ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক কারণ কী ছিল

- November 15, 2019
ফরাসি সমাজে যাজক ও অভিজাতরা ছিল সুবিধাভােগী শ্রেণী। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক ইত্যাদি নিয়ে গঠিত তৃতীয় সম্প্রদায় ছিল সুবিধাহীন। এরা ছিল করভারে জর্জরিত, নিপীড়িত এবং বংশকৌলীন্য না থাকায় সমস্ত রকম রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্মান ও অধিকার থেকে বঞ্চিত। এই সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তৃতীয় সম্প্রদায়ের মানুষ প্রতিবাদ জানালে ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়। অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সে জনগণ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। এই শ্রেণীগুলিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে নিম্নে আলোচনা করা হল।
Social Causes of French Revolution
(১) প্রথম শ্রেণী (First Estate): যাজক সম্প্রদায় ছিল প্রথম শ্রেণী। 1789 খ্রীঃ ফ্রান্সে যাজকদের সংখ্যা ছিল মােট প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার। উচ্চ যাজক ও নিম্ন যাজক এই দুই ভাগে যাজকশ্রেণী বিভক্ত ছিল। বিশপ প্রভৃতি উচ্চ যাজকরা ছিল অভিজাত সম্প্রদায় থেকে আগত। জ্যেষ্ঠ পুত্রের উত্তরাধিকার আইন বা ল অফ প্রাইমােজেনিচার আইন অনুসারে অভিজাতদের জ্যেষ্ঠ পুত্র পিতার উপাধি ও সম্পত্তি পেত। অভিজাতদের অন্য পুত্রদের ভরণপােষণের জন্যে তাদের অনেক সময় বিশপের পদে নিয়ােগ করা হত। এজন্য উচ্চ যাজকরা ছিল বেশীরভাগ অভিজাত শ্রেণী থেকে আগত। ফ্রান্সের আইন অনুসারে প্রজারা গীর্জাকে টাইদ বা ধর্ম কর দিত। এছাড়া নানা প্রকার কর নানা উপলক্ষে গীর্জাকে দিতে হত। মৃত্যু কর, নামকরণ কর, বিবাদ কর প্রভৃতি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। ফরাসী মন্ত্রী নেকারের মতে, ফরাসী গীর্জার বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১৩ কোটি লিভর। গীর্জার এই বিপুল পরিমাণ অর্থ উচ্চ যাজক বা বিশপ শ্রেণীই ভােগ করত। 1789 খ্রীঃ ফ্রান্সে বিশপের সংখ্যা ছিল ১৩৯ জন। গীর্জার সকল ব্যাপার উচ্চ যাজকেরাই নিয়ন্ত্রণ করত। Contract de Poissey বা পােইসির চুক্তি অনুসারে গীর্জার বিশপরা তাদের ভূসম্পত্তির জন্যে সরকারকে নিয়মিত কর দিত না। তারা স্বেচ্ছা কর দিত। উচ্চ যাজক শ্রেণী ছিল অভিজাত ও সুবিধাভােগী শ্রেণী। নিম্নস্তরের যাজকেরা ছিল গ্রামের পদরী। এরা ছিল দরিদ্র এবং নিষ্ঠাবান। এরা ছিল বেশীরভাগ তৃতীয় শ্রেণীর লােক। গীর্জার আয়ের সিংহভাগ বিশপরাই গ্রহণ করতেন। এজন্য নিম্নস্তরের যাজকরা আর্থিক দুরবস্থায় দিন কাটাত। উচ্চ যাজকদের প্রতি নিম্ন যাজকরা প্রবল ঘৃণা পােষণ করত। ফরাসী বিপ্লবের সময় নিম্ন যাজকরা পুরাতনতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাড়ায়। প্রকৃতপক্ষে যাজকরা ছিল একটি সম্প্রদায়। যাজক ছিল একটি বৃত্তি। কেহ যাজক হয়ে জন্মাত না। কিন্তু ফ্রান্সের আইনে তাদের শ্রেণী বলে গণ্য করে আলাদা ভােটদানের অধিকার দেওয়া হয়।

