Rise of Mahatma Gandhi - ভারতীয় রাজনীতিতে মহাত্মা গান্ধীর উত্থান

- October 29, 2019
ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে গান্ধীজির অবদান চিরস্মরণীয়। তার আগমনের ফলেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এক নতুন দিকে মোড় নেয়। তিনিই সর্বপ্রথম ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে গণআন্দোলনের রূপ দিয়েছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের তিনিই ছিলেন এক নতুন মতাদর্শ ও পথের দিশারী। তার মত ও পথ অনুসরণ করেই ভারতের জাতীয় আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদ বিরােধী এক সর্বভারতীয় আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছিল এবং ইংরেজ সরকার আন্দোলনের ভয়াবহতায় শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।
Mahatma Gandhi South Africa Image Album
১৮৬৯ খ্রীঃ ২রা অক্টোবর মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী গুজরাটের কাথিয়াড়ের অন্তর্গত পোরবন্দর নামক স্থানে এক বনেদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কাবা গান্ধি ও মা পুতলিবাঈ। গান্ধীজির মন ও চরিত্র গঠনে তার মায়ের অপরিসীম প্রভাব ছিল। "The Story of My experiments with Truth" নামক আত্মচরিতে গান্ধীজি একথা লিখেছেন। পােরবন্দরে গান্ধীজির শৈশব ও কিশােরকাল কাটে। ১৮৭৮ খ্রীঃ তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৮৮৮ খ্রীঃ তিনি লন্ডন যান এবং ১৮৯১ খ্রীঃ ব্যারিস্টারী পাশ করে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু বােম্বাই হাইকোর্ট ও রাজকোটে তিনি বিশেষ পশার জমাতে পারেননি। এই পরিস্থিতিতে দাদা আবদুল্লা অ্যান্ড কোম্পানী নামক এক মুসলিম ব্যবসায়ী প্ৰতিষ্ঠানের কাছ থেকে তাদের মামলা করার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় যান।

১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে এপ্রিল মাসে গান্ধীজি দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের প্রতি যে বৈষম্য আচরণ করা হত তা প্রত্যক্ষ করে গাজি অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। আইন প্রশাসনের মাধ্যমে সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক নিয়ে ভারতীয়দের ক্ষমতাহীন করে রাখা হয়েছিল। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ইউরোপীয় কুলি বলে সম্বোধন করতেন। গান্ধীজি ভারতীয় বলে তাকে কুলি ব্যারিস্টার বলে সম্বােধন করা হত। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা কালে বর্ণবৈষম্য সম্বন্ধে গান্ধীজির তীব্র অভিজ্ঞতা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় ব্যবসা ছাড়াও অন্যান্য কাজেও ব্যাপ্ত ছিলেন। গান্ধীজি প্রত্যেকের দুরবস্থা দেখে ব্যথিত হন। এবং বৃটিশ শাসনের প্রতি অনুগত থেকেও কিভাবে ভারতীয়দের জন্য ন্যূনতম মানবিক অধিকার অর্জন করা যায় সেজন্য তিনি প্রয়াসী হন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী সকল স্তরের ভারতীয়রা তাকে সাহায্য করতে উদ্যোগী হন। ভারতীয়দের অধিকার অর্জনের অন্য ১৮৯৪ খ্রীঃ ২২ শে মে গান্ধীজি নাটালে ইন্ডিয়ান কংগ্রেস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৯৯ খ্রীঃ দক্ষিণ আফ্রিকায় বুয়োর এবং বৃটিশদের মধ্যে যুদ্ধের সময়ে এবং ১৯০৬ খ্রীঃ জুলু বিদ্রোহের সময় গান্ধীজি বৃটিশদের সাহায্য করেন। তিনি ঘােষণা করেন 'The British Empire existed for the welfare of the world' — বৃটিশ সাম্রাজ্যের অস্থিত্ব পৃথিবীর কল্যাণের জন্যই রয়েছে।

