দিল্লির মামলুক সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবক

- October 04, 2019
ভারতে তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আইবক (শাসনকাল:১২০৬-১২১০ খ্রিস্টাব্দ) জাতিতে তুর্কি ছিলেন এবং তার জন্ম হয় তুর্কিস্থানের এক আইবক উপজাতি পরিবারে। তুর্কি ভাষায় আইবক কথার অর্থ হল চাঁদের মতো সুন্দর। বাল্যকালে তিনি পারস্যর নিশাপুরের কাজী ফকরুদ্দিন আব্দুল আজিজ কুফি দাস হিসেবে বিক্রি হন এবং তার প্রতিভার পরিচয় পেয়ে তাকে সাহিত্য, ধনুর্বিদ্যা ও সামরিক শিক্ষা দেন। কাজির মৃত্যুর পর কুতুবউদ্দিন পুনরায় দাস হিসেবে বিক্রিত হন এবং শেষ পর্যন্ত মহম্মদ ঘুরি তাকে ক্রয় করেন। তার অধ্যবসায়, সাহসিকতা ও প্রভুভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে মহম্মদ ঘুরি প্রথমে তাকে একজন সাধারণ সৈনিক এবং অশ্বশালার অধ্যক্ষ (আমির-ই-আখের) পদে নিযুক্ত করেন। তিনি অচিরেই মহম্মদ ঘুরির অপর দুই প্রধান দাস সেনাপতি নাসিরউদ্দিন কুবচা এবং তাজউদ্দিন ইলদুজ-এর সমান মর্যাদা ও ক্ষমতার অধিকারী হন।
Sultan Qutb al-Din Aibak
কুতুবউদ্দিন আইবকের শক্তিবৃদ্ধি: মহম্মদ ঘুরির ভারত আক্রমণকালে অন্যতম সেনাপতি হিসেবে যুক্ত হন এবং তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে (১১৯২ খ্রিস্টাব্দ) যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ ঘুরি ভারত ত্যাগ করেন এবং বিজিত ভারতীয় রাজ্যগুলির ভার কুতুবউদ্দিন আইবকের উপর অর্পিত হয়। ১১৯২ থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ ঘুরির মৃত্যু পর্যন্ত তিনি হান্সি, মিরাট, দিল্লি, রথথম্বোর, কনৌজ, কালিঞ্জর, মাহোবা, খাজুরাহাে প্রভৃতি অঞ্চল দখল করেন। এক কথায়, মহমদ ঘুরির মৃত্যুর প্রাক্কালে দিল্লি থেকে কালিঞ্জর এবং গুজরাট ও লাহোর থেকে লক্ষ্মণাবতী পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ডে তিনি তুর্কি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। নিজ শক্তিবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিনি ইতিপূর্বে মহম্মদ ঘুরির প্রধান সেনাপতি তাজউদ্দিন ইলদুজ-এর কন্যাকে বিবাহ করেন। মুলতান ও উচ শাসনকর্তা নাসিরউদ্দিন কুবচা-র সঙ্গে নিজ ভগিনীর বিবাহ দেন এবং নিজ কন্যার সঙ্গে দাস সেনাপতি ইলতুৎমিসের বিবাহ দেন।

কুতুবউদ্দিন আইবকের সিংহাসন আরোহণ: ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ ঘুরির মৃত্যুর পর কুতুবউদ্দিন আইবক একজন স্বাধীন ও সার্বভৌন নরপতি হিসেবে মহম্মদ ঘুরির অধিকৃত ভারতীয় রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ ঘুরি কুতুবউদ্দিন আইবককে মালিক উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসে তিনি নিজেকে মালিক ও সিপাহশালার উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি তখনও সুলতান উপাধি গ্রহণ করেন নি।

কুতুবউদ্দিন আইবকের সমস্যা ও সমাধান: সিংহাসনের উপর কুতুবউদ্দিনের কোনও বৈধ অধিকার ছিল না, কারণ মহম্মদ ঘুরি বা তার কোনও উত্তরাধিকারী তাকে ভারতীয় রাজ্যর উত্তরাধিকারী বলে ঘােষণা করেন নি। এছাড়া তখনও কুতুবউদ্দিনের দাস মুক্তি হয় নি এবং ইসলামীয় আইন অনুযায়ী কোনও দাস সিংহাসনে বসার অধিকার ছিল না। তার শ্বশুর তাজউদ্দিন ইলদুজ ও ভগিনিপতি নাসিরউদিন কুবচার নজর ছিল দিল্লির দিকে। মহমদ ঘুরির ভ্রাতুস্পুত্র ও ঘুর রাজ্যের সিংহাসনে তার উত্তরাধিকার গিয়াসউদ্দিন ঘুর, তাজউদ্দিনকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন এবং তাকে গজনির শাসনকর্তা বলে স্বীকৃতি দেন। এর পরেই তাজউদ্দিন গজনির অংশ হিসেবে দিল্লির উপর তার কর্তৃত্ব দাবি করতে থাকে এবং পঞ্জাব জয়ে অগ্রসর হন। ঘুরির মৃত্যুসংবাদে পরাজিত রাজপুত রাজন্যবর্গের অনেকেই স্বাধীনতা ঘােষণা করেন এবং কুতুবউদ্দিনকে নানাভাবে বিরক্ত করতে থাকেন। মধ্য এশিয়ার খােয়ারিজমের শাহ আলাউদ্দিন মহম্মদ ও গজনী ও দিল্লি অধিকারের জন্য সচেষ্ট হন।

