গোল টেবিল বৈঠক ১৯৩০ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত

- November 23, 2019
সাইমন কমিশনের রিপাের্টে বলা হয় যে , ভবিষ্যতে প্রস্তাবিত সংবিধান পর্যালােচনা করে সংশােধন ও পরিবর্ধন করা যাবে। ভারতের চূড়ান্ত সংবিধান হবে যুক্তরাষ্ট্রীয়। সাইমন কমিশনের উপরােক্ত সুপারিশ অনুযায়ী এবং ভারতে আইন অমান্য আন্দোলনকে আপাততঃ প্রশমন করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার ১২ই নভেম্বর ১৯৩০ থেকে ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৩২ পর্যন্ত লন্ডনে পরপর তিনটি গোল টেবিল বৈঠক (Round Table Conference) অনুষ্ঠিত হয়।
Second Round Table Conference
প্রথম গোল টেবিল বৈঠক (First Round Table Conference): প্রথম গোলটেবিল বৈঠক লন্ডনে ১৯৩০ সালের ১২ই নভেম্বর থেকে ১৯শে জানুয়ারী ১৯৩১ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই সম্মেলনে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী রামাজে ম্যাকডোনাল্ড সভাপতিত্ব করেন। এই সম্মেলনের আগে মহাত্মা গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ফলস্বরূপ, কংগ্রেসের অনেক নেতারা কারাগারে থাকায় কংগ্রেস প্রথম সম্মেলনে অংশ নেয় নি, তবে সম্মেলনে ব্রিটেনের রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে ১৬ জন, ভারতীয় রাজন্যবর্গের পক্ষে ১৩ জন এবং ব্রিটিশ শাসিত ভারত থেকে ৫৭ জন বিশিষ্ট নেতা মােট ৮৬ জন সদস্য যােগ দেন।

প্রথম গােলটেবিল বৈঠকের আলােচনা সভায় কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। কেন্দ্রে নির্বাচিত মন্ত্রীসভার হাতে বড়লাটের হস্তক্ষেপের অধিকার সাপেক্ষে দেশরক্ষা ও বৈদেশিক দপ্তর ব্যতীত অন্যান্য দপ্তরের ভার দেওয়ার কথা বলা হয়। প্রদেশে ডায়ার্কি বা দ্বৈত শাসনের স্থানে দায়িত্বশীল মন্ত্রীসভা গঠনের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু আইন সভায় সংখ্যালঘু বিশেষতঃ মুসলিমদের আসন সংরক্ষণ এবং স্বতন্ত্র নির্বাচনের প্রশ্নে হিন্দু নেতাদের সঙ্গে তীব্র মতভেদ দেখা দেয়। অনুন্নত হিন্দুদের পক্ষে ডঃ আম্বেদকর আইনসভার আসন সংরক্ষণ ও স্বতন্ত্র নির্বাচন দাবী করেন। যাই হােক, কংগ্রেস এই বৈঠকে যােগ না দেওয়ার ফলে প্রথম গােলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হয়।

দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠক (Second Round Table Conference): গান্ধী আরউইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে কংগ্রেস দ্বিতীয় গােলটেবিল বৈঠকে যােগ দিতে সম্মতি জানায়। কংগ্রেসের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে মহাত্মা গান্ধী এই বৈঠকে যােগ দেন। ইতিমধ্যে বিলেতে শ্রমিক মন্ত্রিসভার পতন হয়। রক্ষণশীল দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ ও অন্যান্য দলের সমর্থনে বিলাতে একটি জাতীয় সরকার স্থাপিত হলে রক্ষণশীল দলের প্রভাবে ভারত সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী বদলায়। ৭ই সেপ্টেম্বর থেকে ১ম ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৯৩১ খ্রীঃ লন্ডনে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকের উজ্জ্বল তারকা ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। মহাত্মা গান্ধী বলেন যে, এই বৈঠকের অন্যান্য সদস্যরা সরকারের দ্বারা মনােনীত। কংগ্রেস তার নিজের প্রতিনিধি হিসেবে তাকে নির্বাচন করেছে। কংগ্রেস সমস্ত জাতির প্রতিনিধিত্ব করে। গান্ধী দাবী করেন যে, কেন্দ্রে এবং প্রদেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এক্ষেত্রে বড়লাটের হাতে কোন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রাখা চলবে না।

