দিল্লির মামলুক সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ

- October 04, 2019
ইলতুৎমিসকে দিল্লির তুর্কি সুলতান বা দাস বংশীয় সুলতানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার তাকে আদি তুর্কি সুলতানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করেছেন। অনেকের মতে তিনি হলেন দিল্লি সুলতানির প্রকৃত প্রতিষ্ঠতা। লেনপুল এর মতে তিনি হলেন দাসবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। কুতুবউদ্দিন আইবক রাজ্যজয় করেছিলেন, কিন্তু তা সুসংহত করতে পারেন নি। আরাম শাহের রাজত্বকালে রাজ্যের বহু অংশ দিল্লির হাত ছাড়া হয়ে যায়। ইলতুৎমিস ওইসব রাজ্যাংশগুলি পুনরুদ্ধার করেন এবং বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলিকে দমন করে দিল্লি সুলতানিকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন।

ইলতুৎমিশের ক্ষমতা লাভ: শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ (শাসনকাল: ১২১১-১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন মধ্য যুগের ভারত ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতান। তিনি ছিলেন তুর্কিস্তানের ইলবারি গােষ্ঠীভুক্ত এক অভিজাত পরিবারের সন্তান। তার পিতা ছিলেন ইলম খান। তিনি খুবই সুদর্শন ও মধুর ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তাঁর ভাইরা ঈর্ষাবশত তাকে ‘দাস' হিসেবে বিক্রি করে দেন। জালালউদ্দিন নামে দাস-ব্যবসায়ী তাকে গজনিতে নিয়ে আসেন। এরপর কুতুবউদ্দিন আইবক তাকে ক্রয় করেন। ইলতুৎমিশ অতি অল্প বয়সেই সাহিত্য, ধনুর্বিদ্যা ও সামরিক শিক্ষা লাভ করেন। তার দৈহিক সৌন্দর্য ও বিভিন্ন গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে কুতুবউদ্দিন নিজ কন্যার সঙ্গে তার বিবাহ দেন এবং তাকে আমির-ই-শিকার পদে নিয়ােগ করেন। তিনি বদাউন-এর শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। ১২০৫-১২০৬ খ্রিস্টাব্দে খােক্কর উপজাতির বিদ্রোহ দমনে তিনি অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করলে মহম্মদ ঘুরির নির্দেশে কুতুবউদ্দিন আইবক তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন এবং আমির-উল-ওমরা পদে উন্নীত করেন। কুতুবউদ্দিনের মৃত্যুর পর লাহােরের আমির-ওমরাহরা আরাম শাহকে সুলতান হিসেবে মনােনীত করেন। তার অপশাসনে দেশের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে দিল্লির আমিররা বাউনের শাসনকর্তা শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশকে নব-প্রতিষ্ঠিত তুর্কি রাজ্যের শাসনভার গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানান। ১২১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি আরাম শাহকে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসনে বসেন।
Qutb Minar complex, Delhi, Tomb of Iltutmish, Delhi
