Women in Christianity - খ্রিস্টান ধর্মে নারীর অবস্থান ও মর্যাদা

- October 27, 2019
অনেকের মতে বাইবেলে মহিলাদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আধুনিক যুগে অনেক নারী ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে একটি নূতন দৃষ্টিকোণ থেকে খ্রিস্টধর্মশাস্ত্রকে পাঠ করেছেন ও বিশ্লেষণ করেছেন। তারা দেখিয়েছেন যে, শাস্ত্র যেখানে যেখানে মহিলাদের মর্যাদা দিয়েছে, খুব সুপরিকল্পিতভাবে কিছু স্বার্থান্বেষী পুরুষ, গীর্জার পঠন পাঠন থেকে বাইবেলের সেই অংশগুলিকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ক্যাথলিক ক্ষেত্রে এই প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। বিশিষ্ট খ্রিস্টধর্ম গবেষক King (1998) মন্তব্য করেছেন যে New Testament পাঠ করলেই বােঝা যায় যীশু খ্রিস্টের একেবারে আদি ভক্তদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন মহিলা। যেই মহিলাগণ যীশুকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলেন মেরী ম্যাগডালিন, জোয়ানা, এবং সুজানা।
christian religious women
যীশু যেখানেই গমন করেছেন, মহিলাদের দ্বারা সম্মানিত হয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে এবং বৃহত্তর সামাজিক পটভূমিতে, নারীসমাজের সঙ্গে কথােপকথনের মাধ্যমে তার বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান সঞ্চয় হয়েছিল। এমনকি মৃত্যুর পরও তিনি নারীসমাজে সম্মান অর্জন করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে খ্রিস্টিয় প্রথম শতকে মহিলাদের অবদান ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ে মহিলাগণ ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। Stark তার গবেষণায় (1996) দেখিয়েছেন যে আদি উপাদানগুলি পাঠ করে জানা যায় যে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ঘটনা পুরুষদের থেকে মহিলাদের মধ্যে অধিকতর ছিল। অনেক নারী তাদের স্বামী বা ভ্রাতার সঙ্গে স্থানান্তরে গমন করে মিশনারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই সমস্ত মহিলাদের অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাদের কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। নানা অত্যাচার করা হয়েছিল, কখনও বা হত্যাও করা হয়। পল, যিনি যীশুর প্রধান বারজন অনুগামীর অন্যতম, খ্রিস্টিয় প্রথম শতকের মাঝামাঝি কিছু পত্রে উল্লেখ করেছেন যে খ্রিস্টধর্মের আদি পর্বে মহিলাগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এমনকি গীর্জাও স্থাপনের পেছনে তাদের অবদান আছে। রােমান দুনিয়ায় খ্রিস্টধন অনুমােদন পায়নি। ঐ সময়ে ঐ সমস্ত মহিলাগণ নিজেদের গৃহকে প্রার্থনার স্থান হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছেন। নিউ টেষ্টামেন্টে এমন অনেক উদাহরণ আছে যে মহিলাগণ প্রার্থনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

খ্রিস্টধর্মে আদিপর্বে এবং মধ্যযুগে মহিলাদের অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই ধর্মে মহিলাদের ভূমিকা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর একটি কারণ সম্ভবতঃ খ্রিস্ট ধর্মবলম্বীদের আধুনিক যুগে অত্যাচারিত হতে হয় না। তবে একটি দুঃখজনক প্রবণতা আজকাল দেখা যাচ্ছে, যেই সমস্ত দেশে খ্রিস্টানগণ সংখ্যালঘু, সেখানে মাঝে মধ্যে খ্রিস্টানদের সেবামূলক কাজে নিযুক্ত খ্রিস্টান মহিলাগণ আছেন। অন্যান্য ধর্মের উগ্র মৌলবাদীদের হাতে অত্যাচারিত হতে হচ্ছে। আজকাল গীর্জা পরিচালনার ক্ষেত্রে মহিলাদের ভূমিকা উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এমনকি প্যাস্টর (Pastors) এবং চাপলেইন (Chaplain) পদও তা অলংকৃত করছেন। কেউ কেউ একে গত কয়েক দশকের নারীবাদী আন্দোলনের প্রভাব হিসেবে দেখছেন।

