মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলি

- December 03, 2019
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার শীর্ষে রাষ্ট্রপতির অধিষ্ঠান। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ব্রিটেনের রাজা বা রানীর ন্যায় কেবলমাত্র নিয়মতান্ত্রিক শাসক নন, প্রকৃত শাসকও বটে। ক্লিনটন রসিটার-এর মতে, “মার্কিন সংবিধান রচয়িতাগণ একই নির্বাচনমূলক অফিসে রাজমহিমা ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা একত্রিত করে যুগান্তকারী ঘটনার সৃষ্টি করেছিলেন।" তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মুখ্যচরিত্র বলেও বর্ণনা করেন। মার্কিন রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলিকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে আলােচনা করা যেতে পারে।

শাসন সংক্রান্ত ক্ষমতা: সংবিধানের ২ (১) নং ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির হাতে শাসন সংক্রান্ত ক্ষমতাবলি অর্পিত হয়েছে। তার শাসন সংক্রান্ত কার্যাবলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল - (ক) যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধান, আইন, আদালতের রায়, সন্ধি, চুক্তি ইত্যাদি যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে কিনা তা লক্ষ্য রাখা; (খ) সিনেটের পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রদূত, ক্যাবিনেট মন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি প্রভৃতিকে নিয়ােগ করা; (গ) সৈন্যবাহিনী, নৌবাহিনী ও স্বদেশরক্ষী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসাবে কাজ করা; (ঘ) বিদেশ নীতি নির্ধারণ করা; (ঙ) সিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষে আন্তর্জাতিক সন্ধি, চুক্তি সম্পাদন করা ইত্যাদি।

আইন সংক্রান্ত ক্ষমতা: তত্বগতভাবে মার্কিন রাষ্ট্রপতির আইনসংক্রান্ত কোন ক্ষমতা নেই, তবে বাস্তবের কষ্টিপাথরে বিচার করলে রাষ্ট্রপতি আইনসংক্রান্ত বিচারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্রপতি সময়ে সময়ে কংগ্রেসে বাণী প্রেরণ করে কংগ্রেসের কার্যাবলিকে প্রভাবিত করতে পারেন। তিনি জরুরি ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করতে পাবেন। তবে ১৯৩৯ সালের পর রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা উল্লেখযােগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি অর্ডিন্যান্স বা শাসন বিভাগীয় আদেশ জারি করতে পারেন যা আইনের মতােই কার্যকর হয়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার ওপর তিনি অস্থায়ী কমিশন নিয়ােগ করতে পারেন। কমিশন প্রদত্ত রায়কে কার্যকর করার জন্য তিনি কংগ্রেসকে অনুরােধ করতে পাবেন। সর্বোপরি রাষ্ট্রপতি প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে কংগ্রেসকে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করতে পারেন। ক্লিনটন রসিটার-এর মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ সব আইনের খসড়াই রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে প্রণীত হয় এবং কংগ্রেসে তার দল তা সমর্থন করে।”

বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতা: ব্রিটেনের রাজা বা রাণীর মতাে মার্কিন রাষ্ট্রপতির কিছু বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতাও রয়েছে। রাষ্ট্রপতি সিনেটের পরামর্শ ও অনুমােদনক্রমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ােগ করেন। তিনি দণ্ডিত অপরাধীকে ক্ষমা প্রদর্শন করতে পারেন, দণ্ডাদেশ হ্রাস করতে পারেন।

অর্থসংক্রান্ত ক্ষমতা: ১৯২১ সালে প্রণীত 'বাজেট ও হিসাবরক্ষা আইন' অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য কংগ্রেসের কাছে প্রয়ােজনীয় অর্থ দাবি করতে পারেন এবং বিভিন্ন বিভাগের আনুমানিক ব্যয়-বরাদ্দ বৃদ্ধি, হ্রাস অথবা সংশােধন করতে পারেন। বাজেট ব্যুরাের ডিরেক্টর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হন এবং তার অধীনেই কার্য পরিচালনা করেন।

জরুরি অবস্থা সংক্ৰান্ত ক্ষমতা: জরুরি কালীন অবস্থায় নিয়মতান্ত্রিক শাসক এবং প্রকৃত শাসক উভয়েরই ক্ষমতা ও অমর্যাদা বৃদ্ধি পায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এর ব্যতিক্রম নয়। জরুরি অবস্থায় মার্কিন রাষ্ট্রপতি জাতীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নানা প্রকার বিধি নিষেধ আরােপ করতে পারেন। গৃহযুদ্ধের সময় আব্রাহাম লিঙ্কন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় উইলসন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রুজভেল্টর ক্ষমতাবৃদ্ধি এই বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করে।

বিশ্ব রাজনীতির নিয়ামক হিসাবে ভূমিকা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশের পর বিশ্ব রাজনীতির নিয়ামক হিসাবে রাষ্ট্রপতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন। সমাজতন্ত্রের প্রসার বােধ, বিশ্বে মার্কিন একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি উদ্দেশ্যে রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধিনে আনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাজ করতে থাকেন। বস্তুত সােভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পুঁজিবাদী দুনিয়ার অবিসম্বাদিত নেতা হিসাবে মার্কিন যুপ্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব পূর্বাপেক্ষা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সন্ত্রাসবাদ দমনে মার্কিন রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ ও তৎপরতা তার ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করতে সাহায্য করেছে।
Advertisement