Simon Commission - সাইমন কমিশন ১৯২৭

- October 30, 2019
1919 খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু চেমসফোর্ড আইনে বলা হয়েছিল যে, এই আইন ঠিকভাবে কার্যকারী হচ্ছে কিনা তা বিচার করার জন্য দশবছর পরে একটি রাজকীয় কমিশন নিয়ােগ করা হবে। কিন্তু এই আইন জাতীয় নেতাদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। মন্টেগু চেমসফোর্ড আইনে প্রদেশে যে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাও ভারতীয়দের আশা-আকাক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। এজন্য বড়ােলাট লর্ড আরউইন ভারতের সাংবিধানিক ও শাসনতান্ত্রিক সমস্যা দূর করতে সচেষ্ট হন এবং তৎকালীন ভারত সচিব বার্কেনহেডকে সাংবিধানিক সংস্কারের কথা জানিয়েছিলেন। এই বার্কেনহেডই ভারতে সংবিধান সংস্কারের প্রয়ােজনে সাইমন কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
reaction to simon commission
সাইমন কমিশন গঠন (Formation of the Simon Commission): ইংল্যান্ডের বিখ্যাত আইনজীবী স্যার জন সাইমনের সভাপতিত্বে মােট 7 জন সদস্য নিয়ে 1927 খ্রিস্টাব্দে সাইমন কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশনের বিশিষ্ট সদস্যরা হলেন — লর্ডস্ট্যাথকোনা, স্টিফেন ওয়েলিস, ভাইকাউন্ট বার্নহ্যাম, মেজর এটলি, কর্ণেল লেনফক্স ও এডওয়ার্ড ক্যারােগান। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, ভারতীয়দের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে সাইমন কমিশন গঠিত হলেও এই কমিশনে কোনাে ভারতীয় প্রতিনিধি ছিলেন না।

সাইমন কমিশনের উদ্দেশ্য (Purpose of the Simon Commission): মন্টেগু চেমসফোর্ড শাসনসংস্কার আইনের কার্যকারিতা অনুসন্ধান করা। ভারতীয়দের প্রশাসনিক যোগ্যতার মূল্যায়ণ করা। এছাড়া ভারতে আগামী দিনে কতটুকু শাসনসংস্কার কার্যকারী করা যায় তা নির্ধারণ করা।

ভারতীয়দের অসন্তোষ (Dissatisfaction of the Indians): সাইমন কমিশনকে ভারতে প্রেরণের সিদ্ধান্ত ঘােষণার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয়দের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এই কমিশনে কোনাে ভারতীয় প্রতিনিধি না থাকায় এটিকে একটি পক্ষপাতযুক্ত সংসদীয় কমিশন হিসাবে চিহ্নিত করেন ভারতীয়রা। তাই 1927 খ্রিষ্টাব্দে 3 ফেব্রুয়ারি সাইমন কমিশন বােম্বাই বন্দরে এসে পৌছেলে দেশজুড়ে হতাল শুরু হয়। কমিশনকে কালােপতাকা দেখানাে হয়। সেই সঙ্গে স্লোগান দেওয়া হল — সাইমন ফিরে যাও (Go back Simon)। দেশের সর্বত্র সাইমন কমিশনের (Simon Commission) সদস্যরা বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়েছিলেন।

সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন (Anti-Simon Movement): 1927 খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে লালা লাজপত রায়ের সভাপতিত্বে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে সাইমন কমিশন বয়কটের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সাইমন কমিশন বােম্বাই-এর মাটিতে পদার্পণ করলে সর্বত্র হরতাল, বিক্ষোভ, প্রতিবাদসভা ও মিছিল বের করা হয়। বামপন্থীরা হাজার হাজার শ্রমিককে বয়কট আন্দোলনের মাধ্যমে উৎসাহিত করে। মুসলিম লিগের মােহম্মদ আলি জিন্নাহ বয়কটের আহ্বান জানান। সারা দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখে ব্রিটিশ সরকার বিচলিত হয়ে পড়ে এবং দমননীতির আশ্রয় নেয়। লালা লাজপত রায় সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে গিয়ে লাহােরে পুলিশের আক্রমণে আহত হয়ে কিছুদিনের মধ্যে মারা যান। কংগ্রেসের প্রথম সারির অনেক নেতাই আহত হন। শেষ পর্যন্ত এই বিক্ষুদ্ধ অবস্থার মধ্যেই সাইমন কমিশন তার অনুসন্ধান চালায় এবং 1930 খ্রিস্টাব্দের 7 মে ব্রিটিশ সরকারের নিকট তার প্রতিবেদন পেশ করেন।

বার্কেনহেডের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ (Challenge of Birkenhead): সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও আন্দোলন ব্রিটিশ সরকার সুনজরে দেখেনি। সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন ভারতসচিব লর্ড বার্কেহেড। তার ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ভারতীয়দের নিকট অপমানজনক ছিল। তিনি বলেছিলেন, ভারতীয়রা সংবিধান রচনার জন্য যতই হইচই করুক না কেন, সে যোগ্যতাই এখনও তাদের হয়নি। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতারা বার্কেনহেডের এই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করেন।
Advertisement

নেহেরু রিপোর্ট (Nehru Report): বার্কেহেডের বিদ্রুপকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে 1928 খ্রিস্টাব্দের লখনউ-এর সর্বদলীয় সম্মেলনে মতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির ওপর সংবিধান রচনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এক বছরের মধ্যে এই কমিটি ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন, ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের ওপর ভিত্তি করে একটি খসড়া রচনা করে। এটিই নেহেরু রিপাের্ট নামে পরিচিত। তবে শেষপর্যন্ত এই রিপাের্ট সর্বদলীয় ভিত্তিতে গৃহীত হয়নি। এর মূল কারণ ছিল সাম্প্রদায়িক নেতাদের বিরােধিতা।

সাইমন কমিশনের সুপারিশ (simon commission report): প্রাদেশিক ডায়ার্কি বিলুপ্ত করতে হবে এবং প্রাদেশিক আইনসভায় মন্ত্রীর দায়িত্ব বৃদ্ধি করতে হবে। প্রদেশের সুরক্ষা এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ ক্ষমতা রাজ্যপালের অধীনে আসে। ফেডারেল অ্যাসেমব্লিতে (কেন্দ্রে) জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রদেশ এবং অন্যান্য অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করা হয়। বার্মার জন্য প্রস্তাবিত কর্তৃত্বের স্থিতি এবং এটির নিজস্ব সংবিধান সরবরাহ করা উচিত। প্রস্তাবিত কাউন্সিল অফ স্টেটের প্রতিনিধিত্ব প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে বেছে নেওয়া যায় না তবে প্রাদেশিক কাউন্সিলের মাধ্যমে অপ্রত্যক্ষ নির্বাচন হতে পারে যা আধুনিক দিনের নির্বাচন পদ্ধতি যেমন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব হিসাবে কম-বেশি হয়।

উপসংহার (Conclusion): সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের আন্দোলন প্রতিটি সাধারণ ভারতবাসীকে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত করে তােলে। সাইমন কমিশনের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে 1935 সালের ভারত শাসন আইন রচিত হয়। ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে ভারতবাসীর যে মানসিকতা তৈরি হয়েছিল তা ইতিপূর্বে আর ঘটেনি। তাছাড়া, আইন অমান্য আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরিতে এই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তবে নেহেরু রিপাের্ট প্রকাশিত হলে মােহম্মদ আলি জিন্না মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থে যে 14 দফা দাবি তুলে ধরেছিলেন তাতে সাম্প্রদায়িকতার আগুন প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে। এই প্রসঙ্গে সুমিত সরকার বলেছেন — “Not for the first or last time, Hindu communalism had significantly weakencd the national anti-imperialist cause of critical movement".
Advertisement