কুতুবউদ্দিন অতি দক্ষতার সঙ্গে এই সমস্ত সমস্যার মােকাবিলা করেন। ১২০৮ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ ঘুরির উত্তরাধিকারী গিয়াসউদ্দিন ঘুর কুতুবউদ্দিনকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে সুলতান উপাধিতে ভূষিত করেন। এর ফলে তিনি সার্বভৌমত্ব অর্জন করেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে গজনীর অধিপতি তাজউদ্দিন ইলদুজ-এর দাবিকে অস্বীকার করেন এবং দিল্লী দখলে অগ্রণী ইলদুজ-এর বাহিনীকে পাঞ্জাবে পরাজিত করে গজনী দখল করে নেন। তাজউদ্দিন ইলদুজ কুহিস্থানে পালিয়ে আত্মগোপন করেন।

বাংলা বিহার বিজেতা বখতিয়ার খলজীকে হত্যা করে আলিমর্দান সেখানকার নিজ ক্ষমতা বিস্তার করেন। কিন্তু আলিমর্দানের আচরণে অসন্তুষ্ট খলজী মালিকরা মহম্মদ শিরানের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে আলিমর্দানকে পদচ্যুত ও বন্দী করেন। আলিমর্দান কোনক্রমে মুক্ত হয়ে কুতুবউদ্দিনের সাহায্যপ্রার্থী হন। কুতুবউদ্দিন আলিমর্দানের সাহায্যে অযােধ্যার শাসক কোয়াজরুমি-কে অগ্রসর হবার নির্দেশ দেন। রুমি খান কুটকৌশল ও শক্তি প্রদর্শন করে খলজী মালিকদের বশীভূত করেন এবং আলিমর্দানকে বাংলার শাসনকর্তৃত্বে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।

কুতুবউদ্দিন আইবকের মৃত্যু: কুতুবউদ্দিন আইবক মাত্র চার বছর শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১২০৬ খ্রীষ্টাব্দের পর অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করা ছাড়া নতুন রাজ্যদখলের কোন ইচ্ছা তার ছিল না। কারণ নতুন রাজ্যদখলের পরিবর্তে দখলীকৃত রাজ্যে আইন ও প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা তার কাছে জরুরী মনে হয়েছিল। কিন্তু সেই কাজ সম্পন্ন করার আগেই ১২১০ খ্রিস্টাব্দে চৌঘান খেলার সময় ঘােড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন (নিজামী, ২০৩ পৃষ্ঠা)। কুতুবউদ্দিন আইবকের সমাধি বর্তমানে পাকিস্থানের লাহোরের আনারকলি বাজারে অবস্থিত।

কুতুবউদ্দিন আইবকের অবদান: ডঃ এস. আর. শর্মা কুতুবউদ্দিন আইবককে মােগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ডঃ ঈশরী প্রসাদ কুতুবউদ্দিন আইবককে ভারতে মুসলিম বিজয়ের অন্যতম পথিকৃৎ বলে বর্ণনা করেছেন। ডঃ নিজামির মতে কুতুবউদ্দিন আইবক ছিলেন প্রধানত সামরিক নায়ক। তিনি নতুন কোনও প্রশাসনিক সংস্কার করেন নি বা রাজস্ব ব্যবস্থায় কোনও পরিবর্তন আনেন নি। পুরােনাে ভারতীয় কর্মচারীরাই পুরােনাে ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করতেন। ডঃ হাবিবউল্লাহর মতে, দিল্লি সুলতানির প্রধান স্থপতি হলেন কুতুবউদ্দিন আইবক।

ব্যক্তিগতভাবে কুতুবউদ্দিন নানা গুণের অধিকারী ছিলেন। ডঃ হাবিবউল্লাহ বলেন যে, তার মধ্যে তুর্কিদের নির্ভীকতার সঙ্গে পারসিকদের মার্জিত রুচি ও ঔদার্যের সমন্বয় দেখা যায়। তার মধ্যে সাহসিকত, শৌর্যবীর্য, উদারতা, ন্যায়পরায়ণতা, দানশীলতা, শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ এবং গুণগ্রাহিতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। তিনি বিদ্যা ও বিদ্বানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তাদেরকে দানের ব্যাপারে মুক্তহস্ত ছিলেন। তাঁর দানশীলতার জন্য তিনি লাখবক্স বা লক্ষদাতার খ্যাতি অর্জন করেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক হাসান নিজামি এবং ফকর-ই-মুদাব্বির তার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। তিনি শিল্পের পৃষ্ঠপােষকতা করেন। তিনি দিল্লি ও আজমিরে দুটি মসজিদ যথাক্রমে কোয়াত-উল-ইসলামআড়াই-দিন-কা-ঝোপড়া নির্মাণ করেন। দিল্লির বিখ্যাত কুতুব মিনার নির্মাণ কাজ তিনি শুরু করেন। বিখ্যাত সুফি সাধক কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর নাম অনুসারে এই মিনারটির নামকরণ করা হয়।