যান্ত্রিক আবহবিকার - Mechanical Weathering

- November 30, 2019
উষ্ণতার পরিবর্তন, শিলাস্তরে চাপের হ্রাসবৃদ্ধি, আর্দ্রতার পরিবর্তন, জৈব কার্যাবলি প্রকৃতির প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে শিলাস্তর যান্ত্রিক ভাবে চুর্ণবিচূর্ণ অর্থাৎ ভেঙে টুকরাে টুকরাে হলে তাকে যান্ত্রিক আবহবিকার বলে (Mechanical Weathering)। যান্ত্রিক আবহবিকারে শিলাচূর্ণবিচূর্ণ হয়, কিন্তু শিলা খনিজের কোনাে মৌলের পরিবর্তন ঘটে না। যান্ত্রিক আবহবিকার মূলত উষ্ণ মরু ও মরুপ্রায় জলবায়ু, সাভানা জলবায়ু এবং উচ্চ পার্বত্য ও শীতল জলবায়ু অঞ্চলে ঘটে। যান্ত্রিক আবহবিকারের প্রধান প্রক্রিয়াগুলি হল - (1) তাপীয় বা উষ্ণতার পরিবর্তন - তাপীয় বা উষ্ণতার পরিবর্তন প্রধানত তিনটি পদ্ধতিতে হয়। যথা (ক) পিণ্ড বিশরণ (Block Disintegration), (খ) গোলাকৃতি আবহবিকার বা শল্কমোচন (Exfoliation or Onion weathering), (গ) ক্ষুদ্রকণা বিশরণ (Granular Disintegretion), (2) তুষারের দ্বারা তুহিন খন্ডীকরণ, (3) ভারমুক্ত প্রসারণ, (4) জলের মাধ্যমে ও (5) অন্যান্য প্রক্রিয়ায়।
Mechanical Weathering Image
(ক) পিণ্ড বিশরণ বা প্রস্তর চাঁই খণ্ডীকরণ (Block Disintegration): শিলা তাপের কুপরিবাহী। দিনের বেলা প্রবল উষ্ণতায় শিলার উপরিস্তর উত্তপ্ত হয়ে প্রসারিত হয় এবং রাত্রিবেলা তাপ বিকিরণ করে সংকুচিত হয়। কিন্তু শিলার নিম্নস্তরে সংকোচন বা প্রসারণ ঘটে না। এইভাবে ক্রমাগত অসম সংকোচন প্রসারণের কারণে শিলাস্তরে পীড়নের সৃষ্টি হয় এবং পীড়নের নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করলে অসংখ্য উল্লম্ব ও সমান্তরাল ফাটলের সৃষ্টি হয় এবং এক সময় এই ফাটল বরাবর টুকরাে টুকরাে বিভিন্ন আকৃতির শিলাখণ্ড খুলে বেরিয়ে আসে। একেই পিণ্ড বিশরণ বলে। মরু অঞ্চলের গ্রানাইট শিলাস্তরে এই প্রক্রিয়া সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়।

(খ) ক্ষুদ্রকণা বিশরণ (Granular disintegration): শিলা বিভিন্ন খনিজের সমন্বয়ে গঠিত এবং খনিজগুলির বৈশিষ্ট্য, প্রকৃতি ও রং ভিন্ন। ফলে দিনের বেলা সূর্যের তাপে শিলামধ্যস্থিত খনিজগুলি বিভিন্ন হারে প্রসারিত হয় এবং রাত্রিবেলা বিভিন্ন হারে সংকুচিত হয়। এরই ফলে শিলাস্তরের ক্ষুদ্রকণা বিশরণ মধ্যে অসম সংকোচন ও প্রসারণের কারণে শিলায় প্রবল পীড়নের সৃষ্টি হয় এবং এক সময় শিলা আওয়াজ করে ফেটে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে পরিণত হয়। একেই ক্ষুদ্রকণা বিশরণ বলে। মরুভূমি অঞ্চলে মাঝে মাঝেই পিস্তল থেকে গুলি ছোঁড়া আওয়াজের মতাে শিলা ফাটার শব্দ পাওয়া যায়। উষ্ম মরুভূমি অঞ্চলে গ্রানাইট জাতীয় শিলাস্তরে এই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়।

(গ) শল্কমোচন (Exfoliation or Onion weathering): শিলা তাপের কুপরিবাহী হওয়ায় শিলাস্তরের বাইরের অংশ দিনের বেলা প্রবল উন্মতায় প্রসারিত এবং রাতের বেলায় সংকুচিত হয়। কিন্তু ভিতরের অংশ প্রসারিত ও সংকুচিত হতে পারে না। ফলে শিলাস্তরের ভেতর থেকে বাইরের দিকে একটি তাপীয় ঢালের সৃষ্টি হয়। বাইরের অংশ ক্রমাগত সম্প্রসারণে কারণে শিলার স্তরগুলি পেঁয়াজের খোসার মত খুলে যায়। পরবর্তীকালে বায়ুপ্রবাহে খুলে যাওয়া অংশগুলি অপসারিত হয়ে শিলা স্তরটি গোলাকার আকৃতি ধারণ করে। একেই শল্কমোচন বা গোলাকৃতি আবহবিকার বলে। মরুভূমি ও শুষ্ক অঞ্চলের কেলাসিত শিলায় শল্কমোচন আবহবিকার ঘটে।

