মহম্মদ-বিন-তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তর পরিকল্পনা

- October 12, 2019
মহম্মদ-বিন-তুঘলকের পরিকল্পনাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত হল ১৩২৮-১৩২৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি থেকে দক্ষিণ ভারতের দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর। সুলতান কুতুবউদ্দিন মুবারক খলজি দেবগিরির নাম পরিবর্তন করে রেখেছিলেন কুতুবাবাদ। আবার মহম্মদ-বিন-তুঘলক দেবগিরির নতুন নামকরণ করেন দৌলতাবাদ।
sultan uhammad bin tughlaq transfer of capital
রাজধানী স্থানান্তরের উদ্দেশ্য: জিয়াউদ্দিন বরনি-র মতে, দেবগিরি নগরটি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল। এর ফলে এই স্থান থেকে সমগ্র ভারতের উত্তর ও দক্ষিণের রাজ্যগুলি ভালােভাবে শাসন করা যেত। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের সন্নিকটে অবস্থিত হওয়ায় দিল্লিতে সর্বদাই মােঙ্গল আক্রমণের সম্ভাবনা ছিল। অন্যদিকে দেবগিরি সেই আশঙ্কা থেকে মুক্ত ছিল। দীর্ঘদিনের শাসনের ফলে উত্তর ভারতে সুলতানি শাসন সুদৃঢ় হয়েছিল, কিন্তু নববিজিত দক্ষিণ ভারতে সুলতানি শাসনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে সেখানে একটি কেন্দ্র স্থাপনের প্রয়ােজন ছিল। আর্থিক দিক থেকে দক্ষিণ ভারত ছিল সমৃদ্ধশালী। দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে সরাসরি ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে তার বিপুল সম্পদ কাজে লাগাবার উদ্দেশ্যে সেখানে একটি রাজধানী প্রতিষ্ঠার প্রয়ােজন হয়। মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা বলেন যে, দিল্লির নাগরিকরা নানা কুরুচিপূর্ণ পত্র লিখে রাতে সেগুলিকে সুলতানের দরবারে ফেলে দিত। তাই তাদের শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে সুলতান তাদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে দেবগিরিতে যেতে বাধ্য করেন। মহম্মদ ইসামির তার মতে, দিল্লির জনসাধারণ সম্পর্কে সুলতান সন্দেহপরায়ণ ছিলেন। তাদের ক্ষমতা ধ্বংস করার জন্যই তাদের দেবগিরিতে যেতে বাধ্য করা হয়। ডঃ হাবিবউল্লাহ, ডঃ মহম্মদ হাবিব, ডঃ মেহেদি হােসেন, ডঃ গার্ডনার ব্রাউন প্রমুখ ঐতিহাসিক বলেন যে, দক্ষিণ ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা কম হওয়ায় সেখানে সুলতানি শাসনের ভিত ছিল খুবই দুর্বল। এই কারণে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সুলতান দক্ষিণ ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং দিল্লি থেকে দক্ষিণ ভারতে মুসলিমদের নিয়ে যান। এছাড়া তিনি দেবগিরিকে দক্ষিণ ভারতের মুসলিম সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত করার কথা ভাবেন এবং মুসলিম সন্তদের দেবগিরিতে গিয়ে খানকা স্থাপন ও ধর্ম প্রচারের ডাক দেন।

জনশূন্য দিল্লীর বর্ণনা: ইবন বতুতা বলেন যে, সুলতানের হুকুমে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা দিল্লির সব অধিবাসীকেই দেবগিরিতে যেতে হয়। তিনি বলেন যে, দিল্লির একজন খোঁড়া এবং একজন অন্ধ ব্যক্তি দিল্লি ত্যাগে অস্বীকৃত হলে সুলতান খোঁড়া ব্যক্তিটির মৃত্যুদণ্ড দেন এবং অন্ধ লােকটিকে টেনে হিচড়ে দেবগিরিতে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বলা হয় যে, শেষ পর্যন্ত অন্ধ ব্যক্তিটির কেবলমাত্র একটি পা দেবগিরিতে পৌছায়। ইসামি বলেন যে, দিল্লি একেবারে জনমানবশূন্য হয়ে যায়। জিয়াউদ্দিন বরনি এক জায়গায় মন্তব্য করছেন যে, দিল্লিতে একটি কুকুর বা বিড়ালও ছিল না। বলা বাহুল্য, এ বক্তব্য সঠিক নয়। আধুনিক ঐতিহাসিকরা বলেন যে, সুলতান কখনােই দিল্লির সকল জনসাধারণকে দিল্লিত্যাগের নির্দেশ দেন নি দিল্লি কখনােই রাজধানীর গৌরব থেকে বঞ্চিত হয় নি বা জনশূন্য ও পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হয় নি।

