মৌর্য যুগের কেন্দ্রীয় ও নগর শাসন ব্যবস্থা

- October 20, 2019
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনব্যবস্থা এবং অশােকের সংযােজন নিয়ে মৌর্য শাসনব্যবস্থা (Maurya Administration) গঠিত। মৌর্য শাসনব্যবস্থার মূল কাঠামাে রচনা করেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। পরবর্তীকালে সম্রাট অশােক মুল কাঠামাে অপরিবর্তিত রেখে কিছু নতুন সংযােজন করেন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকা, বৌদ্ধগ্রন্থ দিব্যবদান, বিশাখদত্তের মুদ্রারাক্ষস নাটক, জৈনগ্রন্থ পরিশিষ্টপার্বণ, পতঞ্জলির মহাভাষ্য প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে মৌর্য যুগের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। এছাড়া সম্রাট অশােকের বিভিন্ন শিলালিপি ও স্তম্ভলিপি এবং শক-রাজা রুদ্রদামনের জুনাগড় প্রশস্তি থেকে বহু তথ্য পাওয়া যায়। মেগাস্থিনিসের রচনার উপর ভিত্তি করে গ্রীক ও রোমান ঐতিহাসিক স্ট্রাবো, অ্যারিয়ান, জাস্টিন, ডায়ােডােরাস ও প্লিনি রচনা থেকে জানা যায়।
Mauryan Administration image
কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা: মৌর্য শাসনব্যবস্থার প্রধান ছিলেন রাজা। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা এবং সকল ক্ষমতার প্রতীক ও উৎস। তার ক্ষমতা ছিল অপ্রতিহত ও নিরঙ্কুশ। রাজপদ ছিল বংশানুক্রমিক। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান শাসক, প্রধান আইনপ্রণেতা, প্রধান বিচারক ও প্রধান সেনাপতি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসক হিসেবে তিনি বিভিন্ন স্তরের রাজকর্মচারী নিয়ােগ করতেন, তাদের প্রয়ােজনীয় পরামর্শ দিতেন এবং স্বয়ং রাজসভায় উপস্থিত থেকে প্রজাদের অভিযােগ শুনতেন। তিনি ছিলেন দেশের প্রধান আইনপ্রণেতা এবং রাজকীয় অনুশাসনই ছিল আইন। প্রধান বিচারক হিসেবে অনেক সময় তিনি নিজেই বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। অনেক সময় তিনি নিজেই যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা পরিচালনা করতেন এবং সেনাপতিদের প্রয়ােজনীয় পরামর্শ দিতেন। একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী রাজা কিন্তু কখনোই স্বৈরাচারী ছিলেন না বা মৌর্য রাজতন্ত্র কখনােই বল্গাহীন স্বৈরতন্ত্র ছিল না। তারা ছিলেন প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচারী। তারা সর্বদাই রীতিনীতি মেনে শাসন পরিচালনা করতেন এবং ধর্মশাস্ত্র অনুসারে প্রজাকল্যাণে নিয়ােজিত থাকতেন। মৌর্য সম্রাটরা কখনােই দৈবস্বত্ব দাবি করে নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে দাবি করেন নি। তারা নিজেদের দেবানাম প্রিয় বা দেবতাদের প্রিয় বলে অভিহিত করতেন এবং বংশানুক্রমিকভাবে সিংহাসনে বসতেন।

অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে, রাজাকে শাসনকার্যে সাহায্য করতেন সচিব নামক কর্মচারী। মেগাস্থিনিস এদের উপদেষ্টা ও রাজস্ব সংগ্রাহক (Councillors and Assessors) বলে অভিহিত করেছেন। সচিবদের মধ্যে থেকে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মন্ত্রী পদে নিযুক্ত করা হত। তারা শাসননীতি ও পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে রাজাকে পরামর্শ দিতেন। মন্ত্রীদের কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। এছাড়া মন্ত্রী পরিষদ নামে একটি পরামর্শদাতা সভা ছিল। এর স্থান ছিল মন্ত্রীর নীচে। কেবলমাত্র জরুরি অবস্থাতেই এই সভা রাজাকে পরামর্শ দিত তবে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করা বা না করা সম্পূর্ণভাবে রাজার ইচ্ছাধীন ছিল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র এবং অশােকের শিলালিপি থেকে মন্ত্রী পরিষদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা করা যায়।

