মহম্মদ বিন তুঘলকের পরিকল্পনা

- October 20, 2019
মহম্মদ বিন তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১ খ্রিস্টাব্দ) দিল্লির সুলতানী শাসকদের মধ্যে একজন বিতর্কিত চরিত্র। তিনি প্রভুত জ্ঞানের অধিকারী হলেও শাসক হিসেবে ব্যর্থতার পরিচয় দেন। তার মস্তিষ্ক ছিল নানা পরিকল্পনার জন্মভূমি। সিংহাসনে আরােহণের পর প্রজাকল্যাণের তাগিদে তিনি বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। জিয়াউদ্দিন বরনি তার তারিখ ই ফিরােজশাহি গ্রন্থে এ ধরনের পাঁচটি পরিকল্পনা উল্লেখ করেছেন। তিনি এগুলির কোনও সন তারিখের উল্লেখ করেন নি। এই পরিকল্পনা গুলি হল দোয়াবে ভূমি রাজস্ব বৃদ্ধি, দিল্লি থেকে দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর, তামার নােট প্রচলন, খোরাসন অভিযান এবং কারাচল অভিযান। ১৩২৫ থেকে ১৩৩৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করা হয়।
muhammad bin tughlaq five experiments
দোয়াবে ভূমি রাজস্ব বৃদ্ধি: রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী দোয়াব অঞ্চলে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। জিয়াউদ্দিন বরণীর মতে, ভূমি রাজস্বের হার ৫ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করেন। আবার অন্যস্থানে এর পরিমাণ লিখেছেন ১০ থেকে ২০ গুন। কর বৃদ্ধির সময় সম্পর্কে অনেকে ১৩২৬ থেকে ১৩২৭ খ্রিস্টাব্দের কথা বলেন। দুঃখের কথা এই সময় অনাবৃষ্টির ফলে দোয়াব অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দখা যায়। কিন্তু সরকারী কর্মচারীরা নির্মমভাবে রাজস্ব আদায় করতে থাকেন। যদিও সুলতান প্রচুর ঋণ দিয়ে ও জলসেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষক কুলের দুঃখ-কষ্ট কিছুটা উপশমে যত্নবান হয়েছিলেন কিন্তু তার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যায়।

রাজধানী স্থানান্তর: দ্বিতীয় ব্যর্থ ও বিতর্কিত পরিকল্পনাটি হল দিল্লী থেকে দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর। ১৩২৬ থেকে ১৩২৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এই পরিকল্পনাটি গ্রহণ করেন এবং দেবগিরির নতুন নামকরণ করেন দৌলতাবাদ। একথা সত্য, দিল্লীর তুলনায় দেবগিরির অবস্থান ছিল সাম্রাজ্যের মধ্যস্থলে। সুতরাং মােঙ্গল আক্রমণের প্রকোপ থেকে সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা রক্ষার কথা বিবেচনা করলে দেখা যায় পরিকল্পনাটি যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু বাস্তব রূপায়ণের ক্ষেত্রে মহম্মদ বিন তুঘলক চরম দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। শুধু মাত্র সরকারী দপ্তর স্থানান্তরিত করলেই তার উদ্দেশ্য সাধিত হত, কিন্তু দিল্লীর যাবতীয় লােককে ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেবগিরিতে স্থানান্তরিত করার ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। বরণীর বিবরণ থেকে জানা যায় যে, কিছুদিনের মধ্যে মহম্মদ বিন তুঘলক সকলকে পুনরায় দিল্লীতে ফিরে যাওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের সময় জনগণ অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার সম্মুখীন হয়। এর ফলে সুলতানের বিরুদ্ধে জনগণের মনে ব্যাপক অসন্তোষ ও বিদ্বেষভাব সৃষ্টি হয়।

তামার নােট প্রচলন: সুলতানের অপর একটি বহু সংস্কারমূলক ও সমালােচিত পদক্ষেপ হল, তামার নােটের প্রচলন। এশিয়ার অন্যত্র যথা চীন ও ইরানে এই ধরনের নােটের প্রচলন ছিল। প্রসঙ্গত বলা যায় এই সময় ভারতে ও এশিয়ার অন্যত্র রূপার ঘাটতি দেখা যায়। মুদ্রানীতি সংস্কারের জন্য তিনি একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং কয়েকটি ধরনের স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন করেন। এদিকে যুদ্ধ বিগ্রহ ও শাসনকার্যের ব্যয়ভার বৃদ্ধির ফলে রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছিল। এছাড়া চতুর্দশ শতাব্দীতে বিশ্বের বাজারে রূপার যােগান হ্রাস পায়। এই অবস্থায় সুলতান তাম্র মুদ্রার প্রচলনের সিদ্ধান্ত নেন। চীনে কুবলাই খা এই ধরনের মুদ্রার প্রচলন করেন। ইরানেও এ ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছিল। এই সব দুষ্টান্তে উৎসাহিত হয়ে ১৩২৯ খ্রীষ্টাব্দে মহম্মদ বিন তুঘলক তাম্র নােট প্রচলন করেন। কিন্তু সুলতান তামার নােট যাতে কেউ নকল করতে না পারে সে ধরনের কোন সতর্কতা অবলম্বন করেননি ফলে তামার নােট ব্যাপকভাবে জাল হতে লাগল। এর ফলে মুদ্রার মূল্য একেবারে কমে যায় এবং দেশের অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ে। সুলতান বাধ্য হয়ে তামার নােট প্রচলন বন্ধ করেন।

