ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক কারণ কী ছিল

- November 15, 2019
লেফেভার বলেন যে, ফ্রান্সের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যের অগ্রগতি অষ্টাদশ শতকে কোন কোন সময় কিছু পরিমাণে দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু ফ্রান্সের মধ্যযুগীয় সমাজ ব্যবস্থায় ও মধ্যযুগীয় মানসিকতায় অর্থনীতির কোন গভীর পরিবর্তন ও অগ্রগতি হয়নি। ফ্রান্সের মানসিকতাই ছিল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন বিরােধী। লেফেভার বলেন, “শিল্প বাণিজ্যের পালে সামান্য কিছু পরিবর্তনের হাওয়া লাগলেও ফ্রান্স ছিল আগাগােড়া একটি কৃষি ও হস্তশিল্প প্রধান দেশ। শিল্প বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাদ গড়ে ওঠার বিরুদ্ধে ফ্রান্সে তীব্র বিরােধী মনােভাব বিদ্যমান ছিল। বিপ্লবের সময় এই মানসিকতা কার্যকরী হয়”। ফ্রান্সের পাতি বুর্জোয়, শ্রমিক, সাকুলেত প্রভূতি মুনাফাভােগী বণিকদের বিরুদ্ধে ছিল। ফরাসী রাজসরকারও শিল্পের বিকাশ সম্পর্কে কোন দৃঢ় অথচ সুস্পষ্ট নীতি নেননি। কৃষির আধুনিকীকরণের জন্যেও পঞ্চদশ ও ষােড়শ লুই কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেননি। এনক্লোজার বা বেষ্টনী দ্বারা ক্ষেতগুলিকে আবদ্ধ করা প্রভৃতি সংস্কার খামখেয়ালীভাবে করা হয়। মােট কথা, ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে ফ্রান্সের অর্থনেতিক অবস্থা ছিল বিকাশশীল ও উন্নতিসূচক এই মতবাদকে লেফেভার নস্যাৎ করেছেন।
Economic causes of french revolution
অর্থনৈতিক সংস্কারে ব্যর্থতা: ষোড়শ লুই অর্থনৈতিক সংস্কারের চেষ্টা করেন, কিন্তু তার নিজস্ব দুর্বলতা এবং অভিজাত সম্প্রদায় ও তাহার রাণী ম্যারি আন্তয়ানেতের প্রভাবে সেই সকল চেষ্টা কার্যকরী হয়নি। সুদক্ষ রাজস্ব মন্ত্রী তুরগো (Turgot)-র রাজস্ব সংস্কার চেষ্টাও রাণী ম্যারি আন্তয়ানেতের বিরােধিতায়ই বিফল হয়। ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রিগণ যখন একের পর একজন ফরাসী অর্থনীতির উন্নতি সাধনে ব্যস্ত, ম্যারি আন্তয়ানেত তখন নানাপ্রকার মণিমুক্তা ক্রয় এবং বন্ধুবান্ধবদের জন্য উপহার ক্রয়ে বহু অর্থ অপচয় করছিল। তদুপরি ভার্সাইয়ের রাজসভায় পঞ্চদশ লুইয়ের আমলে যে উচ্ছলতা ও অমিতব্যয়িতা শুরু হয়েছিল তার ফলে রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে। এই সকল কারণে ফরাসী রাষ্ট্র তখন সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে পড়ে। তদুপরি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ঔপনিবেশিকদিগকে অর্থ সাহায্য করার ফলে ফরাসী সরকারের আর্থিক অবস্থা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে।

সরকারী অমিতব্যয়িতা: সরকারের রাজস্ব খাতে যে আয় হত কর্মচারীদের বেতন, অস্টিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ, সপ্তবর্ষের যুদ্ধ, আমেরিকা স্বাধীনতা যুদ্ধের খরচ ও রাজপরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে শেষ হয়ে যেত। গুডউইনের মতে, ভার্সাইয়ের রাজসভায় ১৮ হাজার কর্মচারী নিযুক্ত ছিল, এদের মধ্যে ১৬ হাজার কর্মচারী কেবল রাজপ্রাসাদের কাজের জন্যেই বহাল ছিল। রাণীর খাস চাকরের সংখ্যা ছিল ৫০০ জন। রাণী নিত্য নতুন ভােজসভা ও পােষাকের জন্যে প্রচুর খরচ করতেন। রাজপরিবারের এই অতিরিক্ত খরচ মিটাতে সরকারের বহু অর্থ ঋণ হয়। যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে সরকার প্রচুর টাকা ঋণ নেন। গুডউইন মন্তব্য করেছেন যে, ফরাসী বিপ্লবের প্রাক্কালে অর্থনৈতিক সমস্যার মূল কথা ছিল অমিতব্যয়িতা বন্ধ করার ব্যাপারে সরকারের অক্ষমতা।