(২) দ্বিতীয় শ্রেণী (Second Estate): দ্বিতীয় শ্রেণীতে ছিল অভিজাত শ্রেণী। ফরাসী বিপ্লবের প্রাকালে ফ্রান্সের মােট অভিজাতদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার। অভিজাতরা ছিল বংশ কৌলিন্যে সম্পন্ন। এরা নিজ সম্প্রদায়ের সতন্ত্র ও অধিকার রক্ষার জন্যে সর্বদা যত্নবান ছিল। কায়িক বা মস্তিষ্কের শ্রমের দ্বারা জীবিকা অর্জনের কাজকে তারা নিন্দনীয় মনে করত। অভিজাত শ্রেণী বংশানুক্রমিকভাবে তাদের এই বিশেষ অধিকারগুলিকে সযত্নে রক্ষা করত। আবার অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে বিভিন্ন উপগােষ্ঠী ছিল।

(i) প্রাচীন বনেদী ঘরের অভিজাত - মােট অভিজাতদের মধ্যে এদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ হাজার। এরা রাজার সভাসদ, সেনাপতি ও বিচার বিভাগের উচ্চপদ এবং অভিজাত ইনটেন্ডেন্টের (Intendent) কাজ করতো। এদের দরবারী অভিজাত (Court nobility) বলা হয়। রাজার পারিষদ, মন্ত্রী, রাজদূত, প্রাদেশিক শাসনকর্তা, সামরিক বিভাগের উচ্চপদগুলি এদের একচেটিয়া অধিকারে ছিল। এরা ছিল রাজার সহকারী শাসক শ্রেণীর লােক। এই সকল দরবারী অভিজাত আড়ম্বরময় জীবনে অভ্যস্ত ছিল। বহু দাসদাসী ও অনুচর রাখার খরচায় ঋণগ্রস্ত হলেও এরা আড়ম্বর ত্যাগ করত না। এরা ছিল খুবই গর্বিত। অন্যান্য অভিজাতদের বিশেষতঃ গ্রামীণ অভিজাতদের এরা নীচু চোখে দেখত। এরা রাজধানী ভার্সাই নগরে বসবাস করত। এরা একাধারে জমিদারীর আয়, বিভিন্ন পদে চাকুরীর আয় ভােগ করত।

(ii) গ্রামীণ অভিজাত - এরা গ্রামাঞ্চলে নিজ জমিদারীতে বাস করত এবং প্রাদেশিক সভায় প্রতিপত্তি খাটাত। গ্রামীণ অভিজাতরা জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি এবং সেই অনুপাতে তাদের আয় না বাড়ায় ক্রমে দরিদ্র হয়ে পড়ে। তবুও এরা কায়িক পরিশ্রম বা বাণিজ্য দ্বারা রােজগার বাড়াতে রাজী ছিল না। অষ্টাদশ শতকে এই আয় বৃদ্ধির জন্যে কৃষকদের ওপর নিদারুণ নিপীড়ন চালায়। এজন্যে কৃষক শ্রেণী খুবই বিক্ষুব্ধ ছিল।

(iii) চাকুরীজীবি অভিজাত - ধনী বুর্জোয়াদের একাংশ সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা লাভের জন্যে পালেমেন্টের বিচারকের পদ বা প্রদেশে ইন্টেন্ডেন্টের পদ বংশানুক্রমিকভাবে কিনে নিত। এর ফলে এরা পদমর্যাদার জোরে অভিজাত বলে গণ্য হত। এজন্য এদের পােষাকী অভিজাত বলা হয়। এরা প্রশাসক ও আইনবিদ এবং বিচারকের কাজ করত। এরাও বংশানুক্রমে বিভিন্ন পদ ভোগ করত। পার্লেমেন্ট বা বিচারসভাগুলির বিচারকের পদ এদের একচেটিয়া ছিল।

অভিজাত সম্প্রদায় ছিল ফ্রান্সের বিশেষ অধিকার ভােগী শ্রেণী। এরা বংশ কৌলিন্যের জোরে সরকারি উচ্চ পদগুলির একচেটিয়া অধিকার ভােগ করত। ফ্রান্সের কৃষি জমির 1/3 অংশের এরা মালিক ছিল। ফ্রান্সের আইনে অভিজাতরা টাইল বা ভুমিকর আদায় দিতে বাধ্য ছিল না। ভিটিংএমে ও ক্যাপিটেশন প্রভূতি প্রত্যক্ষ কর প্রদান থেকেও তারা নানা ভাবে অব্যাহতি পেত। রাস্তাঘাট নির্মাণ বা খাল খননে জন্যে অভিজাত শ্রেণী বাধ্যতামূলক শ্রম Corvee কর দিত না। অভিজাত শ্রেণী তাদের জমিদারীতে নানা প্রকার সামন্ত স্বত্ব ভােগ করত, যথা - জমিদারীর সামন্ত উপসত্ব বা Champart, জমিদারীতে সামন্ত আদালত গঠনের অধিকার, জরিমানা আদায়ের অধিকার, যে কোন একচেটিয়া ব্যবসায়ের অধিকার, গম পেষাই ও মদ চোলাই কারখানা রাখার অধিকার, বানালিতে বা উপকর আদায়ের অধিকার ও বেগার খাটাবার অধিকার ইত্যাদি। রাজার সভাসদ হিসেবে ভাতা, পুরস্কার ও পেনসন এরা ভােগ করত।

