জ্যাকোবিন দলের প্রতিষ্ঠা ও কর্মকাণ্ড

- November 19, 2019
ফরাসী বিপ্লবের ইতিহাসে জ্যাকোবিন দলের ভূমিকা এবং জ্যাকোবিন নেতা রােবসপিয়েরের (Robespierre) ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। স্টেটস জেনারেল বা জাতীয় সভা আহ্বানের পর বিভিন্ন মতবাদের সদস্যরা বিভিন্ন ক্লাব বা রাজনৈতিক গােষ্ঠী স্থাপন করে। এই সময়ে ব্রিটানী প্রদেশের সদস্যরা Society of the Friend of the Constitution নামে এক সমিতি স্থাপন করে। এই সমিতির চলতি নাম ছিল ব্রেটন ক্লাব। ব্রেটন ক্লাবের সদস্যদের সমাবেশের জন্যে জ্যাকোবিন সম্প্রদায়ের গীর্জার একটি ঘর ভাড়া নেওয়া হয়। জ্যাকোবিন মঠে ব্রেটন ক্লাবের সভা হত বলে লােকে এই দলকে জ্যাকোবিন দল (Jacobin Party) নাম দেয়। এই নামেই এই দল সমধিক প্রসিদ্ধ হয়। জ্যাকোবিন দলের সদস্যদের চাদা ছিল কম। ফলে প্যারিসের নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী এই দলের সদস্য হওয়ার সুযােগ পায়। ১৭৯০ খ্রীঃ জ্যাকোবিন ক্লাবের সভায় সর্বসাধারণকে যােগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলে এই দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ক্রমে এই দলের শাখা ফ্রান্সের অন্যান্য শহর ও গ্রামে স্থাপিত হয়। সমাজের দরিদ্র শ্রেণী এই ক্লাবের আদর্শকে সমর্থন জানায়। ১৭৯২ খ্রীঃ এই ক্লাবের এক হাজার শাখা ফ্রান্সে স্থাপিত হয়। ১৭৯৩ খ্রীঃ এই ক্লাবের শাখার সংখ্যা ছিল অন্ততঃ ৫ হাজার।
Jacobin club in Paris
Source Image: Wikipedia.org
জ্যাকোবিন দলের সদস্যরা প্রধানতঃ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লােক ছিল। তবে নীতিবাদী জ্যাকোবিনরা মধ্যবিত্ত নীতির দিক থেকে বুর্জোয়া শ্রেণীর সমর্থক ছিল না। জ্যাকোবিন দলের অধিকাংশ সদস্য ছিল বামপন্থী। জিরোন্ডিন দল বিপ্লবকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ধরে রাখতে চেষ্টা করে। জিরোন্ডিনরা মনে করত যে, রাজনৈতিক বিপ্লবই ছিল জরুরী। ন্যাশনাল কনভেনশন গণভােটে গঠিত হলে তারা সন্তুষ্ট হয়। বিপ্লবকে স্থিতিশীল করতে চায়। জিরোন্ডিন দল রাজনৈতিক বিপ্লব অর্থাৎ সর্বসাধারণের ভােটাধিকার, প্রজাতন্ত্র প্রকৃতি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায়। কিন্তু জ্যাকোবিনরা বিপ্লবকে যুক্তিসম্মত পরিণতিতে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। জ্যাকোবিন দল বিপ্লবের অর্থনৈতিক লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন ছিল। রুশাের প্রচারিত সাম্য, রাজনৈতিক ও সামাজিক আদর্শে তারা বিশ্বাস করত। যেক্ষেত্রে জিরোন্ডিন গােষ্ঠী বণিক ও ধনী বুর্জোয়াদের স্বার্থের কথা ভাবত, সেক্ষেত্রে জ্যাকোবিন দল নিম্নবিত্ত লােক যথা পাতি বুর্জোয়া, কারিগর, ছােট দোকানদার, সাধারণ কৃষকের ও সাকুলেতদের স্বার্থের কথা ভাবত। মােট কথা, জ্যাকোবিন দলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্য ছিল সমাজতন্ত্র।

লেফেভারের মতে, জ্যাকোবিনরা ছিল আসলে বুর্জোয়া শ্রেণীর সমর্থক। কারণ তারা সম্পত্তির অধিকার লােপ করেনি। উগ্র জ্যাকোবিনরা সম্পত্তি ও মুনাফাকে জনস্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কিন্তু সম্পত্তি পুনর্বণ্টনের কথা ভাবেনি। কোবানের মতে জ্যাকোবিন নেতাদের অনেকের মােটামুটি ভাল সম্পত্তি ছিল। কারণ সন্ত্রাসের সময় যখন কর ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস হয় তখন জ্যাকোবিনরা সর্বসাধারণ অপেক্ষা বেশী কর দেয়। কারণ তাদের সম্পত্তির মালিকানা ছিল। তা হলেও একথা বলা দরকার যে, রাজনৈতিক স্বার্থের জন্যেই হােক অথবা সুবিধাবাদের জন্যেই হােক জ্যাকোবিনরা প্রলিতারিয়েতের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করে। এজন্য প্যারিসের শাখা গুলিতে তাদের অসাধারণ জনপ্রিয়তা ছিল। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে জ্যাকোবিনরা আদর্শের কারণে দরিদ্রের বন্ধু হয়নি। তারা ছিল প্রখর বাস্তববুদ্ধির লােক। কিন্তু তারা বুঝতে পারে যে, জনসাধারণের সাহায্য না পেলে তারা আইনসভায় গুরুত্ব পাবে না। জনতার সমর্থন আদায়ের জন্যে বাধ্য হয়ে তারা সমাজতান্ত্রিক নীতি গ্রহণ করে। এই কারণে তারা সাকুলেতদের সঙ্গে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হয়। জ্যাকোবিনরা সাকুলেতের সাহায্যে আইনসভাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনে।

