Nehru Report 1928 - নেহরু রিপোর্ট ১৯২৮

- October 30, 2019
লর্ড বার্কেনহেডের বিদ্রুপপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ভারতীয় শিক্ষিত নেতাদের কাছে অত্যন্ত অপমানজনক মনে হয়। ভারতীয়রা যে নিজেদের সংবিধান রচনা করতে সমর্থ — তা প্রমাণ করার জন্য 1928 খ্রিস্টাব্দে 12ই ফেব্রুয়ারি দিল্লীতে মিঃ এম.এ.আনসারীর সভাপতিত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির এক সর্বদলীয় সম্মেলনে মতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন স্যার আলি ইমাম, এস কুরেশি, জয়াকর, তেজবাহাদুর সাপ্রু, এম. এন. জোশী, এস. এস্. আর্য প্রমুখ। ওই বছরই শেষের দিকে এই কমিটি যে খসড়া সংবিধান তৈরি করে তা নেহরু রিপাের্ট (Nehru Report) নামে পরিচিত।
Indian lawyer Motilal Nehru
মহম্মদ আলি জিন্নাহ এই অধিবেশনে প্রস্তাব দেন যে, (১) যদি কেন্দ্রীয় আইনসভায় সংখ্যালঘু মুসলিম সদস্যদের 1/3 আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, (২) পাঞ্জাব ও বাংলার আইনসভায় মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতে আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তবে (৩) মুসলিমরা তাদের স্বতন্ত্র নির্বাচনের দাবী ত্যাগ করে হিন্দুদের সঙ্গে যৌথ নির্বাচন করতে রাজী হবে। (৪) সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বালুচিস্তানের মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের আইনসভায় আসন দিতে হবে। 1927 খ্রীঃ মুসলিম লীগের একাংশ পুনরায় এই প্রস্তাব কংগ্রেসের কাছে দেয়। উল্লেখ্য মুসলিম লীগের অনেক সদস্য যথা, পাঞ্জাবের ফজলী হােসেন, মহম্মদ সফী প্রভৃতি এই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না।

নেহেরু রিপোর্টের প্রস্তাব (Nehru Report Recommendation): (১) ব্রিটেনের অন্যান্য ডােমিনিয়নের মতােই ভারতে একটি সার্বভৌম পার্লামেন্ট গঠিত হবে। (২) ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং মূল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় আইনসভার হাতে থাকবে। (৩) প্রদেশে এককক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা স্থাপিত হবে। (৪) কেন্দ্রে ও প্রদেশের আইনসভায় যৌথ নির্বাচন প্রথা অনুষ্ঠিত হবে। মুসলিমদের জন্যে স্বতন্ত্র নির্বাচন থাকবে না। (৫) কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিমদের জন্যে 1/3 অংশ আসন সংরক্ষিত থাকবে। (৬) লােকসংখ্যার ভিত্তিতে মুসলিম সংখ্যালঘিষ্ট প্রদেশে মুসলিমদের জন্যে আসন সংরক্ষণ করা হবে। (৭) ডােমিনিয়ন ষ্টেটাস দানের পর সিন্ধু, বালুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তকে আলাদা প্রদেশরূপে স্বীকৃতি দিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের প্রাপ্য অধিকার দেওয়া হবে। তবে অ-মুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্যে আসন সংরক্ষণ করা হবে। (৮) পাঞ্জাব ও বাংলায় কোন সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে আসন সংরক্ষণ করা হবে না। (৯) আপাততঃ 10 বছরের জন্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থে আসন সংরক্ষণ প্রথা চালু রাখা হবে। (১০) কেন্দ্রে একটি দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। (১১) প্রদেশে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন চালু করা হবে। ডায়ার্কি লােপ করা হবে। (১২) যতদিন না প্রাপ্তবয়স্কের ভােট চালু হয় ততদিন পাঞ্জাব ও বাংলার লােকসংখ্যার ভিত্তিতে মুসলিম প্রতিনিধিদের নির্বাচন করা হবে।

