Women in Mauryan Society - মৌর্য যুগের নারীর সামাজিক অবস্থান

- October 28, 2019
মৌর্য যুগের সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য প্রধানত গ্রীক উপাদান, অর্থশাস্ত্র, অশােকের লেখ, পাণিনি ও পতঞ্জলির ব্যাকরণ গ্রন্থ, দুইটি মহাকাব্য, বৌদ্ধ, জৈন ও সংস্কৃত সাহিত্য, বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্র ইত্যাদি থেকে পাওয়া যায়। এই উপাদানগুলি সমাজ বিবর্তনের বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত হওয়ায়, সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে মিশ্র ধারণা তুলে ধরেছে।
Women of the Mauryan age
মৌর্য যুগের ধর্মীয় শাস্ত্রতে দেখা যায় যে, বৈদিক যুগের প্রথমদিকে নারীদের যে উপনয়ন সংস্কার হত, তা কালক্রমে বন্ধ হয়ে গিয়েছে, বেদপাঠের অধিকারও তারা হারিয়েছেন। ধর্মশাস্ত্রসমূহের বিধান অনুযায়ী বিবাহই ছিল নারীদের একমাত্র সংস্কার। সাধারণত পিতা অথবা তার অবর্তমানে অন্য অভিভাবক কন্যার বিবাহের আয়ােজন করতেন। পাত্র পাত্রীকে একই বর্ণের, কিন্তু ভিন্ন গােত্র এবং প্রবরের হতে হত। অভিভাবক কন্যার বিবাহ দিতে না পারলে, কিংবা কন্যা যদি অভিভাবকহীন হতেন, তাহলে মনু এবং মহাভারত অনুসারে সেই কন্যা স্বয়ং পাত্র নির্বাচন করতে পারতেন। বৌধায়ন স্মৃতিতে বলা হয়েছে যে, প্রাপ্তবয়স্কা কন্যা তিন বছর পিতার শাসনের অপেক্ষা করবেন, এরপর নিজেই উপযুক্ত স্বামী গ্রহণ করতে পারবেন। বােধায়ন ধর্মসূত্র বিবরণকার গোবিন্দ স্বামী এটিকে স্বয়ম্বর অধিকার বলেছেন। যেখানে গুরুজন কন্যাকে বিবাহ দিতে সচেষ্ট নন, সেখানে বোধায়ন ধর্মসূত্র কন্যাকে শুধু স্বামী নির্বাচনের অধিকারই দেয়নি, সুযােগ্য স্বামী না পাওয়া গেলে অল্পগুণ সম্পন্ন স্বামীবরণ করার অধিকারও দিয়েছেন। অথচ এই বোধায়ন ধর্মসূত্রই কৌমারে পিতাকে, যৌবনে স্বামীকে, বৃদ্ধাবস্থায় পুত্রকে নারীর অভিভাবকত্ব দিয়েছেন এবং নারীকে স্বাধীনতা না দেবার ব্যাপারে মনুর সাথে সহমত পােষণ করেছেন।

মহাকাব্যদ্বয়ে মেয়েদের প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিবাহের পচিয় পাওয়া যায়। ক্ষত্রিয় রমণী দ্রৌপদী, কুন্তী, উত্তরা এবং ব্রহ্মণ রমণী দেবযানী তার অন্যতম উদাহরণ। তবে ধর্মশাস্ত্রসমূহে মেয়েদের বিবাহযােগ্য বয়স কমিয়ে আনা হয়েছে, এমনকি বয়ঃসন্ধির পূর্বেই বিবাহের কথা বলা হয়েছে। মনুস্মৃতিতে এর সমর্থন আছে। তবে মনু বলেছেন যে, সুযােগ্য পাত্র না পেলে কন্যার আজীবন পিতৃগৃহে বাস করা সমীচিন। যাজ্ঞবল্কা যৌবনলাভের পূর্বে মেয়েদের বিবাহের কথা বলেছেন। অন্যদিকে পরকালের নারদস্মৃতিতে প্রাপ্তবয়স্কা নারীদের বিবাহের কথা বলা হয়েছে। বৌদ্ধ সাহিত্যেও এ ব্যাপারে সমর্থন পাওয়া যায়। অনেকের মতে, স্মৃতিশাস্ত্রে অল্প বয়েসে মেয়েদের বিবাহের যে বিধান দেওয়া হয়েছে তা শুধু ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে প্রযােজ্য। মনুসংহিতাতে বলা হয়েছে, যে নারীর পক্ষে বিবাহ হল উপনয়ন, পতিগৃহে বাস হল গুরুগৃহে বাস এবং পতিসেবা হল বেদাধ্যয়ন।

