Advertise

মধ্যযুগে ভারতের নারী শিক্ষা কেমন ছিল?

মধ্যযুগে অর্থাৎ ইসলাম আগমনের পর বিশেষত উচ্চাংশের মেয়েদের জন্য পর্দা প্রথা প্রবলতর রূপ ধারণ করে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং অ-ইসলাম জনগােষ্ঠী উভয় ক্ষেত্রের নারীরা এর শিকার হন। ফলে কার্যত শিক্ষার অঙ্গণ থেকে নারীরা বহু দূরে নির্বাসিতের জীবনযাপন করেন। ইসলাম ধর্মের নিয়মানুযায়ী বিশুর ৪ বছর, ৪ মাস, ৪ দিনে উদযাপিত হয় বিসমিল্লা অনুষ্ঠান। অর্থাৎ সেদিন সে প্রথম পবিত্র কোরানের আয়াত আব্বৃতি করে তার বিদ্যাচর্চার সূচনা হয়। এই পর্বে গৃহে শিক্ষক এসে শিশুকে কোরান শরিফ মুখস্ত করাতে শুরু করেন। মেয়েরাও একই প্রথাই ওই দিন শিক্ষা শুরু করে। এই সময় আরবী ভাষায় তারা কোরান আবৃত্তি করতে শেখে। শিক্ষক বা শিক্ষিকার নিজের জ্ঞানের উপর নির্ভর করে, যে তিনি কোরানের যে আয়াত গুলি মুখস্ত করাচ্ছেন তার অর্থ শিশুটিকে বলবেন কিনা। ছেলে মেয়েদের এই পর্বে আরবী ভাষায় পবিত্র গ্রন্থ এবং পার্সি ভাষায় কিছু সাধারণ জ্ঞান এবং নীতিকথা শিক্ষামূলক গল্প কবিতা শেখানো হয়।
মধ্যযুগে ভারতের নারী শিক্ষা কেমন ছিল
গৃহের শিক্ষা শেষে ছেলেরা মক্তব বা মৌলভীর গৃহে বিদ্যাচর্চার জন্য যায়, কিন্তু মেয়েরা একটু বড়ো হলেই পর্দা প্রথায় গৃহে আবদ্ধ হয়ে পড়ে বলে বাইরে শিক্ষার জন্য যেতে পারে না। এবং শুরুতে বৃদ্ধ শিক্ষকের কাছে পাঠ শুরু করলেও অল্পদিন পরেই মেয়েদের জন্য বাড়ীতে ওস্তানীরা আসতেন। এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এদের জ্ঞান কোরানের নির্দিষ্ট কয়েকটি অংশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতো। ফলে মেয়েরা যদিও বা অঙ্গ বিস্তর পড়তে শেখে কিন্তু মােটেই লিখতে শেখে না। প্রথম যে ১৮৪৫ সালে মুসলিম বালিকা বিদ্যালয়ে এ কথা জানা যায় তা মধ্যযুগের ঘটনা নয়, অবশ্যই সরকারী উদ্যোগে, এবং দিল্লীতে অবস্থিত ছিল মােট ৬টি বিদ্যালয়ে মােট ছাত্রী সংখ্যা ছিল ৪৬ জন। দিল্লীর একটি বিশেষ অঞ্চলে পাঞ্জাবী মহিলাদের দ্বারা এই বিদ্যালয়গুলি পরিচালিত হয়েছে। খুবই অল্প সংখ্যক মহিলা বা একেবারে উচ্চ বংশীয়াদের কেউ কেউ মধ্যযুগেও শিক্ষার সুযােগ পেয়েছিলেন বটে কিন্তু সেগুলি ব্যতিক্রমি চরিত্র ও ঘটনা। কিন্তু নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে একটু অন্য কাহিনী শােনা যায় মুঘল ভারতের জীবনযাপনে।