করভার বণ্টনে অসাম্য: বুরবো সরকারের গৃহীত অর্থনীতিই ছিল ফান্সের অর্থনৈতিক সঙ্কটের জন্যে দায়ী। ফ্রান্স ছিল ভুল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি প্রকান্ড জাদুঘর। ফ্রান্সের তিনটি প্রধান কর ছিল যথা- টেইলি বা ভূমি কর, ক্যাপিটেশন উৎপাদন কর ও ভিটিংয়েমে বা আয়কর। কিন্তু যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় যারা যথাক্রমে ফ্রান্সের ১/১০ অংশ ও ১/৫ অংশ সম্পত্তির মালিক ছিল তারা টেইলি কর দিত না। যাজক সম্প্রদায় পোইসির চুক্তি (১৫৬১ খ্রিস্টাব্দ) অনুযায়ী স্বেচ্ছা কর দিত। রাজা তাদের ওপর সমান হারে কর বসাতে পারতেন না। এদিকে অভিজাতরাও নানাভাবে ক্যাপিটেশন এবং আয়কর বা ভিটিংয়েমে কর এড়িয়ে যেত। এজন্য এই তিনটি প্রত্যক্ষ করের প্রধান বোঝা পড়ত তৃতীয় শ্রেণীর উপর। যদিও উচ্চ যাজক ও অভিজাত ফ্রান্সের জাতীয় সম্পদের ৪০% ভাগের মালিক ছিল, তারা এই বিরাট সম্পদের জন্য ন্যায্য কর দিত না। কর ধার্য করার ক্ষেত্রে ত্রিবিধ দুর্নীতি যথা “বিশেষ অধিকার", যাদের দেওয়ার ক্ষমতা আছে তাদের ওপর কম হারে কর এবং কর ছাড় ফ্রান্সের রাজস্ব ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দেয়। ইন্টেন্ডেন্ট নামে রাজস্ব কর্মচারীরা ছিল ঘাের দুনীতিগ্রস্থ, অমিতব্যয়ী। ফলে যেটুকু কর আদায় হত তার বেশীর ভাগ কর্মচারীদের ভরণপােষণে ব্যয় হয়ে যেত।

ফরাসী সরকার গ্যাবেলা বা লবণ কর, বাণিজ্য কর, আবগারী কর, পরিবহন কর প্রভৃতি পরােক্ষ কর আদায় করত। তৃতীয় শ্রেণী সরকারকে প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ কর দিত। তারা গীর্জাকে টাইদ অর্থাৎ ধর্মীয় কর যা ফসলের ১/১০ ভাগ কর দিত। সামন্ত প্রভূদের জন্যে কর্ভি বা বিনা মজুরীতে কাজ করা, বানালিতে (Banalites) প্রভৃতি বাধ্যতামূলক কর দিত। সরকার, গীর্জা ও সামন্ত প্রভুদের প্রাপ্য দেওয়ার পর তৃতীয় শ্রেণী, বিশেষত কৃষকদের হাতে আর বিশেষ কিছু থাকত না। প্রতিদিনের ব্যবহার্য জিনিসপত্র উপর এইডস নামে একটি প্রধান পরোক্ষ কর ধার্য ছিল। অভিজাত সামন্তদের দিতে হত ফিউডাল ডিউস (Feudal Dues)।

মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি: গুডউইন বলেন ফ্রান্সে ১৭৬৩ খ্রীঃ পর প্রায় তিন মিলিয়ন লােকসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। এই মূল্য বৃদ্ধির দুটি প্রধান কারণ ছিল, যথা- দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইওরােপে প্রচুর পরিমাণ সােনা, রূপা আমদানি করা হয়। একটি সূত্র থেকে জানা যায় যে, অষ্টাদশ শতকে ৫৭ হাজার মেট্রিক টন রূপা এবং ১৯০০ টন সােনা আমেরিকা থেকে ইওরােপে আনা হয়। সর্বাপেক্ষা বেশী পরিমাণ আসে ১৭৮০ খ্রীঃ পর থেকে। এই ধাতুর অনেকটা ফ্রান্সে চলে আসে। এজন্য মুদ্রাস্ফীতি হয়। জিনিষের দাম বাড়ে। ১৭৭০ খ্রীঃ পর ফ্রান্সের কৃষি ও শিল্পদ্রব্যের উৎপাদনে মন্দা দেখা দেয়। ১৭৮৮ খ্রীঃ থেকে ক্রমাগত ফসল হানির জন্যে খাদ্যশস্যের দাম বাড়ে। খাদ্যদ্রব্যের দাম ৬০% বাড়লেও শ্রমিকের ও দিন মজুরের মজুরী ২২% বেশী বাড়েনি। ফলে খাদ্যের জন্যে দাঙ্গা (Bread riot) আরম্ভ হয়। কেমব্রিজ ঐতিহাসিক জর্জ রুডের মতে, মুদ্রাস্ফীতি ও ১৭৭৫-১৭৮৮ খ্রীঃ পর্যন্ত প্যারিস, লায়নস প্রভৃতি শহরে রুটির দাঙ্গা হয়। ১৭৮৮ খ্রীঃ নিদারুণ শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে শস্য হানি ঘটে। গ্রামের কৃষকেরা খাদ্যের সন্ধানে শহরের দিকে ছুটতে আরম্ভ করে। বুরবো সরকার এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের মােকাবিলা করতে ব্যর্থ হন।
Advertisement