দিল্লির মামলুক সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ

- October 04, 2019
নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (শাসনকাল: ১২৪৬-১২৬৬) ছিলেন দিল্লির অষ্টম মামলুক (দাস বংশ) সুলতান। আলাউদ্দিন মাহমুদ শাহের পদচ্যুতির পর চল্লিশ চক্রের নায়ক গিয়াসউদ্দিন বলবন (বাহাউদ্দিন) এর সহায়তায় ১৬ বছর বয়সে নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ সিংহাসনে বসেন। তিনি ইলতুৎমিসের জ্যেষ্ঠপুত্র নাসিরউদ্দিন মাহমুদের পুত্র ছিলেন। পিতামহ ইলতুৎমিসের কোন গুণই তার ছিলনা। তিনি ছিলেন দুর্বলচিত্ত, দয়ালু, ধর্মভীরু, ন্যায়পরায়ণ ও নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। তার জীবনযাত্রা ছিল সহজ, সরল ও অনাড়ম্বর। তিনি কোরান নকল করে সময় কাটাতেন। তিনি রাজকার্যে হস্তক্ষেপ করতেন না — বাহাউদ্দিন এবং চল্লিশ চক্র-ই এই দায়িত্ব পালন করতো। ইলতুৎমিস চল্লিশ চক্র প্রতিষ্ঠা করেন, রাজিয়ার মৃত্যুর পর তার ক্ষমতা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায় এবং নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে আরো বৃদ্ধি পায়। নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ নামেমাত্র সুলতান ছিলেন, প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন আমিররা।
Sultan Nasiruddin Mahmud Shah
এই সময় চল্লিশ চক্রের নেতা বাহাউদ্দিন রাষ্ট্রের প্রকৃত শাসকে পরিণত হন। ১২৪৯ খ্রিস্টাব্দে নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের সঙ্গে বাহাউদ্দিন নিজ কন্যার বিবাহ দেন এবং নায়েব-ই-মামলিকাৎ (প্রধানমন্ত্রী) পদ গ্রহণ করেন এবং উলুঘ খা উপাধি পান। এর ফলে তিনি রাষ্ট্রে অপ্রতিহত শক্তির অধিকারী হন। এরপর তিনি রাষ্ট্র সকল গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে নিজের আত্মীয় স্বজন নিয়ােগ করে সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন।

বাহাউদ্দিনের এই একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে তুর্কি আমিরদের মধ্যে বিক্ষোভ দেখা দেয়। এই সুযােগে ইমামউদ্দিন রাইয়ান নামে জনৈক হিন্দুস্তানি মুসলিম অভিজাত কর্মচারীর পরামর্শে সুলতান নাসিরউদ্দিন উলুঘ খা-কে (বাহাউদ্দিন) রাজধানী থেকে দূরে হানসি প্রদেশে বদলি করেন। এর ফলে ইমামউদ্দিন রাইয়ান দরবারে প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী হন। এদিকে তুর্কি অভিজাতরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে উলুঘ খা-কে দিল্লি ফিরে আসতে অনুরােধ জানান। বাহাউদ্দিন সসৈন্যে দিল্লি ফিরে এলে সুলতান তার প্রতি আনুগত্য জানান। ১২৫৪ খ্রিস্টাব্দের এই ঘটনাকে নিরব প্রাসাদ বিপ্লব নামে পরিচিত। ১৯৫৪ থেকে ১২৬৬ খ্রিঃ অর্থাৎ নাসিরউদ্দিনের মৃত্যু পর্যন্ত উলুঘ খা নায়েব-ই-মামলিকাৎ পদে বহাল থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন।

১২৫৪-১২৬৬ খ্রিস্টাব্দ এই কালপর্বে বাহাউদ্দিনের নির্দেশেই রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালিত হত এবং এ সময় রাষ্ট্রের সংহতি প্রতিষ্ঠায় তিনি যথাযােগ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি দোয়াব অঞ্চলে পর পর কয়েকটি অভিযান চালিয়ে বিদ্রোহী রাজা ও জমিদারদের সম্পূর্ণভাবে দমন করেন। ১২৪৯ খ্রিস্টাব্দে সৈফউদ্দিন হাসান মুলতান দখল করলে বাহাউদ্দিন পুনরুদ্ধার করেন। এর কয়েক বৎসর পর মুলতান ও উচ-এর শাসনকর্তা কিসলু খা বিদ্রোহ ঘােষণা করলে তিনি তাকে দমন করেন। এ সময় মােঙ্গলরা পাঞ্জাব দখল করলে তিনি মােঙ্গল নেতা হলাগু-র সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করেন এবং তাদের কাছ থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের নিরাপত্তার আশ্বাস আদায় করেন।

বাংলার শাসনকর্তা তুঘান খা বিদ্রোহ ঘোষণা করলে বাহাউদ্দিন তাকে দমন করেন। তুঘান খা-র মৃত্যুর পর মুঘিসউদ্দিন উজবেক বাংলার স্বাধীনতা ঘােষণা করেন (১২৫৩ খ্রিঃ)। ১২৫৭ খ্রিস্টাব্দে কামরূপ আক্রমণ করতে গিয়ে তার মৃত্যু হলে বাংলা আবার দিল্লির অন্তর্ভুক্ত হয়। এর তিন বছর পর কারার শাসনকর্তা আরসনাল খা গৌড় দখল করে স্বাধীনভাবে বাংলায় রাজত্ব করতে থাকেন। নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে বাংলা স্বাধীন ছিল। তিনি কালিঞ্জর, রণথম্বাের ও গােয়ালিয়রের হিন্দু রাজাদের দমন করেন।

১২৬৬ খ্রিস্টাব্দে ১৮ ফেব্রুয়ারি ৩৬ বছর বয়সে নিঃসন্তান অবস্থায় নাসিরউদ্দিনের মৃত্যু হলে তার প্রধানমন্ত্রী ও শশুর গিয়াসউদ্দিন বলবন সিংহাসনে বসেন। নাসিরউদ্দিনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ইলতুৎমিসের বংশের পতন ঘটে। ফেরিস্তা, ইসামি প্রমুখ ঐতিহাসিকরা মনে করেন, ক্ষমতালােভী উলুঘ খা তাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন। ডঃ নিজামি এ বিষয়ে একমত। অপরপক্ষে উলসী হেগ, ডঃ হাবিবউল্লাহ প্রমুখের মতে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক।
Advertisement