রাজধানী স্থানান্তরের সমালোচনা: ১৩২৭ থেকে ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীতে প্রাপ্ত দুটি সংস্কৃত লিপি থেকে জানা যায় যে, ঐ সময় দিল্লীতে হিন্দুরা সুখেই বাস করছিল। মহম্মদ-বিন-তুঘলককে সুসাসক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। মাসালিক-ই-অবসর গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, দিল্লি ছিল সুলতানের প্রথম রাজধানী এবং দ্বিতীয়টি ছিল দৌলতাবাদ। তারিখ-ই-মুবারকশাহিতে বলা আছে যে, সাধারণ মানুষ এবং সমাজের নিম্নশ্রেণির লােকদের দিল্লি ত্যাগ করতে হয় নি। ডঃ মেহেদি হােসেন বলেন যে, দিল্লির হিন্দুদের দক্ষিণে যেতে হয় নি। মুতলাব-উৎ-তালিবন গ্রন্থে মহম্মদ বলক লিখেছেন যে, কেবলমাত্র দিল্লির গণ্যমান্য মুসলিম আমির-ওমরাহ, সেনাবাহিনীর লােকজন ও তাদের আত্মীয়দেরই দৌলতাবাদে যেতে হয়, সাধারণ মানুষদের নয়। ডঃ নিজামি বলেন যে, সুলতানের রাজধানী স্থানান্তর নিয়ে এত বিরূপ সমালােচনার কারণ হল বরনী, ইসামি ও ইবন বতুতার বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য। জিয়াউদ্দিন বরনি দিল্লি থেকে অভিজাত ও সাধু-সন্তদের অপসারণ মানতে পারেন নি—তাই তার কাছে দিল্লি শ্মশানভূমিতে পরিণত হয়। ইসামি-র বৃদ্ধ পিতামহ দৌলতাবাদ যাওয়ার পথে তিলপতে মারা যান। এ কারণে তিনি সুলতানের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। ইবন বতুতা দিল্লিবাসীর দুর্দশার কথা শুনেছেন অন্যের মুখে। এইসব কারণে এই ঘটনাকে ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

রাজধানী স্থানান্তরের ব্যর্থতা: দিল্লি থেকে দেবগিরির দূরত্ব ছিল ৭০০ মাইল। এই দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সেজন্য পথের দুধারে ছায়াপ্রদ বৃক্ষের চারা রােপিত হয় এবং সরাইখানা নির্মিত হয়। সরকারি ব্যয়ে খাদ্য ও পানীয়ের ব্যবস্থা করা হয়। এ সত্ত্বেও প্রচণ্ড গ্রীষ্মে দীর্ঘ ৪০ দিন ধরে কষ্টকর এই অভিযানে সামিল হওয়া সকলে কিন্তু গন্তব্যে পৌছাতে পারে নি। পথেই অনেকের মৃত্যু হয়। যারা পৌছায় তারা সুলতানের সমালােচনায় মুখর হয়। শেষ পর্যন্ত ১৩৩৫-১৩৩৭ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আবার দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন এবং জনসাধারণকে দিল্লি ফিরে যেতে বাধ্য করেন। এর ফলে জনসাধারণের দুর্দশা ও রাজকীয় অর্থের অপচয় বৃদ্ধি পায়। সুলতানের রাজধানী স্থানান্তরের পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার জন্য নানা কারণকে দায়ী করা হয় - রাজধানী স্থানান্তরের জন্য দিল্লির সকল মুসলিম নাগরিকদের দিল্লি ত্যাগের প্রয়ােজন ছিল না, কেবলমাত্র সরকারি কর্মচারীদের দৌলতাবাদে নিয়ে গেলেই চলত। পূর্বপুরুষদের বাসস্থান ও জমি জমা ছেড়ে স্থানান্তরে গমন দিল্লির নাগরিকরা মানতে পারে নি। দিল্লির মুসলিম নাগরিকরা হিন্দু সংস্কৃতি দ্বারা পরিবেষ্টিত দেবগিরিতে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে নি। রাজধানী হিসেবে দিল্লি দৌলতাবাদের চেয়ে অনেক বেশি উপযােগী ছিল এবং দিল্লি থেকেই ভারতের অন্যান্য অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ ছিল। মােঙ্গল আক্রমণ প্রতিরােধের জন্য দৌলতাবাদ নয়, দিল্লিই ছিল যােগ্য স্থান।

রাজধানী স্থানান্তরের ফলাফল: দিল্লি থেকে দেবগিরি এবং পুনরায় দেবগিরি থেকে দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তরের প্রত্যক্ষ ফল ছিল বিপর্যয়কারী। এর ফলে রাজকোষের বহু অর্থ ব্যয় হয়, মানুষ চরম দুর্দশাগ্রস্ত হয়, সুলতান মানুষের সমর্থন হারান, জনচক্ষে সুলতানের মর্যাদাহানি হয় এবং দিল্লি নগরী তার পূর্বগৌরব ও সমৃদ্ধি হারিয়ে ফেলে। ঐতিহাসিক লেনপুল-এর মতে, দৌলতাবাদ হল সুলতানের বিপথগামী শক্তির স্তম্ভ-বিশেষ। এই পরিকল্পনার পরােক্ষ ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। রাজধানী স্থানান্তর উপলক্ষে দিল্লি থেকে দেবগিরি পর্যন্ত রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে যােগাযােগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। এর ফলে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। মহম্মদ-বিন-তুঘলকের সঙ্গে যে সব সাধক দেবগিরিতে উপস্থিত হন, তাদের মাধ্যমে সেখানে সুফিবাদ প্রচারিত হয়। উত্তর ভারতের তুর্কি সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় ও সামাজিক ভাবধারা দক্ষিণ ভারতে বিস্তৃত হওয়ায় উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে এক নতুন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দক্ষিণ ভারতে এক মিশ্র সংস্কৃতির উদ্ভব হয়। ড: নিজামী মনে করেন, মহম্মদ-বিন-তুঘলকের কর্তৃক দৌলতাবাদে মুসলিম জনসমাবেশের পরোক্ষ ফল হল বাহমনি রাজ্য সৃষ্টি।