ইলতুৎমিশের সমস্যা ও সমাধান: সিংহাসনে আরােহণ করে ইলতুৎমিসকে নানা কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কুতুবউদ্দিনের সহকর্মী ও সিন্ধুদেশের শাসনকর্তা নাসিরউদ্দিন কুবাচা নিজেকে স্বাধীন নরপতি রূপে ঘােষণা করে লাহাের জয় করেন ও পাঞ্জাব দখলের পরিকল্পনা করেন। কুতুবউদ্দিনের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী তাজউদ্দিন ইলদুজ গজনির শাসক হিসেবে ভারতের উপর নিজ সার্বভৌমত্ব দাবি করেন ও ইলতুৎমিসকে নিজ প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করতে চান। বাংলার তৎকালীন শাসনকর্তা খলজি আলিমর্দান দিল্লির কর্তৃত্ব অস্বীকার করে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘােষণা করেন। এইসব বিশৃঙ্খলার সুযােগ নিয়ে জালাের, রণথম্বাের, আজমির, গােয়ালিয়র, কালিঞ্জর এবং দোয়াব অঞ্চল প্রভৃতি স্থানের রাজপুতগণ ক্ষমতা পুনর্দখল করেন। এছাড়া দিল্লি সুলতানির কিছু আমির ইলতুৎমিসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘােষণা করেন। এর ফলে নবপ্রতিষ্ঠিত সুলতানি শাসন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিভ্রান্ত না হয়ে তিনি কঠোর হাতে শত্রুদমনে অগ্রসর হন। তিনি প্রথমেই দিল্লি, বদাউন, অযােধ্যা, বারাণসী, শিবালিক প্রভৃতি অঞ্চলের বিদ্রোহী আমির ওমরাহদের দমন করে নিজ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর তিনি গজনির শাসনকর্তা তাজউদ্দিন ইলদুজের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। ইতিমধ্যে তিনি খােয়ারিজমের শাহ কর্তৃক গজনি থেকে বিতাড়িত হয়ে লাহোরে অবস্থান করছিলেন এবং পাঞ্জাবের অধিকাংশ দখল করে ইলতুৎমিসের উপর নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন। ১২১৬ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় তরাইনের যুদ্ধে ইলতুৎমিশের নিকট তাজউদ্দিন ইলদুজ পরাজিত ও বন্দি হন। পরে তিনি বদাউনে নিহত হন। এরপর তিনি উচ ও মুলতানের শাসনকর্তা নাসিরউদ্দিন কুবাচার বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। ১২১৭ খ্রিস্টাব্দে চিনাব নদীর নিকটে "মনসুরার যুদ্ধে" তিনি ইলতুৎমিসের হাতে পরাজিত হয়ে সিন্ধু প্রদেশে পলায়ন করেন। ১২২৭ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় তিনি ইলতুৎমিসের হাতে পরাজিত হন এবং সিন্ধু নদের জলে ডুবে আত্মহত্যা করেন। এর ফলে মুলতান ও সিন্ধুর উপর ইলতুৎমিসের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলার খলজি আলিমর্দান বিদ্রোহ ঘােষণা করলে গিয়াসউদ্দিন খলজি তাকে হত্যা করে নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান বলে ঘােষণা করেন। ইলতুৎমিস এই বিদ্রোহ মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। ১২২৬ খ্রিস্টাব্দে ইলতুৎমিস তার বিরুদ্ধে অগ্রসর হলে গিয়াসউদ্দিন বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেন এবং তার আনুগত্য মেনে নেন। ইলতুৎমিস দিল্লি ফিরে গেলে তিনি পুনরায় বিদ্রোহ ঘােষণা করেন। এ সময় ইলতুৎমিসের পুত্র অযােধ্যার শাসক নাসিরউদ্দিন মামুদ ১২২৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ আক্রমণ করে গিয়াসউদ্দিনকে হত্যা করেন এবং তিনি বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। ১২২৯ খ্রিস্টাব্দে নাসিরউদ্দিন মামুদের মৃত্যু হলে বলকা খলজি স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করার চেষ্টা করেন। ইলতুৎমিস তাকে হত্যা করে আলাউদ্দিন জানি-কে বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। বাংলায় সুলতানি শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া তিনি রণথম্বাের (১২২৫ খ্রিঃ), জালোর (১২২৬ খ্রিঃ), যােধপুর (১২২৭ খ্রিঃ), গােয়ালিয়র (১২৩১ খ্রিঃ), গুজরাট (১২৩২ খ্রিঃ) প্রভৃতি স্থানগুলি পুনরুদ্ধার করেন।

