United Nations Organization Origin - সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের উৎপত্তি

- November 10, 2019
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি রক্ষা ও আন্তর্জাতিক বিরােধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্যে 1920 খ্রিস্টাব্দে 10 জানুয়ারি জাতিসঙ্ঘ বা লীগ অফ নেশনস (League Of Nations) স্থাপিত হয়। কিন্তু নানা কারণে জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ 1939 খ্রীঃ আরম্ভ হলে League Of Nations মৃত্যুর ঘন্টা বেজে যায়। লীগের পতন হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উত্তেজনা প্রশমন ও শান্তি স্থাপনের জন্যে একটি আন্তর্জাতিক প্রয়ােজনীয়তা প্রতিষ্ঠানের প্রয়ােজনীয়তা দেখা যায়। লীগের পতনের ফলে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয় তা পূরণ করার দরকার বৃহৎ শক্তিগুলি অনুভব করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই মিত্রশক্তির নেতারা একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা ভাবতে থাকেন। অবশেষে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বা ইউনাইটেড নেশনস অর্গানাইজেশন বা UNO (United Nations Organization) স্থাপন দ্বারা এই উদ্দেশ্যকে বাস্তব রূপ দান করা হয়।
United Nations Organization Logo
লন্ডন ঘোষণা (London Declaration): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়েই নতুন করে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তােলার প্রয়াস শুরু হয়েছিল। 1941 খ্রিস্টাব্দের জুনে ইংল্যান্ড, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপ্রধানরা লন্ডনে সমবেত হয়ে ঘােষণা করেন যে-যুধান্তে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা স্থাপনে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। তাদের এই ঘােষণা লন্ডন ঘোষণা (London Declaration) নামে পরিচিত।

আটলান্টিক সনদ (Atlantic Charter): 1941 খ্রিস্টাব্দে 9 আগস্টে আটলান্টিক মহাসাগরে 'Prince of Wales' নামে এক যুদ্ধজাহাজে এক গােপন বৈঠকে মিলিত হন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। তারা বিশ্বশান্তি ও বিভিন্ন জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সম্পর্কে ৮ দফার একটি ঘােষণাপত্র প্রকাশ করেন। এই ঘােষণাপত্র ‘আটলান্টিক সনদ' (Atlantic Charter) নামে খ্যাত। এই ঘােষণাপত্রে বলা হয় (ক) ভবিষ্যতে কোনাে রাষ্ট্র কোনাে বিস্তারনীতি গ্রহণ করবে না। (খ) সীমানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জনগণের মতামত গ্রহণ করবে। (গ) পরাধীন জাতিগুলির স্বাধীনতালাভের অধিকার এবং পরে তাদের সরকার গঠনের অধিকার থাকবে। (ঘ) সব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সমঅধিকার স্বীকৃত হবে। (ঙ) বিভিন্ন উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন রাষ্ট্র পারস্পরিক সহযােগিতার নীতি গ্রহণ করবে। (চ) বৈদেশিক আক্রমণের ভীতি দূর করে অভ্যন্তরীণ উন্নতিকল্পে অনুকুল পরিবেশ গঠন করবে। (ছ) বিশ্বের সামুদ্রিক পথগুলি সবরাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। (জ) প্রত্যেকটি রাষ্ট্র সামরিক উপকরণ হ্রাস করে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট হবে।

ওয়াশিংটন সম্মেলন (Washington Conference): 1942 খ্রিস্টাব্দের 1st জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত একসম্মেলনে আটলান্টিক সনদের নীতিগুলি বিশ্বের ২৬টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিবর্গ মেনে নিয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ঘােষণাপত্র নামে এক দলিলে স্বাক্ষর করেন। এই সম্মেলনেই সর্বপ্রথম ইংরেজ কবি লর্ড বায়রন এর চাইল্ড হেরাল্ড-এ উন্নখিত United Nations শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয়।

মস্কো ঘোষণা (Moscow Declaration): 1943 খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে মস্কোতে ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন মিত্রশক্তিবর্গের সম্মেলনে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাবিধানে একযােগে কাজ করার এবং সবরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তােলার সংকল্প ঘােষণা করা হয়। এই ঘােষণা মস্কো ঘােষণা (Moscow Declaration) নামে পরিচিত। এই ঘােষণাপত্রের চতুর্থ অনুচ্ছেদে বলা হয় যে- “আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্যে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্রগুলির সার্বভৌমতার ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রয়ােজনীয় চার শক্তি স্বীকার করছে।” এইভাবে মস্কোর ঘােষণাপত্রে মিত্রশক্তি একটি আন্তর্জাতিক সংঘ স্থাপনের নীতি ঘােষণা করে।

তেহরান সম্মেলন (Tehran Conference): 1943 খ্রিস্টাব্দের তেহরান সম্মেলনে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এবং রুশ প্রধান স্ট্যালিন মিলিতভাবে ছােটো বড়ো সমন্ত রাষ্ট্রের সহযােগিতায় পৃথিবী থেকে সমস্ত ধরনের অনাচার, অত্যাচার, দাসত্ব, অসহিষ্ণুতা দূর করে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্র পরিবার গঠনের সংকল্প ঘােষণা করেন। এই ঘােষণা একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠনেরই ইঙ্গিত দেয়।
Advertisement

ডাম্বারটন ওকস সম্মেলন (Dumbarton Oaks Conference): 1944 খ্রিস্টাব্দের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডাম্বারটন ওকস নামক স্থানে ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সােভিয়েত রাশিয়া, চিন প্রভৃতি শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির প্রতিনিধিবর্গ আটলান্টিক সনদ, মস্কো, তেহরান সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব গুলির বাস্তব রূপদানে সচেষ্ট হন। তারা দীর্ঘ আলাপ আলােচনার মাধ্যমে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের কাঠামাে ও রূপরেখা প্রস্তুত করণের খসড়া রচনা করেন। কিন্তু ভেটো (Veto) নিয়ে মতানৈক্য দেখা দিলে পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ইয়াল্টা সম্মেলন (Yalta Conference): 1945 খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে ইয়াল্টা নামক স্থানে চার্চিল, রুজভেল্ট ও স্ট্যালিন এক সম্মেলনে মিলিত হয়ে ভেটো (Veto) সমস্যা নিয়ে সিধান্ত গ্রহণ করেন।

সানফ্রান্সিসকো সম্মেলন (San Francisco Conference): সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ গঠনের সর্বশেষ পদক্ষেপ ছিল সানফ্রান্সিসকো সম্মেলন। ইয়াল্টা সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুসারে 1945 খ্রিস্টাব্দের 25 এপ্রিল 51টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিয়ে সানফ্রান্সিসকো সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যােগদানকারী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে 50টি রাষ্ট্র সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের উদ্দেশ্য, নীতি, গণতন্ত্র প্রভূতি বিভিন্ন বিষয়ে বিশদ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলােচনা করেন এবং জাতিপুঞ্জের সনদে স্বাক্ষর করেন। 1945 খ্রিস্টাব্দের 24 অক্টোবর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়।
Advertisement