ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলী

- December 04, 2019
ব্রিটেনের শাসব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর পদ গুরত্বপূর্ণ। তিনি হলেন ক্যাবিনেট তোরণের কেন্দ্র প্রস্তর, তাকে ঘিরেই ক্যাবিনেট ঘুরতে থাকে। আইভর জেনিংস বলেছেন, শাসনতন্ত্রের সকল পথই প্রধানমন্ত্রীর নিকট পৌঁছে দেই। ১৯৩৭ সালের রাজমন্ত্রী আইনে সর্বপ্রথম প্রধানমন্ত্রীর পদের উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে কমন্সভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বা নেত্রীকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে রাজা বা রানী নিয়োগ করেন। কমন্সসভায় কোন দলের সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে রাজা বা রানী নিজ বিচার-বিবেচনা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নিয়ােগের সুযােগ লাভ করেন। বিংশ শতাব্দীর পুর্বে প্রধানমন্ত্রীর লর্ডসভা বা কমন্সভা যে কোন কক্ষ থেকে নির্বাচিত হতেন। কিন্তু ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে লর্ড সলিসবেরীর পদত্যাগের পর লর্ডসভা থেকে আর কেউ প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন নি। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড হিউম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নিযুক্ত হলেও তিনি লর্ড উপাধি এবং লর্ডসভার সদস্যপদ ত্যাগ করে কমন্সসভায় নির্বাচিত হন এবং স্যার হিউম নামে পরিচিত হন। প্রধানমন্ত্ৰীকে কমন্সসভার সদস্য হতে হবে এই শাসনতান্ত্রিক রীতি বর্তমানে সুপ্রতিষ্ঠিত।

সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে: প্রধানমন্ত্রী তার দলের নেতা। দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপরই তার প্রধানমন্ত্রীত্ব নির্ভর করে। সুতরাং দলীয় ঐক্য বজায় রাখা তার অন্যতম প্রধান কাজ। নির্বাচনের সময় তার এই দায়িত্ব বৃদ্ধি পায়। তার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকে ঘিরে দলের শক্তি ও জনপ্রিয়তা গড়ে ওঠে। জনগণের বক্তব্য ও মতামতের ধারা অনুভব করবার ক্ষমতা তার থাকা প্রয়ােজন। জাতীয় জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে জনগণের প্রকৃত মত কি তা প্রধানমকে উপলব্ধি করতে হয়। প্রয়ােজন হলে দলীয় স্বার্থে জনমতকে পরিচালিত করবার জন্য উদ্যোগী হতে হয়। দলের জনপ্রিয়তা এবং নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠার জনা বিরােধী দল ও অন্যান্য রাষ্ট্রনৈতিক নেতৃবন্দের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। সংক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীকে জনমতের প্রকৃত মুল্যায়নের যোগ্যতাসম্পন্ন এবং প্রচারদক্ষ হতে হয়। উপযুক্ত নেতৃত্ব ছাড়া দলের সংহতি এবং জনমনে দলীয় প্রভাব রাখা সম্ভব হয় না। আইভর জেনিংস এর মতে, জনমনে প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রধানমন্ত্রীকে জনপ্রিয় চিত্রতারকার মত আচরণ করতে হয়।

কমন্সসভার নেতা হিসেবে: প্রধানমন্ত্রী হলেন কমন্সসভার নেতা। তার গুরুদায়িত্ব লাঘবের জন্য প্রয়ােজন হলে তিনি অন্য কোন মন্ত্রীর উপর কার্যভার অর্পণ করতে পারেন, কিন্তু চরম দায়িত্ব তারই হাতে থেকে যায়। দলীয় হুইপের সাহায্যে সভার আলােচনার কর্মসুচী প্রণয়ন, বিরােধী দলের জন্য সময় বণ্টন, সভার কার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য স্পীকারকে সাহায্য করা প্রভৃতি দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী পালন করে থাকেন। পার্লামেন্টের সকল গুরুত্বপূর্ণ বিলের সমর্থনের প্রধান দায়িত্ব তারই। পার্লামেন্টের কক্ষে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাঁকে সমস্ত জাতির নিকট সরকারের কাজের জবাবদিহি করতে হয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিরােধী দলের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক স্থাপনের দায়িত্বও প্রধানত তার।

রাজা বা রানীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক: প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমেই রাজা বা রানীর সঙ্গে ক্যাবিনেটের সংযােগ করা হয়। ক্যাবিনেটের বক্তব্য রাজা বা রানীর নিকট উপস্থাপন করা এবং ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর। তা ছাড়া রাজা বা রানীর পরামর্শদাতা হিসাবে প্রধানমন্ত্রীকে আবার কাজ করতে হয়। তার পরামর্শেই কমন্সসভা ভেঙ্গে দেওয়া হয়, লর্ডসভার সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়, প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য নিযুক্ত করা হয়। বিবিধ সম্মানসূচক উপাধি বিতরণ, যাজক ও বিচারক প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীই রাজা বা রানীকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

ক্যাবিনেট ও প্রধানমন্ত্রী: ক্যাবিনেটের অন্যান্য মন্ত্রীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক প্রসঙ্গে বলা হয়ে থাকে যে, তিনি সমপর্যায়ভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রধান, অর্থাৎ অন্যান্য মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সমমর্যাদাসম্পন্ন সহকর্মী, অধীনস্ত কর্মচারী নন। তারা একমত হয়ে কথা বলেন, ভোটের সময় সকলেই একটি ভােটের অধিকারী কিন্তু ক্যাবিনেট প্রধান এক অসাধারণ কর্তৃত্ব ও মর্যাদার অধিকারী হন। কিন্তু বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর যে ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে তাতে এই বর্ণনা উপযুক্ত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী ক্যাবিনেট ও মন্ত্রীমন্ডলীর মূল ভিত্তিস্বরূপ। প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করেই ক্যাবিনেটের উত্থান পতন হয়। তিনি ক্যাবিনেটের সভায় সভাপতিত্ব করেন, রাজার সম্মতিতে অন্যান্য ক্যাবিনেট সদস্যদের মনােনীত করেন, প্রয়ােজনবােধে কোন মন্ত্রীকে পদচ্যুত করেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোন মন্ত্রীর বিরােধ হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে হয়। এমেরীর মতে, ক্যাবিনেট গঠনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী যে স্বাধীনতা ভােগ করেন, সেরূপ স্বৈরক্ষমতা একনায়কও সকল ক্ষেত্রে ভােগ করেন। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ক্যাবিনেটর বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমম্বয় সাধন করেন। মন্ত্রীরা বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান সমস্যা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে থাকেন। পররাষ্ট্র সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে পররাষ্ট্র সচিব ও প্রধানমন্ত্ৰী ক্যাবিনেট উত্থাপনের পূর্বে একযােগে আলােচনা করে কর্তব্য স্থির করেন। বর্তমান অবস্থায় সরকারী কাজের পবিধি এত বিস্তৃত হয়ে পড়ে যে, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সমস্ত কাজ ও দপ্তরের তত্ত্বাবধান করা সম্ভব হয় না, কিন্তু এই অসুবিধা সত্বেও সামগ্রিকভাবে সব বিভাগের ওপর তাকে লক্ষ্য রাখতে হয় এবং সরকারী কাজের জন্য দায়িত্বশীল থাকতে হয়।
Advertisement