পল্লব যুগের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পকলা

- October 03, 2019
ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসে দক্ষিণ ভারত এক বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। উত্তর ভারতের মতােই এখানে প্রচুর মঠ, মন্দির ও চৈত্য নির্মিত হয়। দক্ষিণ ভারতের শিল্পকলার মধ্য পল্লব শিল্প ছিল নতুনত্বে পূর্ণ। পল্লব যুগের মন্দিরগুলিকে দুভাগে ভাগ করা যায় — (১) পাহাড়-কাটা মন্দির এবং (২) স্বাধীনভাবে তৈরি মন্দির। পল্লব যুগের প্রথম পর্বের স্থাপত্য-নিদর্শনগুলি সবই পাহাড় কেটে তৈরি। এই পাহাড়-কাটা স্থাপত্যকে আবার দুভাগে ভাগ করা যায়। (ক) মহেন্দ্র রীতি ও (খ) মহামল্ল রীতি। স্বাধীন ভাবে তৈরি মন্দিরগুলিও আবার কয়েকটি ভাগে বিভক্ত।
Mahabalipuram Cave Architecture

পল্লব স্থাপত্য শিল্প

দক্ষিণ ভারতের স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ইতিহাস পল্লব আমলের মন্দিরগুলি থেকেই শুরু হয়েছে। পল্লব যুগের এই মন্দিরগুলিতেই প্রথম দ্রাবিড় শিল্পরীতির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। দ্রাবিড় রীতির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এই মন্দিরগুলির উচ্চতা পিরামিডের মতাে। মন্দিরগুলি বহুতলবিশিষ্ট সর্বনিম্ন স্তরে যে গর্ভগৃহ থাকত, প্রতিটি তলেই তার অনুরূপ বিন্যাস লক্ষ করা যায়—তবে প্রতিটি তলেই তার আয়তন নিম্নতর তল অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর হতে থাকে। মন্দিরের শীর্ষদেশ গম্বুজাকুতি। শিল্পশাস্ত্রে একে স্তূপ বলা হয়। একেবারে নীচের তলায় অবস্থিত চতুষ্কোণ গর্ভগৃহ। এর চারদিকে থাকে একটি বৃহত্তর চতুষ্কোণ আচ্ছাদিত বেষ্টনী, যা প্রদক্ষিণ পথ নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে মূল মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে স্তম্ভযুক্ত হলঘর, প্রবেশদ্বার বা বড়াে গােপুরম।

(ক) মহেন্দ্র রীতি: পল্লব রাজ প্রথম মহেন্দ্রবর্মন-এর রাজত্বকালে (৬০০-৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত মন্দিরগুলি ছিল স্তম্ভযুক্ত। পাহাড় কেটে গুহা তৈরি হত এবং ত্রিকোণ বা গোলাকার স্তম্ভ দিয়ে মন্দিরের ছাদটি ধরে রাখা হত। এটি মহেন্দ্র রীতি নামে পরিচিত। ত্রিচিনোপল্লি, চেঙ্গলপেট এবং আর্কট জেলায় এ ধরনের মন্দিরের নিদর্শন পাওয়া গেছে। মহেন্দ্র বর্মনের রাজত্বকালের প্রথম দিকের মন্দিরগুলি ছিল অতি সাধারণ ধরনের, কিন্তু পরবর্তীকালে শিল্পরীতিতে পরিবর্তন আসে এবং মন্দিরের অলঙ্করণ বৈচিত্রময় হয়ে ওঠে। এর দুটি উদাহরণ হল — বৌদ্ধ বিহারের অনুকরণে তৈরি গুন্টুর জেলার অনন্ত শায়ন মন্দির এবং উত্তর আর্কট জেলার ভৈরবকোণ্ডের মন্দির। অনন্ত শায়ন মন্দিরটি চারতলা-এর উচ্চতা ৫০ ফুট। এর স্তম্ভগুলিতে সুন্দর শিল্পকর্ম পরিলক্ষিত হয়। ভৈরবকোণ্ডের মন্দির আরও বড়াে এবং স্তম্ভগুলির অলঙ্করণ উন্নততর।