এইসমস্ত কর্মচারী ছাড়াও মৌর্য শাসনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য অনেক কর্মচারী নিয়োগ করা হত। অমাত্য নামে কর্মচারীদের উপর রাজত্ব, অর্থ, বিচার ও প্রশাসন প্রভৃতি বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হত। বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তারা ওই পদ পেতেন। অন্যান্য কর্মচারী অপরীক্ষিতরা নিচু পদে নিযুক্ত হতেন। সরকারি কাজে নানা বিভাগ ছিল। এইসব বিভাগের প্রধানকে বলা হত অধ্যক্ষ। খনি, গােশালা, অশ্বশালা প্রভৃতি তদারকির দায়িত্ব ছিল অধ্যক্ষ উপর। অর্থশাস্ত্রে ৩২ জন অধ্যক্ষ এবং তাদের কার্যাবলীর বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। অর্থশাস্ত্রে সমাহর্তা ও সন্নিধাতা নামে দুজন উচ্চপদস্থ কর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায়। সমাহর্তা ছিলেন রাজ্যের রাজস্ব বিভাগের প্রধান। তিনি রাজ্যের আয় ব্যয়ের হিসেব রাখতেন। ভূমিরাজ ও শুল্ক বিভাগের সকল কার্য অধ্যক্ষের নির্দেশে চলত। সন্নিধাতা ছিলেন রাজার কোষাধ্যক্ষ। এছাড়া করণিক, পুরােহিত, দৌবারিক, প্রতিবেদক, দুর্গপাল, গুপ্তচর প্রভৃতি নানা ধরনের কর্মচারী ছিল। মৌর্য যুগে বংশানুক্রমিক কোন কর্মচারী নিয়োগ করা হত না।

প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা: চন্দ্রগুপ্তের আমলে মৌর্য সাম্রাজ্য চারটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল—প্রাচ্য, উত্তরাপথ, অবন্তী ও দক্ষিণাপথ। এদের রাজধানী ছিল যথাক্রমে পাটলিপুত্র, তক্ষশিলা, উজ্জয়িনী এবং সুবর্ণগিরি। অশােকের আমলে আরেকটি প্রদেশের উল্লেখ পাওয়া যায়—কলিঙ্গ। এর রাজধানী ছিল তেসালি। প্রদেশগুলিকে 'দেশ' বলা হত। সম্রাট স্বয়ং পাটলিপুত্র থেকে 'প্রাচ্য' প্রদেশের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। সাধারণভাবে প্রদেশগুলির শাসনভার ছিল রাজপুত্রদের উপর। তাদের কুমার বা প্রদেশপাল বলা হত। তাদের দায়িত্ব ছিল নিজ এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, রাজস্ব সংগ্রহ করা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যােগাযােগ রাখা। কেন্দ্রের মতো প্রদেশগুলিতে মন্ত্রিসভা ছিল। প্রদেশগুলি ছাড়াও অর্থশাস্ত্রে কতকগুলি স্বায়ত্তশাসিত নগর বা গােষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়। সম্রাট এইসব স্বায়ত্তশাসিত গােষ্ঠীর শাসনকার্যে হস্তক্ষেপ করতেন না।

প্রাদেশিক কর্মচারীরা বংশানুক্রমিক ছিলেন না। প্রাদেশিক কর্মচারীদের নিয়মিত বদলি করা হত। রাজধানী পাটলিপুত্র থেকে প্রদেশগুলিতে নিয়মিত নির্দেশ পাঠানাে হত। প্রদেশগুলি থেকে কেন্দ্রে নিয়মিত রাজত্ব পাঠাতে হত। প্রদেশগুলিতে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নিযুক্ত প্রতিবেদক বা গুপ্তচররা প্রাদেশিক সরকারগুলির কাজকর্মের উপর নজর রাখত। মহামাত্র নামক রাজকর্মচারীরা রাজার প্রতি আনুগত্যপরায়ণ ছিলেন।

গ্রাম ছিল মৌর্য শাসনব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর। গ্রাম শাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন গ্রামিক বা গ্রাম-ভােজক। সম্ভবত তিনি ছিলেন অবৈতনিক কর্মচারী এবং তিনি গ্রামবাসীদের দ্বারা নির্বাচিত হতেন। তিনি গ্রামের প্রধান ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। মনে হয় গ্রামীণ স্তরে স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। গ্রামে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, চুরি-ডাকাতির প্রতিকার এবং ছােটোখাটো মামলার বিচারের দায়িত্ব গ্রামিক-এর উপর অর্পিত ছিল। অর্থশাস্ত্রের বিবরণ অনুসারে গ্রামিকের উপরে ছিল গােপ। তার উপর পাঁচ-দশটি গ্রামের শাসনভার অর্পিত ছিল। কয়েকজন গােপের উপর বা জেলার ১/৪ ভাগের উপর থাকত একজন স্থানিক। জেলার শীর্ষ শাসনকর্তা ছিলেন সমাহর্তা। স্থানীয় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, রাজস্ব ও শুল্ক আদায়, বাণিজ্যের অনুমতি দান প্রভৃতি তাঁর দায়িত্ব ছিল।

