সােভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণ

- November 12, 2019
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন বা ভাঙন আনুষ্ঠানিকভাবে 1991 সালের 26শে ডিসেম্বর নতুন রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলৎসিন ঘোষণা করেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের 15টি প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতার স্বীকৃতি ঘোষণা করা হয়। সােভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন বা পতনকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা লক্ষ করা যায়। প্রাক্‌ সােভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ অবস্থার স্পষ্ট রূপ এখনও পর্যন্ত পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠেনি বলে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলােচনা অসম্পূর্ণ থাকাই স্বাভাবিক। এই জটিল ও সুবিস্তীর্ণ বিষয়কে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আলােচনা করা যেতে পারে। ই. জে. হবসবম তার The Age of Extremes নামক গ্রন্থে সােভিয়েত ইউনিয়নের শেষ দিকটিকে Aslowmotion Catostrophe বলে উল্লেখ করেছেন।
Madrid Conference 1991
জাতিগত বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা: সােভিয়েত ইউনিয়নের একটি অন্তনিহিত দুর্বলতা হিসাবে সােভিয়েতদের জাতিগত বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতার বিষয়টিকে উল্লেখ করা যেতে পারে। 1989 খ্রিস্টাব্দের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে সমস্ত সােভিয়েত দেশে তিন প্রধান জনগােষ্ঠী শ্লাভ সম্প্রদায়ভুক্ত, যার মধ্যে রুশ 14.52 কোটি, ইউক্রেনিয় 4.42 কোটি, বেলারুশ প্রায় 1 কোটি। এদের মধ্যে আবার অসংখ্য ছােটো ছােটো উপজাতির অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। এত অসংখ্য জাতি এবং সম্প্রদায়ের মানুষকে একটি সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করে রাখা নিঃসন্দেহে একটি জটিল বিষয়। স্বভাবতই সােভিয়েত নেতৃত্ব রাজনৈতিক সংহতির উপর জোর দিয়েছিলেন। বিপ্লব এর পর পরই জার প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের জাতিগত জটিলতা লক্ষ করে লেনিনের পক্ষ থেকে সব জাতি গােষ্ঠীকে আশ্বাস দেওয়া হয় যে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাদের অবস্থান হবে স্বাধীন ও স্বেচ্ছাপ্রণােদিত। সােভিয়েত সংবিধানে অঙ্গীভূত রাজ্যগুলিকে তাদের ইচ্ছামতন সােভিয়েত রাষ্ট্রসংঘ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে স্বাধীনতা দেওয়া ছিল। এই জাতীয় স্বাধীনতা বা অধিকার বাস্তবে কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল।

অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ: সােভিয়েত ইউনিয়নের আরেকটি অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা হল অতিরিক্ত মাত্রায় কেন্দ্রীকরণ। কেন্দ্রীকরণের পিছনে কতগুলি কারণ ছিল। প্রথমত, বিপ্লবের পরই সােভিয়েত ইউনিয়নকে বিপুল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এই জাতীয় সমস্যার মােকাবিলা করার জন্য লেনিনের সামনে কোন পূর্ব নজির না থাকায় তাকে পথিকৃতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। পথিকৃতের সীমাবদ্ধতাগুলি স্বভাবতই তারা এড়িয়ে যেতে পারেন নি। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমি ধনতান্ত্রিক দেশগুলি সােভিয়েত ব্যবস্থাকে গােড়াতেই বিনষ্ট করে দেওয়ার জন্য সক্রিয় হয়। এই বাহ্যিক চাপের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত মাত্রায় কেন্দ্রীকরণ করতে হয়েছিল। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক বিপ্লবী মানসিকতা জোরালাে হয়ে ওঠে নি। ফলস্বরূপ পুঁজিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা এদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বেশিমাত্রায় ছিল। তৃতীয়তঃ অতিরিক্ত মাত্রায় কেন্দ্রীভূত রাষ্টব্যবস্থা দলীয় আমলাতান্ত্রিক শোষণের পথ প্রশস্ত করেছিল।

পূর্ব ইউরোপের দুর্বল সরকার: 1989 খ্রিস্টাব্দে পূর্ব ইওরােপের সরকারগুলির গণভিত্তি একান্তই দুর্বল ছিল। যখনই পূর্ব ইওরােপের কোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়েছিল, তখনই সােভিয়েত ইউনিয়নকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যেতে পারে যে 1953 সালের জুন মাসে পূর্ব জার্মানি, 1956 সালে হাঙ্গেরি এবং 1968 সালে চেকোশ্লাভাকিয়ার অভূর্থানের সময় সােভিয়েত ইউনিয়নকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। 1956 থেকে 1981 – এই সময়ের মধ্যে পােল্যান্ডের কমিউনিস্ট পার্টি একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেয় যে, সােভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তারা তাদের নিজস্ব ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে। সােভিয়েত হস্তক্ষেপ বা ভীতি প্রদর্শন বাহ্যিক একটি শান্তির বাতাবরণ গড়ে তুলেছিল।