(খ) মহামল্ল রীতি: প্রথম মহেন্দ্রবর্মনের পুত্র প্রথম নরসিংহবর্মন এর রাজত্বকালে (৬২৫-৬৭৫ খ্রিস্টাব্দ) মহামল্ল রীতির সূচনা হয়। মহামল্ল রীতির বৈশিষ্ট্য হল পাহাড় কেটে একটি প্রস্তর-খণ্ডে রথের আকৃতিতে মন্দির নির্মাণ। চেন্নাই (মাদ্রাজ) শহরের ত্রিশ মাইল দক্ষিণে মামল্লপুরমে (মহাবলীপুরম) এ ধরনের সাতটি রথ বা রথমন্দির পাওয়া গেছে। এই রথগুলি পঞ্চপাণ্ডব এবং দ্ৰৌপদী ও গণেশের মহান নামাঙ্কিত। এগুলিকে একত্রে সপ্ত প্যাগােডা বলা হয়। এই রথ বা রথমন্দিরগুলি হল আসলে শিবমন্দির। রথগুলির আয়তন মােটামুটি একই রকম, তবে সর্ববৃহৎ রথটির দৈর্ঘ্য ৪২ ফুট, প্রস্থ ৩৫ ফুট এবং উচ্চতা হল ৪০ ফুট। এই শিল্পরীতি একশিলা বা রথশৈলী পশু নামেও পরিচিত। রথগুলির ভিতরের দিক অসম্পূর্ণ হলেও, এর বাইরের দিক অসাধারণ। সূক্ষ্ম ভাস্কর্যের কাজে পূর্ণ। সমালােচকদের মতে এই রথগুলির মধ্য দিয়ে পল্লব স্থাপত্যের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। মহামল্ল রীতি অনুসারে পাহাড় খােদাই করে মণ্ডপ বা গুহা নির্মাণ করা হয়। মামল্লপুরমে এ ধরনের সতেরােটি গুহামন্দির নির্মিত হয়। এগুলির মধ্যে মহিষমর্দিনী, আদিবরাহ, বরাহ, ত্রিমুর্তি প্রভৃতি গুহামন্দির উল্লেখযােগ্য। এই মণ্ডপগুলি মহেন্দ্রবর্মনের মণ্ডপগুলির তুলনায় উন্নত।

(ক) রাজসিংহ ও নন্দীবর্মন গোষ্ঠী: মহামল্ল যুগের পর গুহামন্দির বা রথমন্দিরের পরিবর্তে পাথর দিয়ে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র মন্দির নির্মাণ শুরু হয়। পাথরের উপর পাথর সাজিয়ে এই রীতির মন্দির তৈরি করা হত। এই সময়ের মন্দিরগুলি দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত—রাজসিংহ গােষ্ঠীর (৭০০-৮০০ খ্রিস্টাব্দ) মন্দির এবং নন্দীবর্মন গােষ্ঠীর (৮০০-৯০০ খ্রিস্টাব্দ) মন্দির। রাজসিংহ গােষ্ঠীর মন্দিরের সংখ্যা ছিল ছয়টি। এদের মধ্যে তিনটি মন্দির মামল্লপুরমে - তির মন্দির, ঈশ্বর মন্দির ও মুকুন্দ মন্দির। একটি মন্দির আছে আর্কটের পনমলইয়ে। অন্য দুটি মন্দির হল কাঞ্চিপুরমের কৈলাসনাথ মন্দির এবং বৈকুণ্ঠ পেরুমল মন্দির। নন্দীৰ্মন গােষ্ঠীর আমলের মন্দিরগুলি আগের পর্যায়ের মতাে উজ্জ্বল নয়। মন্দিরের আয়তন অনেক ছােটো। এই মন্দিরগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল কাঞ্চিপুরমের মুক্তেশ্বর ও মতঙ্গশ্বের মন্দির।

(খ) অপরাজিত রীতি: পল্লব স্থাপত্যের শেষ ধাপ হল অপরাজিত রীতি। অপরাজিতবর্মন এই রীতি প্রবর্তন করেন। এই রীতির নিজস্ব কোনও বৈশিষ্ট্য ছিল না। এই রীতি পল্লব শিল্পকে ক্রমশ চোল শিল্পের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল।

