গান্ধী আরউইন চুক্তি বা দিল্লি চুক্তি কী

- November 23, 2019
১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগে সাইমন কমিশনের রিপাের্ট হাতে পাবার পর ইংরেজ সরকার ভারতের শাসনসংস্কার আলােচনার জন্য প্রথম গােল টেবিল বৈঠক আহ্বান করেন। অন্যান্য ভারতীয় নেতৃবৃন্দ এই বৈঠকে অংশ নিলেও কংগ্রেস তা বয়কট করে। কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া ভারতবর্ষ সম্পর্কিত কোন আলােচনা সফল হবে না বুঝে পরবর্তী বৈঠকে যাতে কংগ্রেস যােগদান করে সেজন্য সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ভাইসরয় লর্ড আরউইন গান্ধীজির সঙ্গে আলােচনায় আগ্রহী হন। এমতাবস্থায় প্রথম গােলটেবিল বৈঠক থেকে ফিরে তেজবাহাদুর সপ্রু, জয়কর প্রমুখ নেতারা গান্ধীজিকে বােঝান যে গােলটেবিল বৈঠকেই অংশ নিলে সুফল মিলবে। দিল্লীতে ১৭ই ফেব্রুয়ারী থেকে ৫ই মার্চ পর্যন্ত গান্ধীজির সঙ্গে ভাইসরয় লর্ড আরউইনের আলােচনা চলে। শেষপর্যন্ত ৫ই মার্চ, ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে স্বাক্ষরিত হয় গান্ধী আরউইন চুক্তি বা দিল্লী চুক্তি (Gandhi Irwin Pact)।
Gandhi-Irwin Pact 1931
গান্ধী আরউইন চুক্তির শর্ত: এতে বলা হয় যে, (১) কংগ্রেস আপাততঃ আইন অমান্য আন্দোলন স্থগিত রাখবে। (২) এছাড়াও কংগ্রেস গােলটেবিল বৈঠকেও যােগদান করবে। (৩) সরকার আইন অমান্যকারী রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে সম্মত হয়। (৪) লবণ সত্যাগ্রহকে আইনসঙ্গত বলে সরকার মেনে নেয়। (৫) যে সব জরিমানা তখনও আদায় হয়নি সেগুলি মুকুব করতে হবে। (৬) বাজেয়াপ্ত করা জমি যা তখনও বিক্রি হয়নি সেগুলি ফেরত দিতে হবে। (৭) পদচ্যুত সরকারী কর্মীদের প্রতি ক্ষমাশীল মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে। (৮) শান্তিপূর্ণ পিকেটিং করার অধিকার দরকার অনুমোদন করে।

গান্ধী আরউইন চুক্তির পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি: গান্ধী আরউইন চুক্তি দেশে বিজাতীয় প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। লাহোর কংগ্রেসে গৃহীত পূর্ণ স্বরাজের প্রভাব কার্যকর না হওয়া এবং বিপ্লবী ভগৎ সিং, রাজগুরুর মৃত্যুর আদেশ ও কংগ্রেসের এই পশ্চাদপসারণে জনসাধারণ, বিশেষত যুবসম্প্রদায় গান্ধীজীর প্রতি ক্ষুন্ন হয়। এই চুক্তিকে বিশ্বাসঘাতকতা, ভারতীয় বুর্জোয়াদের দোদুল্যমানতার নিদর্শন এবং গান্ধীর নতিস্বীকারের প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ক্ষোভ এত তীব্র ছিল যে কংগ্রেসের করাচী অধিবেশনে যাওয়ার পথে গান্ধীজিকে কালাে পতাকা দেখানাে হয়।

গান্ধীজির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে অধ্যাপক অমলেশ ত্রিপাঠী বলেছেন এই আন্দোলনের তিনটি দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। প্রথমতঃ ১৯৩০ এর শরৎকালের পর শহরাঞ্চলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে। যদিও তা গ্রামাঞ্চলে প্রবল হয়। দ্বিতীয়তঃ উত্তর পশ্চিম সীমান্তের বাইরে মুসলিমরা কখনই আন্দোলনে যােগ দেয়নি। তৃতীয়তঃ ১৯২৭ ও ১৯২৮ -এ শ্রমিক আন্দোলন প্রবলাকার ধারণ করলেও ঠিক আন্দোলনের সময় ১৯৩০- ১৯৩১ তা প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়। অধ্যাপক বিপানচন্দ্র মনে করেন গান্ধী আরউইন চুক্তির আগেই আন্দোলনে ভাটার টান দেখা যাচ্ছিল। সরকারের দমননীতি এর জন্য কিছুটা দায়ী। বণিক এবং শিল্পপতিরাও আন্দোলনের বিপক্ষে ছিল।

ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠীর মতে, গােলটেবিল বৈঠকে যােগদান না করলে কংগ্রেস মার্কিন ও অন্যান্য বৈদেশিক রাষ্ট্রের সহানুভূতি হারাত। সুতরাং এই বৈঠকে যােগদানের আগে গান্ধী আরউইন চুক্তির দ্বারা গান্ধী সরকারকে যুদ্ধ বিরতি স্বাক্ষরে বাধ্য করেন। উত্তরপ্রদেশের কিষাণদের বয়কট গান্ধীজির প্রত্যাহার করে টাকায় ১২ আনা ও ৮ আনা খাজনা দিতে বলায় গান্ধীজি কৃষকদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেন বলা হয়। ত্রিপাঠার মতে, জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা মনে রেখে উত্তরপ্রদেশের কিষাণদের ব্যাপারে জেদ প্রকাশ গান্ধীজি উচিত মনে করেন নি। গুজরাটের কৃষকরা হতাশ হয় যে, তাদের বাজেয়াপ্ত জমি এই চুক্তিতে ফেরতের ব্যবস্থা ছিল না। ১৯৩৭ খ্রীঃ কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠন করলে এই জমি ফেরৎ দেওয়ার জন্যে আইন করা হয়। গান্ধী আরউইন চুক্তি আপাততঃ গান্ধীজি ও কংগ্রেসের একটি নৈতিক জয় বলে তখনকার লােকেরা ভাবে। জেল থেকে রাজবন্দীদের মুক্তি দেওয়া হলে জনগণ তাদের বীরের সম্মান জানান।
Advertisement