ফরাসি বিপ্লবের কারণ গুলি কী ছিল

- November 16, 2019
সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হইতে ফরাসী রাজত্ব খুবই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইওরােপের রাজনীতি ক্ষেত্রে ফরাসিরাজ চতুর্দশ লুই (১৬৪৩-১৭১৫) তার যুদ্ধনীতি দ্বারা এক দারুণ ভীতির সঞ্চার করেন। কিন্তু তার আমলের শেষদিক থেকে যে আর্থিক দুর্বলতা দেখা দেয় তা পরবতী রাজা পঞ্চদশ লুই ও ষােড়শ লুইয়ের আমলে চরমে পৌঁছাই। পঞ্চদশ লুইয়ের শাসনকার্যের অযােগ্যতা, তার অমিতব্যয়িতা ও বিলাসপ্রিয়তা ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটায়। রাজকর্মচারী মাত্রেই স্বার্থপর ও দুনীতিপরায়ণ হয়ে ওঠে। বিচারব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে পড়ে। ষােড়শ লুই আন্তরিকভাবে এই সর্বনাশা পরিস্থিতি থেকে দেশ ও রাজতন্ত্রকে রক্ষার উদ্দেশ্যে চেষ্টা করেন বটে, কিন্তু তার দঢ়তার অভাব এবং নিজ রাণী ম্যারি অ্যান্তয়ানেতের প্রভাব—এই আবর্তে পড়ে তিনি শাসনব্যবস্থার কোন উন্নতি সাধন করতে পারেনি। সরকারের এবং জনসাধারণের আর্থিক দুর্বলতার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দুর্বলতা, সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও শ্রেণী বৈষম্য প্রভৃতি সবকিছু ফরাসী রাজতন্ত্রের ভিত্তি শিথিল করে দেই। এইরকম অবস্থায় জনগণের দুরবস্থাও স্বভাবতই চরমে পৌঁছাই। ফ্রান্সের আভ্যন্তরীণ অবস্থা যখন এইরূপ তখন তার প্রতিকারকল্পে দেখা দেয় ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সের সাধারণ লোক বুর্জোয়া শ্রেণীর নেতৃত্বে পুরাতন ব্যবস্থা ভেঙে নতুন সমাজ ব্যবস্থা গঠনের তৎপরতা।
Causes of French Revolution
রাজনৈতিক কারণ (Political Causes): ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক কারণকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা - (ক) ফরাসি রাজাগণের দুর্বলতা ও অকর্মণ্যতা, (খ) দুর্নীতিপূর্ণ শাসনব্যবস্থা ও স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা, (গ) বিশৃঙ্খলাপূর্ণ বিচার ব্যবস্থা। ফরাসি দেশের মালিক ছিলেন রাজা। তিনি ছিলেন স্বৈরাচারী ও দৈৰস্বত্বে বিশ্বাসী। প্রজাদের জীবন ও সম্পত্তি নিয়ে তিনি যা খুশি তাই করতেন। রাজা ইচ্ছা করলে যে কোনাে লােককে যতদিন খুশি বন্দি করে রাখতে পারতেন বা প্রজাগণের ওপর যখন তখন ট্যাক্স বসাতে পারতেন। রাজার কার্যকলাপের বিচার বা সমালােচনা করার অধিকার কারও ছিল না। রাজা ছিলেন একাধারে শাসক, বিচারক, আইন প্রণেতা ও প্রজাগণের ভাগ্য নিয়ন্তা। চতুর্দশ লুই এর মৃত্যুর পর পঞ্চদশ লুই (১৭১৫-১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দ) এবং যােড়শ লুই এর (১৭৭৪-১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দ) প্রয়ােজনীয় শাসন দক্ষতা মােটেই ছিল না। এদের চারিত্রিক দৃঢ়তারও অভাব ছিল। এরা সাময়িক আকাক্ষা ও বিলাসব্যসন চরিতার্থ করবার জন্য অপরিমিত অর্থ ব্যয় করেছিলেন। রাজপরিবারের বেপরােয়া ভােগবিলাসে রাজকোশ নিঃশেষ হয়ে যায়।