যাহা হােক, জ্যাকোবিন দল দরিদ্র শ্রেণীর স্বার্থের জন্যে বিপ্লবকে ব্যবহার করে। আইনসভায় আইনের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা অপেক্ষা তারা জনতার মতামতকে অনেক বেশী দাম দিত। রুশাের সার্বভৌম ক্ষমতাতত্ত্বের (Doctrine of Popular Sovereignty) তারা এক বৈপ্লবিক ব্যাখ্যা করে। জ্যাকোবিনরা মনে করত যে, আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতের সঙ্গে জনসাধারণের মতের গরমিল হলে আইনসভাকে জনতার মত মানতে বাধ্য করা উচিত। কারণ জনসাধারণই হল আসল সার্বভৌম শক্তি। জাতীয় সম্মেলনে (National Convention) জিরোন্ডিন ও মডারেটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও জ্যাকোবিনরা প্যারিসের জনতার দ্বারা চাপ দিয়ে আইনসভাকে জ্যাকোবিনের দাবী মানতে বাধ্য করে। শেষ পর্যন্ত প্যারিসের জনতার সাহায্যে বল প্রয়ােগ দ্বারা প্রতিদ্বন্দ্বী জিরণ্ডিষ্টদের তারা আইনসভা থেকে বহিস্কার করে। জ্যাকোবিন দল এই কাজকে সংবিধান ও গণতন্ত্র বিরােধী বলে মনে করত না।

জ্যাকোবিন দল প্রজাতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাস করত। ১৭৯১ খ্রীঃ সংবিধানে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রকে তারা সমর্থন করত না। জ্যাকোবিন দলের প্ররােচনায় প্যারিসের জনতা টুইলারিস প্রাসাদ আক্রমণ করে। ১০ই আগস্ট, ১৭৯২ খ্রীঃ আইনসভাকে ঘেরাও করে সংবিধান রদ করা হয়। জনতার চাপে তারা বিধানসভাকে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করতে বাধ্য করে। লেফেভারের মতে, ইহা ছিল দ্বিতীয় ফরাসী বিপ্লব (Second French Revolution)। জ্যাকোবিন পত্রিকা সম্পাদক মারা (Marat), সা-জুসত (Saint-Just ), রােবসপিয়ের প্রভৃতি এতে বিশেষ ভূমিকা নেন।

জাতীয় সম্মেলনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার পর, জাকোবিন দল সন্ত্রাসের রাজত্ব স্থাপন করে প্রতিবিপ্লব দমন করে। তারা সাফল্যের সঙ্গে বৈদেশিক যুদ্ধকে চালায়। যদিও জ্যাকোবিনরা বৈদেশিক যুদ্ধের বিরােধী ছিল, কিন্তু যুদ্ধের দায়িত্ব তারা ভালভাবে বহন করে। দ্রব্যের সর্বোচ্চ মূল্য, সর্বনিম্ন মজুরী আইন, বাজেয়াপ্ত জমির বণ্টন ব্যবস্থা, বাজেয়াপ্ত জমির ক্ষতিপূরণ লােপ, প্রাপ্তবয়স্কের ভােটাধিকার, মুনাফা বিরােধী আইন প্রভৃতির দ্বারা তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লবকে এগিয়ে দেয়। তথাপি জ্যাকোবিন নেতাদের অর্থনৈতিক চিন্তাধারায় সীমাবদ্ধতা ছিল। জর্জ রুডের মতে, তারা ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করলেও, ব্যক্তিগত সম্পত্তি লােপ অথবা বাড়তি সম্পত্তি বন্টন করার কথা ভাবেননি। জ্যাকোবিন দলের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা যথেষ্ট অগ্রগামী ছিল না। তারা সম্পত্তির অধিকারকে পবিত্র মনে করতেন। তারা এবারবাদী গােষ্ঠীর উগ্রপন্থী নীতি সমর্থন করতেন না। তথাপি একথা সত্য যে, ফরাসী বিপ্লবের মহত্তম রূপ এই দলের প্রচেষ্টায় বাস্তবতা লাভ করে।

জ্যাকোবিন দলের পতন বেদনাদায়ক ছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু এই দলের নেতাদের দোষেই তা ঘটে। সন্ত্রাসের রাজত্বের ভয়াবহতা জ্যাকোবিনদের জনপ্রিয়তা বিনষ্ট করে। এদিকে জ্যাকোবিনদের মধ্যে ক্ষমতা, লােভ ও অন্তদ্বন্দ্ব দেখা দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের ধ্বংস করার জন্যে গিলােটিনের যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়। ফলে বিপ্লব নিজ সন্তানদের গিলে ফেলে। এই কারণে জ্যাকোবিনদের পতন ঘটে।
Advertisement