কারও কারও মতে খ্রিস্টধর্ম সমাজে নারীদের উপর পুরুষের প্রভূত্বকে ত্বরান্বিত করে। অনেক আধুনিক মহিলা মনে করেন যে গতানুগতিক সমাজে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে দেখা হয়। ওঁদের সম্বন্ধে পুরুষদের গতানুগতিক তথা অযৌক্তিক কিছু ধারণা তাদের সমাজে একটি প্রান্তিক অবস্থানের দিকে ঠেলে দেয়। অযৌক্তিক ধারণার বশবর্তী পুরুষ সমাজ মহিলাদের আশা আকাঙ্খা বা সমস্যা, সম্ভাবনা ও ক্ষমতাকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। Doug Groothuis মনে করেন যে খ্রিস্টানদের এই ধরনের অভিযােগ সম্বন্ধে সংবেদনশীল হওয়া উচিৎ। তার মতে ঈশ্বর সকলকে সমানভাবে শ্রদ্ধা করতে শেখান (Genesis 1: 28) তা সত্ত্বেও খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে উপরােক্ত অভিযোগ আনা হয়েছে। অনেক অ-খ্রিস্টান নারীবাদী অভিযােগ করেন যে বাইবেল এর ঈশ্বর হল পুরুষ এবং সেক্ষেত্রে পুরুষদের সঙ্গে ঈশ্বরের অধিকতর সাদৃশ্য থাকবে। অর্থাৎ ঈশ্বর যেভাবে তার সৃষ্টির উপর কর্তৃত্ব জাহির করেন, পুরুষ মানুষও সেইভাবে মহিলাদের উপর নিজ কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে। এই সমস্ত অভিযোগ খণ্ডনে উদ্যোগী Doug ধর্মশাস্ত্র ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে বাইবেলের ঈশ্বর কোন ভাবেই পুরুষ নন। এই ঈশ্বরের কোন লিঙ্গ নেই (John 4: 24)।

Doug বলছেন যে সেই ধরনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাইবেল আবির্ভূত হয়েছিল সেখানে মহিলাদের তুলনায় পুরুষের কর্তৃত্ব অধিক ছিল। তবে তার অর্থ এই নয় যে বাইবেল নারীর উপরে পুরুষের কর্তৃত্বকে বৈধতা দিতে চেয়েছিল। যীশু কখনই একটা পুরুষ শাসিত সমাজের কথা ভাবেননি। তার অনুগামীদের অবাক করে দিয়ে যীশু মহিলাদের ধর্মশাস্ত্র শিক্ষা দিয়েছিলেন। (Luke 10: 38-42)। নিজের নবজাগরণের পরে যীশু আবির্ভূত হয়েছিলেন মেরীর সম্মুখে এবং পৃথিবী পরিবর্তনের যে ঘটনা যীশু ঘটিয়েছিলেন তার সাক্ষী রেখেছিলেন মেরীকে। এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা কারণ সেই যুগে মহিলাদের সাক্ষ্যদানের মর্যাদা দেওয়া হতাে না (John 20:17-18; Matthew 28: 5-10, Doug এর প্রবন্ধে উল্লেখিত) নিজের বক্তব্যের সমর্থনে Doug একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি উদ্ধৃত করেছেনঃ "There is neither Jew nor Greek, slave nor free, male not fermale, and you are all one in Christ Jesus" (Gulatians 3: 26-28)।
Advertisement

