ভারতের নির্বাচন কমিশনের গঠন ও কার্যাবলী

- December 05, 2019
ভারতের নির্বাচন অনুষ্ঠান যাতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয় এবং যাতে নির্বাচন ব্যাপারে কোন দুর্নীতি বা পক্ষপাতিত্ব দেখা না দেয় তার জন্য ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ ধারা অনুসারে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন (Election Commission) গঠনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পার্লামেন্ট ও রাজ্য আইনসভাগুলির সদস্য নির্বাচন, রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন তালিকা প্রণয়ন ও নির্বাচন পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানের সকল দায়িত্ব এই কমিশনের উপর ন্যস্ত। নির্বাচন সম্পর্কে বিবাদ মীমাংসার জন্য নির্বাচন কমিশন নির্বাচন ট্রাইবুনাল নিয়োগ করে। সংবিধানের ১৯তম সংশােধন আইনে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করা হয়েছে। ১৯৬২ সালের তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে নির্বাচন মামলার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ট্রাইবুনালের দ্বারা বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সুপারিশ জানায়। সরকার এই সুপারিশ গ্রহণ করে। সংবিধানের ১৯তম সংশােধন আইনে নির্বাচন ট্রাইবুনাল বিলােপ করে তার পরিবর্তে নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয় হাইকোর্টের নিকট আবেদনের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার ছিলেন সুকুমার সেন।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের গঠন ও কার্যাবলী
নির্বাচন কমিশনের গঠন (Structure of Election Commission): নির্বাচন কমিশন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়ে গঠিত হয়। অন্যান্য কমিশনারদের সংখ্যা রাষ্ট্রপতি নির্ধারণ করেন। এদের নিয়োগ করবার ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির। রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কয়েকজন আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করতে পারেন। নির্বাচন গুরুদায়িত্ব স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে পালন করবার জন্য নির্বাচন কমিশনকে যথাসম্ভব শাসন বিভাগের নিয়ন্ত্ৰণমুক্ত করা হয়েছে। সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের যে পদ্ধতি সংবিধানে নির্দিষ্ট আছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে কেবলমাত্র সেই পদ্ধতির মাধ্যমে অপসারণ করা যায়। পার্লামেন্টের প্রতি কক্ষে দুর্নীতি বা অযােগ্যতার জন্যে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে প্রস্তাব গৃহীত হলে ইনপীচমেন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে রাষ্টপতি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে অপসারণ করতে পারেন। নির্বাচন কমিশনের অন্যান্য সদস্য এবং আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশনারদের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশ ব্যতীত পদচ্যুত করা যায় না।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার T.N. Seshan কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সকল রাজনৈতিক দলের সমালােচনার বিষয় হয়ে উঠছিল। ১৯৯৩ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতি বহু সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যবস্থা করেছেন। কেন্দ্রীয় কৃষিসচিব M.S. Gill এবং আইন কমিশনের প্রাক্তন সচিব G.V.G. Krishnamurthy কে অন্য দুই সদস্য হিসাবে নিয়ােগ করেছিলেন।

নির্বাচন কমিশনের কার্যাবলী (Function of Election Commission): ভারতের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই দায়িত্ব বা কাজগুলি হল -
(১) পার্লামেন্ট, রাজ্য আইনসভা, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক সংস্থার নির্বাচনের ভােটার তালিকা প্রণয়ন ও সংশোধন।
(২) সংবিধান ও আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, পার্লামেন্ট, রাজ্য আইনসভার নির্বাচন পরিচালনা ও তদারক করা।
(৩) নির্বাচনের কর্মসূচী অর্থাৎ দিন স্থির, মনােনয়নপত্র পেশ, প্রত্যাহার ও মনােয়নপত্রের বৈধতার পরীক্ষা প্রভৃতির ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের।
(৪) নির্বাচন পরিচালনার জন্যে প্রয়ােজনীয় কর্মচারী নিয়ােগের জন্য রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালদের অনুরােধ করা।
(৫) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী প্রতীক বণ্টন করা।
(৬) কারচুপি, দুর্নীতি বা নির্দিষ্ট অভিযােগের ভিত্তিতে কোন কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত, বাতিল ৰা পুনর্নির্বাচনের আদেশ দিতে পারে।
(৭) সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্যে রাজনৈতিক দল এবং সংশ্লিষ্ট সকলের জন্যে নির্বাচনী আচরণ বিধি তৈরী করতে পারে।
(৮) নির্বাচন কমিশনের নিয়মবিধি মানা হচ্ছে কিনা তা তদারকি করার জন্যে কমিশন পরিদর্শক নিয়ােগ করে।

সমালােচনা: ভারতীয় সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে গড়ে তােলার চেষ্টা করা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ ক্রটি মুক্ত ব্যবস্থা বর্তমান একথা বলা যায় না -
(১) সংবিধানে নির্বাচন কমিশনারদের যোগ্যতা কার্যকাল প্রভৃতি বিষয়ে সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। শাসকদল এক্ষেত্রে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
(২) মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এর চাকরীর শর্তাদি রাষ্ট্রপতি ধার্য করেন। এক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার প্রভাব উপেক্ষা করা যায় না। অনেকের মতে বহুক্ষেত্রে কমিশন কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে।
(৩) অবসর গ্রহণের পর মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অন্য পদে নিয়ােগ করা যায়। সরকারী অনুগ্রহ লাভের এই সুযোগ কমিশনের নিরপেক্ষতার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে।
(৪) নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কোন কর্মচারীমণ্ডলী নেই। এ বিষয়ে কমিশনকে রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালদের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রয়ােজনের সময় কমিশনকে অসুবিধায় পড়তে হয়।
Advertisement