পল্লব ভাস্কর্য

ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে পল্লব যুগ ছিল খুবই উন্নত। বলা হয় যে, পল্লব ভাস্কর্য দিয়েই দক্ষিণ ভারতের ভাস্কর্য শিল্পের সূচনা হয়। প্রথম পর্বের পল্লব ভাস্কর্যে শেষ দিকের বেঙ্গি ভাস্কর্যের প্রভাব ছিল খুব বেশি। মামল্লপুরমের রথমন্দিরগুলিতে অঙ্কিত বিভিন্ন দেব দেবী ও মানবমুর্তিগুলি পল্লব ভাস্কর্যের অসামান্য নিদর্শন। মানবমূর্তি গুলির মধ্যে আছে পল্লব-রাজ সিংহবিষ্ণু, প্রথম মহেন্দ্রবর্মন ও নরসিংহবর্মনের প্রতিকৃতি। প্রথম দুই রাজার সঙ্গে তাদের রানিদের প্রতিকৃতি এখানে আছে। পল্লব ভাস্কর্যের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন হল মহাবলীপুরমের গঙ্গাবতরণ বা গঙ্গার মর্তে অবতরণ ও বিষ্ণুর অনন্ত শায়ান। এক সময় সমালােচকরা এই রিলিফটিকে ভগীরথের গঙ্গা আনয়নের কাহিনির সঙ্গে যুক্ত করতেন। অধুনা সমালােচকরা বলেন যে, এই রিলিয়ে কিরাতার্জুনীয়ম পৌরাণিক কাহিনী বিবৃত হয়েছে। সমুদ্রমুখী পাহাড়ের পুরাে একদিক জুড়ে প্রায় ৯০ ফুট লম্বা ও ২৩ ফুট উঁচু এই মহাকাব্যিক রিলিফটি পাহাড়ের গা কেটে খােদাই করা হয়েছে। অসংখ্য মানুষ, জীবজন্তু, দেবতা, অর্ধদেবতা, সন্ন্যাসী—সবই এখানে উপস্থিত। এখানে মূর্তিগুলি সজীব ও স্বাভাবিক। সমালােচকদের মতে পশুর প্রতি এত মমত্ববােধ পল্লব ভাস্কর্য ছাড়া প্রাচ্যের আর কোনও ভাস্কর্যে পাওয়া যায় না। মহাবলীপুরমের এই রিলিফটিকে বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য বলা হয়। পল্লব গুহামন্দিরগুলির দেওয়ালে ভাস্কর্যের কাজ অতুলনীয়। কৃষ্ণমণ্ডপে পশুপালকের জীবন-কাহিনি, মহিষমদিনী মণ্ডপে দেবী দুর্গার সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ দৃশ্য, অনন্তশয্যায় বিষ্ণুর মাথার উপর ছত্র হিসেবে ফণাধারী শেষনাগ, বরাহ অবতারের দৃশ্য প্রভৃতি ভাস্কর্যের দৃশ্য অতুলনীয়। এছাড়া বরাহ-গুহার ভাস্কর্য-মণ্ডিত থামগুলিও অপুর্ব। পল্লব ভাস্কর্যে বেঙ্গির প্রভাব থাকলেও এই প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসছিল। বেঙ্গির তুলনায় পল্লব-মূর্তিগুলি ছিল অনেক বেশি প্রাণবন্ত এবং ইন্দ্রিয়পরায়ণতা থেকে মুক্ত। অজন্তা-ইলােরার রহস্যঘন অতীন্দ্রিয়তা এবং আলােছায়ার খেলা এখানে অনুপস্থিত।

পল্লব চিত্রকলা

পল্লব যুগে চিত্রকলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি দেখা যায়। প্রথম মহেন্দ্রবর্মনের রাজত্বকালের সুচনায় সিওনভাসল-এর জৈন মন্দিরে অপূর্ব চিত্রকলার নিদর্শন পাওয়া যায়। তার আমলের কিছু গুহামন্দির—বিশেষত মামন্দুরে পল্লব শিল্পকলার কিছু নিদর্শন চোখে পড়ে। দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন রাজসিংহ-র আমলে নির্মিত পনমলই ও কাঞ্চিপুরমের মন্দিরগুলিতেও চিত্রকলার বেশ কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়। পনমলই মন্দিরের চিত্রকলায় দেখা যায়, পার্বতী আনন্দের সঙ্গে শিব-নৃত্য দেখছেন। কাঞ্চির কৈলাসনাথ মন্দিরের কক্ষগুলিতেও কিছু চিত্র অঙ্কিত আছে। একটি চিত্রে সােমস্কন্দ অর্থাৎ শিব, পার্বতী ও তাদের পুত্র স্কন্দ বা কার্তিক আছেন। পাদুকোট্রাই রাজ্যে পল্লব চিত্রকলার কিছু নিদর্শন লক্ষ করা যায়।