১৯০৬ খ্রীঃ ট্রান্সভ্যাল শহরে একটি আইন পাশ করে তার মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের নাম নথিভুক্ত করতে বলা হয় এবং প্রত্যেক ভারতীয়কে এই সরকারী অনুমােদন পত্র সঙ্গে রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়। গান্ধীজি এই ধরনের অপমানজনক আইনের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিরােধ সংগঠিত করেন। পরবর্তীকালে এই অহিংস প্রতিরোধই সত্যাগ্রহ নামে পরিচিত হয়। গান্ধীজি পুরুষ ও মহিলাদের সঙ্গী করে সত্যাগ্রহ শুরু করলে শেতাঙ্গ সরকার ১৮৯৪ খ্রীঃ ইন্ডিয়ান অ্যাক্ট পাশ করে ভারতীয়দের দুর্দশা কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করেন।

১৮৯৩-১৯১৪ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের অধিকার অর্জনের দাবীতে গান্ধীজির কার্যাবলী তাকে একজন আদর্শবাদী জননেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই সময় তিনি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে হিন্দুধর্ম ছাড়াও প্রতিটি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন। রুশ সাহিত্যক টলস্টয়ের লেখা The Kingdom of God, রাসকিনের লেখা Unto the last গ্রন্থ দুটি গান্ধীজিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। টলস্টয় ফার্ম নামে একটি আশ্রমিক আবাস তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯১০ খ্রীঃ টলস্টয়ের মৃত্যু পর্যন্ত গান্ধীজির তার সঙ্গে পত্রালাপ ছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকায় কারাগারে কাটানাের সময়ে মার্কিন চিন্তাবিদ হেনরি ডেভিড থোরা রচিত আইন অমান্য আন্দোলন বিষয়ক (Civil Disobelience, 1849) প্রবন্ধ পাঠ করেন। গুজরাটে থাকাকালীনই তিনি প্রচলিত বৈষ্ণব ও জৈন ধর্মের মাধ্যমে অহিংসার আদর্শ গ্রহণ করেন। আফ্রিকাতেই গান্ধীজির রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত হয়। সেখানকার হিন্দুদের বিশেষত নিম্নবর্গের হিন্দুদের সংস্পর্শে এসে তিনি প্রথম অস্পৃশ্যতাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক পাপ হিসেবে চিহ্নিত করেন। কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি শেতাঙ্গদের অসম আচরণ দেখে পশ্চিমী ভাবধারা এবং বৃটিশ সাম্রাজ্য সম্পর্কে তার মােহমুক্তি ঘটতে থাকে। তবে তখনও তিনি বৃটিশরাজের প্রতি সরাসরি যুদ্ধে যাননি। এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বাধবার পরও তিনি বিনাশর্তে বৃটিশ সরকারের সঙ্গে সহযােগিতার কথা ঘােষণা করেন। এমনকি আনুগত্য প্রকাশ করেন। কুড়ি বছর ধরে একটানা সংগ্রামের ফলে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন তাতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সম্বন্ধে তার দৃষ্টিভঙ্গীকে স্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গীকে রূপদান করতে সক্ষম হন।

১৯১৬ খ্রীঃ জানুয়ারী মাসে গান্ধীজি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে এলেও তখনই প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেননি। তার অন্তরঙ্গ বন্ধু গােপালকৃষ্ণ গোখলের নির্দেশে ১৯১৩-১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজি ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমন করে নিজের দেশবাসীর সঙ্গে পরিচিত হন ও ভারতের অবস্থা সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান লাভ করেন। ১৯১৫ খ্রীঃ মে মাসে আমেদাবাদে সবরমতি আশ্রম গঠন করে সমাজসেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯১৭ খ্রীঃ প্রথম পর্যন্ত গান্ধীজি একজন সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে চম্পারণ, ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে খেদা ও আমেদাবাদের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গান্ধীজি ভারতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
Advertisement