মুঘল যুগের শিক্ষা ব্যবস্থায় দুই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল। (ক) আরবি-ফারসি শিক্ষা ব্যবস্থা, (খ) সংস্কৃত শিক্ষা ব্যবস্থা যার মধ্যে দ্রাবিড় শিক্ষা-পদ্ধতি ছিল। আরবি-ফারসি শিক্ষা ব্যবস্থা ত্রিস্তর ব্যবস্থা যার প্রথম স্তর মক্তব বা দবিস্থান যেখানে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হত। দ্বিতীয় স্তরটি হল মাদ্রাসা যেখানে সামান্য উচ্চশিক্ষা কিন্তু মূলত ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হত। এবং উচ্চ শিক্ষার অর্থাৎ ইনশারা ও সিয়াক লিখন শিক্ষা, হিসাব শাস্ত্র, ফরমান, নানাবিধ হুকুমের মুসাবিদা করা — ইত্যাদি বিষয় অর্থাৎ আমলা তৈরি করার জন্য যা লাগত সেগুলি শেখানাে হত ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে। নারীরা যেহেতু আমলা হতেন না এবং এই স্তরের শিক্ষার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির গৃহে যেতে হত সুতরাং উচ্চশিক্ষার প্রয়ােজনও তাদের হত না এবং এ শিক্ষার অঙ্গণে মুঘল যুগেও নারীদের অবস্থান ছিল না। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা অর্থাৎ মক্তব স্তরে ছাত্রীদের সংখ্যা ছাত্রদের চেয়ে বেশী ছিল, এমন প্রমাণ দিয়েছেন শিরিন মুসভি। ১৪৬৮ -১৪৬৯ সাল নাগাদ রচিত একটি শব্দার্থকোষে মিস্তাউল ফজল শাহবাদীতে মুদ্রিত একটি ক্ষুদ্র চিত্রের সাক্ষ্যে বোঝা যায় যে মক্তব ছাত্রের পাশে বসে ছাত্রীও অয়তি লিখতে শিখছে উল্টোদিকে বসা জনৈক পুরুষ শিক্ষকের কাছ থেকে।

ড: মুসভি এ প্রসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। (A) বালিকাটি নিশ্চিতভাবে আরবী লিখতে চেষ্টা করছিল না, হয় ফরাসি অথবা সে যুগের কোন ভাষা লিখতে চাইছিল। অর্থাৎ মুলমানদের মধ্যে নারীদের লিখতে শেখা নিষিদ্ধ বলে যে সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে তা সঠিক নয়। (B) চিত্রের বালিকাটি শাহজাদা নয়, মধ্যশ্রেণীর মেয়ে। শাহজাদীদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষিত ছিল। কিন্তু এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ প্রয়ােজনীয়। হুমায়ন কন্যা গুলবদন বেগম যে কেবল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিকথা লিখেছিলেন তাই নয় তার একটি অসাধারণ সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ছিল যেটি রাজকীয় গ্রন্থাগারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এবং সে যুগে নিয়ম ছিল প্রত্যেকের প্রতিটি গ্রন্থের দুটি করে কপি তাকে পাঠাতে হত। একটি তার নিজের পড়ার জন্য, অন্যটি সাধারণের ব্যবহার্যে গ্রন্থাগারে রাখার জন্য। এ থেকে বােঝা যায় যে তিনি নিজেই কেবলমাত্র বিদ্যোৎসাহী ছিলেন তাই নয়, সর্বজনের মধ্যে বিদ্যা তথা জ্ঞানচর্চায় উদ্যোগী ছিলেন। তার জীবনের আরও একটি কৌতুহলপ্রদ বিষয় হচ্ছে এমন একজন রুচিশীলা, অতি শিক্ষিতা, সাহিত্যপ্রেমী শাহজাদীর স্বামী খুব ভালাে সৈনিক হলেও নিরক্ষর ছিলেন। এই যুগে উস্তানীরা মধ্য বা উচ্চমধ্য শ্রেণীর বালিকাদের গৃহে গিয়ে শিক্ষা দিতেন কিন্তু সাধারণ শ্রেণীর মহিলাদের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার এবং কাব্য ও কলাবিদ্যা চর্চার প্রচলন ছিল। কোরান পাঠ যেহেতু পবিত্র কাজ তাই তা সকল শ্রেণীর নারীর জন্যই অবশ্য করণীয় বলে বিবেচ্য হয়েছে।

মুঘলযুগের মহিলারা প্রধানতই কবি ও চিত্রকর হতেন। এক্ষেত্রে বদায়ুনী ও আবুল ফজলের রচনা থেকে জানা যায় যে সমাজের সব শ্রেণীর মহিলাদের মধ্যেই এই গুণ ছিল। এমনকি বদায়ুনী যাকে সকল মহিলা কবির মধ্যে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিলেন এবং তার রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন সেই নেহানি একদম সাধারণ পরিবার থেকেই এসেছিলেন। মুঘল যুগে বহু নারীই আপন স্বাক্ষর বিশিষ্ট ছবি রেখে গেছেন। যাদের মধ্যে অন্যতম নাদরা বানু যাঁর আঁকা অনেক ছবিই জাহাঙ্গীরের খুবই বিখ্যাত আতেলিয়ারে আছে।