রাজপরিবারের দুর্বলতার সুযােগ নিয়ে রাজ্যের স্বার্থপর অভিজাতরা রাজক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার ও হৃত ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছিল। ভার্সাই এর রাজপ্রাসাদ রাজ পরিবারের ও অভিজাতদের অবর্ণনীয় কার্যকলাপের কেন্দ্রে পরিণত হয়। রাজকর্মচারীরা সকলেই ক্ষমতাদর্শী প্রধান হয়ে ওঠে। রাজ ক্ষমতার দুর্বলতার সুযােগে রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাও পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। প্রশাসনিক দুর্বলতাও প্রত্যক্ষভাবে আত্মপ্রকাশ করে। রাজার আশ্রিত প্রভাবশালী অভিজাত সম্প্রদায় খুশিমতাে Letters de Cachet নামে অভিযােগপত্রে রাজাকে দিয়ে সই করিয়ে যে কোনাে জনগণকে কুখ্যাত বাস্তিল কারাগারে ঢুকিয়ে দিত। ফরাসি রাজতন্ত্র ছিল স্বৈরাচারী। স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা জনগণের আনুগত্য লাভে সমর্থ হয়নি। পঞ্চদশ ও ষােড়শ লুইয়ের আমলে শাসনব্যবস্থা অত্যাচারের নামান্তর হয়ে ওঠে। প্রজাবর্গের দুঃখদুর্দশা বৃদ্ধি পায় চরম। রাজগণের দুর্বলতার সুযােগে অভিজাত ও যাজক সম্প্রদায় শাসন ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। প্রজাবর্গের অভাব অভিযােগের সংবাদ রাজার নিকট পৌছােত না। অভিজাত ও যাজক সম্প্রদায় প্রজাবর্গের ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালাতে পরামর্শ দিত। রাজা অভিজাত ও যাজক সম্প্রদায়ের হাতের ক্রীড়নক হয়ে পড়েন।

ফ্রান্সের আইন ব্যবস্থাও ছিল বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। সামান্য অপরাধে কঠিন শাস্তি এমনকি অঙ্গচ্ছেদের ব্যবস্থাও ছিল। ফ্রান্সে ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে কিছু ছিল না। যে কোনাে ব্যক্তিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিনা কারণে আটক করা যেত। বিচারের নামে হত প্রহসন। বিচারব্যবস্থায় চলছিল ভয়ংকর দুর্নীতি ও চরম বৈষম্য। শাসনব্যবস্থায় রাজ পরিবারের উদাসীনতা এবং বিচার বিভাগে চরম বিশৃঙ্খলার ফলে জনগণের মনে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ধীরে ধীরে জমে ওঠে, যার বিস্ফোরণেই ফরাসি বিপ্লব ত্বরান্বিত হয়।

সামাজিক কারণ (Social Causes): ফ্রান্সের সামাজিক অবস্থা তখন অপরাপর ইওরােপীয় দেশের ন্যায় অধিকারপ্রাপ্ত ও অধিকারহীন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। যাজক সম্প্রদায় ও অভিজাতগণ ছিলেন অধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণীভুক্ত আর দেশের অপর সকল ছিল অধিকাহীন শ্রেণীভুক্ত। যাজকদিগকে বলা হত প্রথম সম্প্রদায় (First Estate), অভিজাতগণ দ্বিতীয় সম্প্রদায় (Second Estate), আর মধ্যবিত্ত, শ্রমিক ও কৃষকগণ সকলে ছিল তৃতীয় সম্প্রদায়ভুক্ত (Third Estate)। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক যাবতীয় সুযােগ সুবিধা ও মর্যাদা প্রথম দুই সম্প্রদায় ভোগ করতো। শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারের মাধ্যমে তৃতীয় সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে বুর্জোয়া শ্রেণীর উৎপত্তি হয়। এই বুর্জোয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল বণিক, ব্যাঙ্কের মালিক, পাইকারী ব্যবসায়ী, দোকানদার, ডাক্তার, আইনজীবী, অধ্যাপক, শিক্ষক প্রভৃতি। দেশের শিল্প ব্যবসায় বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে এই শ্রেণীর প্রতিপত্তি ছিল সর্বাধিক। যাতে অভিজাত শ্রেণীর অর্থাৎ অধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণীর লোকসংখ্যা ফ্রান্সের মােট লােকসংখ্যার একশতাংশ ছিল, কিন্তু ফ্রান্সের মােট ভূসম্পত্তির 1/5 অংশ, ইওরােপে ফ্রান্সের সম্পত্তির 1/3 অংশ, দেশের মােট রাজস্বের 1/4 অংশ এবং দেশের সমগ্র মূলধনের 1/3 অংশ তাদের হস্তগত ছিল।

