ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক কারণ কী ছিল

- November 15, 2019
সপ্তদশ শতকের ফরাসী রাজনীতিজ্ঞ রিসেলু ও ম্যাজারিন এবং ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই ফরাসী রাজতন্ত্রকে একটি স্বৈরতন্ত্রী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। এই যুগের রাজারা মনে করতেন যে, ঈশ্বর রাজাকে নিযুক্ত করেছেন। তারা ঈশ্বর ছাড়া আর কারও কাছে দায়ী নন। ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা নীতির ওপর নির্ভর করে বুরবো রাজবংশীয় চতুর্দশ লুই ফরাসী রাজতন্ত্রকে সর্বময় ক্ষমতার আধারে পরিণত করেন। রাজার এই ক্ষমতা বুঝাবার জন্যে তিনি মন্তব্য করেন যে, "রাজাই হলেন রাষ্ট্র" (The State it is Myself)। রাজার ক্ষমতাকে সর্বময় করার জন্যে ফ্রান্সের পার্লামেন্ট সভা স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন ১৬১৪ খ্রীঃ থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যেহেতু রাজা আহ্বান না করলে জাতীয় সভা বা স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন বসতে পারত না, সেহেতু ফ্রান্সের বুরবো রাজারা স্বৈরতন্ত্রকে নিরঙ্কুশ করার জন্যে জাতীয় সভার অধিবেশন আহবান করেননি। এজন্য ফ্রান্সে প্রজাদের সঙ্গে রাজশক্তির কোন যােগাযােগ ছিল না। বুরবো বাজারা সকল ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে প্রজাদের মতামত অগ্রাহ্য করে চলতেন। এর ফলে বুরবো রাজতন্ত্র বৃহত্তর জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
political causes of french revolution
বুরবাে রাজতন্ত্র আইনতঃ সর্বশক্তিমান হলেও বাস্তবক্ষেত্রে রাজার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ ছিল না। ফ্রান্সের সামন্ত অভিজাত ও যাজক শ্রেণী রাজার তরফে সরকারি ক্ষমতা হস্তগত করে ভোগ করত। ফরাসী অভিজাতরা দাবী করতেন, তারা রাজার সমশ্রেণীভুক্ত লোক। সুতরাং দেশ শাসনের কাজে একমাত্র তারাই রাজাকে সাহায্য করার অধিকারী। রাজবংশের মত তাদেরও বংশ কৌলীন্য ছিল। এই বংশ মর্যাদার জোরে তারা দেশ শাসনের অধিকার ভােগ করত। চতুর্দশ লুইয়ের পর বুরবাে বংশে সুযােগ্য শাসকের অভাব দেখা দেয়। পঞ্চদশ লুই ছিলেন “বিলাসী, রমণীরঞ্জন, প্রজাপতি রাজা" (Butterfly Monarch)। তিনি ছিলেন পরিশ্রম বিমুখ এবং উপপত্নী মাদাম দু পম্পাদরের দ্বারা প্রভাবিত। ষােড়শ লুই সৎ এবং সদিচ্ছাপরায়ণ হলেও ব্যক্তিত্বহীন ছিলেন। তিনি তার সুন্দরী পত্নী অষ্ট্রিয়ার রাজকুমারী মেরী এ্যান্টোনেটের আয়ত্বে ছিলেন। বুরবাে রাজাদের এই ব্যক্তিগত অযােগ্যতার ফলে রাজার তরফে সকল ক্ষমতা অভিজাত শ্রেণীর লােকেরা হস্তগত করে। ফ্রান্সের Gallican Church ছিল স্বয়ং শাসিত সংস্থা। রাজা গীর্জার অভ্যন্তরীণ শাসনে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন না। গীর্জার ভূ সম্পত্তির ওপর রাজা কর ধার্য করতে পারতেন না। ১৫৬১ খ্রীঃ পােইসির চুক্তি অনুসারে যাকেরা গীর্জার ভূমির ওপর স্বেচ্ছা কর দিত। ফ্রান্সের প্রদেশগুলিতে যে সভা ছিল সেগুলির সম্মতি ছাড়া রাজার কোন নির্দেশ প্রদেশগুলিতে কার্যকরী করা যেত না। প্রাদেশিক সভাগুলিতে স্থানীয় অভিজাতরা প্রাধান্য ভােগ করত।

