খলজি বিপ্লব ও তার গুরত্ব

- October 09, 2019
গজনির সুলতান মামুদ ও মহম্মদ ঘুরির সেনাবাহিনীতে প্রচুর খলজি যোগ দেন। ১১৯১ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের প্রথম যুদ্ধে জৈনিক খলজি সেনাপতি মহম্মদ ঘুরির প্রাণরক্ষা করেন। তার অন্যতম অনুচর ও সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি বাংলা-বিহার জয় করেন এবং বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। খ্রিস্টীয় এয়োদশ শতকের সূচনায় মােঙ্গল আক্রমণের ফলে খলজিরা দলে দলে আফগানিস্থান থেকে ভারতে আসতে থাকে এবং মামেলুক সুলতানদের অধীনে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের বিভিন্ন পদে নিযুক্ত হয়। তুর্কি বংশােদ্ভূত মামেলুক সুলতানরা অ-তুর্কিদের ঘৃণার চোখে দেখত। যােগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এই যুগে অ-তুর্কিদের উন্নতির কোনও আশা ছিলনা। অ-তুর্কিরা এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর উচ্চপদে নিযুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখত। এর ফলে তুর্কি ও অ-তুর্কিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
Khalji Revolution 1290
গিয়াসউদ্দিন বলবনের মৃত্যুর পর তুর্কি প্রাধান্য দুর্বল হয়ে পড়ে। কায়কোবাদের অদূরদর্শিতার সুযোগে মালিক নিজামউদ্দিন সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে। কিন্তু পিতা বুগরা খার পরামর্শে কায়কোবাদ মুলতানের দায়িত্ব দিয়ে মালিক নিজামউদ্দিনকে দিল্লি ছাড়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তুর্কী অভিজাতদের ষড়যন্ত্রে মালিক নিজামউদ্দিন প্রাণ হারান। এরপর কায়কোবাদ সামানার শাসনকর্তা ও খলজি গােষ্ঠীর নেতা মালিক ফিরোজকে উজির-ই-মামলিক পদে নিয়ােগ করলে তুর্কি এবং অ-তুর্কিদের মধ্যে গােষ্ঠীদ্বন্দ্ব তীব্রতর রূপ ধারণ করে। এই অবস্থায় ১২৯০ খ্রিস্টাব্দে মালিক ফিরোজ কাইকোবাদ ও শিশু সম্রাট কায়ুমার্স-কে হত্যা করে জালালউদ্দিন ফিরোজ শাহ উপাধি নিয়ে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। এর ফলে দাস বংশের পতন হয় এবং খলজি বংশ দিল্লির সিংহাসনে বসে। ডঃ আর. পি. ত্রিপাঠী ও ড: কে. এস. লাল প্রমুখ ঐতিহাসিক এই ঘটনাকে খলজি বিপ্লব বলে অভিহিত করেছেন।

খলজি বিপ্লবের গুরত্ব

ড: লাল, হবিবউল্লাহ ও ত্রিপাঠী প্রমুখ অধিকাংশ ঐতিহাসিক খলজী বিপ্লবকে ভারত ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী ঘটনা বলে মনে করেন। খলজি বিপ্লব ভারত ইতিহাসে এক নব যুগের সূচনা করে। ড. কে. এস. লাল এর মতে, খলজি বিপ্লব কেবল একটি রাজবংশ থেকে অন্য রাজবংশের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সাধারণ ঘটনা ছিল না। এটি ছিল তুর্কী একাধিপত্যের বিরুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানদের জেহাদ ও সাফল্যর নিদর্শন।
(১) খলজি বিপ্লবের ফলে দিল্লির শাসনব্যবস্থায় ইলবারি তুর্কিদের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটে এবং হিন্দুস্তানি মুসলিমদের উত্থান হয়। মধ্যযুগে আফগান ও অন্যান্য ভারতীয় মুসলিমদের হিন্দুস্তানি মুসলমান বলা হত।
(২) জালালউদ্দিন ফিরোজ শাহের সিংহাসন লাভ প্রমাণ করে যে, সিংহাসনের সার্বভৌম অধিকার বিশেষ কোনও সম্প্রদায় বা জাতিগােষ্ঠীর একচেটিয়া নয়, যােগ্যতাসম্পন্ন যে কোনও ব্যক্তি এই অধিকার লাভ করতে পারে।
(৩) খলজিরা অস্ত্রবলের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এবং অস্ত্রবলের মাধ্যমেই তা রক্ষা করে। ক্ষমতা বজায় রাখতে গিয়ে তারা কখনােই জনসাধারণ, উলেমা বা অভিজাতদের সমর্থনের উপর নির্ভর করেনি। তারা প্রমাণ করে যে জনসাধারণ, উলেমা বা অভিজাতরা নয়, ক্ষমতা লাভ এবং তা বজায় রাখতে গেলে অস্ত্রই শেষ কথা।
(৪) খলজি বিপ্লবের ফলে শাসকগােষ্ঠী অনেকখানি সম্প্রসারিত হয়। এতদিন তুর্কিরাই ছিল শাসকগােষ্ঠীর প্রধান। খলজিরা ক্ষমতায় এসে তুর্কি, তাজিক, ভারতীয় মুসলমান, হিন্দু—সকলকে শাসকগােষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করে।
(৫) ডঃ হাবিবউল্লাহ বলেন যে, জালালউদ্দিন ফিরােজ খলজির সিংহাসন লাভ কেবলমাত্র একটি রাজবংশের পরিবর্তন নয়—এটি একটি যুগের অবসান। এই ঘটনার ফলে ভারতে মুসলিম প্রভুত্বের সম্প্রসারণ হয়, রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটে এবং শিক্ষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি দেখা যায়।
(৬) খলজিদের ক্ষমতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে সুলতানি শাসনের পরিধি বহুদূর বিস্তৃত হয়। আলাউদ্দিন খলজির প্রচেষ্টায় দিল্লির সুলতানি রাজ্য একটি সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। এই যুগেই সর্বপ্রথম দাক্ষিণাত্যে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আলাউদ্দিন খলজি মােঙ্গলদের বিরুদ্ধে যথার্থ আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করেন। এই যুগে আলাউদ্দিন খলজি বেশ কিছু পরীক্ষামূলক সংস্কার প্রবর্তন করেন। এগুলির মধ্যে স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন, বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তন, গণিকাবৃত্তি ও সতীপ্রথা বিরােধী আইন প্রবর্তন, মদ্যপান-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা প্রভৃতি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে শুরু হয় এক গৌরবময় যুগের। আমির খসরু, শেখ নিজামউদ্দিন প্রমুখ যুগন্ধর ব্যক্তিদের আবির্ভাব ঘটে। শিল্পকলা এক নতুন যুগে প্রবেশ করে।