মুঘলযুগে গুজরাট ও পশ্চিমাঞ্চলে মহিলারা আইনি ব্যক্তি হিসাবে কাজ করেছেন। অর্থাৎ তারা সম্পত্তি কেনা-বেচা, বন্ধক রাখা ইত্যাদি করেছেন, এমনকি সম্পত্তিকেন্দ্রিক বিবাদে কাজীর সামনে নিজেরাই আত্নপক্ষ সমর্থন করেছেন। অতএব তারা নিজেদের মান দস্তখত করেছেন এবং ক্ষেএ বিশেষে সাক্ষী হিসাবে দস্তখত করেছেন। কোন কোন ব্যবসা সংক্রান্ত বিবাদের নথি থেকে এমন জানা যায় যে, স্বামীর মৃত্যুর পর তার কোন অনুচর ব্যবসাটি হাতাতে চাইলে স্ত্রী ব্যবসাটিতে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন কারণ তিনি শিক্ষিত এবং বিদেশের ব্যবসা চালানাের কাজে পুরােপুরি দক্ষ। এলাহাবাদ, বিলগ্রাম ও অন্যান্য স্থান থেকেও প্রাপ্ত নথিতে মুসলমান নারীদের ভূমিদান গ্রহণের প্রমাণও পাওয়া যায়।

শিরিন মুসভি আরও একটি কৌতূহলােদ্দীপক বিষয়ের উল্লেখ করেছে। তিনি বলেছেন যে, “জাহাঙ্গীর একজন মহিলাকে সমস্ত মদদ-ই-মাশ জমি বা ভূমিদানের তত্ত্বাবধায়ক করেছিলেন, শুধু দান প্রক্রিয়ার দেখভালের জন্য নয়, দানযােগ্য ব্যক্তিদের মনােনয়নের জন্যও। এরকম একজন মহিলা কোনােভাবেই নিরক্ষর হতে পারেন না। তিনি যখন নথিপত্রের প্রক্রিয়াকরণ করছেন তখন তিনি নিশ্চয় হিসাব শাস্ত্র জানেন। তিনি কোন শাহজাদী নন, অভিজাত গোষ্ঠী থেকে আসেনি, সম্ভবত তিনি ছিলেন একজন অমুসলমান যিনি এসেছিলেন কায়স্থ পরিবার থেকে।

১৮২৩ সালের সিন্ধের একটি আদমশুমারী থেকে এই ধারার প্রমাণ মেলে। জানা যায় যে, বেশ কিছু নারী সিন্ধি লিখতে ও পড়তে পারতেন। যদিও তারা ফারসী পড়তে বা লিখতে পারেন না। বস্তুতপক্ষে, সিন্ধিলিপি আরবি লিপি হওয়ায় সিন্ধি লিপি জানলে কোরান জানা সম্ভব হয়। এছাড়া ১৯শ শতকের মালাবারে ৩১৯৬ মুসলমান পুরুষ পিছু ১১২২ জন মুসলমান বালিকা বিদ্যালয়ে যেত। সুতরাং মুসলমান পুরুষদের তুলনায় মুসলমান নারীদের মধ্যে স্বাক্ষরতার হার ৩৫ শতাংশ। দক্ষিণভারতে দেবদাসীদের স্বাক্ষর হওয়া আবশ্যক ছিল। আবার ১৮২৩ সালে বিশাখাপত্তনমে ৯৪ জন ব্রাহ্মণ ও ৭০ জন শুদ্ৰ নারী বিদ্যালয়ে যেতেন। অর্থাৎ বুকাননের যে বক্তব্য ছিল যে উচ্চশ্রেণীর নারীদের মধ্যে শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধা ছিল কিন্তু নিম্নবর্ণের নারীরা শিক্ষার বাইরে ছিলেন না — তা এক্ষেত্রে প্রযােজ্য ছিল না। অর্থাৎ মুঘল যুগে সর্বত্র এবং সব সময় নারীশিক্ষার ব্যাপক প্রসার হয়েছিল এমন সার্বিক ঘটনা প্রমাণ করা যাবে না। এক এক সময়ে এক এক অংশে নারী শিক্ষার এক এক প্রকার চিত্র ছিল।