নােবেল পুরস্কার প্রাপ্ত মাদার টেরেসা কলকাতাকে কেন্দ্র করে তার সমাজ সেবামূলক কার্যকলাপ বজায় রেখেছিল। তিনি বহু দুস্ত তথা নিরাশ্রয় শিশুকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। অনাথ শিশুদের ধর্মান্তরিত করার অভিযােগ তার বিরুদ্ধে যারা এনেছিলেন তারা মাদার টেরেজার সমাজসেবামূলক কার্যকলাপের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেননি। ভারতবর্ষের মতাে দরিদ্র দেশে, যেখানে শিক্ষার আলাে সর্বত্র পৌঁছায়নি সেখানে বিভিন্ন শিক্ষা ও সেবাপ্রতিষ্ঠানে বহু খ্রিস্টান মিশনারী মহিলা শিক্ষা ও সেবার মাধ্যমে সমাজে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুমিত সরকার, তনিকা সরকার প্রমুখ তাদের গ্রন্থ Christian Conversation এ দেখিয়েছেন যে আমাদের দেশের অনেক সেবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় মিশনারীদের দ্বারা। অনেক প্রথম সারির বালিকা বিদ্যালয় পরিচালিত হয়ে থাকে মিশনারী মহিলাদের দ্বারা। সুমিত সরকার যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে সমস্ত খ্রিস্টান সমাজসেবীদের ধর্মান্তরকরণের অধিকার থাকে না। যেমন কয়েক বছর আগে উড়িষ্যায় ধর্মান্তরকরণের অভিযােগ যেই অস্ট্রেলিয় সমাজসেবীকে এক ধর্মীয় মৌলবাদী পুড়িয়ে মেরেছিল, তার ধর্মান্তরকরণের অধিকারই ছিল না। তার দোষ ছিল যে, তিনি বঞ্চিত কুষ্ঠরোগীদের সেবায় নিয়োজিত ছিল। তার স্ত্রী একজন নিরলস সমাজসেবী। তিনি তার স্বামীর হত্যাকারীকে ক্ষমা করেছিলেন। কতটা মহানুভবতা থাকলে একজন মহিলা এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে তা আমরা অনুমান করতে পারি।

ভারতের গ্রামাঞ্চলে আদিবাসী মহিলাদের মধ্যে এবং দরিদ্র বঞ্চিত অন্যান্য মহিলাদের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য চেতনা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে খ্রিস্টান মিশনারীদের বিশেষ ভূমিকা ছিল। ১৯ শতকের বাংলায় ভদ্রমহিলাদের অন্দরমহলে শিক্ষার যে ব্যবস্থা ছিল তাতে খ্রিস্টান মহিলাদের ভূমিকা সকলের জানা আছে। M. Borthwick তাঁর Changing Role of Women in Colonial Bengal গ্রন্থে এই বিষয়ে আলােচনা করেছেন। এই শিক্ষিত খ্রিস্টান মহিলাগণ তৎকালীন সমাজে হিন্দু ও মুসলমান সমাজসেবীদের শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবনে সহায়ক হয়েছিলেন। এখানে একটি কথা মনে রাখা দরকার যে ১১ শতকের বঙ্গদেশে উপরােক্ত খ্রিস্টন মহিলাগণ যারা অন্দরমহলে শিক্ষয়ত্ৰী হিসেবে কাজ করতেন তাদের অনেকক্ষেত্রে সন্দেহের চোখে দেখা হত। মনে করা হত যে অন্দরমহলে প্রবেশের সুযােগ পেয়ে তারা ভারতীয় মহিলাদের শিক্ষিত করার সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টান ধর্মের প্রচারকার্য করতে পারেন।

গ্রন্থপঞ্জী:
1. Douglas R. Groothuis, Unmasking the New Age: Is there a new religious movement trying to transform society?(Inter Varsity Press,1986)
2. Rebecca Merrill Groothuis, Women caught in the conflict: the culture war between traditionalist and feminism (Baker books, 1994)
3. Rebecca Merrill Groothuis, Good news for women, (Baker books, 1997)
4. https://ivpress.com/Groothuis/Doug/archives/000134.php
5. Alister McGrath, "In what way can Jesus Be a Moral Example for Christians?" Journal of Evangelical Theological Society, vol. 34, no. 3 (September 1991) p. 295.
6. Meredith Borthwick, The Changing Role of Women in Bengali, 1849 1905, Princeton, 1984.
Advertisement