রাষ্ট্রের করভার যাজক ও অভিজাত শ্রেণী বহন করতো না। প্রত্যক্ষ কর তাদেরকে দিতে হত না। পরােক্ষ কর তারা প্রজাবর্গের উপর চাপাতো। তৃতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্তগণ অর্থ, শিক্ষা প্রভৃতিতে অভিজাত বা যাজক সম্প্রদায় থেকে শ্রেষ্ঠতর হলেও তাদের ন্যায় কোন অধিকার বা মর্যাদা ভােগের অধিকারী ছিল না। অথচ রাষ্ট্রের করভারের প্রায় সবটাই তাদেরকে বহন করতে হত। ফলে ফরাসী সমাজের অধিকারপ্রাপ্ত ও অধিকারহীন শ্রেণীর মধ্যে এক তীব্র বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, অভিজাত শ্রেণী ও উচ্চতর যাজক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ শ্রেণীর, বিশেষভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে এক তীব্র অসন্তােষ দেখা দেয়। তারা অভিজাত শ্রেণী প্রভাবিত রাজতন্ত্রের পক্ষপাতী ছিল না, ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তারা চেয়েছিলেন রাষ্ট্র কর্তৃতের অবসান। সামাজিক মর্যাদা বংশগত না হয়ে ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল হোক এটা তারা চেয়েছিলেন। নেপােলিয়ন বােনাপাট বলেন, “অহমিকা ছিল বিপ্লবের মূল কারণ, ব্যক্তি স্বাধীনতা লাভ ছিল অজুহাত মাত্র।" কিন্তু ফরাসী বিপ্লব কেবলমাত্র মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল একথা মনে করা ঠিক নয়। সমাজের সর্বনিম্ন পর্যায়ের লােকও তদানীন্তন ফরাসী রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক শােষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘকালের পুঞ্জিভূত অভিযােগ প্রকাশ করেছিল।

অর্থনৈতিক কারণ (Economic Causes): ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক কারণ ছিল গুরত্বপূর্ণ। ফরাসি রাষ্ট্র তখন কর্পদক হয়ে পড়েছিল। চতুর্দশ লুইয়ের আমলে কয়েকটি যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। এর ফলে ফরাসি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দুর্বলতা দেখা দেই। পঞ্চদশ লুইয়ের বেহিসাবী ব্যয় অর্থসংকট চরম আকার ধারণ করে। ষােড়শ লুই অর্থসংকট দুর করার চেষ্ঠা করে, রাণী ম্যারি অ্যান্তয়ানেতের প্রভাবে ব্যর্থ হয়। রাণী ম্যারি অ্যান্তয়ানেতের বিরোধীতার ফলে একের পর এক অর্থমন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে থাকে। এছাড়া আমেরিকা স্বাধীনতা যুদ্ধে অর্থ সাহায্য দান ফরাসি সরকারের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে।

