদ্ধতি ও অধিবেশন সংক্রান্ত নিয়মকানুন প্রভৃতি অনেক বিষয় শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির অন্তর্ভুক্ত। শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি অনেকগুলি পারস্পরিক বােঝাপড়া ছাড়া কিছু নয়, এরা আইনের শুস্ক কাঠামােকে জীবন্ত করে তােলে। প্রকৃতপক্ষে, কেবলমাত্র আইনের পদ্ধতি দিয়ে কোন শাসনব্যবস্থার সত্য রূপটি প্রকাশিত হতে পারে না। আইনগত কাঠামাের পাশাপাশি প্রথা ও রীতিনীতিগুলিরও পর্যালােচনা করতে হবে।

(২) বিধিবদ্ধ আইন (Statutes): শাসনতন্ত্রের দ্বিতীয় উৎস হিসাবে পার্লামেন্টে গৃহীত কয়েকটি বিধিবদ্ধ আইনের উল্লেখ করা যায়। পার্লামেন্টে বিভিন্ন সময়ে এই আইনগুলি প্রণয়ন করে শাসনতন্ত্র রচনার পথ সুগম করেছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সম্পর্কে ১৫৭৯ সালের হেবিয়াস কর্পাস আইন, ১৮৩১, ১৮৬৭, ১৮৬৯ ও ১৮৮৪ খ্রীস্টাব্দের সংস্কার আইন, ১৯১১ ও ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের পার্লামেন্ট আইন, ১৯৩১ খ্রীস্টাব্দের ওয়েস্টমিনস্টার আইন, ১৯৪৮ খ্রীস্টাব্দের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৩৭ সালের রাজমন্ত্রী আইন, ১৯৪৭ সালের রাজমন্ত্রী আইন, ১৯৬৩ সালের পীয়ারেজ অ্যাক্ট প্রভৃতি আইনগুলি উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

(৩) বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত (Judicial Decisions): সনদ ও বিধিবদ্ধ আইনের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বিচারকগণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইনের সঠিক অর্থ নিরূপণ করতে চেষ্টা করেন। এইভাবে নতুন আইনের সৃষ্টি হয়েছে। অধ্যাপক ডাইসির মতে, শাসনতন্ত্রের সাধারণ সুত্রগুলি ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিচারালয়ে আনীত মামলার সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে।

(৪) প্রথাগত আইন (Common Law): প্রথাগত আইনের ভিত্তি হল প্রচলিত প্রথা ও রীতিনীতি, যা আদালতের মাধ্যমে আইন বলে স্বীকৃতি লাভ করে। রাজকীয় বিশেষ ক্ষমতা, জুরীর সাহায্যে বিচার, বাকস্বাধীনতা প্রভূতি প্রথাগত আইনের অন্তর্ভুক্ত। প্রথম অবস্থায় প্রথাগত আইনকে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আইনগত স্বীকৃতি লাভ করে প্রথাগত আইন ব্রিটেনে ব্যক্তি স্বাধীনতার রক্ষক এবং ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে।

(৫) সনদ (Charter): বিভিন্ন সময়ে গৃহীত কতকগুলি ঐতিহাসিক সনদ বা চুক্তির উল্লেখ করা যেতে পারে। ১২১৫ খ্রিস্টাব্দের মহাসনদ, ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দের অধিকারের আবেদনপত্র, ১৬৮৯ খ্রীস্টাব্দের অধিকারের বিল, ১৭০০ খ্রীস্টাব্দের মীমাংসার আইন এবং অন্যান্য আরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল ব্রিটেনের শাসনতান্ত্রিক বুনিয়াদ গড়ে তুলেছে।

(৬) শাসনতন্ত্র সম্পর্কে গ্রন্থ (Text book on Constitution): শাসনতন্ত্র সম্পর্কে রচিত প্রামাণ্য গ্রহসমূহও ব্রিটেনের শাসনতন্ত্রের উল্লেখযােগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে। প্রামাণ্য গ্রন্থগুলি শাসনতন্ত্রের বিকাশে অসামান্য সহায়তা করেছে। এদের মধ্যে বেজহটের ইংল্যান্ডের শাসনতন্ত্র, অ্যানসনের শাসনতন্ত্রের আইন ও রীতি, শাসনতন্ত্রের আইন, আইভির জেনিংসের আইন এবং শাসনতন্ত্র, ক্যাবিনেট শাসনব্যবস্থা, ল্যাস্কির ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টারী শাসনব্যবস্থা, কীথের ব্রিটেনের ক্যাবিনেট ব্যবস্থা, অ্যামেরির শাসনতন্ত্র সম্পর্কিত চিন্তা প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযােগ্য।

মূল্যায়ন (Assessment): সুতরাং কোন একটি লিখিত দলিলে শাসনতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলি লিপিবদ্ধ না থাকলেও বিভিন্ন উপাদানের মধ্যেই শাসনতন্ত্রের মূলভিত্তির সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। ব্রিটেনের শাসনতন্ত্রের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিতর্ক প্রায় মূল্যহীন বলা যায়। ব্রিটেনের পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামাের মধ্যে শাসনতন্ত্র উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থেই একসময় স্বীকৃত হয়েছিল যার ধারা বর্তমান সময়েও বহমান। বুর্জোয়া রাজনৈতিক ধ্যান ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্য করেই ব্রিটেনের শাসনতন্ত্র একটি আদর্শ উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদাহরণ হিসাবে স্বীকৃত।
Advertisement