আইন অমান্য আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা

- November 19, 2019
১৯৩০ সালে ৬ই এপ্রিল গান্ধীজী লবণ আইন ভঙ্গের মাধ্যমে আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দেন। তিনি সবরমতী আশ্রম থেকে ২৪১ মাইল দূরে সমুদ্র উপকূলে ডান্ডি অঞ্চলে অভিযান করে লবণ তৈরীর মাধ্যমে সরকারের লবণ তৈরীর একচেটিয়া অধিকারকে অধীকার করে। গান্ধীজী ১২ই মার্চ, ১৯৩০ সালের এই অভিযানে তার ৭৯ জন সদস্যের মধ্যে কোন নারী অন্তর্ভুক্ত ছিল না। যখন আশ্রমের মহিলারা তাকে অনুরােধ করেন যে, অন্ততঃ চার পাঁচ জন মহিলাকে তাঁর সাথে নেওয়ার জন্য, তিনি জানান যে এর জন্য পরে অনেক সময় আছে। নারীরা গান্ধীর এই মনােভাবের বিরােধিতা করেন এবং মহিলাদের Indian Association প্রতিবাদ করে জানায় যে কোন অহিংস আন্দোলনে লিঙ্গ বৈষম্য অনুচিত এবং সদ্য জাগ্রত নারী সচেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
Indian Feminism kamaladevi chattopadhyay
দাদাভাই নওরােজীর নাতনী খুরশীদ বেহন গান্ধীজীকে চিঠি লিখে জানতে চান কেন তিনি নারীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখছেন। মৃদুলা সরাভাই নামে গুজরাট বিদ্যাপীঠের এক ছাত্রী অধ্যক্ষের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। মহিলারা নিজেদের কোন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বন্দী রাখতে অস্বীকার করেন এবং মনে করেন যে কোন মিছিল, মিটিং বা হাজতবাস তাদের অংশগ্রহণ ব্যতীত হওয়া সম্ভব নয়। যদিও কোন মহিলা গান্ধীজীর ঐতিহাসিক ডাণ্ডী অভিযানে সঙ্গী ছিলেন না, কিন্তু তারা সর্বত্র তাকে অভিবাদন জানিয়েছে এবং অধীর আগ্রহে তার কথা শােনার জন্য অপেক্ষা করেছে। আমেদাবাদ থেকে ডাণ্ডী যাওয়ার পথে গান্ধী বক্তৃতায় বলেন যে নারীরা সমস্ত মদের এবং বিদেশী দ্রব্য বিক্রয়কারী দোকানগুলিকে উচ্ছেদ করবে। তিনি নির্দেশ দেন চরকা কাটতে এবং খাদির কাপড় পরিধান করতে। হাজার হাজার রমণী সমুদ্র তীরে যায় এবং নিষিদ্ধ লবণ তৈরী করে ও অকল্পনীয় দামে নিলাম করে অর্থাৎ তারা সরকারের লবণ আইন ভঙ্গ করে।

কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন কিভাবে এই অশিক্ষিত নারীরা সমস্ত ভয় বিপদ অগ্রাহ্য করে আইন অমান্য আন্দোলনকে সার্বজনীন করে তােলেন। তারা প্রত্যেক গৃহকে আইন ভঙ্গকারীদের মন্দিরে পরিণত করেন। তারা শােভাযাত্রা করে, বানর সেনা গঠন করে, প্রভাত ফেরীর আয়ােজন করে প্রভাতকালে তাদের গানের মাধ্যমে গান্ধীজীর ডাকা আন্দোলনে তারা মানুষকে অংশগ্রহণ করতে অনুরােধ করে। বিভিন্ন মিটিংয়ে তারা বক্তৃতা করে। সাহিত্যের লেখা বিক্রি করে এবং সমস্ত ধরনের অত্যাচার ও গ্রেপ্তারীর জন্য প্রস্তুত হয়। পুলিশ তাদের ভয় দেখানাের জন্য অনেককে বন্দী করে রাত্রে জঙ্গলে ছেড়ে দেয়, জলের পাইপ দিয়ে তাদের ভিজিয়ে দেয়, লঙ্কা গুঁড়াে তাদের চোখে ছিটিয়ে দেয় এবং তাদের স্বামীদের অকথ্য ভাষায় অপমান করে ও সন্তানদের ছিনিয়ে নেয়। তাসত্বেও আন্দোলনের প্রথম দশ মাসের মধ্যে প্রায় ১৭, ০০০ মহিলা দোষী সাব্যস্ত হয় এবং তাদের জেলে পাঠানাে হয়।

কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় এবং অবন্তী কাবাই গোখলে প্রথম মহিলা সদস্যা ছিলেন যারা বম্বেতে লবণ আইন অমান্য করে। কমলাদেবীর লেখা থেকে জানতে পারি যে মানুষ বিমুগ্ধ হয়ে দেখতেন কিভাবে কোন অস্ত্র ছাড়া সাধারণ সুতির শাড়ী পক্ষে এই অন্তঃপুর নারীগণ সমস্ত বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করে জনসমক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। তারা তাদের সংঘর্ষকে একটি কাব্যে পরিণত করেছে। ধন্দোকেম্বব কারভে (প্রথম নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা) নারীদের এই লবণ আইন ভঙ্গের শােভাযাত্রা দেখে মন্তব্য করেছিলেন যে, বছরের পর বছর ধরে তিনি যা পাবেননি, সবরমতীর এই যাদুকর তার একটি ছোয়ায় তা সম্ভব হয়েছে।

