ইসলাম ধর্মে নারীর অধিকার ও মর্যাদা

- October 27, 2019
মুসলিম দুনিয়ার অন্যান্য দেশের মতো ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম মহিলাদের অবস্থা ছিল শােচনীয়। একবিংশ শতকে এই অবস্থার উল্লেখযােগ্য পরিবর্তন হয়েছে, একথা বলা যাবে না। সহস্র বছর ধরে সমাজে তথা পারিবারিক জীবনে পুরুষতন্ত্রের প্রভাবে মহিলাদের পুরুষের তুলনায় খাটো করে দেখা হতাে। মনে করা হতো প্রকৃতির নিয়মে সবদিক থেকেই পুরুষের তুলনায় মহিলাগণ সীমিত ক্ষমতা বা দক্ষতার অধকারী। মনে করা হতাে যে পুরুষের কাছে মহিলার শর্তহীন আনুগত্যই পারিবারিক জীবনে শান্তি আনে। হজরত মহম্মদের আবিভাবের পূর্বে আরবদেশে বিরাজ করত অজ্ঞতার। সেই অজ্ঞতার যুগকে পরিভাষায় বলা হয় জাহিলিয়া যুগ। সেই যুগে মহিলাদের অবস্থা ছিল জন্তু জানােয়ারের মতাে।
ইসলাম ধর্মে নারীর অধিকার ও মর্যাদা
কোনাে আইনের অধিকার তাদের ছিল না। কন্যা সন্তানের অনেকক্ষেত্রে জীবন্ত সমাধি দেওয়া হত। একই পুরুষের অসংখ্য স্ত্রী থাকতাে। কন্যা সন্তানের জন্মকে দুর্ঘটনা মনে করা হতাে। কন্যা সন্তানের যখন সাত বা আট বছর বয়স থাকতাে তখনই জোর করে তাদের বিবাহ দিয়ে দেওয়া হতাে। যুদ্ধবিগ্রহের প্রাচুর্য ও মদ্যপানের রেওয়াজ, সমাজে মহিলাদের দুরবস্থা বৃদ্ধি করেছিল। আরব সমাজে, সেই জাহিলিয়ার পটভূমিতে লুণ্ঠন বা ক্রয় করে বালিকাদের বিয়ে করার রেওয়াজ ছিল। মহিলাদের পুরুষের সম্পতি ছাড়া আর কিছু মনে করা হতাে না। এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে জাহিলিয়ার পটভূমিতে অর্থাৎ প্রাক-ইসলামীয় আরবদেশে অবস্থা শােচনীয় ছিল এই তত্ত্ব অনেক গবেষক বিশ্বাস করেন না। তাদের মতে ইসলামের আবির্ভাবের অন্ততঃ একশত বছর আগে থেকে আরব সমাজে মহিলাদের মর্যাদার চোখে দেখা হতাে। তাদের কিছু কিছু অধিকারও ছিল এবং তারা সীমিতভাবে কিছুটা স্বাধীনতা ভােগ করতেন।[1][2]

কোন কোন আধুনিক চিন্তাবিদ মনে করেন যে প্রাক-ইসলামীয় আরব দুনিয়ার ধর্মীয় ক্ষেত্রেও মহিলাদের একটা মর্যাদা ছিল। প্রমাণ স্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে আরব জগতে সেই সময়ে বেশ কয়েকজন কাহিনাহ বা মহিলা পুরােহিত ছিলেন। এছাড়া স্ত্রী দেবতার ধারণাও সেই প্রাক মুসলিম আরব সমাজে ছিল।[3] অনেক গবেষক আলােচনা করেছেন যে হজরত মহম্মদ তথা ইসলামের আবির্ভাবের পর যে ধর্মীয় সংস্কারের সূত্রপাত হয় তা সমাজে মহিলাদের মর্যাদা বৃদ্ধির সহায়ক হয়েছিল। পবিত্র কোরান পুরুষ ও নারী, উভয়কেই সমানভাবে আহ্বান করে ধর্মের পথে চলার জন্য : লো! যে লোকেরা আল্লাহর নিকটে আত্মসমর্পণ করে এবং যে মহিলারা আত্মসমর্পণ করে এবং যারা বিশ্বাস এনেছে এমন মহিলারা এবং পুরুষ যারা তাদের পবিত্রতা রক্ষা করে এবং যে মহিলারা হেফাযত করে এবং যে পুরুষরা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং যে মহিলারা আল্লাহকে স্মরণ করে তাদের জন্য ক্ষমা ও এক মহা পুরস্কার প্রস্তুত করেছে।"(পবিত্র কোরাণের এই অংশটি Asghar Ali Engineer এর গ্রন্থের 44 পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত হয়েছে)।