(৩) তৃতীয় শ্রেণী (Third Estate): ফ্রান্সের বাকি লােকেরা তৃতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। বুর্জোয়া, মধ্যবিত্ত, শ্রমিক, কৃষক, দিনমজুর প্রভূতি সকলেই ছিল তৃতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তৃতীয় শ্রেণীকে Unprivileged বা অধিকারহীন শ্রেণী বলা হয়। ফ্রান্সের মোট লােকসংখ্যার শতকরা ৯০% লােক ছিল তৃতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তৃতীয় শ্রেণীর লােকেরা একটি মাত্র সমশ্রেণী ও সমজীবিকাভুক্ত ছিল না। বিভিন্ন স্তরের লােকেরা একত্রে হয় তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত হয়। ধনী বুর্জোয়া থেকে চালচুলােহীন ভবঘুরে সকলেই ছিল তৃতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত। এদের নিজেদের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে যথেষ্ট বৈষম্য ছিল। এই শ্রেণীর মধ্যে বিরোধ ও ব্যবধানও কম ছিল না। কিন্তু অভিজাতদের আধিপত্য ও শােষণ নীতির জন্যে এরা বিপ্লবের প্রাক্কালে নিজেদের বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়।

(ক) বুর্জোয়া শ্রেণী (Bourgeois): তৃতীয় শ্রেণীর মুখপাত্র ছিল বুর্জোয়া শ্রেণী। বুর্জোয়া বলতে সাধারণতঃ পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক শ্রেণী বোঝায়। কিন্তু ফরাসী বুর্জোয়াদের সকলেই পুজিবাদী ছিল না। মধ্যযুগে যারা Burg বা শহরের উপকণ্ঠে বসবাস করে ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্প কারিগরী দ্বারা জীবিকা অর্জন করত তাদের বলা হত Burgess বা বার্গের অধিবাসী। এই Burgess কথাটি থেকে আধুনিক বুর্জোয়া (Bourgeois) কথাটির উদ্ভব হয়। শহরবাসী ধনী বণিক, সাধারণ দোকানদার, কারিগর, বুদ্ধিজীবি, চাকুরিয়া সকলেই বুর্জোয়া। বুর্জোয়াদের মধ্যে স্তরভেদ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল। বুর্জোয়াদের আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলেও তাদের বংশকৌলিন্য ছিল না।

(i) বুর্জোয়াদের আবার বিভিন্ন স্তরে ছিল পাতি বুর্জোয়া। এদের মধ্যে একটি অংশে চাকুরিয়া, আইনজীবি, চিকিৎসক, অধ্যাপক প্রভৃতি পেশায় নিযুক্ত ছিল। তাদের বৃত্তিজীবি বুর্জোয়া বলা হয়। এরা ছিল বুদ্ধিমান, সাহসী এবং সমাজ সচেতন। দার্শনিকদের আলোকিত ভাবধারা এই শ্রেণীর মধ্য বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করে। এই শ্রেণীর লােকেরাই অভিজাতদের জন্মকৌলিন্য ও বিশেষ অধিকারকে আক্রমণ করে।

(ii) বুর্জোয়াদের অপর অংশ ব্যবসায় বাণিজ্যের দ্বারা অর্থ উপার্জন করত। এদের হাতে প্রচুর অর্থ থাকলেও জন্ম কৌলিন্যর অভাবে এরা অভিজাতদের সমান মর্যাদা পেত না। এদের ধনী বুর্জোয়া বলা হত। ধনী বুর্জোয়ারা সরকারকে প্রচুর অর্থ ঋণ দিত। বুরবো সরকার বণিকদের শিল্প, বাণিজ্যের ওপর নানাবিধ বাধানিষেধ জারি করায় এবং মালের ওপর শুল্ক চাপাবার জন্যে এই শ্রেণী সরকারের ওপর অসন্তুষ্ট ছিল।

