বায়ুমণ্ডলের স্তর বিন্যাস - Atmosphere Layers

- November 28, 2019
বায়ুমণ্ডলকে দুটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে স্তর বিন্যাস করা হয়। যথা, (১) রাসায়নিক গঠন বা উপাদানের তারতম্য অনুসারে বায়ুমণ্ডলকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা, (ক) হােমােস্ফিয়ার বা সমমণ্ডল (Homosphere), (খ) হেটেরােস্ফিয়ার বা বিষমমণ্ডল (Heterosphere)। (২) উচ্চতা ও উষ্ণতা অনুসারে বায়ুমণ্ডলকে ছয়টি স্তরে বিভক্ত করা যায়। যথা,(I) ট্রপোস্ফিয়ার (Troposphere), (II) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার বা শান্তমণ্ডল (Stratosphere), (III) মেসােস্ফিয়ার (Mesosphre), (IV) থার্মোস্ফিয়ার বা আয়নােস্ফিয়ার (Thermosphere), (V) এক্সোস্ফিয়ার বা তাপমন্ডল (Exosphere), (VI) ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বা চৌম্বকমন্ডল (Magnetosphere)
Atmosphere Layers Image
(ক) হােমােস্ফিয়ার বা সমমণ্ডল (Homosphere): ভূপৃষ্ঠ থেকে উর্ধ্বে ১০০ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলের অংশ Homosphere এর অন্তর্গত। বায়ুমণ্ডলের উপাদানগুলির অনুপাত এই স্তরে মােটামুটি একই রকম থাকে বলে একে হােমােস্ফিয়ার বলা হয়। Troposphere, Stratosphere, Mesosphre এবং Thermosphere এর সামান্য অংশ Homosphere এর অন্তর্গত। বিভিন্ন গ্যাস, জলীয় বাষ্প এবং জৈব ও অজৈব কণিকা দ্বারা Homosphere গঠিত।

(খ) হেটেরােস্ফিয়ার বা বিষমমণ্ডল (Heterosphere): হােমােস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বে ১০০ কিমি থেকে ১০,০০০ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বায়ুমণ্ডল Heterosphere এর অন্তর্গত। এই স্তরে বায়ুমণ্ডলের উপাদানগুলির অনুপাত একই রকম থাকে না। এক একটি স্তরে একটি গ্যাসেরই প্রাধান্য থাকে বলে একে হেটেরােস্ফিয়ার বলে। হেটেরােস্ফিয়ার প্রধানত চারটি স্তরে বিভক্ত, যথাঃ (a) আণবিক নাইট্রোজেন স্তর (১০০-২০০ কিমি)। (b) পারমাণবিক অক্সিজেন স্তর (২০০-১১২০ কিমি)। (c) হিলিয়াম স্তর (১১২০-৩৫৪০ কিমি) এবং (d) হাইড্রোজেন স্তর (৩৫৪০-১০,০০০ কিমি)।

(I) ট্রপোস্ফিয়ার বা ঘনমণ্ডল (Troposphere): গ্রিক শব্দ 'Tropos' অর্থাৎ 'Turbulence' বা Mixing এবং 'Sphere' এর অর্থ ‘অঞ্চল’ বা ‘মণ্ডল’ থেকেই ট্রপোস্ফিয়ার নামকরণ হয়েছে। এটি বায়ুমণ্ডলের নিম্নতম স্তর। ভূপৃষ্ঠ থেকে ট্রপোস্ফিয়ারের উচ্চতা নিরক্ষীয় অঞ্চলে ১৮ কিমি এবং দুই মেরুতে কমতে কমতে তা ৮ কিমিতে পৌঁছায়। ট্রপোস্ফিয়ার স্তরের বৈশিষ্ট্য -
(i) উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতি কিমি উচ্চতায় ৬.৪ সেন্টিগ্রড হারে উষ্ণতা হ্রাস পায় - একেই ন্যরম্যাল ল্যাপসরেট বা স্বাভাবিক উষ্ণতা হ্রাসের বিধি বলে। তবে মেরু অঞ্চলে সারা বছর বরফে ঢাকা থাকে বলে কিছুটা উষ্ণতার বৈপরীত্য ঘটে।
(ii) নিরক্ষীয় অঞ্চলে ট্রপোস্ফিয়ারের উর্ধাংশের উষ্ণতা থাকে - ৮০° সেন্টিগ্রেড এবং মধ্য অক্ষাংশে - ৫৮° সেন্টিগ্রেড।
(iii) মােট গ্যাসীয় ভরের ৭৫ শতাংশ রয়েছে এই স্তরে। কেবলমাত্র ট্রপোস্ফিয়ারে জলীয়বাষ্প, ধূলিকণা ও মেঘ রয়েছে বলেই আবহাওয়া ও জলবায়ুর যাবতীয় ঘটনা এই স্তরে ঘটে। তাই একে ঘনমণ্ডল বলে।
(iv) বায়ুদূষণকারী প্রায় সমস্ত পদার্থই এই স্তরে অবস্থান করে। (v) ট্রপােস্ফিয়ারে ২ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত ভূপ্রকৃতি বায়ুকে বাধা দেয় বলে বায়ুর গতিবেগ কম হয়, কিন্তু তার পর গতিবেগ ক্রমশ বাড়তে থাকে।

ট্রপােপজ (Tropopause): ট্রপােস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বে প্রায় ২-৩ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত উষ্ণতার হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটে না। একে ট্রপােপজ (Pause অর্থ থামা) বলে। উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেও উষ্ণতা অপরিবর্তিত থাকে বলে একে সমতাপ অঞ্চল (Isothermal Zone) বলে।