খোরাসন অভিযান: মহম্মদ বিন তুঘলক মধ্য এশিয়ার খােরাসান এবং ইরাক জয়ের এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। বরণী সম্ভবত ভৌগােলিক জ্ঞানের অভাবের জন্যে খােরাসান অঞ্চলের সাথে ইরাককে যুক্ত করেছেন। ফেরিস্তা লিখেছেন: খােরাসান ও তুরানের কিছু অভিজাত সুলতানের দরবারে অতিথি হিসেবে অবস্থান করছিলেন এবং এই খােরাসানের অপদার্থ, অত্যাচারী শাসক আবু সৈয়দের বিরুদ্ধে অভিযান পাঠানাের জন্য সুলতানকে প্ররােচিত করেছিলেন। তবে মহম্মদ বিন তুঘলক কি উদ্দেশ্যে এই পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, সে বিষয়ে বরণী কিছু বলেননি। ড. নিজামী মনে করেন, ইল খা বংশের পতন এবং তৈমুর লঙের উত্থানের মধ্যবর্তী কালে মধ্য এশিয়ার রাজনীতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে কাজে লাগিয়ে মহম্মদ বিন তুঘলক ঐ অঞ্চলে নিজ কর্তৃত্ব সম্প্রসারিত করতে আগ্রহী হয়েছিলেন। এজন্য তিনি ইজিপ্ট-সহ কয়েকটি বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে মিত্রতা গড়ে তােলেন। কিন্তু এক বছর প্রস্তুতির পর সুলতান এই পরিকল্পনা বাতিল করে দেন। সুলতান দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রচুর অর্থব্যয়ের পরে আকস্মিক কেন এই পরিকল্পনা বাতিল করলেন, সে বিষয়ে বরণী কিছু বলেননি। পরিকল্পনা গ্রহণের আগে তিনি ভৌগােলিক পরিস্থিতিকে বিচারের মধ্যে আনেননি। হিমালয় ও হিন্দুকুশের দুর্গম গিরিবত্ব অতিক্রম করে ঐ দূরদেশে সেনাদল, রসদ ও সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া এবং স্থানীয় উপজাতির বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল লড়াই করে টিকে থাকা ছিল প্রায় অসম্ভব একটা চিন্তা।

কারাচল অভিযান: ১৩৩৭-১৩৮ খ্রিস্টাব্দে সুলতান হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে কারাজল বা কারাচিল বা কুর্মাচল জয়ের জন্য অভিযান পাঠান। ইবন বতুতা ও গার্ডনার ব্রাউনের বিশ্লেষণ থেকে অনুমান করা যায় যে, কারাচল বলতে হিমালয়ের কুমায়ুন গাড়ােয়াল অঞ্চলের কাংড়া জেলার কুলু অঞ্চলকে বােঝানাে হয়েছে। বরণীও এই স্থানটিকে ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী অঞ্চল বলে উল্লেখ করেছেন। বরণী লিখেছেনঃ সুলতান খােরাসান অভিযানের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে কারাচল দখল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ মত গ্রহণযােগ্য নয়। কারণ দিল্লী থেকে খােরাসান অভিযানের পথে হিমালয়ের এই অঞ্চলটি পড়ে না। বরঞ্চ কারাচল পর্বতমালা চীন ও তিব্বত যাত্রাপথের অন্তর্ভুক্ত। সেই কারণে ফেরিস্তা লিখেছেনঃ সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক চীন অভিযানের অংশ হিসেবে কারাচল অভিযান করেছিলেন। কিন্তু মহম্মদ বিন তুঘলক চীন দখল করতে চেয়েছিলেন এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

মহম্মদ বিন তুঘলকের ভাগিনােয় খসরু মালিকের নেতৃত্বে কারাচল অভিযান পাঠানো হয়। সুলতানি বাহিনী ‘জিদ্যা' নামক স্থানটি দখল করতে সক্ষম হলে সুলতান তার বাহিনীকে সেখানেই অবস্থান করার ও কর্তৃত্ব দৃঢ় করার নির্দেশ দেন। কারণ সুলতান জানতেন যে, আরও উচুতে উঠলে সুলতানি বাহিনীর পক্ষে সংকীর্ণ পাহাড়ী পথ ও জলবায়ু বিপজ্জনক হতে পারে। কিন্তু খসরু মালিক জয়ের আনন্দে সংকীর্ণ পথ ধরে আরাে উঁচুতে উঠে যান এবং তিব্বত অভিমুখে এগােতে থাকেন। ইতিমধ্যে বর্ষা নেমে গেলে জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। আকস্মিক প্লেগের আক্রমণ সুলতানি সেনার মনােবল নিঃশেষ করে দেয়। এই সুযােগে পার্বত্য উপজাতি তাদের নিক্ষিপ্ত পাথর ও প্লেগের দাপটে সুলতানি বাহিনী প্রায় নিঃশেষিত হয়ে যায়। অবশ্য সামরিক অভিযান ব্যর্থ হলেও পার্বত্য অধিবাসীরা স্বেচ্ছায় সুলতানকে কর প্রদানে সম্মত হয়। ইবন বতুতা এবং মাসালিক-উল-আসর গ্রন্থে পার্বত্য উপজাতির বশ্যতা স্বীকার ও করদানের প্রসঙ্গ থাকলেও বরণী ও ইসামী সম্ভবত সুলতানের প্রতি অন্ধবিরূপতার কারণে নীরব থেকেছেন।
Advertisement