ইসলামে নারীর অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। একটি মত অনুযায়ী সম্পত্তির উপর মুসলিম নারীর অধিকার সীমিত কারণ স্ত্রী যদি প্রচুর সম্পত্তির মালিক হন এবং স্বামী যদি দরিদ্রও হন, স্বামীর দায়িত্ব হল স্ত্রীকে ও সম্ভানাদিকে নিজের ক্ষমতায় লালন করা। একজন মুসলিম নারী নিজ সম্পত্তির কোন অংশ স্বামী তথা সন্তানাদিকে পালন করতে ব্যয় করতে বাধ্য নন।[4][5] উপরােক্ত বক্তব্যের যারা সমর্থক তারা মনে করেন যে হজরত মুহম্মদ সমাজে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন।

এই প্রসঙ্গে হজরত মুহম্মদের কয়েকটি পদক্ষেপের উল্লেখ করা হয় যেমনঃ বহুবিবাহের ক্ষেত্রে স্ত্রীর সংখ্যা মাত্র চারজনে সীমাবদ্ধ রাখার ব্যবস্থা, কন্যা সন্তান হত্যাকে অপরাধ বলে ঘােষণা করা, সম্পত্তির উবিকার প্রসঙ্গে নারীর অধিকার সুনিশ্চিত করতে প্রয়াসী হওয়া, দেলমেহের বা বিবাহের পণকে নববধূর পুরস্কার হিসেবে ঘােষণা করা এবং বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের সময় নারীর অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে আরব দেশীয় আইনে নূতন মাত্রা সংযােজন করা ইত্যাদি। সমাজে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে হজরত মুহম্মদ অনেক ক্ষেত্রে নিজের পারিবারিক জীবনকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। নিজের দুধমাতা বিবি হালিমার প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা প্রদর্শন এক্ষেত্রে উল্লেখযােগ্য। সীরাত (হজরত মুহম্মদের জীবনী) সাহিত্যে এর প্রতিফলন আছে। বৃহৎ জনজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করার অধিকারও নারীকে দেওয়া হয়েছে । এছাড়া বিবাহ বিচ্ছেদের পরে একজন মুসলিম নারীর পুনর্বিবাহেরও অধিকার আছে। বিদ্যার্জনের ক্ষেত্রেও মুসলিম নারীকে উৎসাহ দান করা হয়েছে।[6]

এটা মনে রাখা দরকার যে ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব সমাজে মহিলাদের পুরুষের সমান অধিকার দেওয়া হয়েছিল, এই তত্ত্ব সকল গবেষক গ্রহণ করেন না। সমালােচকগণ মনে করেন যে, মুসলিম সমাজে নারীকে খুব সীমিত অধিকার দেওয়া হয়েছে। তারা বলেন যে গতানুগতিক পুরুষতান্ত্রিক মুসলিম সমাজে ছেলেরা পিতার সম্পত্তির সিংহভাগ অধিকার করেন। এই সমালােচকগণ মনে করেন যে হজরত মহম্মদের প্রয়াস সত্ত্বেও মুসলিম সমাজে নারীকে সমানাধিকার দেওয়া সম্ভব হয় নি।[7]