করভারের অসম বণ্টনের ফলে ফরাসি কৃষক ও শ্রমিক এবং মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের উপর ধার্য কর অসন্তুষ্ট সৃষ্টি করে। টেইলি, ক্যাপিটেশন, ভিংতিয়েমে, মাথাপিছু কর, লাইসেন্স কর প্রভৃতি প্রত্যক্ষ কর (direct tax) এবং গেবেল, এইডস, আন্তঃপ্রাদেশিক শুল্ক, পরিবহণ কর, আবগারি শুল্ক প্রভৃতি পরােক্ষ কর (Indirect tax) জনসাধারণকে দিতে হয়। এছাড়া আয়ের ১/১০ অংশ চার্চকে ধর্মকর হিসেবে দিতে হত। তদুপরি বেগার খাটিয়া সরকারী রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামত শ্রমিক কৃষকদের করতে হত। এই শ্রমকর করভি (Corvee) নামে পরিচিত ছিল। রাজস্বের শতকরা ৯৬ ভাগ অধিকারহীন সম্প্রদায় — অর্থাৎ মধ্যবিত্ত ও কৃষক শ্রমিক সম্প্রদায়ের নিকট থেকে আদায় করা হত। এমতাবস্থায় দিন দিনই যখন সাধারণ শ্রেণীর আর্থিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে তখন বিপ্লব সৃষ্টির পথ প্রস্তুত হতে আর বিলম্ব হল না।
Advertisement
দার্শনিক প্রভাব (Philosopher Impact): ফ্রান্সের জনগণ যখন শাসকবর্গের শাসানিতে এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের অত্যাচার ও শােষণে ভয়ংকর অতিষ্ঠ, ঠিক সেই সময়ে তাদের পুঞ্জীভূত বেদনা যন্ত্রণা আর প্রতিবাদকে ভাষায় প্রাণবন্ত করে তুলে ধরলেন কয়েকজন দার্শনিক ও সাহিত্যিক। এরা হলেন মন্টেস্কু, ভলতেয়ার, রুশো, দিদেরাে, হেলভিটাস, হলব্যাক প্রমুখ মনীষী। মন্টেস্কু তার The Persian Letters নামক গ্রন্থে তৎকালীন প্রচলিত সমাজব্যবস্থার তীব্র সমালােচনা করেছেন। The Spirit of Laws গ্রন্থে আইন প্রণয়ন, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের মধ্যে স্বতন্ত্র্য বিধানের যুক্তি প্রদর্শন করেন। ভলতেয়ারের লেখনী ফরাসি জাতির মনে বিপ্লবী প্রবণতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। তিনি প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রবল আঘাত হানতে সমর্থ হন। তার আক্রমণ ছিল যুক্তিমূলক। তার রচনা ছিল প্রাণবন্ত।

দার্শনিক রুশাের প্রভাবই ফ্রান্সের সমাজে সর্বাপেক্ষা বেশি পড়েছিল। সাম্যের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও রাষ্ট্রই ছিল রুশোর আদর্শ। রুশাের মতে, প্রজাবর্গের সম্মতির (general will) ওপরই শাসকশ্রেণির ক্ষমতা পরিচালনা নির্ভর করে। তিনি বললেন, “মানুষ জন্মায় স্বাধীন হয়ে, কিন্তু বাস্তব জীবনে সে পরাধীন (Man is born free, but every where he is in chains)। রাজা সর্বেসর্বা নন। তিনি জনগণের প্রতিভূ মাত্র। তার এই বৈপ্লবিক চিন্তাধারা ফ্রান্সের জনমানসে প্রচণ্ড আলােড়ন তুলে। ফ্রান্সের শােষিত মানুষ তাদের নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন ও ক্রিয়াশীল হয়। দিদেরাে সমসাময়িক পণ্ডিতগণের সহযােগিতায় এনসাইক্লোপিডিয়া বা বিশ্বকোশ সংকলন করে ফ্রান্সের প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার ত্রুটিবিচ্যুতি তুলে ধরেন। এ যুগে ফিজিওক্র্যাট নামে একদল অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ত্রুটিবিচ্যুতি সম্পর্কে সমালােচনা করেন।