(II) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার বা শান্তমণ্ডল (Stratosphere): ট্রপোপজের উর্ধ্বে ৫০ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার বলে। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরের বৈশিষ্ট্য -
(i) উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়। ট্রপোপজে যেখানে উষ্ণতা থাকে -৮০° সেন্টিমিটার, সেখান থেকে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের উর্ধ্বে উষ্ণতা বেড়ে হয় ৪° সেন্টিগ্রড।
(ii) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বাংশে ওজোন (O3) গ্যাসের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি বলে এই স্তরকে ওজোন স্তর (২০-৫০ কিমি) বলে। ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি এই স্তরে শােষিত হয় বলেই এই অংশে উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়।
(iii) এই স্তরে বায়ুপ্রবাহ, জলীয়বাষ্প, মেঘ প্রভূতি থাকে না বলে একে শান্তমণ্ডল বলে। দ্রুতগামী জেটপ্লেনগুলি স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরেই যাতায়াত করে। তবে অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে শীতকালে মাঝে মাঝে সামান্য মেঘের সঞ্চার ঘটে। এক মৌক্তিক বা শুক্তি বলে।
(iv) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরের ঊর্ধ্বে কিছুদুর পর্যন্ত উষ্ণতা বাড়ে না বা কমেনা। স্থিতিবস্থা বিরাজ করে, একে স্ট্রাটোপজ (Stratopause) বলে।

(III) মেসােস্ফিয়ার (Mesosphre): স্ট্রাটোপজের উর্ধ্বে ৮০ কিমি পর্যন্ত অংশকে মেসােস্ফিয়ার বলে। মেসােস্ফিয়ার স্তরের বৈশিষ্ট্য -
(i) এই স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা কমে যায়।
(ii) এই অংশে বায়ুর চাপও অনেক কমে যায়।
(iii) মেসােস্ফিয়ার বায়ুমণ্ডলের শীতলতম স্তর।
(iv) উল্কাপিণ্ড এই স্তরেই পড়ে ছাই হয়।
(v) বায়ুর প্রবল ঊর্ধ্বগামী পরিচলন স্রোতের প্রভাবে এই স্তরে জলীয় বাষ্প প্রবেশ করে ও অতি হালকা মেঘের সৃষ্টি হয়।
(vi) মেসােস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বাংশে কিছুদুর পর্যন্ত উষ্ণতার পরিবর্তন হয় না, একে মেসােপজ (Mesopause) বলে।


(IV) থার্মোস্ফিয়ার বা আয়নােস্ফিয়ার (Thermosphere): মেসােপজের উর্ধ্বে ৫০০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল থার্মোস্ফিয়ার বলে। এই স্তরের নীচের অংশের বায়ু আয়নিত অবস্থায় থাকে বলে একে আয়নােস্ফিয়ার (Ionosphere) বলা হয়। থার্মোস্ফিয়ারের স্তরের বৈশিষ্ট্য -
(i) এখানে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা অতি দ্রুত হারে বৃদ্ধি পায় এবং ৫০০ কিমি উচ্চতায় উষ্মতা হয় প্রায় ১২০০° সেন্টিগ্রেড। এখানে বায়ুর ঘনত্ব অত্যন্ত কম এবং বায়ুমণ্ডল প্রধানত আণবিক ও পারমাণবিক নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন দ্বারা গঠিত বলে অতিবেগুনি ও রঞ্জন (X-ray) রশ্মি এই স্তরে শােষিত হয়। ফলে উষ্মতা দ্রত হলে বাড়ে।
(ii) সূর্য থেকে আগত রঞ্জন, গামা, অতিবেগুনি রশ্মি প্রভৃতি বায়ুমণ্ডলের পরমাণু ভেঙে ঋণাত্মক ইলেকট্রনের বহিষ্কার ও ধনাত্মক বস্তুকণার সৃষ্টি করে (আয়নিত করে)। তাই এই স্তরের নাম আয়ােনােস্ফিয়ার
(iii) বস্তুকণা আয়নিত অবস্থায় আছে বলে রেডিও তরঙ্গ থার্মোস্ফিয়ার স্তর থেকেই প্রতিফলিত হয়।
(iv) এই স্তরে বায়ুকণা পরমাণুতে পরিণত হয় এবং শক্তিশালী ইলেকট্রন ও প্রােটনের সংস্পর্শে এক ধরনের আলােক রশ্মি বেরিয়ে আসে। সুমেরুতে তা অরােরা বেরিওলিস বা সুমেরু প্রভা এবং কুমেরুতে অরােরা অস্ট্রিয়ালিস বা কুমেরু প্রভা নামে পরিচিত। একে মেরুজ্যোতি বলা হয়।

(V) এক্সোস্ফিয়ার বা তাপমন্ডল (Exosphere): উর্ধ্বে ৫০০-৭৫০ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এক্সোস্ফিয়ার স্তরের বৈশিষ্ট্য -
(i) এই স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা বাড়ে (১২০০°-১৬০০° সেন্টিগ্রেড)।
(ii) এই অংশে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসের প্রাধান্য বেশি।

(VI) ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বা চৌম্বকমন্ডল (Magnetosphere): এক্সোস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বাংশকে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বলে। ইহাই বায়ুমণ্ডলের উর্ধতম স্তর তথা পৃথিবীর শেষ সীমা। ইলেকট্রন ও প্রােটন দ্বারা গঠিত চৌম্বকক্ষেত্র বায়ুমণ্ডলকে বেষ্টন করে আছে বলেই এই স্তরকে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বলা হয়।
Advertisement