Advertise

স্বরাজ্য দলের উৎপত্তি ও কার্যকলাপ

১৯২০ খ্রীষ্টাব্দের অসহযােগ আন্দোলনের সূচনা হয় এবং আইনসভা বর্জনের কর্মসূচী নেওয়া হয়। কিন্তু ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দে অসহযােগ আন্দোলনের অবসান হওয়ায় ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে হতাশা ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। খিলাফৎ আন্দোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির অবসান ঘটে এবং সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে। সরকারী দমনমূলক নীতির ফলে সক্রিয় ভাবে আন্দোলন পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্বরাজ্য দলের প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন দাশ এবং মতিলাল নেহেরু
এই অবস্থায় জাতীয় রাজনীতিতে গতিশীলতা অব্যাহত রাখার জন্য উপযুক্ত কর্মসূচী গ্রহণ করতে কংগ্রেস অপারগ হয়। গান্ধীজী সমাজ সেবামূলক কর্মসূচী গ্রহণের নির্দেশ দেন। কিন্তু অন্যদিকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মতিলাল নেহরু জাতীয় আন্দোলনের বিকল্প রূপে সংসদীয় কার্যকলাপ শুরু করার প্রয়ােজন অনুভব করলেন। দেশবন্ধু প্রস্তাব দিলেন যে আইনসভা বর্জন করে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করা প্রয়ােজন এবং আইনসভায় প্রবেশ করে সরকারী নীতির বিরােধিতা করতে হবে। তার মতে কংগ্রেসীদের উচিত আইনসভার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য স্বশাসিত প্ৰতিষ্ঠানগুলিতে নির্বাচিত আসনগুলি দখল করা।

গান্ধীজী নির্দেশিত অসহযােগিতার নীতি বর্জন করে সংসদীয় কার্যকলাপ শুরু করার এই পরিকল্পনা কংগ্রেসের গান্ধীপন্থী নেতৃবৃন্দের মনঃপুত হয় নি। কংগ্রেসের মধ্যে পরিবর্তন পন্থী (pro-changer) ও পরিবর্তন বিরােধী (No-changer) এই দুটি গােষ্ঠীর উদ্ভব হয়। পরিবর্তন পন্থী অর্থাৎ সংসদীয় কার্যকলাপের স্বপক্ষে ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ, মতিলাল নেহরু, হাকিম আজমল খা, বিঠঠল ভাই প্যাটেল, সত্যমূর্তি এন. সি. কেলকার প্রমুখ। পরিবর্তন বিরােধী ছিলেন ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ, রাজা গােপালাচারী, সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল প্রমুখ। ১৯২২ খ্রীস্টাব্দের ডিসেম্বরে গয়াতে অনুষ্ঠিত কগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে আইনসভায় প্রবেশের প্রশ্নে তীব্র মতবিরােধ দেখা যায়। রাজা গােপালাচারীর নেতৃত্বে গান্ধীজীর অনুগামী পরিবর্তন বিরােধী গােষ্ঠী জয়লাভ করে। এই অবস্থায় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনের সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাশ নিজেই কংগ্রেসের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। ১৯২৩ খ্রীস্টাব্দের ১লা জানুয়ারী চিত্তরঞ্জন দাশ, মতিলাল নেহরু প্রমুখ নেতারা সংসদে প্রবেশের সপক্ষে স্বরাজ্য দল নামে এক নতুন দল গঠন করেন। স্বরাজ্য দলের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন চিত্তরঞ্জন দাশ।

স্বরাজ্য দলের প্রধান কর্মসূচি: (১) আইনসভায় প্রবেশ করে সরকারের কাজকর্মে বিরোধিতা করা। (২) সরকারী বাজেট বা আয় ব্যয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা। (৩) নানাবিধ বিল ও প্রস্তাব উত্থাপন করে জাতীয়তাবাদের অগ্রগতিতে সহায়তা করা এবং (৪) সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে বিদেশী শােষণ বন্ধ করা। এক কথায় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু চেমসফোর্ড প্রবর্তিত শাসন ব্যবস্থাকে ব্যর্থ করাই ছিল স্বরাজ্য দলের উদ্দেশ্য। স্বরাজ্য দলের অন্য উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থেকে স্বায়ত্ত শাসনের অধিকার লাভ করা।

স্বরাজ্য দলের সাফল্য: ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দের সংস্কার আইন (মন্টেগু চেমসফোর্ড) অনুসারে ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দে দ্বিতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্বরাজ্য দল কেন্দ্রীয় আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে বাংলা ও মধ্যপ্রদেশে এই দলের সাফল্য ছিল সবেচেয়ে বেশি। উত্তরপ্রদেশ ও বােম্বাই এর আইনসভায় এই দলের সাফল্য ছিল উল্লেখযােগ্য। স্বরাজ্য দলের এই সাফল্যের মূলে ছিল দলীয় ঐক্য, সাংগঠনিক শক্তি ও দক্ষ নেতৃত্ব। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন বাংলায় আইনসভায় স্বরাজ্য দলের নেতা নির্বাচিত হন। এছাড়া কলকাতা কর্পোরেশনে স্বরাজ্য দল জয়লাভ করে এবং চিত্তরঞ্জন প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন প্রধান কর্মকর্তা। স্বরাজ্য দল সব রকমের সরকারী অনুষ্ঠান ও অভ্যর্থনা সভা বর্জন করে সরকারী নীতির প্রতি অসহযােগিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। কেন্দ্রীয় আইনসভায় এই দল ভারতে পূর্ব দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একটি প্রস্তাব অনুমােদন করতে সমর্থ হয়।