স্যার উইলিয়াম ম্যুর মনে করেন যে হজরত মুহম্মদ মহিলাদের জন্য ইসলামে যেই স্থান নির্দিষ্ট করেছেন তা পুরুষের তুলনায় নিকৃষ্ট এবং পুরুষের সেবায় জীবন অতিবাহিত করা ছাড়া নারীর আর কোনাে ভূমিকা নেই। পুরুষ ইচ্ছামতাে অনায়াসে এবং নিঃশব্দে নিজের জীবন থেকে বিতাড়িত করতে পারে নারীকে (Anowar Hossain)। প্রাক্তন আই. এ. এস. অফিসার S. M. Murshed-এর একটি ছোট প্রবন্ধে আমাদের আলােচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। প্রবন্ধটির নাম “What the Koran says about the veil" প্রবন্ধটি দ্য স্টেটম্যান পত্রিকায় সতেরাে নভেম্বর, ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি প্রখ্যাত চিত্রাভিনেত্রী ও সমাজসেবী শাবানা আজমীর পর্দা প্রথা সংক্রান্ত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দিল্লীর জামা মসজিদের ইমাম বুখারীর প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত, শাবনা মন্তব্য করেছিলেন যে কোরান নারীর পর্দা বা হেজাবের কথা বলে না। ইমাম বুখারী, স্বীকার করে না যে শাবানার কোরান ব্যাখ্যার অধিকার আছে। ইমাম বুখারী বলছেন যে কোরান পর্দা বা হেজাব অবলম্বনের কথা বলে। S. M. Murshed-এর প্রবন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি ছাপা হয়েছে তা হল প্রখ্যাত টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা ইসলামী পােষাকে মায়ের সঙ্গে মক্কা ভ্রমণ করছেন। শাবনার মতাে শিক্ষিত মহিলার কোরান ব্যাখ্যা করার অধিকার আছে। এইজন্য তার কোন ইমামের বা মৌলবীর কাছে যাওয়ার প্রয়ােজন নেই। কোন কোন মৌলবী বা উলামা এই পরিস্থিতিকে সহজভাবে মেনে নেননি, কারণ এটা চলতে থাকলে সমাজে তাদের প্রতিপত্তি কমে যাবে।

Advertisement
জ্ঞানী ব্যক্তির কোরাণ ব্যাখ্যার অধিকারকে বলে ইজতেহাদ। এটা একটা গণতান্ত্রিক অভ্যাস। প্রাক ঔপনিবেশিক যুগে, যথন পাস পাশ্চাত্য তথা ইওরােপের নিরঙ্কুশ সামরিক ও রাজনৈতিক কতৃত্ব স্থাপিত হয়নি, যখন পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইসলাম রাজশক্তি হিসেবে তার বিজয় পতাকা উড্ডয়ন রাখতে সক্ষম হয়েছিল, সেই পটভূমিতে মুসলিম সমাজে ইজতেহাদের মর্যাদা ছিল। ভারতে সুলতানী তথা মােঘল যুগেও এর মর্যাদা ছিল। তাই মুসলিম রাজশক্তি অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়েই তাঁর সাম্রাজ্যকে বজায় রাখতে ও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ১৯ শতক থেকে যখন পাশ্চাত্যের সামরিক শক্তি তাদের ঔপনিবেশিক সাহাজ্য গড়ে তুলতে সাহায্য করে তখন মুসলিম রাজশক্তির বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে ইসলাম ধর্ম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষাকে আর তেমন উৎসাহ দিতে উলেমা প্রস্তুত ছিলেন না। তাদের আশংকা হল যে বিজয়ীর ধর্ম খ্রিস্টধর্ম এবং অন্যান্য ধর্ম সেক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ইজতেহাদের গুরুত্বও কমে গেল কারণ ইজতেহাদ যুক্তিবাদ ও পরীক্ষা নিরীক্ষাকে গুরুত্ব দেয়। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে মুসলিম মহিলাদের আক্ষরিক অর্থে শাস্ত্র মেনে চলার কথা উলেমা বলেছিল।

