অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা

- November 24, 2019
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শুরু থেকেই সদস্যপদ নারীর জন্য উন্মুক্ত ছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখী বন্ধনের সূচনা করেন। নারীরা এতে অংশগ্রহণ করে এবং অরন্ধনে যােগ দেয়। তারা প্রতিবাদী মিছিল এবং মিটিংয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বিদেশী দ্রব্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে এবং দেশজ দ্রব্যের স্বপক্ষে দেশব্যাপী প্রচার শুরু হয়। নারী স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আন্দোলনের ডাকে সাড়া দেয়। তারা বিদেশী জিনিস বর্জন করে ও পুরুষ নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক জগতে অংশগ্রহণ করে। দেশপূজার সাথে স্বাধীনতা আন্দোলনের একাত্মকরণ করা হয় এবং শক্তি ও নারীশক্তি।
Women's role in non cooperation movement
স্বদেশী আন্দোলনে মহিলাদের রাজনৈতিক আগ্রহ জাগরিত এবং বিকশিত হয় অ্যানি বেসান্তের নেতৃত্বে তার হােমরুল আন্দোলনে। এই আন্দোলন নারীকে অনুপ্রাণিত করে এবং তাদের কাছে এক বিশেষ বার্তা বহন করে। বেসান্ত মনে করতেন যে, নারীর প্রতি তার মুক্তির উপর নির্ভরশীল। নারীর অবগত হওয়া প্রয়ােজন যে, পুরুষ কেন আন্দোলন করছে এবং নারীর সেখানে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। হােমরুল আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তরে নারীদের নৈতিক ভাবে সচেতন করে।

১৯১৯-১৯২০ সালে ভারতীয় রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে এক নটিকীয় পরিবর্তন সূচিত হয়। মহাত্মা গান্ধীর ভারতীয় রাজনীতিতে আবির্ভাব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করে এবং অনেক বেশি সংখ্যায় নারীকে সক্রিয় রাজনীতির অঙিনায় নিয়ে আসে। দক্ষিণ আফ্রিকার সত্যাগ্রহ আন্দোলনে নারী ছিল তার প্রধান বাহিনী। দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা থেকে গান্ধী উপলব্ধি করেছিলেন নারীদের পরোক্ষ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে। আমেদাবাদের বস্ত্র শিল্পে শ্রমিকদের ধর্মঘটের সময় তাঁর প্রধান সহকারিণী ছিলেন অনুসুয়া বেহন (সুতি বস্ত্র শিল্পের মালিক অম্বালাল সরাভাইয়ের ভগ্নী)। গান্ধীজীর চুম্বকসম আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং তার স্বচ্ছতা নারীদের অনুপ্রাণিত করেছিল।

জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং খিলাফৎ আন্দোলনের সাথে ১৯২০ সালে গান্ধী আনুষ্ঠানিকভাবে তার অসহযােগ আন্দোলনের সূচনা করেন। প্রথম অসহযােগ আন্দোলনে নারীরা বিভিন্ন মিছিলে অংশগ্রহণ করে। খদ্দর এবং চরকার ব্যবহারের কথা প্রচার করে এবং কেউ কেউ সরকারী স্কুল ও কলেজ পরিত্যাগ করে। গান্ধীজীর বাণী নারীদের মন্ত্রমুগ্ধ করে এবং অনেকে তাদের টাকাপয়সা ও গহনা দান করে। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র যখন চাঁদা সংগ্রহ করছিল, তখন শ্রীমতী বিজয়লক্ষী পন্ডিত তার সােনার বালাজোড়া দান করেন। তার একমাত্র দুঃখ ছিল যে তিনি আরাে বেশি কিছু দিতে পারলেন না।