দ্বিতীয় গােলটেবিল বৈঠকে সাম্প্রদায়িক সমস্যা তীব্রভাবে দেখা দেয়। এই সমস্যা সমাধানে মহাত্মা গান্ধী আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। গান্ধীজি ঘােষণা করেন যে, গােলটেবিল বৈঠকের সদস্যদের এমনভাবে মনােনয়ন করা হয়েছে যে, তাদের সাহায্যে সংখ্যালঘু সমস্যার মীমাংসা করা অসম্ভব। ডঃ আম্বেদকর দাবী করেন যে, অনুন্নত শ্রেণীর হিন্দুদের জন্যে আইনসভার কিছু পদ সংরক্ষণ করতে হবে। অবশ্য মুসলিম নেতারাই সাম্প্রদায়িক প্রশ্নের সমাধানে প্রধান বাধা সৃষ্টি করেন।

শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী রামজে ম্যাকডােনাল্ড ঘােষণা করেন যে, যেহেতু সংখ্যালঘু সমস্যা সমাধানে নেতারা ব্যর্থ হয়েছেন, সেহেতু সরকার তার নিজ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই সমস্যার সমাধান সূত্র রচনা করবেন। তিনি সদস্যদের কাছে প্রতিশ্রুতি চান যে, সদস্যরা সেই সমাধান মেনে নিবেন। গান্ধীজি মুসলিম ও শিখদের ক্ষেত্রে পৃথক নির্বাচন মানলেও, অন্য সম্প্রদায় বিশেষতঃ অনুন্নত শ্রেণীর হিন্দুদের পৃথক নির্বাচনের দাবী মানতে রাজী হননি। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী রামজে ম্যাকডােনাল্ড সংখ্যালঘু সমস্যার সমাধানের জন্যে প্রস্তাব দিলে সদস্যরা তা মানতে আনচ্ছা জানান। ফলে এই বৈঠক সফল হয়নি। গান্ধীজি খালি হাতে দেশে ফিরলে লীগ প্রভৃতি দলগুলি এজন্য আনন্দ প্রকাশ করে যে, গান্ধীজি তার ইচ্ছামত সংখ্যালঘু সমস্যা বিশেষতঃ মুসলিমদের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছেন।

তৃতীয় গোল টেবিল বৈঠক (Third Round Table Conference): তৃতীয় গোল টেবিল বৈঠক ১৯৩২ সালের ১৭ই নভেম্বর থেকে ২৪শে ডিসেম্বর পর্যন্ত লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ছিল একটি নামমাত্র সম্মেলন, কংগ্রেস এতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায় (আসলে আমন্ত্রিত ছিল না) এবং ব্রিটেনে শ্রমিক দলও এতে অংশ নিতে অস্বীকার করেছিল। সুতরাং, কেবল 46 জন সেখানে পৌঁছেছিলেন। তৃতীয় গোল টেবিল বৈঠকের মূল পরিণতি ছিল সরকার কর্তৃক জারি করা "হোয়াইট পেপার"। এই কাগজের ভিত্তিতে, ভারত সরকার আইন 1935 পাস করতে হয়েছিল।

এই সম্মেলনে কলেজের এক শিক্ষার্থী চৌধুরী রহমত আলী মুসলমানদের জন্য ভারত থেকে বিশেষভাবে খোদাই করা নতুন জমির নাম প্রস্তাব করেছিলেন। এই পবিত্র ভূমির নাম ছিল পাকিস্তান। এই সম্মেলনে অংশ নেওয়া মুসলিম নেতারা হলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, আগা খান, ফজলুল হক।
Advertisement