স্বরাজ্য দলের কার্যকলাপ: কলিকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে স্বরাজ্য দল নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায়। চিত্তরঞ্জন নিজে মেয়রের পদ অলংকৃত এবং জনহিতকর কাজের দ্বারা স্বরাজ্য দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার নীতি নেন। কিন্তু কর্পোরেশনের সচিব বা Executive অফিসারের পদে দাবীদার ছিলেন সুভাষ বসু ও বীরেন শাসমল। প্রথম জন কায়স্থ গোষ্ঠী সমর্থিত এবং কলিকাতার এলিটদের দ্বারা পুষ্ট। দ্বিতীয় জন দাশের একনিষ্ট অনুগামী ও মাহিষ্য সম্প্রদায় সমর্থিত হলেও তার জোর ছিল গ্রামে, কলিকাতায় বেশী সমর্থক ছিল না। ফলে বীরেন শাসমল হেরে যান, চিত্তরঞ্জন সুভাষকেই বেছে নেন। এতে স্বরাজ্য দলে গােষ্ঠীদ্বন্দ্ব দেখা দেয়। মেদিনীপুর, হাওড়া, চব্বিশ পরগণার মাহিষ্য প্রধান অঞ্চলে স্বরাজ্য দল প্রভাব হারায়। অমলেশ ত্রিপাঠী অবশ্য বলেন যে, সুভাষ যােগ্য ছিলেন এবং দাশের স্নেহভাজন ছিলেন বলেই দাশ তাকে বেছে নেন। কর্পোরেশনে দাশ নয় দফা সূত্র কার্যকরী করার চেষ্টা করেন। এই নয় দফার অধিকাংশ ছিল কলিকাতাবাসী দরিদ্র শ্রেণীর কল্যাণের জন্যে তৈরি যেমন অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, চিকিৎসার উন্নতি, জল সরবরাহের উন্নতি। দুধ সরবরাহের জন্যে কো-অপারেটিভ দুগ্ধ সমিতি স্থাপিত হয়। এই সকল কাজের ঠিকাদারী ভারতীয়দের হাতে দেওয়ার ফলে ইওরােপীয় বণিক সভাগুলি অবশ্য চটে যায়। এলাহাবাদের কার্পারেশনে জওহরলাল নেহেরু ও আমেদাবাদে বল্লভ ভাই প্যাটেল উল্লেখযােগ্য কাজ করেন। দাশ বাংলায় মুসলিমদের হাতে রাখার জন্যে ১৯২৩ খ্রীঃ বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষর করেন। স্বরাজ লাভের পর প্রশাসনে ৫৫% চাকুরী তিনি মুসলিমদের দিতে, আপাততঃ মসজিদের সামনে বাদ্যযন্ত্র বন্ধ করতে এবং বকর ইদের দিন গােহত্যায় বাধা না দিতে প্রতিশ্রুতি দেন।

স্বরাজ্য দলের ব্যর্থতা: স্বরাজ্য দলের অভূতপূর্ব সাফল্যে ইংরেজ সরকার প্রমাদ গুণেছিল। বিদেশি শাসকবর্গ তাই এই দলের ওপর আঘাত হানতে সচেষ্ট হয়েছিল। এক সরকারি আইন বলে ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে স্বরাজ্য দলের ৮০ জন সক্রিয় সদস্য নেতাকে কারারুদ্ধ করা হলে তার প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ঝড় বয়ে গিয়েছিল। এছাড়া পরে চিত্তরঞ্জন দাশ ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত বাংলা প্রাদেশিক সম্মেলনে স্বাধীনতার পরিবর্তে ডােমিনিয়নের আদর্শ সমর্থন করেন এবং এই ব্যাপারে তিনি সরকারের সঙ্গে সহযােগিতা করার কথাও ঘােষণা করেন। তার এই ঘােষণা ও নীতির পরিবর্তন তার সহকর্মী ও অনুগামীদের মধ্যে অসন্তোষের সঞ্চার করে। ইতিমধ্যে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই জুন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের মৃত্যু দলকে আরও দুর্বল করে তােলে। অন্যদিকে গান্ধিজির অনুপস্থিতিতে জাতীয় আন্দোলনের গতিও মন্থর হয়ে পড়ে। দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা এবং সন্ত্রাসবাদের পুনরাবির্ভাব ঘটেছিল। দেশবন্ধুর পরবর্তীকালে তার সুযোগ সহকর্মী যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্ত স্বরাজ্য দলের নেতা নির্বাচিত হলেও, তার নেতৃত্বে একদিকে যেমন দলের ভাঙনকে বন্ধ করা যায়নি, তেমনই অন্যদিকে দেশের অন্যতম প্রধান দল হিসাবে জাতীয় সমস্যাগুলির সুষ্ঠু সমাধানও নির্ধারণ করা যায় নি।

গুরুত্ব: স্বরাজ্য দলের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল দুধরনের। প্রথমত, স্বরাজ্য দল আইন সভায় ব্রিটিশ সরকারের কার্যকলাপকে অচল করে ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দের সংস্কার আইনকে অর্থহীন করে তুলেছিল। দ্বিতীয়ত, অসহযােগ আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে জাতীয় আন্দোলনে যে অবসাদ দেখা দেয়, স্বরাজ্য দলের কার্যকলাপের ফলে তার কিছুটা আবসান ঘটে।