সুইজারল্যান্ড সংবিধানের বৈশিষ্ট্য

- December 02, 2019
পৃথিবীর সকল দেশের শাসনব্যবস্থায় কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে, যা জাতীয় জীবনের উত্থান পতনের প্রবাহমান ধারায় সমতলে বিবর্তিত হয়ে দেশের প্রগতির পথ প্রশস্ত করেছে এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য দেশ হতে তার স্বাতন্ত্রকে পরিস্ফুট করেছে। সুইজারল্যাণ্ডের শাসনব্যবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। সুতরাং সুইজারল্যাণ্ডের শাসনতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আলােচনা করলেই আমরা অন্যান্য শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের শাসনব্যবস্থার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য উপলব্ধি করতে পারব।
Switzerland Federal Constitution
(১) কেন্দ্রমুখীনতা: অধ্যাপক Strong বলেন, সুইজারল্যাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলেও তা পূর্ণ রূপ লাভ করতে পারে নি। শাসনতন্ত্রের তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ক্যান্টনগুলির সার্বভৌমত্ব যতদুর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনতন্ত্র দ্বারা সীমাবদ্ধ হয় নি, ক্যান্টনগুলি ততদূর পর্যন্ত সার্বভৌম, এবং যে সকল ক্ষমতা তারা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের নিকট হস্তান্তরিত করে নি তা তাদেরই ক্ষমতা (Article-3)। সুইজারল্যান্ডের এই ব্যবস্থা অনেকের মতে জাতীয় ঐক্যকে হ্রাস করেছে। অন্যদিকে ক্যান্টনগুলির শাসনতন্ত্রের সংরক্ষণের ভার কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর অর্পণ করে ক্যান্টনগুলিকে কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল করে তােলা হয়েছে। ৪টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্যে সুইজারল্যাণ্ড শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীকরণ ঘটেছে বলা হয়। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, সমাজকল্যাণকর কাজের জন্যে চাহিদা এবং পরিবহন ও শিল্পে প্রযুক্তিগত বিপ্লব। অবশ্য এই বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর অন্যান্য যুক্তরাষ্ট্রও দেখা যায়।

(২) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র: সুইজারল্যাণ্ডকে গণতন্ত্রের আবাসভূমি বলা যেতে পারে। ক্যান্টনগুলির অধিকার গণভোট পদ্ধতির মাধ্যমে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোন ক্যান্টনের অধিবাসীগণ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট দাবী করলে কেন্দ্রীয় সরকার ঐ ক্যান্টনের শাসনতন্ত্র অথবা শাসনতন্ত্রের সংশােধন মেনে নিতে বাধ্য। গণভোট ছাড়া, গণ-সমাবেশ ও গণ-উদ্যোগের ব্যবস্থা আছে। এই প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি সুইজারল্যান্ডের শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। গণতন্ত্র এবং সুইজারল্যান্ড প্রায় সমার্থবােধক শব্দে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের দ্বারা নিজেদের শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবার ক্ষমতা সুইজারল্যান্ডের মত পৃথিবীর অন্য কোন রাষ্ট্রেই স্বীকৃত হয় নি। Lord Bryce বলেছেন, “পৃথিবীর আধুনিক গণতন্ত্রের মধ্যে যাদের সত্যকার গণতন্ত্র বলে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে, তাদের মধ্যে সুইজারল্যাণ্ডের পঠনপাঠনের দাবী সর্বাধিক। ইউরােপের অন্য কোন রাষ্ট্র অপেক্ষা সুইজারল্যান্ডের গণতান্ত্রিক নীতিগুলি অধিক সংখ্যায় সামঞ্জস্যের সঙ্গে কার্জকর হয়েছে"।

(৩) লিখিত শাসনতন্ত্র-অলিখিত প্রথা: সুইজারল্যাণ্ডের শাসনতন্ত্র আমেরিকা, রাশিয়া এবং ভারতের ন্যায় লিখিত। এটি আকারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিগুণ। শাসনতন্ত্র লিখিত হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় অলিখিত প্রথা ও রীতিনীতির প্রভাব রয়েছে। যেমন নাগরিকত্ব অর্জনের নিয়মাবলী রচনার ক্ষমতা আইনতঃ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকলেও বাস্তবে ক্যান্টন সরকারগুলি এই ক্ষমতা পরিচালনা করে। সুইজারল্যাণ্ডে ক্যান্টনের নাগরিকত্ব লাভ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া যায় (Article-43)।

(৪) প্রজাতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রঃ সুইজারল্যাণ্ডের শাসনতন্ত্র প্রজাতান্ত্রিক। শুধু কেন্দ্র নয়, ক্যান্টনগুলিতেও অন্য কোন ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হতে পারে না (Article-67)। রাজতান্ত্রিক ধ্যান ধারণা সুইস জনগণের নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত। তাদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কোন নির্বাচিত ব্যক্তির বা উত্তরাধিকারীর নয়, এটি সম্পূর্ণভাবে নাগরিকের অধিকার। সুইজারল্যাণ্ডেরই পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা পুরাতন প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছে।