রাজা কোন নতুন আইন জারী করলে তা পার্লেমেন্ট নামক বিচার সভায় নথিবদ্ধ করতে হত। নতুবা এই আইন বৈধ হত না। পার্লেমেন্ট ইচ্ছা করলে রাজার প্রস্তাবিত আইনকে নাকচ করতে পারত। পার্লেমেন্টগুলির বিচারকরা ছিল অভিজাত শ্রেণীর। অভিজাতদের বিরুদ্ধে রাজা কোন আইন রচনা করিলে পার্লেমেন্ট তা নথিবদ্ধ করত না। তার ফলে আইনটি কার্যকরী করা যেত না। ফ্রান্সের পার্লেমেন্ট ছিল ১২ টি। এদের মধ্যে Parlement of Paris বা প্যারিসের বিচারসভা ছিল সর্বাপেক্ষা প্রতিপত্তিশালী। প্যারিসের পার্লেমেন্টের অভিজাত শ্রেণীর বিচারক সদস্যরা এতই ক্ষমতাশালী ছিল যে, তারা মন্ত্রী টুর্গোর প্রস্তাবিত মৌলিক সংস্কারের ব্যবস্থাকে কার্যকরী হতে দেয়নি। রাজা অবশ্য পার্লেমেন্টের বিরােধিতা Lit de Justice প্রথা দ্বারা দমন করতে পারতেন। Lit de Justice হল রাজা নিজে পার্লেমেন্টের সভায় সভাপতিত্ব করে আইন পাশ করিয়ে নেওয়ার প্রথা। কিন্তু পার্লেমেন্টের বিরােধিতা কার্যতঃ রাজা অগ্রাহ্য করতে সাহস করতেন না। সুতরাং ফ্রান্সের রাজারা ঐশ্বরিক ক্ষমতা দাবী করলেও বাস্তবে তাদের ক্ষমতা ছিল সীমিত। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসনের মতে, “ফরাসী রাজতন্ত্র ছিল আসলে সামন্ত রাজতন্ত্র”। পার্লেমেন্ট বা অভিজাত বিচারসভাগুলি, প্রাদেশিক সভাগুলি ও গীর্জা আদালতগুলি রাজকীয় আইনকে অনুমােদন না দিলে তা কার্যকরী করা যেত না।

অষ্টাদশ শতকে দুর্নীতিপূর্ণ শাসন নীতির জন্যে বুরবো রাজতন্ত্রের মহিমা বিনষ্ট হয়ে যায়। সরকারি কর্মচারীরা ছিল দুর্নীতিগ্রস্থ ও অত্যাচারী। ফ্রান্সের বিচারব্যবস্থা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। লত্রে দ্য গ্রাস ও লত্রে দ্য কেসে (Letters de Grass and Letters de Cachet) দ্বারা নাগরিকদের বিচারের ক্ষেত্রে রাজা হস্তক্ষেপ করতে পারতেন। লত্রে দ্য গ্রাস ক্ষমতা প্রয়ােগ করে তিনি আদালত দ্বারা প্রদত্ত শাস্তি মকুব বা মাফ করতে পারতেন। লত্রে দ্য কেসে ক্ষমতা দ্বারা তিনি যে কোন নাগরিককে বিনা বিচারে কারাগারে আটক করে রাখতে পারতেন। সরকারি কর্মচারী ও অভিজাত সভাসদরা লত্রে দ্য কেসের অপপ্রয়ােগ করত। বিচার ব্যবস্থা ছিল ব্যয়বহুল ও বিলম্বিত। বিচারকরা ছিল পক্ষপাতদুষ্ট। আইনের নিকট সকলে সমান অধিকার পেত না। প্রদেশগুলিতে রাজস্ব আদায়কারী ইনটেন্ডেন্টরা (Intendent) ছিল ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত অর্থলােলুপ। তারা বহু প্রকার বাড়তি কর আদায় করত। আদায় করা করের বহু অংশ তারা আত্মসাৎ করত। একমাত্র প্রাদেশিক সভা ও পার্লামেন্টগুলিকে তারা ভয় করত। নতুবা তাদের দুর্নীতি ও প্রতাপে তৃতীয় শ্রেণীর লােকেদের দুর্গতির সীমা ছিল না।

বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে পঞ্চদশ লুই ও যােড়শ লুই প্রকাণ্ড ব্যর্থতার নজির সৃষ্টি করেন। পঞ্চদশ লুই অষ্ট্রিয়ার উত্তরাধিকারের যুদ্ধে (১৭৪০-১৭৪৮ খ্রীঃ) এবং সপ্তবর্ষের যুদ্ধে (১৭৫৬-১৭৬৩ খ্রীঃ) পরাজিত হন। এর ফলে ইওরােপে ফ্রান্সের সামরিক মর্যাদা বিনষ্ট হয়। এই দুই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ফরাসী বণিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী বাণিজ্য ও উপনিবেশ হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যােড়শ লুই এই পরাজয় থেকে শিক্ষা না নিয়ে আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধে ইংলন্ডের বিরুদ্ধে যােগ দেন। এই দীর্ঘ যুদ্ধগুলিতে ফ্রান্সের পরাজয়ে ফ্রান্সের মর্যাদা নষ্ট হয়। ভ্ৰান্ত বৈদেশিক নীতি ফ্রান্সের জনস্বার্থের ক্ষতি করে এবং রাজকোষ শূন্য করে দেয়।
Advertisement
অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সের শাসনব্যবস্থায় রাজার তরফে রাজপরিষদ কেন্দ্রীয় শাসন চালাত। অভিজাতরাই ছিল পরিষদের সদস্য। রাজপরিষদের সদস্যরা রাজার প্রিয় পাত্র হওয়ার জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত। ১০ জন মন্ত্রীর মধ্যেও রেষারেষি চলত। এজন্য শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। প্রদেশগুলিতে ইন্টেনডেন্ট (Inendent) নামে কর্মচারীরাই ছিল সর্বেসর্বা। প্রদেশে এরাই রাজার তরফে ক্ষমতা জাহির করত, রাজস্ব আদায়, আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করত। কিন্তু ইন্টেনডেন্টরা ছিল দুর্নীতি পরায়ণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী। লেফেভারের মতে, এই ইন্টেন্ডেন্টরা একমাত্র প্রাদেশিক সভাকেই মান্য করত। ফ্রান্সের সকল অঞ্চলে একই প্রকার আইন চালু ছিল না। দক্ষিণ ফ্রান্সে রোমান আইন চলত, উত্তর ফ্রান্সে চিরাচরিত প্রথাগুলিই আইন হিসেবে চালু ছিল। অভিজাতরা তাদের নিজস্ব শ্রেণীর জন্যে আলাদা আইনের সুবিধা ভােগ করত। ফ্রান্সের সর্বত্র একই প্রকার ওজন ও মাপ চালু ছিল না। আইনগত পার্থক্য ও স্থানীয় প্রথার ফলে ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঐক্য ছিল না। রাজা কোন রকমে ইন্টেন্ডেন্টদের সাহায্যে শাসন চালু রাখতেন।

রাজকীয় রাজস্বনীতি ও অর্থনীতি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। যাদের কর প্রদানের ক্ষমতা ছিল যথা — অভিজাত ও উচ্চ যাজক তারা কর প্রদান থেকে অব্যাহতি ভােগ করত। যাদের কর প্রদানের ক্ষমতা ছিল না যথা — কৃষক, পাতি বুর্জোয়া ও উচ্চ বুর্জোয়া তারাই করের ভারে বহন করত। রাজার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সমতা ছিল না। রাজা অভিজাত ও যাজকদের ওপর কর বসিয়ে রাজস্ব ঘাটতি দূর করতে সাহস করেননি। এজন্য সরকার সর্বদাই অর্থসঙ্কটে ভুগত।

বুরবো রাজারা ছিলেন ঘাের অমিতব্যয়ি। যুদ্ধ ও অমিতব্যয়ের ফলে সরকারের ঋণ বাড়তে থাকে। আদায়ী রাজস্ব থেকে সরকারি ব্যয় সঙ্কুলান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অর্থসঙ্কট হতে মুক্ত হওয়ার উপায় না পেয়ে যােড়শ লুই অবশেষে স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন ডাকেন। এর ফলে বুরবো স্বৈরতন্ত্রের দুর্বলতা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এই সকল বিভিন্ন কারণে বুরবো রাজতন্ত্র ফরাসি বিপ্লবের জন্য বহুলাংশে দায়ী ছিল একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে।
Advertisement