ইজতেহাদের পথ আংশিকভাবে রুদ্ধ করে দেওয়ার ফলে মুসলিম মহিলাদের সার্বিক বিকাশের পথ, স্বতন্ত্র ও স্বাধীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে ওঠার পথও অনেকটাই সংকীর্ণ হয়েছিল। বলা যায় খিলাফৎ আন্দোলনের সময় থেকে ভারতীয় মুসলিম সমাজে উলেমার প্রতিপত্তি ধীরে ধীরে কমে যায়। এর প্রভাব সব সময়ে মুসলিম মহিলাদের পক্ষে ভাল হয়নি। সঙ্গীত, পােষাক ইত্যাদি নানা বিষয়ে ক্রমাগত ফতােয়া জারি করে মুসলিম মহিলাদের কোনঠাসা করার প্রয়াস একশ্রেণীর উলেমার মধ্যে দেখা যায়। বিংশ ও একবিংশ শতকে মুসলিম মহিলার স্বাধীনতা রক্ষার্থে ভারতীয় উপমহাদেশে একাধিক জ্ঞানী গুণী ও শাস্ত্র পুরুষ নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন। বিভিন্ন N.G.O. ও মুসলিম নারীর উপর কোনাে অবিচার হলে সােচ্চার হয়েছে।

বিংশ শতকের ঠিক সূচনায় বেহেস্তী জেওয়ার (স্বর্গীয় অলংকার) নামে একটি উর্দু বই লেখেন দেওবন্দের দার-উল-উলুম মাদ্রাসার প্রখ্যাত আলিম মৌলানা আশরফ আলী থানই। এখানে কোরান, হাদিস অক্ষরে পালন করে মুসলিম মহিলাদের শিক্ষিত করার কথা বলা হয়েছে। উপমহাদেশে বিভিন্ন ভাষায় বইটির অনুবাদ হয়েছে। পাকিস্তানের প্রাক্তন সেনা শাসক জিয়া-উল-হক, যিনি বল প্রয়ােগে অর্জিত ক্ষমতা বৈধতা দিতে ধর্মীয় মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, তিনি উলমাকে তুষ্ট করতে পাকিস্তানী মহিলাদের মধ্যে উপরােক্ত বেহেস্তী জেওয়ার গ্রন্থটিকে জনপ্রিয় করতে প্রয়াসী হন। শিক্ষায় অগ্রসর ও সমাজ সচেতন এক শ্রেণীর পাকিস্থানি মহিলাগণ জেনারেল জিয়ার প্রয়াসের বিরােধীতা করেছিলেন। অর্থাৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি (পাকিন্তান, বাংলাদেশ ইত্যাপির উদাহরণ থেকে) যে ধর্মীয় মৌলবাদ, ও সামরিক শাসন অনেক সময়েই পরস্পরের উপর নির্ভরশীল হয়ে শক্তি সঞ্চয় করে এবং ওই পরিস্থিতি শিক্ষিত ও গণতন্ত্র প্রেমী মহিলাদের অনুকূল হয় না।

জ্ঞানী-গুণী মুসলিম যারা স্যার উইলিয়াম মূরের নারী সংক্রান্ত বক্তব্য, অর্থাৎ ইসলাম মহিলাদের হেয় করে, এই তত্ত্ব স্বীকার করেন না তারা ইসলামের ইতিহাস থেকে উদাহরণ দিয়ে দেখান যে ইসলামের ধাপদী যুগে মহিলাগণ রাষ্ট্রনীতি, যুদ্ধ, কবিতা, বিদ্যাচর্চা ইত্যাদি সকল বিষয়েই তাদের দক্ষতা প্রদর্শন করছিলেন। বিশেষতঃ হজরত মহম্মদের পরিবারের মহিলাদের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই প্রসঙ্গে ১৯ শতকের বিখ্যাত পণ্ডিত সৈয়দ আমীর আলি বিরচিত The Spirit of Islam-এর উল্লেখ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে সুফী আন্দোলন মহিলাদের রক্ষণশীল তথা শাস্ত্রনুসারী ইসলামের থেকে অধিক মর্যাদা দেয় ও ধর্মীয় উদারতার কথা বলে। বিশ্বের শান্তি ও সৃজনশীলতা নির্ভর করে ধর্মীয় ঔদার্য্যবােধের মধ্যে ও ইজতেহাদ কেন্দ্রীক যুক্তিবাদের মধ্যে।
Advertisement