(৫) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাঃ সুইজারল্যান্ডের শাসনতন্ত্রের (১৮৭৪) সুইজারল্যাণ্ড রাষ্ট্র-সমবায় বলে বর্ণিত হলেও কার্যত এর প্রকৃতি যুক্তরাষ্ট্রীয় বলা যেতে পারে। ২৩টি ক্যান্টন নিয়ে সুইজারল্যান্ডের যুক্তরাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। প্রত্যেক ক্যান্টনের পক্ষে শাসনতন্ত্র ও নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সুতরাং যে নামেই অভিহিত হােক না কেন, সুইজারল্যাণ্ড হল প্রকৃত একটি যুক্তরাষ্ট্র।

(৬) মৌলিক অধিকার: সুইজারল্যান্ডের শাসনতন্ত্রে মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত কোন বিশেষ অধ্যায় সংযােজিত না হলেও শাসনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারায় নাগরিকগণের কতকগুলি অধিকার সংরক্ষিত হয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে সাম্য, ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা, মুদ্রণযন্ত্রের স্বাধীনতা, সংঘ গঠন ও আবেদন করবার অধিকার সুইজারল্যান্ডের নাগরিকগণ ভােগ করে। অবশ্য ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার কতকগুলি ক্ষেত্র সীমারেখা টানা হয়েছে।

(৭) ধর্ম নিরপেক্ষতা: সুইজারল্যান্ডের সংবিধানে ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা স্বীকার করা হলেও তা কার্যত সীমাবদ্ধ। সংবিধানে Jesuits সম্প্রদায়ের কাজকর্ম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং পুরােহিত সম্প্রদায়ের যাতে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত না হয় সে বিষয়েও লক্ষ্য রাখা হয়েছে (Article-51)। সুতরাং মোটামুটিভাবে সুইজারল্যাণ্ডকে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র (secular state) বলা চলে।

(৮) শাসনতন্ত্রের দুস্পরিবর্তনীয়তাঃ সুইজারল্যাণ্ডের শাসনতন্ত্রের দুষ্পরিবর্তনীয়তা এই শাসনতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অবশ্য সুইস শাসনতন্ত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রের মত দুষ্পরিবর্তনীয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা অথবা পঞ্চাশ হাজার নির্বাচকের পক্ষ হতে শাসনতন্ত্র সংশােধনের প্রস্তাব উত্থাপন করা যেতে পারে। এই প্রস্তাব গণভােটে সমর্থিত হওয়া প্রয়ােজন। গণভােটে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ নির্বাচক এবং ক্যান্টনগুলি প্রস্তাব মেনে নিলে সংশােধন প্রস্তাব শাসনতন্ত্রের অঙ্গীভূত হয়।

(৯) শাসন বিভাগ: সুইজারল্যাণ্ডের শাসনব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য হল যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন পরিষদ। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসক প্রধান সুইজারল্যাণ্ডে একজনের পরিবর্তে ৭ জনের একটি পরিষদ (Collegial Executive) এবং তত্ত্বগতভাবে এই পরিষদ সম্পূর্ণভাবে আইনসভার অধীন। সম্মিলিত পরিষদের একজন সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হন এবং তিনিই আনুষ্ঠানিক ব্যাপার রাষ্ট্রপ্রধানের কাজ করে থাকেন।

(১০) বিচার ব্যবস্থা: সুইজারল্যাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত অন্যান্য যুক্তরাষ্ট্রের আদালত হতে পৃথক। যুক্তরাষ্ট্রীয় আইনসভার প্রণীত কোন আইনকে অবৈধ বলে ঘােষণা করবার ক্ষমতা আদালতের নেই। এই ক্ষমতা নেই বলে সুইজারল্যাণ্ডের সর্বোচ্চ আদালতের শাসনতন্ত্রের বাধ্যবাধকতা ও সংরক্ষক হিসাবে কোন ভূমিকা নেই।

(১১) উদারনৈতিক দর্শনের প্রভাব: সুইজারল্যাণ্ডের শাসনব্যবস্থার ঊনবিংশ শতাব্দীর উদারনৈতিক দর্শনের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। শাসনতন্ত্র রচয়িতাগণ পরম্পরাগত উদারনৈতিক স্বাধীনতার বিভিন্ন দিক - যথা, বাক স্বাধীনতা, মুদ্রণ যন্ত্রের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রভূতি শাসনতন্ত্রে বিশেষ স্থান পেয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সমাজকল্যাণ রাষ্ট্রের আদর্শের প্রভাব এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য সুইজারল্যান্ডে সতন্ত্রবাদের পরিবর্তে কেন্দ্রপ্রবণতা প্রবল হয়ে উঠেছে।
Advertisement