(2) তুষারের দ্বারা তুহিন খন্ডীকরণ: উচ্চ পার্বত্য ও উচ্চ অক্ষাংশের শীতল জলবায়ু অঞ্চলে যেখানে উষ্ণতার তারতম্যে জল বরফে এবং বরফ জলে পরিণত হয় সেখানেই এই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়। উচ্চ পার্বত্য ও উচ্চ অক্ষাংশীয় অঞ্চলে শিলাস্তরের ফাটলের মধ্যে রাত্রিবেলা জল বরফে পরিণত হলে (যদি উষ্ণতা হিমাঙ্কের নীচে নেমে যায়) ফাটলের দুপাশে প্রবল চাপ (জল বরফে পরিণত হলে যেহেতু আয়তনের ৯% বৃদ্ধি পায়) সৃষ্টি করে। আবার দিনের বেলা বরফ জলে পরিণত হলে চাপ হ্রাস পায়। দিন রাত্রির উষ্ণতার তারতম্যে শিলাস্তরে প্রবল চাপের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে। ফলে শিলার ওপর পীড়ন ও টানের (stress and strain) সৃষ্টি হয় এবং এক সময় শিলাস্তর ভেঙে টুকরাে টুকরাে খণ্ডে পরিণত হয়। পাললিক শিলাস্তরের ওপর এই প্রক্রিয়া অধিক কার্যকর হয়। এই প্রকার আবহবিকারের ফলে সৃষ্ট শিলাখণ্ড গুলিকে স্ক্রী বা ট্যালাস ((Screes or Tallus) বলে এবং Tallus দিয়ে গঠিত ভূমিকূপ ব্লক স্পেড, ফেলসেনমির, প্রস্তরক্ষেত্র প্রভূতি নামে পরিচিত।

(3) ভারমুক্ত প্রসারণ: ভূগর্ভে গ্রানাইট জাতীয় শিলা প্রবল চাপে সংকুচিত অবস্থায় থাকে। শিলাস্তরের ওপর অংশ থেকে ভার লাঘব হলে শিলাস্তরের মধ্যে পীড়ন ও টানের সৃষ্টি হয়। ফলে শিলার মধ্যে ফাটলের সৃষ্টি হয়। শিলাস্তরের ওপর থেকে বরফের ভার লাঘব হলে শিলায় ফাটলের সৃষ্টি হয়।

(4) জলের মাধ্যমে: জলের মাধ্যমে যান্ত্রিক আবহবিকার বিভিন্ন ভাবে ঘটে - (a) জলস্রোতের ফলে সৃষ্ট বুদবুদের বায়ু শিলা ফাটলে প্রবল চাপের সৃষ্টি করে এবং শিলায় আবহবিকার ঘটায়। (b) শিলার ছিদ্রে সঞ্চিত জল গ্রীষ্মকালে শুকিয়ে যায় এবং আর্দ্র সময়ে জলে পূর্ণ হয়। ক্রমাগত আর্দ্রতা ও শুষ্কতার কারণে শিলা ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়। (c) মরু অঞ্চলে অতি উত্তপ্ত শিলার ওপর হঠাৎ বৃষ্টির জল পড়লে শিলা সংকুচিত হয় এবং ফেটে যায়।

(5) অন্যান্য প্রক্রিয়া: (a) উপকূল বরবার পর্যায়ক্রমে জোয়ার-ভাটার প্রভাবে শিলা আর্দ্র ও শুষ্ক হয় এবং শিলা ফেটে যায়। একে কলিকরণ বা Slaking বলে। (b) শিলাস্তরের ওপর আর্দ্র মৃত্তিকা-কণা (কলয়েড) সঞ্চিত হলে তা যখন শুকিয়ে যায় মূল শিলা থেকে ক্ষুদ্রকণা উৎপাটন করে। একে কলয়েড প্লাকিং বলে। (c) দাবানলের প্রভাবে শিলা প্রবল ভাবে উত্তপ্ত হলে শিলা ভেঙে যায়। (d) মানুষের বিভিয়া কার্যাবলির প্রভাবে (খনি খনন, জলাধার নির্মাণ, ডিনামাইটের মাধ্যমে পাহাড় ফাটানো ইত্যাদি) শিলায় আবহবিকার ঘটে। মানুষের কার্যের প্রভাবে আবহবিকার দ্রুত হারে ঘটে।
Advertisement