বাসন্তীদেবী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সাথে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় যান এবং নারীদের বিদেশী দ্রব্য বর্জন ও পিকেটিংয়ের নেতৃত্ব দেন। ১৯২১ সালের ৭ই ডিসেম্বর কলকাতার রাস্তায় খদ্দর ফেরী করার জন্য উর্মিলাদেবী এবং সুনীতিদেবীর সাথে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তারা মুক্তি পান। তাদের গ্রেপ্তার জনসাধারণকে আরাে বেশি উদ্বুদ্ধ করে। ১৯২২ সালে বাসন্তীদেবী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতি হন এবং এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের পুরােভাগে একজন বাঙালী নারীকে নিয়ে আসে। এই বছরে কস্তুরবা গান্ধী গুজরাট প্রাদেশিক সভার সভাপতিত্ব করেন এবং নারীদের কাছে চরকায় সুতাে কাটা ও খাদি বস্ত্র ব্যবহারের জন্য আহ্বান জানান। এলাহাবাদে রামেশ্বরী নেহেরু কুমারী সভা গঠন করেন যেখানে মেয়েদের গণ আলােচনায় বক্তব্য রাখতে ও বিতর্কে অংশ নিতে শেখানাে হয়। হেমপ্রভা মজুমদার অনেক পুলিশি অত্যাচার সহ্য করেন এবং চিত্তরঞ্জন দাসের মতে তিনি “জেলের বাইরে একমাত্র পুরুষ"। বি. আম্মান (সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের মাতা) তারা অবগুণ্ঠন সরিয়ে জনসমক্ষে বক্তাতা এবং খাদির ব্যবহার ও হিন্দু মুসলমানের ঐক্যের কথা প্রচার করেন। বাসন্তীদেবীর ননদ উর্মিলাদেবী স্বরাজ্যের মূল মন্ত্র নিঃশব্দে প্রচার করেন এবং মহিলাদের মধ্যে চরকা প্রচলন জনপ্রিয় করে তােলার জন্য "নারী কর্মমন্দির” এর কর্মসূচিতে আংনিয়ােগ করেন।

নারীরা একত্রিতভাবে জাতীয় আন্দোলনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সংগঠন তৈরী করেন। বাংলায় লতিকা ঘােষের নেতৃত্বে মহিলা রাষ্ট্রীয় সংঘের সৃষ্টি হয়। প্রায় ছয় মাস ধরে এই সংঘের সদস্যরা পিকেটিং অভিযানের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। উর্মিলাদেবী নারী সত্যাগ্রহ কমিটি গঠন করেন। এবং সরকারী আদেশের বিরুদ্ধে গিয়ে মিছিল বার করেছিলেন। জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী (সিংহলে শিক্ষকতা ত্যাগ কৱে অসহযােগ আন্দোলনে যােগদান করেন), হেমপ্রভা দাস প্রভৃতি ছিলেন এই সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যা। নারী পিকেটিং বাের্ড গঠিত হয়। এই সংস্থার অনেকগুলি শাখা ছিল। যথা — বয়কট এবং পিকেটিং শাখা, স্বদেশ প্রচার শাখা যেখানে খাদি ব্যবহারের কথা প্রচার করা হত, প্রভাত ফেরী শাখা যারা বিভিন্ন মিছিলের আয়ােজন করতেন, সংগঠনমূলক শাখা যেখানে চরকা ব্যবহারের পন্থা শেখানাে হত এবং তাদের তৈরী সুতো বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারের সাথে পরিচয় করানাে হত ইত্যাদি। সংগঠন বিদেশী দ্রব্য বয়কটের উদ্দেশ্যে হিন্দু ও মুসলমান ঐক্য স্থাপনের জন্য, পর্দা এবং অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের জন্য মহিলা সমিতি গঠনের প্রয়ােজনীয়তার কথা বলে।

রাজনীতিতে সরোজিনী নাইডু, উর্মিলাদেবী ও জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী প্রভৃতি মহিলাদের প্রবেশ জাতীয় আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি নারী জগতের কাছে সত্যিকারের প্রেরণা রূপে কাজ করেছে। তারা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে, নারী পরিচিত গণ্ডী থেকে বেরিয়ে এসে বৃহত্তর সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম। সরকারী রিপাের্ট অনুযায়ী বলা হয়েছে যে মহিলারা প্রতিদিন রাস্তায় নামেন এবং পুরুষ স্বেচ্ছাসেবক ও অন্যান্য উৎসাহীদের সমবেত করে গান গাইতে থাকেন এবং দোকানদার ও সাধারণ মানুষদের বিদেশী দ্রব্য বর্জন ও স্বদেশী জিনিস ব্যবহার করার জন্য অনুরােধ করতে থাকেন। জনসমাবেশ ও মিছিলে সরকারী নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ অমান্য করার মধ্য দিয়ে মহিলাদের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছিল। এইসৰ সত্ত্বেও প্রথম অসহযােগ আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত এবং তারাই প্রধাণতঃ যােগদান করেছিল যাদের পিতা, স্বামী বা পুত্র এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে এবং জেলবন্দী হয়েছে।
Advertisement