(iii) মূলধনী বুর্জোয়া শ্রেণী ছিল ব্যাংকের মালিক, বড় বড় শিল্পের মালিক। তাদের হুটে বুর্জোয়া বা পুজিপতি শ্রেণী বলা হত। এরা ছিল অর্থবান। এরা বাণিজ্যে মূলধন লগ্নী করত। সরকারকে এরা সুদের বিনিময়ে ঋণ দিত। বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণী বুঝাতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের লােক বুঝাত। হ্যাম্পসনের মতে, “বুর্জোয়া শ্রেণীর সকল শাখাই অভিজাতদের সমালােচনা করত। তারা অভিজাত শ্রেণীর সমান মর্যাদা ও অধিকার লাভের ইচ্ছা পােষণ করত"। বুর্জোয়ারা ছিল ফরাসী সমাজের সর্বাপেক্ষা অসন্তুষ্ট শ্রেণী। শিক্ষা ও অর্থের অধিকারী হলেও সমাজের উচ্চশ্রেণীতে ঢােকার দরজা তাদের কাছে বন্ধ ছিল। হতাশা থেকেই তারা পুরাতনতন্ত্র ভাঙার কাজে অগ্রণী হয়। তারা এমন একটি সমাজ চায় যেখানে অর্থ ও বিদ্যার জোরে তারাই প্রাধান্য পেতে সক্ষম হবে। বুর্জোয়াদের এই অর্থ ও বিদ্যার অহমিকা বােধ বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করে। এজন্যেই নেপােলিয়ন মন্তব্য করেন যে, “বিপ্লবের মূল কারণ ছিল অহমিকা; স্বাধীনতার দাবী ছিল একটি অজুহাত মাত্র”।

(খ) কৃষক শ্রেণী: তৃতীয় শ্রেণীর বৃহদংশ ছিল কৃষক সম্প্রদায়। অভিজাত, ধনী বুর্জোয়া, নগরবাসী পাতি বুর্জোয়া সকলের চোখে ফরাসী কৃষকরা ছিল নিম্নশ্রেণী, নিরক্ষর, বর্বর লােক। এরা মনে করত যে উচ্চশ্রেণীর খাদ্য উৎপাদনের জন্যেই কৃষকরা জন্মেছে। রাজকোষে রাজস্ব প্রদান, সামন্ত প্রভুদের কর ও রসদ যােগান ও শহুরে লােকেদের খাদ্য সরবরাহ করতে কৃষকরা বাধ্য ছিল বলে মনে করা হত। বহু বছর ধরে কৃষকরা নানা ভাবে শােষিত হচ্ছিল। কৃষকদের মধ্যে কয়েকটি ভাগ ছিল, যথা -

(i) স্বাধীন কৃষক নিজের জমি নিজে চাষ করত। এই শ্রেণী ফ্রান্সের 1/3 অংশ কৃষি জমির মালিক ছিল। কিন্তু বেশীরভাগ স্বাধীন কৃষক পরিবারের জমির পরিমাণ ছিল নগণ্য। কৃষকরা রাজাকে ভূমিকর (Taille), লবণকর (Gabelle), তামাক ও মদের ওপর আবগারী কর (Excise), ক্যাপিটেশন (Capitation) বা মাথাপিছু উৎপাদন কর, ভিংটিয়েম (Vingtieme) বা সম্পত্তি কর, এছাড়া তারা গীর্জাকে দিত টাইদ (Tithe) বা ধর্মকর।
Advertisement

(ii) এছাড়া কিছু কৃষক ছিল ভাগ চাষী বা বর্গা চাষী (Metayers)। এরা জমিদারদের জমি ভাগে চাষ করত। সকল প্রকার কর প্রদানের পর উৎপন্ন ফসলের মাত্র ২০ শতাংশ এদের হাতে থাকত।

(iii) বর্গা বা ভাগচাষী ছাড়া ছিল খাজনা চাষী (Rentier)। এরা জমিদার ও সামন্ত প্রভূর জমি খাজনায় চাষ করত। জমিতে এদের কোন স্বত্ব ছিল না।