মনু এবং যাজ্ঞবল্ক্য প্রাচীন স্মৃতিশাস্ত্র অনুসরণ করে ৮ রকম বিবাহের কথা বলেছেন - ব্রাহ্মা, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য, গান্ধর্ব, আসুর, রাক্ষস ও পৈশাচ বিবাহ। এই ৮ রকম বিবাহের মধ্যে প্রথম ৪ রকম বিবাহকে ধর্মীয় বিবাহ মনে করা হত। বিবাহ বিচ্ছেদের সুযােগ এই বিবাহগুলিতে ছিল না। গান্ধর্ব বিবাহের একটি বিশেষ রূপ ছিল স্বয়ম্বর প্রথা। মহাকাব্যদুটিতে এর কয়েকটি উদাহরণ আছে যেমন সাবিত্রী-সত্যবান, নল-দময়ন্তি ও রাম-সীতার বিবাহ। নিয়ারবাসের বক্তব্যে স্বয়ম্বরের আভাস আছে। অবদান শতকের কাহিনীকেও এক ধরনের স্বয়ম্বরের উল্লেখ আছে। এ থেকে তখনও বিবাহের ক্ষেত্রে নারীরা কয়েকটি ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা পেত।

নারীদের দৈহিক পবিত্রতাকে ক্রমশ খুব বড় করে দেখা হত বলে বিধবাদের পুনর্বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ অথবা নিয়ােগ প্রথাকে উৎসাহিত করা হত না। তবে এগুলি একেবারে অপ্রচলিত হয়ে পড়েনি। নিয়ােগ প্রথার অনেক উদাহরণ মহাভারতে আছে। কোন কোন ক্ষেত্রে বিধবার পুনর্বিবাহ স্বীকার করে নিলেও মনু ও যাজ্ঞবল্ক্য, বিধবা-বিবাহের অনুকূলে মত দেননি, যদিও কৌটিল্য, পরাশর স্মৃতি, অগ্নিপুরাণে বিধবার দ্বিতীয় বিবাহের পক্ষে অনুমােদন আছে। মহাভারত ও গ্রীক লেখকদের রচনায় বিধবাদের সহমরণ প্রথার উল্লেখ আছে। তবে স্মৃতিশাস্ত্রে এই প্রথা অনুমােদিত নয়। মনু স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবাকে আত্মসংযমী ও শুদ্ধ জীবন যাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন। মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকারের কথাও কৌটিল্য বলেছেন। স্বামী বর্তমানে স্ত্রীর দ্বিতীয় বিবাহ কোন কোন ক্ষেত্রে শাস্ত্রকাররা অনুমােদন করেছেন। মনু একস্থানে বলেছেন যে, কোন নারীর প্রথম স্বামীর সন্তান ও দ্বিতীয় স্বামীর সন্তান থাকলে, প্রথমােক্তগণ প্রথম স্বামীর এবং দ্বিতীয়ােক্তগণ দ্বিতীয় স্বামীর সম্পত্তির অধিকারী হবে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না থাকলে উভয়ের মধ্যে আইনত বিবাহ বিচ্ছেদের কথাও বলেছেন।