অর্থনৈতিক কারণ: পশ্চিম ইওরােপের তুলনায় পূর্ণ ইওরােপ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পশ্চাৎপদ হয়ে পড়ে। 1987 সালে মাথাপিছু আয়ের হিসাব থেকে দেখা যায় যে পােল্যান্ড ও হাঙ্গেরির আয় ছিল পশ্চিম জার্মানি ও সুইডেনের 14 শতাংশ। হবসবমের মতে, অর্থনৈতিক দুর্বলতা স্বত্ত্বেও একটি জটিল এবং বৃহৎ সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছিল, যা সােভিয়েত রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করে। এই অর্থনৈতিক অবক্ষয় পতনের হাত থেকে নিজস্ব রাষ্ট্রব্যবস্থার নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করার জন্য পূর্ব ইওরােপের রাষ্ট্রগুলি বেরিয়ে আসতে সচেষ্ট হয়। হবসবম মন্তব্য করেছেন, "Hunger & sbortelie behind every thing that happend in the last two years of USSR". সংস্কার সাধনের মাধ্যমে এই অন্তর্নিহিত সমস্যার সমাধান সম্ভবপর ছিল না। পুরানাে ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করা ছাড়া অন্য কোন সহজ পন্থা ছিল না। ব্রিটিশ এবং আমেরিকান বিশেষজ্ঞ আনিয়ে অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয় নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু এই বিশেষজ্ঞদের সােভিয়েত অর্থনীতি সম্পর্কে সঠিক কোন ধারণা না থাকার দরুন তাদের প্রদর্শিত পথ সাফল্যমণ্ডিত হতে পারে নি। কার্যত এক ধরনের মিশ্র অর্থনীতির সূত্রপাত ঘটে যা মূল সমস্যার সমাধান করতে পারে নি।

গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রইকা (Perestroika and Glasnost): মিখাইল গর্বাচেভ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে যে সিদ্ধান্তে আসেন, তাহল যদি দেশে গণতন্ত্র প্রবর্তন করতে হয়, তাহলে তার সঙ্গে সাম্রাজ্য প্রতিম প্রভুত্ব একই সঙ্গে বজায় রাখা চলে না। দ্বিতীয়ত, উপর থেকে বিপ্লব শুরু হলে নীচের দিকে বিচ্ছিন্নতাবােধ জাগ্রত হবে। এই অবস্থায় 1986 সালে 27 তম পার্টি সম্মেলনে মিখাইল গর্বাচেভ গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রইকা এই দুটি নীতি প্রবর্তন করেন। গ্লাসনস্ত এর অর্থ হল মুক্তমন। এর উদ্দেশ্য ছিল সােভিয়েত সমাজে উন্মুক্ত পরিবেশের সৃষ্টি করা। সােভিয়েত ইউনিয়নের জনগণ যাতে স্বাধীনভাবে মতামত বিনিময় ও মত প্রকাশ করতে পারে, তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই প্রথম সােভিয়েত ইউনিয়নে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়। একদলীয় ব্যবস্থার সমালােচনাকে গণতান্ত্রিক অধিকার বলে মনে করা হয়। ফলস্বরূপ দলীয় আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। এছাড়া গ্লাসনস্ত এর দরুন সােভিয়েত সমাজে বহুদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন ও উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মতামত বিনিময়ের সুযােগ করে দেওয়া হয়।

পেরেস্ত্রইকা ছিল গ্লাসনস্ত এর পরিপূরক - এর অর্থ হল অর্থনৈতিক পুনর্গঠন। Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধ এর সময় সােভিয়েত ইউনিয়ন তার শিল্প পরিকাঠামােকে বিশেষ উন্নত করতে পারেনি। ঠাণ্ডা যুদ্ধে নিজেকে নিয়ােজিত রাখার প্রয়ােজনে মূলত ভারী শিল্প ও সামরিক শিল্পের প্রতি বিশেষ নজর দেয় সােভিয়েত ইউনিয়ন। এর ফলে তথ্য প্রযুক্তি বা ইলেকট্রনিকস বিশেষ উন্নত হয়ে উঠতে পারেনি। এই কারণে পেরেস্ত্ৰৈকা অথনৈতিক ক্ষেত্রে উদারীকরণের সূত্রপাত হয়।