(iv) যে সকল কৃষকের নিজের সামান্য জমি, নিজের লাঙল ও বলদ ছিল এদের বলা হত প্রান্তিক স্বাধীন কৃষক (Labourer)। দক্ষিণ ফ্রান্সে এদের সংখ্যা বেশী ছিল। এরা সম্পন্ন ও স্বচ্ছল কৃষক ছিল না।

(v) এদের নীচে ছিল ভূমিহীন ক্ষেতমজুর (Cottager)। এরা ফসল রােপণ ও ফসল তােলার মরশুমে ক্ষেতে মজুরের কাজ করত। বাকি সময় দিন মজুরী করে অনাহারে, অর্ধাহারে কাটাত। কখনও কখনও এরা জমিদারের জমি খাজনায় অস্থায়ী শর্তে চাষ করত। কৃষকদের ২ ভাগ ছিল ভূমিহীন দিনমজুর।

(vi) সবার নীচে ছিল ভূমিদাস (Serf)। প্রতি ২০ জন কৃষকের ১ জন ছিল ভূমিদাস। ভূমিদাসদের অবস্থা ছিল সর্বাপেক্ষা শােচনীয়। নানা প্রকার সামন্ত কর, টাইদ ও সামন্ত প্রভূর নানা দাবী পূরণ করে ও বেগার খাটার পর ভূমিদাসের ভাগ্যে কিছুই থাকত না। ভূমিদাসদের ওপর আরােপিত কর ছিল বিভিন্ন প্রকার, যথা — রাজার প্রাপ্য টাইলে, গীর্জার প্রাপ্য টাইদ ছাড়া সামন্ত প্রভূর প্রাপ্য স্যামপার্ত (Champart) বা ফসলের ভাগ, সেন্স (Cens) ছিল বাৎসরিক খাজনা, বানালিতে (Banalite) সামন্ত প্রভূর গম পেষাই কলে গম ভাঙান, ভাটিখানায় মদ্য তৈরির বিনিময়ে ময়দা ও মদ্যের কিছু অংশ দিতে হত। এছাড়া ভূমিদাস সামন্ত প্রভুর জমিতে বেগার খাটত। এর নাম ছিল কর্ভি (Corvee)। কৃষকদের অভিযােগের সাধারণ কারণ ছিল টাইলে বা ভূমিকর, টাইদ বা ধৰ্মকর ও সামন্তকরের বােঝা। এই শােষণের ফলে কৃষক শ্রেণীর মধ্যে গভীর অসন্তোষ ছিল।

(গ) সাকুলেৎ শ্রেণী (Sanscullotes): তৃতীয় শ্রেণীতে ছিল নগরবাসী শ্রমজীবি, চালচুলােহীন ভাসমান লােক। ফ্রান্সে এদের বলা হত সাকুলেৎ (Suns-culottes)। জনসংখ্যা বাড়ার ফলে গ্রাম থেকে আসা লােক শহরে জমা হয়। এছাড়া শহুরে শ্রমিক ও বস্তিবাসীদের সন্তান সন্ততি এদের সংখ্যা বাড়ায়। ফ্রান্সের সামন্ততান্ত্রিক সমাজে কায়িক শ্রম ছিল ঘৃণার বস্তু। তদুপরি চালচুলােহীন শ্রমিক, মুঠিয়া, অথবা ভবঘুরে শ্রেণী ছিল ততােধিক ঘৃণিত। এদের মধ্যে ছিল গরীব কারিগর ও ছোট দোকানদার। সাকুলেৎদের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনেতিক আশা আকাঙ্খার পার্থক্য ছিল। যারা ছিল কারিগর বা ছােট দোকানদার তারা চাইত সকলের হাতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি কিছু না কিছু থাকবে। মুষ্টিমেয় লােকের হাতে সম্পত্তি জমা হবে না। যাদের কিছুই ছিল না তারা ভাবত এমন দিন আসবে তারা কিছু সম্পত্তির মালিক হবে। সাকুলেৎদের মনে তখনও পর্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলােপ ও সমাজতন্ত্রের ধ্যান ধারণা দানা বাঁধেনি। সাকুলেৎদের প্রধান অভিযোগ ছিল, জিনিসপত্রের উচ্চ দামের তুলনায় মজুরি ছিল কম। তারা মাঝেমধ্য দাঙ্গা করত। এরা ধ্বংসমুখী শ্রেণী ছিল।
Advertisement