ফরাসি বিপ্লবে দার্শনিকদের ভূমিকা বা চিন্তাধারা বিপ্লবের প্রত্যক্ষ কারণ না হলেও এগুলি বিপ্লবের জন্য প্রয়ােজনীয় মানসিক প্রস্তুতি হিসাবে যথেষ্ট ফলপ্রসু ছিল। ফরাসি মনীষীদের এ সকল লেখা জনসাধারণকে গণমুক্তির বিপ্লবী পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করেছিল। তারা বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন। তাদের বাণী, রচনা, চিন্তাধারা, জাতীয় জীবনকে আলােকবর্তিকার ন্যায় আলােকিত করে তুলেছিল।

ইংলণ্ড ও আমেরিকার বিপ্লবের প্রভাব (Impact of Revolution in England and American): ফরাসী বিপ্লব ঘটার জন্যে বৈদেশিক প্রভাব দায়ী ছিল। ইংলন্ডে ১৬৮৮ খ্রীঃ গৌরবজনক বিপ্লব (Glorious Revolution) ঘটায় ইংলন্ডে স্বৈরতন্ত্র ধ্বংস হয়। ইংলন্ডে পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রিত সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা স্থাপিত হয়। ইংরাজ দার্শনিক লক-এর মতবাদ এই বিপ্লবে কার্যকরী হয়। প্রতিবেশী ফরাসী দেশের চিন্তাবিদেরা এর দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। তারা ফ্রান্সে অনুরূপ শাসন প্রবর্তনের দাবী করেন। আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধে (American War of Independence) বহু ফরাসী স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেন। আমেরিকা স্বাধীনতা যুদ্ধের সাফল্য ও তাৎপর্য ফরাসিবাসীকে উদ্বুদ্ধ করে। মার্কিন দেশ থেকে তারা টম পেইনের ভাবধারা, প্রজাতন্ত্রবাদ এবং মানবাধিকারের আদর্শ গ্রহণ করেন। লাফায়েৎ প্রমুখ ফরাসী নেতা আমেরিকা থেকে ফিরে আসার পর মার্কিন প্রজাতন্ত্র ও স্বাধীনতার আদর্শকে ফ্রান্সে রূপায়িত করার কথা ভাবেন।

ফরাসি বিপ্লবের প্রত্যক্ষ কারণ (Direct Cause of France Revolution): এই সকল কারণে যখন ফরাসি বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল তখন অর্থাভাবের জন্য ফরাসীরাজ যােড়শ লুই বাধ্য হইয়া ১৭৮৯ সালে ফরাসী জাতীয় সভার অধিবেশন আহ্বান করেন। কিন্তু স্টেটস জেনারেল বা জাতীয় সভার সাহায্যে অর্থ সংগ্রহই ছিল তাঁহার উদ্দেশ্য। স্টেটস জেনারেল (States General) ফরাসী জাতির যাবতীয় অভিযোেগ দুর করতে বদ্ধপরিকর হলে স্বভাবতই বিপ্লব শুরু হয়। অর্থাভাব হেতু ফরাসী স্টেট জেনারেলের আহ্বান ফরাসী বিপ্লবের প্রত্যক্ষ কারণ বলিয়া বিবেচনা করা হয়। কারণ, দীর্ঘ 175 বছর পর স্টেটস জেনারেলকে পুনরায় আহ্বান করার মধ্যই স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র যে আর নিজ শক্তির সাহায্যে চলতে পারছিল না সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘকাল উপেক্ষিত জাতীয় সভার নবনির্বাচিত সদস্যবর্গ দেশের ও দশের যাবতীয় অভিযােগ দূর করার দঢ়ঙ্কল্প নিয়ে স্টেট জেনারেলে উপস্থিত হয়েছিল।
Advertisement