কলিঙ্গ যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল

- October 17, 2019
অশােকের ত্রয়ােদশ শিলালিপি (R. E. XIII) থেকে কলিঙ্গ যুদ্ধের বিবরণ পাওয়া যায়। অশােকের রাজ্যাভিষেকের নবম বর্ষ (মতান্তরে অষ্টম) ২৬৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে (মতান্তরে ২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) অশোক বাংলার সুবর্ণরেখা নদী থেকে গােদাবরী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত স্থানে অবস্থিত বর্তমান উড়িষ্যা ও অন্ধ্রের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত কলিঙ্গ রাজ্য জয় করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৫ অব্দে দয়া নদীর নিকটবর্তী ধৌলি পাহাড়ের কাছে মৌর্য ও কলিঙ্গ বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এই সময় কলিঙ্গ রাজ্য রাজা ছিলেন অনন্ত ও তার সেনাপতি ছিলেন মহা পদ্মনাভা। কলিঙ্গ যুদ্ধের ফলে অশোকের জীবনে আমূল পরিবর্তন ঘটে ও বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। কলিঙ্গ যুদ্ধ ছিল অশোকের জীবনে প্রথম ও শেষ যুদ্ধ।
Ashoka Kalinga War

কলিঙ্গ যুদ্ধের কারণ

কলিঙ্গ যুদ্ধের কারণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়না। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিভিন্ন ভাবে কলিঙ্গ যুদ্ধের কারণ আলোচনা করেছেন। নন্দ বংশের আমলে কলিঙ্গ মগধের অধীনে ছিল। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে কলিঙ্গ স্বাধীনতা ঘােষণা করে। বিন্দুসার দাক্ষিণাত্যের চোলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলে কলিঙ্গ রাজ্য চোল ও পাণ্ড্য রাজাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে শক্তিজোট গঠন করে। এর ফলে বিন্দুসার পরাজিত হন। এই পরাজয়ের প্রতিশােধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে অশােক কলিঙ্গ রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন।

কলিঙ্গ রাজ্য দিন দিন সামরিক বলে প্রবলভাবে বলীয়ান হয়ে উঠেছিল। প্লিনি-র মতে কলিঙ্গের পদাতিক বাহিনীর সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার, অশ্বারােহী ১ হাজার এবং রণহস্তী ৭০০ পরবর্তীকালে কলিঙ্গের শক্তি আরও বৃদ্ধি পায়। নিজ সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে অশােকের পক্ষে কলিঙ্গের মতাে শক্তিশালী রাজ্যের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না।

ডঃ রোমিলা থাপার বলেন যে, কলিঙ্গ রাজ্য দাক্ষিণাত্যে যাওয়ার জলপথ ও স্থলপথগুলিকে নিয়ন্ত্রিত করত। মগধের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের যােগাযােগের পথে কলিঙ্গ ছিল প্রধান বাধা। সুতরাং নিজ বাণিজ্যিক স্বার্থের তাগিদে মগধের পক্ষে কলিঙ্গ আক্রমণ অপরিহার্য ছিল।

মগধের সামুদ্রিক বাণিজ্য তখন তাম্রলিপ্ত হয়ে বঙ্গোপসাগরের পথে ব্রহ্মদেশ, সুমাত্রা, জাভা প্রভৃতি অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। কলিঙ্গ ছিল মগধের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী। সুতরাং এইসব নানা কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে স্বাধীন কলিঙ্গ রাজ্যের উপস্থিতি মগধের পক্ষে ক্ষতিকর ছিল। এর ফলে অশোক বাধ্য হয়ে কলিঙ্গ রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন।

কলিঙ্গ যুদ্ধের ফলাফল

কলিঙ্গ যুদ্ধে এক লক্ষ মানুষ নিহত, দেড় লক্ষ মানুষ বন্দি এবং বহু সাধারণ মানুষ নানাভাবে প্রাণ হারায়। কলিঙ্গ যুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পূর্বে প্লিনি কলিঙ্গের যে পরিমাণ সেনার উল্লেখ করেছেন, এই যুদ্ধে তার চেয়ে অনেক বেশি সৈন্য আহত ও নিহত হয়। ডঃ ভাণ্ডারকর বলেন যে, এই যুদ্ধে চোল ও পাণ্ড্যরা কলিঙ্গের পক্ষে যােগ দেওয়ায় হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়। এই যুদ্ধের ফলে কলিঙ্গ মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পুরী জেলার সন্নিকটে তােশালি নববিজিত কলিঙ্গের রাজধানী হয়।

কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা অশােকের মনােভাবের আমূল পরিবর্তন ঘটায়। রাজ্যজয়ের প্রতি আগ্রহের পরিবর্তে তার মনে মানুষের প্রতি প্রবল দাক্ষিণ্যের উদয় হয়। যুদ্ধের ভয়াবহতা তার মনে যে প্রবল অনুশােচনার সৃষ্টি করেছিল ত্রয়ােদশ শিলালিপিতে তার হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা পাওয়া যায়। ডঃ রাধাকুমুদ মুখােপাধ্যায়-এর মতে, কলিঙ্গ যুদ্ধ অশােকের ব্যক্তিজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে। তিনি ভেরীঘোষ-কে ধর্মঘােষ-এ পরিণত করেন। মানসিক শান্তিলাভের আশায় তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে শান্তি, অহিংসা ও মানবপ্রেমের আদর্শে দীক্ষিত হন। বিহারযাত্রা বা প্রমােদ ভ্রমণ ত্যাগ করে ধর্মযাত্রা বা বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলি ভ্রমণ করতে থাকেন। রাজ্যের সর্বত্র প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ করা হয়। তিনি চিরতরে যুদ্ধনীতি ত্যাগ করেন।

সম্রাট অশােক রাজকর্তব্যের এক নতুন আদর্শ স্থাপন করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, সকল প্রজাই তার সন্তান (সব মুনিসে পজা মমা) এবং তাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ সাধনই তার লক্ষ্য। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র-এর মতে রাজা সর্বশক্তির আধার এবং কারাে কাছে তার কোনও দায়-দায়িত্ব নেই। সম্রাট অশােক রাজকীয় কর্তব্য ও আদর্শের নতুন কথা ঘােষণা করে বলেন যে, রাজপদ গ্রহণ করে প্রজাদের কাছে তিনি ঋণগ্রস্ত। প্রজাবর্গের মঙ্গলসাধনের জন্য তিনি শাসনব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করেন। রাজুক, যুত, মহামাত্র ও ধম্মমহামাত্র প্রভৃতি রাজকর্মচারী নিয়ােগ করে প্রজাকল্যাণের উদ্দেশ্যে তাদের উপর বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করেন। কুপখনন, বৃক্ষরােপণ, মানুষ ও পশুর জন্য চিকিৎসালয় স্থাপন, অতিথিশালা নির্মাণ, জীবহত্যা নিষিদ্ধকরণ প্রভূতির মাধ্যমে তিনি প্রজাহিতৈষণায় উদ্যোগী হন। ভগবান বুদ্ধের শান্তি ও মৈত্রীর আদর্শ এবং ধর্মমত প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এইভাবে তিনি মৌর্য রাষ্ট্রব্যবস্থাকে জনকল্যাণকামী করে তোলেন।

কলিঙ্গ যুদ্ধ মৌর্য সাম্রাজ্যের পররাষ্ট্রনীতির বিরাট পরিবর্তনের সূচনা করে। তিনি চিরতরে যুদ্ধনীতি ত্যাগ করে ধম্মবিজয় অর্থাৎ সৌহার্দ্য ও সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেন। তিনি কলিঙ্গ প্রস্তরলিপি-তে ঘােষণা করেন যে, তার প্রতিবেশীরা যেন মৌর্য সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তিতে ভীত না হন। অহিংসা ও শান্তির বাণী প্রচার করে ভারত ও ভারতের বাইরে বিভিন্ন রাজন্যবর্গের সঙ্গে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হন।

ডঃ ব্যাসাম, ডঃ রামশরণ শর্মা, ডঃ রােমিলা থাপার, ডঃ বনগার্ড লেভিন প্রমুখের মতে কলিঙ্গ যুদ্ধের ফলে অশােক কখনােই নিছক শান্তিবাদীতে পরিণত হন নি। কারণ তিনি কলিঙ্গের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেননি, বিদ্রোহী ও যুদ্ধবন্দিদের ক্ষমা করেননি। সম্রাট অশােক তার ত্রয়ােদশ শিলালিপিতে তিনি অনুশােচনার কথা ব্যক্ত করেছেন, তা কিন্তু কলিঙ্গ রাজ্যে প্রচার করেন নি। আসলে কলিঙ্গ যুদ্ধের পর তিনি অহিংস নীতি গ্রহণ করেছিলেন এই কারণে যে, তার সাম্রাজ্য তখন চারদিকেই নিরাপদ ছিল, দক্ষিণের তামিল ভাষী রাজ্যগুলি বাদে সারা ভারত মগধের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল—এমনকী তামিল ভাষী রাজ্যগুলি মগধের অধীনস্থ মিত্রে পরিণত হয়েছিল। এই কারণে আর যুদ্ধের কোনও প্রয়ােজন ছিল না। রুশ গবেষক বনগার্ড লেভিন বলেন যে, “কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশােক এক স্বপ্নবিলাসী, আদর্শবাদী অহিংস শাসকে পরিণত হন বলে মনে করার কোন কারণ নেই। তিনি কোন কিছুতেই ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য স্থাপনের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন নি।”
Advertisement