নগর শাসন ব্যবস্থা: মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকে পাটলিপুত্র নগরের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। মৌর্য যুগে গ্রামের মতােই নগরগুলি স্বায়ত্তশাসন ভােগ করত। ত্রিশজন সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিষদের উপর পাটলিপুত্র নগরের শাসনভার অর্পিত ছিল। এই সমিতি ছটি শাখায় বিভক্ত ছিল এবং প্রতি শাখা-সমিতিতে পাঁচজন করে সদস্য ছিলেন। এই শাখা-সমিতিগুলি কারিগরি শিল্পের নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি আগন্তুকদের তত্ত্বাবধান, জন্ম-মৃত্যুর হিসাব রক্ষা, ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা, শিল্পজাত দ্রব্যাদি বিক্রয়ের তত্ত্বাবধান ও বিক্রীত পণ্যের উপর থেকে ১/১০ শুল্ক সংগ্রহ করা প্রভৃতি দায়িত্ব পালন করত। কেবলমাত্র পাটলিপুত্ৰই নয়, সম্ভবত কৌশাম্বী, উজ্জয়িনী, অবন্তী, তক্ষশিলা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ নগরগুলিতে একই ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ডঃ ব্যাসাম বলেন যে, যদি মেগাস্থিনিসের বিবরণ সত্য হয়, তাহলে বলতে হয় যে, যেভাবে পাটলিপুত্রে জন্ম-মৃত্যুর হিসেব রাখা হত এবং বিদেশিদের উপর নজর রাখা হত, তাতে পাটলিপুত্রের অবস্থাকে বর্তমান পুলিশি রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকে চন্দ্রগুপ্তের সেনাবাহিনীর কথা জানা যায়। তার সেনাবাহিনীতে ৬ লক্ষ পদাতিক, ৩০ হাজার অশ্বারােহী, ৮ হাজার রথারােহী এবং ৯ হাজার হাতি ছিল। মেগাস্থিনিস বলেন যে, ৩০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত একটি পরিষদের উপর মৌর্যদের সামরিক বিভাগের দায়িত্ব অর্পিত ছিল। এই পরিষদ ৫ জন করে সদস্য নিয়ে ৬ টি সমিতিতে বিভক্ত ছিল। এই সমিতিগুলি হল পদাতিক, অশ্বারােহী, হস্তীবাহিনী, রথারােহী, নৌ-বিভাগ এবং যানবাহন ও রসদ সংগ্রহ প্রভুতির দায়িত্ব পালন করত। সমাজের সকল বর্ণের মানুষের মধ্যে থেকে সেনা সংগৃহীত হত। অর্থশাস্ত্রে বলা আছে গুপ্তচররা সন্ন্যাসী, গৃহস্ত, ব্যবসায়ী, ছাত্র, ভিখারিনী, বারবণিতা প্রভৃতি বহু ছদ্মবেশে কাজ করত।

বিচার ব্যবস্থা: বিচার বিভাগে রাজা ছিলেন সর্বেসর্বা। তিনি শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ও অভিজ্ঞ মন্ত্রীদের সাহায্যে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তিনি নিজেই অনেক সময় বিচার করতেন। গ্রামে গ্রামিক এবং নগরে নগর-ব্যবহারিক বা পৌর-ব্যবহারিক বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। অর্থশাস্ত্রে দুই ধরনের বিচারালয়ের উল্লেখ আছে - ধর্মাস্থিয় ও কণ্টকশােধন। ধর্মাস্থিয় ছিল দেওয়ানি ও কন্টকশােধন ছিল ফৌজদারি আদালত। বিদেশিদের জন্য পৃথক আদালত ছিল। কৌটিল্য ও মেগাস্থিনিস—দুজনেই কঠোর দণ্ডবিধির কথা উল্লখ করেছেন। কঠোর জরিমানা, কারাবাস, অঙ্গচ্ছেদ, মৃত্যুদণ্ড, শুলে চড়ানাে প্রভৃতি ব্যবস্থা মৌর্য যুগে প্রচলিত ছিল।

রাজস্ব ব্যবস্থা: ভূমিরাজ ছিল সরকারের আয়ের প্রধান উৎস এবং তার হার ছিল উৎপন্ন শস্যের ১/৬ বা ১/৪ অংশ। এছাড়া শুল্ক, আমদানি-রপ্তানি, বিক্রয় কর, জলকর, পথকর, খনিকর এবং বিভিন্ন বৃত্তি, পানশালা প্রভৃতি থেকে সরকার কর আদায় করত। কর্মচারী ও সেনাবাহিনীর বেতন, সেচ, জনহিতৈষণামূলক কর্ম প্রভৃতি খাতে সরকারের অর্থ ব্যয় হত। ডঃ রামশরণ শর্মা বলেন যে, এইভাবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য একটি সুসংগঠিত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং তাকে একটি মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন।

শাসনব্যবস্থায় অশােকের সংযােজন: চন্দ্রগুপ্ত প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা যুগপােযােগী সংস্কারের দ্বারা অশােক আরও দক্ষ ও মানবিক করে তুলেছিলেন। তিনি পুরাতন কর্মচারী যুত, রাজুক প্রমুখদের ক্ষমতা ও পদমর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন আবার ধর্মমহামাত্র, স্ত্রী অধ্যক্ষ মহামাত্র, অন্তমহাপাত্র, ব্রজভূমিক প্রভৃতি বহু নতুন কর্মচারীর সৃষ্টি করেছিলেন। শাসন ও বিচার ক্ষেত্রে ব্যবহার-সমতা ও দণ্ড-সমতা নীতি প্রবর্তন করেন এবং প্রাণীহত্যা সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
Advertisement