স্মৃতির যুগে মনুর সময়ে নারীদের শিক্ষার অধিকার অনেকটা সংকুচিত দেখা যায়। মনু বলেছেন নারীদের বেদমন্ত্র দেওয়ার প্রয়ােজন নেই। বৈবাহিক বিধিই তাদের বৈদিক সংস্কার। যজ্ঞে নারীরা চালক হতে পারেন না বা তারা যজ্ঞে আহুতি দিতে পারেন না। তবে মনু অন্যত্র বলেছেন পুত্রের শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি কন্যাকেও একইরকম শিক্ষা দিতে হবে – “কন্যাপ্যেবং পালনীয়া শিক্ষণীয়াতিযত্নতঃ" এবং অতি যত্নে পালন করতে হবে। মহাভারতে নারীদের কোথাও কোথাও 'অশাস্ত্রা' বললেও বহুস্থানে নারীদের শিক্ষাদীক্ষার কথা বলেছেন। মহাভারতে দ্রৌপদীকে 'পণ্ডিতা' আখ্যা দেওয়া হয়েছে। শান্তিপর্বে তাকে ধর্মজ্ঞা ও ধর্মলিনী আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কুন্তী বৈদিক মন্ত্রে দীক্ষালাভ করেছিলেন। ধর্মপ্রাণ গান্ধারীর নীতিশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান ছিল। তাছাড়া শাণ্ডিলী, অরুন্ধতী, সুলভা, গৌতমী প্রমুখের কথা পাওয়া যায়, যারা জ্ঞানে, ধর্মে ও তপস্যায় অধিকারিনী ছিলেন। ক্ষত্রিয়কন্যা বিদুলাও বহু বেদ অধ্যয়ন করে তপস্বিনী হয়েছিলেন। মহাভারতের উদ্যোগপর্বে ১৩৩ থেকে ১৩৬ পর্যন্ত পুরো চারটি অধ্যায়েই তার বীরবাণী রয়েছে। বৌদ্ধ এবং জৈন গ্রন্থে ব্রহ্মবাদিনী নারীদের উল্লেখ আছে। গানের সংকলন, থেরিগাথা ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীদের রচনা। জৈনগ্রন্থে কৌশাম্বী রাজকন্যা জয়ন্তীর কথা আছে, যিনি ধর্ম ও দর্শনচর্চার জন্য আজীবন অবিবাহিত ছিলেন। সংস্কৃত কাব্য ও নাটক রচয়িতা হিসাবেও নারীরা ছিলেন। তৎকালীন সংস্কৃত সাহিত্যে কিছু নারী চরিত্র আছে, যারা উচ্চশিক্ষিত ছিলেন ও সঙ্গীত রচনা করতেন।
Advertisement

নারীদের ধর্মীয় অধিকার ছিল। অশােকের লেখ থেকে নারীদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের কথা জানা যায়। একটি লেখতে অশােকের দ্বিতীয়া পত্নী কারুবাকির ধর্মীয় দানের উল্লেখ আছে। সংঘমিত্র মহেন্দ্রের সাথে সিংহলে ধর্মপ্রচারে গিয়েছিলেন। সাতবাহন বংশের বিধবা রানী গৌতমী বলশ্রীর ধর্মীয় জীবনের কথা নাসিক প্রশস্তিতে পাওয়া যায়। মহাভারতের যুগে সাধনার বিভিন্ন পথে নারীদের গতিবিধি দেখা যায়। পুরুষদের মতাে নারীরা সংসারধর্ম পালন করে বানপ্রস্থ অবলম্বন করতে পারতেন। শেষজীবনে ধৃতরাষ্ট্রের সাথে গান্ধারী বনে গিয়ে তপস্যা করেন। সত্যভামা প্রভৃতি শ্রীকৃষ্ণের পত্নীগণ বানপ্রস্ত আশ্রয় করেছিলেন। নারীদের এই তপস্যার অধিকার জৈন ও বৌদ্ধদের মধ্যেও অব্যাহত ছিল। থেরীগাথায় বহু নারীর নানা বিষয়ে গভীর সাধনা ও বিদ্যার পরিচয় মেলে।

কয়েকটি ক্ষেত্রে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ করতেন। রাজমহিষীগণ তাদের নাবালক পুত্রদের হয়ে রাজকার্য পরিচালনা করছেন এই দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সাতবাহন বংশীয় নায়নিকার নাম এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। নারীদের সামরিক ঐতিহ্যও একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়নি। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ সালে মেগেসা অবরােধকালে ভারতীয় নারী যোদ্ধার কথা কাটিয়াস উল্লেখ করেছেন। মেগাস্থিনিস খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের নারী রক্ষিবাহিনীর কথা বলেছেন। আর্যশাস্ত্রে এই বর্ণনার সমর্থন পাওয়া যায়।

যাইহােক প্রাচীন বৈদিক যুগে নারীদের যে কিছু অধিকার ছিল , তা মৌর্য যুগে খর্ব হয়। স্মৃতিশাস্ত্রসহ বিশেষত মনুস্মৃতিতে তার নির্ভুল প্রমাণ পাওয়া যায়। নারীর স্বাধীন সত্তা স্বীকার করা হয়নি। তাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তথা পরিবারের অধীন করা হয়। নারীদের প্রধান দায়িত্ব ছিল বিবাহ, স্বামী সেবা এবং সন্তান পালন। জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও নারীদের ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে ঠিকই তাবে তা সামগ্রিকভাবে নারী সম্পর্কে পুরুষ প্রধান সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তিত করতে পারেনি।
Advertisement