কমলাদেবী, সরােজিনী নাইডু, হনসা মেহেতা, জয়শ্রী রাইজী তিলকের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ১লা আগষ্ট, ১৯৩০ সালে বােম্বতে একটি শােভাযাত্রা বের করেন। পুলিশ তাদের বাধা দান করলে তারা সারা রাত বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় অবস্থান করেন। হনসা মেহেতা প্রমুখেরা 'দেশ সেবিকা সংঘ' তৈরী করেন। বােম্বেতে পিকেটিংয়ের কাজ এত ভালভাবে চলে যে পুলিশ তা আইন বিরােধী বলে ঘােষণা করে। শহরের চারিদিকে মহিলাদের দেখা যেত। তারা হয় মদের বা বিদেশী কাপড়ের দোকানের বাইরে বসে আছে এবং চরকা কাটছে ও নিঃশব্দে সমস্ত ভারতীয়দের সেইসব দোকান থেকে জিনিস কেনার ব্যাপারে সতর্ক করছে। মাদ্রাজে লবণ সত্যাগ্রহটি প্রকাশনের নেতৃত্বে শুরু হয়। তার গ্রেফতারের পর আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন দূর্গাবাই। তিনি একমাস এই সত্যাগ্রহ আন্দোলন করেন এবং পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর তাকে ভেলােরের সেন্ট্রাল জেলে একবছর কারাবন্দী রাখা হয়। অনেক মহিলারা প্যাকেটে নুন বিক্রি করতেন বা টাকা যােগাড়ের জন্য নিলাম করতেন।

গুজরাটে সবরমতী আশ্রমে নারী সত্যাগ্রহীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। আমেদাবাদে কস্তুরবা গান্ধী, সরলাদেবী সরাভাই, মৃদুলা সরাভাই প্রমুখ সত্যাগ্রহের নেতৃত্ব দেন। হাজার হাজার ছাত্রী, শিক্ষিকা এবং গৃহবধূবা প্রভাত ফেরীতে অংশগ্রহণ করে এবং অনেকে 'কৃপান' নিয়ে রাস্তায় ঘুরতেন।। গঙ্গাবেইন বৈদ্য ৩১শে জানুয়ারী, ১৯৩১ সালে ১২০০ মহিলাদের নিয়ে বরসাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। পুলিশ লাঠি চালায়, গঙ্গাবেহেনকে আহত করে কিন্তু তিনি ত্ৰিরঙ্গা পতকা নিজে আকড়ে ধরে রাখেন। কলিকাতায় নারী পিকেটিং বাের্ড গঠিত হয় এবং বিভিন্ন নারী সংস্থা—যথা, রাষ্ট্রীয় মহিলা সংঘ, নিখিল জাতীয় নারী সংঘ, লবণ আইন অমান্য করে এবং নারীদের এই আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করে। দিল্লীতে অনেক মহিলাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কয়েক শতক রমণী আদালত চত্বরে গিয়ে আইনজীবিদের পদত্যাগ করতে অনুরােধ করে। স্বামী শ্ৰদ্ধানন্দের পত্নী সত্যাবতী যমুনা নদীতে স্নানের জন্য যে সব বড় ঘরের কােন মহিলা আসতো, তাদের অনুনয় করেন বিদেশী দ্রব্য করতে। দিল্লীর নারী জাগরণের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ।

পাঞ্জাবে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা হয় ৫,০০০ নারীর শােভাযাত্রার দ্বারা। প্রভাত ফেরী, মিটিং এবং পিকেটিং দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল। লালা লাজপত রায়ের কন্যা পার্বতী দেবী লাহোরে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। পাঞ্জাবে সাগর না থাকায় জওহরলাল নেহেরুর পরামর্শ অনুযায়ী তারা রাভি নদীর তীরে লবণ আইন ভঙ্গ করে। প্রায় সমগ্র ভারতে একই চিত্র দেখা যায় নারীরা সদলবলে শােভাযাত্রা করেছে, দেশাত্মবোধক গানের দ্বারা জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং বিদেশী দোকানগুলিতে পিকেটিং করেছে। জওহরলাল নেহেরু নইনি কারাগার থেকে লিখেছিলেন যে, আইন অমান্য আন্দোলনে ৮০, ০০০ মানুষ কারাবরণ করেছে এবং তার মধ্যে ১৭, ০০০ জনই মহিলা।

একটি সাক্ষাৎকারে মহিলারা জানান যে পুরুষের সাথে কাধ মিলিয়ে নারীদের জাতীয় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার সুযোেগ মহিলাদের সমস্ত ভয় বিপত্তি জয় করতে সাহায্য করেছে এবং নারী মুক্তির ক্ষেত্রে গান্ধীজীৱ এটি সবচেয়ে বড় অবদান। গান্ধীজীর মধ্যে তারা একজন বিচক্ষণ পিতা ও স্নেহশীল মাতাকে পেয়েছেন, যার ভালবাসার কাছে সমস্ত লজ্জা সঙ্কোচ নিমেষে দূর হয়ে যায়। গান্ধীজীর সমালােচকেরা মনে করেন যে নারীদের দ্বায়িত্ব ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার আবিষ্কার মহাত্মা গান্ধীর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃতিত্ব।
Advertisement