রাজ্যজয়: তিনি শিবালিক পর্বতের অন্তর্ভুক্ত মান্দর জয় করেন এবং ১২৩৪ খ্রিষ্টাব্দে মালব রাজ্য আক্রমণ করে ভিলসা ও উজ্জয়িনী দখল করেন। উজ্জয়িনী জয়ের পর তিনি সেখান থেকে সম্রাট বিক্রমাদিত্যের একটি মূর্তি দিল্লি নিয়ে যান। ইলতুৎমিসের শেষ অভিযান ছিল সিন্ধু সাগর দোয়াব অঞ্চলের পার্বত্য রাজ্য বানিয়ানের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই অভিযানের মাঝপথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অসুস্থ অবস্থায় অভিযান অসমাপ্ত রেখে দিল্লী ফিরে আসেন। এর অল্পকালের মধ্যে তার মৃত্যু হয় ২৯শে এপ্রিল, ১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দে।

মােঙ্গল সংকট: ইলতুৎমিসের রাজত্বকালে ১২২১ খ্রিস্টাব্দে দুর্ধর্ষ মােঙ্গল নায়ক চিঙ্গিজ খাঁ মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার নানা রাজ্য জয় করে খিবা বা খােয়ারিজম রাজ্য আক্রমণ করেন। খিবার অধিপতি জালালউদ্দিন মঙ্গবরণী প্রাণভয়ে পাঞ্জাবে উপস্থিত হয়ে ইলতুৎমিসের আশ্রয় প্রার্থনা করেন। চিঙ্গিজ খাঁ তার পশ্চাদ্ধাবন করে সিন্ধু নদের তীরে উপনীত হন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ইলতুৎমিস উপলব্ধি করেন যে, জালালউদ্দিনকে আশ্রয় দেওয়ার অর্থই হল চিঙ্গিজ খাঁর আক্রমণের সম্মুখীন হওয়া এবং তা নবপ্রতিষ্ঠিত সুলতানি শাসনের অস্তিত্বের পক্ষে বিপজ্জনক। প্রত্যাখ্যাত জালালউদ্দিন ভারত ত্যাগ করলে চিঙ্গিজ খাঁ সিন্ধু ও পশ্চিম পাঞ্জাব লুণ্ঠন করে ভারত ত্যাগ করেন। এবং এইভাবে নবপ্রতিষ্ঠিত সুলতান শাহি আশু ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।

Advertisement
উপাধি: বাগদাদের খলিফা মুসলিম জগতের ধর্মগুরু ও শ্রেষ্ঠ শাসক বলে বিবেচিত হতেন। ইলতুৎমিস নিজ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে খলিফার কাছে দূত পাঠান। ১২২৯ খ্রিস্টাব্দে খলিফা তাকে একটি ফরমান পাঠান এবং তাকে "সুলতান ই আজম" বা প্রধান সুলতান উপাধিতে ভূষিত করেন।

শাসনব্যস্থা: মহম্মদ ঘুরি মধ্য এশিয়া নিয়ে অধিক ব্যাপৃত থাকায় এবং কুতুবউদ্দিনের শাসনকাল স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় তারা ভারতে কোনও সুষ্ঠু প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন নি। কুতুবউদ্দিনের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করেন ইলতুৎমিস। তিনি দিল্লি সুলতান শাহির প্রশাসনিক কাঠামাের প্রাথমিক রূপরেখাটি তৈরি করেন। দাস তুর্কি, স্বাধীন তুর্কি ও স্থানীয় হিন্দুদের নিয়ে তিনি একটি আমলাতন্ত্র গড়ে তােলেন। কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি তিনটি ব্যবস্থা অবলম্বন করেন যথা - (১) ইকতা প্রথার প্রবর্তন, (২) একটি কেন্দ্রীভূত স্থায়ী সামরিক বাহিনী গঠন এবং (৩) একটি নতুন মুদ্রানীতি প্রবর্তন। ইকতা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিজিত স্থানগুলিকে তিনি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে আনেন। কেন্দ্রীয় সামরিক বাহিনী গঠন করে তিনি রাজতন্ত্রকে সুদৃঢ় করেন। মুদ্ৰাবিদ্যা বিশারদ নেলসন রাইট এর মতে, দিল্লির মুদ্রাব্যবসা প্রবর্তনের ইতিহাসে ইলতুৎমিসের রাজত্বকাল এক স্মরণীয় অধ্যায়। রূপার তৈরি মুদ্রা (তঙ্কা) ছাড়াও তামা (জিতাল) ও পিতলের মুদ্রাও তার সময় প্রবর্তিত হয়েছিল। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ভারতের আধুনিক টাকার আদিম পুর্বপুরুষ হল ইলতুৎমিস প্রবর্তিত 'তঙ্কা'।

শিল্প সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক: ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৎ, ধার্মিক, বিদ্যোৎসাহী ও শিল্পানুরাগী ছিলেন। বহু জ্ঞানী ও বিদ্বান মানুষকে তিনি দিল্লিতে আশ্রয় দিয়ে তাদের পৃষ্ঠপােষকতা করেন। সমকালীন বিখ্যাত পণ্ডিত মিনহাজ-উস-সিরাজ, হাসান নিজামি, মহম্মদ আউফি, নুরউদ্দিন প্রমুখ তার রাজসভা অলঙ্কৃত করতেন। তিনি বিখ্যাত কুতুব মিনারের নির্মাণকার্য সম্পন্ন করেন। তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম ছিলেন এবং সুফি সন্তদের শ্রদ্ধা করতেন। ভারতকে তিনি দার-উল ইসলামে রূপান্তরিত করার কোনও চেষ্টা করেন নি, অ-মুসলমানদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন নি, রাজপুতদের বিরুদ্ধেও জেহাদ ঘােষণা করেন নি বা নিজ কন্যা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনােনীত করার ব্যাপারে উলেমাদের পরামর্শও গ্রহণ করেন নি।
Advertisement