1928 খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে লক্ষ্ণৌ-এ সর্বদলীয় সম্মেলনে নেহেরু রিপাের্ট আলােচনার জন্যে পেশ করা হয়। ইতিমধ্যে মহম্মদ আলি জিন্নাহ তার দিল্লী ঘােষণার বয়ান বদলে ফেলেন। তিনি নেহেরু রিপাের্টে কিছু সংশােধনী যােগ করতে চান। সংশােধনগুলি হলঃ - (১) এখনই সিন্ধু প্রদেশকে বােম্বাই থেকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে পরিণত করতে হবে। ডােমিনিয়ন ষ্টেটাসের ঘােষণা পর্যন্ত অপেক্ষা চলবে না। (২) মূল ক্ষমতা বা রেসিডুয়ারী ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে না রেখে প্রদেশের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। দিল্লী প্রস্তাবে অবশ্য তিনি এই ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে রাখার কথাই বলেছিলেন। (৩) কেন্দ্রে আইনসভার 1/3 আসন মুসলিম সদস্যদের জন্যে সংরক্ষিত থাকবে। (৪) পাঞ্জাব ও বাংলার আইনসভায় মুসলিমদের জন্যে আসন সংরক্ষণ চালু করতে হবে। আগে তিনি একথা বলেননি। (৫) মুসলিম সংখ্যালঘু প্রদেশগুলিতে মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে রক্ষা কবচ হিসেবে আইনসভায় নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষণ করতে হবে।

নেহেরু রিপোর্টের বিরোধিতা: হিন্দু মহাসভা 1928 খ্রিষ্টাব্দে সম্মেলনে পাঞ্জাব ও বাংলায় মুসলিমদের জন্যে আসন সংরক্ষণের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়। তারা আশঙ্কা করে যে, এর ফলে এই দুটি প্রদেশে মুসলিম লীগের শাসনাধীন হয়ে পড়বে। লক্ষ্ণৌ সর্বদলীয় সম্মেলনে হিন্দু মহাসভার পক্ষে এম. আর. জয়াকর জিন্নাহের সংশােধনী প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানান। তিনি বলেন, জিন্নাহ তার দিল্লী প্রস্তাব থেকে সরে আসছেন। জিন্নাহ যে সংশােধনী প্রস্তাব দেন সর্বদলীয় সম্মেলনে তা গৃহীত হয়নি। পাঞ্জাবের হিন্দু, শিখরা প্রবল আপত্তি জানায়। কারণ পাঞ্জাবের জনসংখ্যার 14% ছিল শিখ। সুতরাং শিখরা দাবী করে যে, যদি মুসলিমরা সংখ্যালঘু হয়েও রক্ষাকবচ চায়, তবে শিখরা 14% হলেও আইনসভায় তাদের 30% আসন দিতে হবে। কারণ ইংরাজ পাঞ্জাব অধিকার করার আগে পাঞ্জাব শিখদের অধীনেই ছিল। সর্বদলীয় সম্মেলনে এই মতপার্থক্য নিয়ে 1928 খ্রিষ্টাব্দে কলিকাতায় কংগ্রেসের সর্বদলীয় সম্মেলনে নেহেরু রিপোর্ট গৃহীত হয়। জিন্নাহ পুনরায় দাবী করেন যে, বাড়তি ক্ষমতা বা Residuary Power রাজ্যের হাতে দিতে হবে। পাঞ্জাব ও বাংলায় মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতে মুসলিমদের জন্যে আইনসভায় আসন সংরক্ষণ করতে হবে। তেজবাহাদুর সাপ্রু প্রস্তাব দেন, জিন্নাহের দাবী মেনে নিয়ে ব্যাপারটার শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি করা হোক। কিন্তু বহু সদস্য তাতে রাজী না হওয়ায় কলকাতা সর্বদলীয় সম্মেলনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ দুভাগ হয়ে যায়।
Advertisement