Advertisement
জাতীয় স্বাধীনতার উদ্যোগ: উপরােক্ত সংস্কারমূলক পরিস্থিতিতে যে নির্বাচন হয়, তাতে দেখা যায় যে জনগণের ভােটে পুরাতনপন্থী বহু নেতাই পরাজিত হয়েছেন। রাজনৈতিক ক্ষমতায় ক্রমশ একমাত্র দল CPSU থেকে গণপ্রতিনিধি সংসদের কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। এই অবস্থায় পার্টির মধ্যে সংস্কারপন্থী ও রক্ষশীলদের মধ্যে দ্বন্দ তীব্র হয়ে ওঠে। এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সােভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত রাজ্যগুলি একে একে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সােভিয়েত সাম্রাজ্যের ভাঙন অনিবার্য হয়ে ওঠে। সােভিয়েত অঙ্গরাজ্যগুলির জাতীয় স্বাধীনতার উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টা শুরু হয়। মূল রুশ উদ্যোগ ভূখণ্ডে জাতীয় স্বাধীনতার দাবি তীব্র হয়ে ওঠে। 1990 সালের মার্চ মাসে গণপ্রতিনিধি সংসদে যারা নির্বাচিত হয়ে এলেন, তাদের বেশির ভাগ ইয়েলৎসিনপন্থী। এদেরই উদ্যোগে রাশিয়া সােভিয়েত রাষ্ট্র সংঘ থেকে সতন্ত্রের দাবি জানায়। 1990 সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির আইনসভা পূর্ণ স্বাধীনতা ঘােষণা করে। অপরাপর প্রতিবেশী রাজ্য বেলারুশ, মােল্ডাভিয়া, জর্জিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে।

উপসংহার (Conclusion): সােভিয়েত ইউনিয়নের পতনের জন্য সােভিয়েত ব্যবস্থা অনেকাংশেই দায়ী ছিল। সােভিয়েত ব্যবস্থা অনুযায়ী অতিরিক্ত মাত্রায় কেন্দ্রীকরণ পূর্ব ইওরােপের রাষ্ট্রগুলির ক্ষেত্রে অভিপ্রেত বিষয় ছিল না। 1950 এর দশকে পােল্যান্ড ও হাঙ্গেরির ঘটনা ও 1960 এর দশকে চেকোশ্লাভাকিয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে পূর্ব ইওরােপের রাষ্ট্রগুলির স্বাধীনতার আখাঙ্খা দেখা যায়। Cold War বা ঠাণ্ডা লড়াই জনিত পরিস্থিতিতে স্ট্যালিন বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে পূর্ব ইউরোপের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। এই জাতীয় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ পূর্ব ইওরােপের অধিকাংশ রাষ্ট্রই মেনে নিতে পারেনি। স্বাধীন বা নিরপেক্ষ হওয়ার বাসনা তাদের মধ্যে যথেষ্ট মাত্রায় ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের দিক থেকে কঠোর পদক্ষেপের ভীতির দরুন তাদের পক্ষে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করা সম্ভব হয় নি।

তবে শুধুমাত্র সােভিয়েত ব্যবস্থার দুর্বলতাকে পতনের জন্য দায়ী করা যুক্তিযুক্ত হবে না এর সঙ্গে পূর্ব ইওরােপীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে জাতীয়তাবাদের প্রসারের বিষয়টিও নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। জাতীয়তাবাদী এই ধারণার প্রভাবে পূর্ব ইওরােপের রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সােভিয়েত নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়ার বাসনা তীব্র হয়ে ওঠে। 1950 ও 1960 এর দশকে পূর্ব ইওরােপের রাষ্ট্রগুলির বুদ্ধিজীবী শ্রেণির লােকেরা স্বাধীন চিন্তাধারা এবং সংস্কারপন্থী মনােভাবের জন্য লেখনী ধারণ করলে তার প্রভাবও পূর্ব ইওরােপের রাষ্ট্রগুলির উপর বিশেষভাবে পড়েছিল। সর্বোপরি 1968 খ্রিস্টাব্দে চেকোশ্লাভাকিয়ায় ক্ষণিক বসন্তের প্রভাব সােভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে বিপর্যয়কর হয়েছিল। কাজেই সােভিয়েত ইউনিয়নের পতনে শুধুমাত্র সােভিয়েত ব্যবস্থার দুর্বলতার দরুন ঘটেছিল এরূপ মনে করা যুক্তিযুক্ত হবে না, এই ব্যবস্থার দুর্বলতা ছাড়াও অন্যান্য নানান কারণ এর জন্য দায়ী ছিল।
Advertisement