Home Rule League Movement - হোমরুল আন্দোলন

- October 29, 2019
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে হোমরুল আন্দোলন এক নতুন সূচনা করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন যখন দিশেহারা ও লক্ষ্যভ্রষ্ট এবং চরমপন্থী ও নরমপন্থী বিবাদ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও তার রাজনীতিকে দুর্বল করেছিল, ঠিক তখনই সংগ্রামশীল সশস্ত্র আন্দোলনের পাশাপাশি হোমরুল আন্দোলন ব্রিটিশ সরকারের দুশ্চিন্তা ও আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছিল। বাল গঙ্গাধর তিলক ও শ্ৰীমত অ্যানি বেসান্ত আয়ারল্যান্ডের হোমরুল আন্দোলনের প্রবর্তক মি. রেমন্ডের আদর্শ অনুকরন করে ভারতে নব আন্দোলনের সূচনা করে।
Home rule movement in india
হোমরুল আন্দোলনের উদ্দেশ্য (Purpose of the Home Rule Movement) হোমরুল শব্দের অর্থ হল স্বায়ত্তশাসন। তবে এর প্রকৃত অর্থ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত এক দায়িত্বশীল সরকার গঠন করা। ভারতের প্রতিটি প্রশাসনিক স্তরে ভারতীয়দের আধিপত্য কায়েম করা। বাল গঙ্গাধর তিলক ঘােষণা করেন যে, “আয়ারল্যান্ডে আইরিশ স্বায়ত্বশাসনবাদীরা যা চায়, আমরা ভারতে তাই চাই। আমরা শাসন সংস্কার চাই, ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ চাই না"। হােমরুল আন্দোলন দ্বারা তিলক ভারতীয় রাজনীতিকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করেন।

হােমরুল আন্দোলনে অ্যানি বেসান্তের অবদান (Annie Besant contribution to the Home Rule Movement): থিওসােফিক্যাল সােসাইটির কর্ণধার শ্রীমতী অ্যানি বেসান্ত ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে সম্পূর্ণ নিজ প্রচেষ্টায় মাদ্রাজের আদিয়ারে হােমরুল লিগ গঠন করেন। তিনি মনে করতেন ভারতীয়রা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দক্ষতা অর্জন না করলে ভারতবর্ষের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। বেসান্ত Common Will নামক সাপ্তাহিক পত্রিকায় বলেন, ভারতকে স্বশাসিত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে নরমপন্থী চরমপন্থী গােষ্ঠীর মিলন অপরিহার্য। জওহরলাল নেহরু, যমুনালাল বাজাজ, শঙ্করলাল ব্যাংকের প্রমুখের প্রচেষ্টায় বেসান্তের হােমরুল লিগ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। অচিরেই ২০০টির ওপর লিগ শাখাকার্যালয় গড়ে ওঠে। তার মধ্য ১৩২ টি ছিল মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে। তবে কংগ্রেস বা মুসলিম লিগ নেতারা কেউই এই আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন না। অ্যানি বেসান্ত New India নামে এক দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করে হোমরুল আন্দোলনের আদর্শ প্রচার করেন।

১৯১৮ সালে অ্যানি বেসান্তের লীগে ২৭ হাজার সদস্য ছিল। মিসেস এ্যানি বেসান্তের হােমরুল লীগের প্রভাব ছিল মাদ্রাজের তামিল এলাকায় এবং উত্তর প্রদেশের কায়স্থ ও কাশ্মীরি ব্রাহ্মণদের মধ্যে বেশী। এছাড়া গুজরাট শিল্পপতি বণিক, সিন্ধীদের মধ্যেও তার সমর্থক ছিল। তবে অ্যানি বেশান্ত হােমরুলের সঙ্গে থিওজফি প্রচার করতেন। বােম্বাই ও মাদ্রাজে বেশান্তের প্রভাব ছিল সর্বাধিক। বেশান্তের হােমরুল লীগের পরিচালক সমিতির সাত জন সদস্য ছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন সি.পি. রামস্বামী আইয়ার, বি.পি ওয়াদিয়া, জর্জ অরুণ্ডেল। কলিকাতার অধ্যাপক জে.এল. ব্যানার্জী, এলাহাবাদের জওহরলাল নেহেরু, চৌধুরী খালিকুজ্জমান হােমরুল লীগে যােগ দেন। বি.পি. ওয়াদিয়া হােমরুল লীগের পতাকার নীচে মাদ্রাজ ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন গঠন করেন।

হােমরুল আন্দোলনে তিলকের অবদান (Tilak contribution to the Home Rule Movement): বাল গঙ্গাধর তিলক চরমপন্থী মনােভাব থেকে সরে এসে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৮ এপ্রিল বেলগাঁওতে অনুষ্ঠিত বােম্বাই প্রভেনসিয়াল কনফারেলে তার হোমরুল লীগ গঠনের কথা প্রকাশ করেন। জনসাধারণকে একতার বন্ধনে আবন্ধ করার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন-স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার এবং আমাকে তা অর্জন করতেই হবে। ”(Swaraj is my birth right and I must have it). তিনি মহারাষ্ট্রে বিশেষত পুণা, বোম্বাই, বেরার প্রভূতি অঞ্চলে হােমরুল আন্দোলনের সূচনা করেন। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে তিলকের লীগে ৩২ হাজার সদস্য ছিল। পুণা ছিল হােমরুল আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র।

তিলক মারাঠি ও কেশরী পত্রিকায় হােমরুল আন্দোলনের স্বপক্ষে প্রচার চালিয়ে জনমত গঠনে সচেষ্ট হন। তিলকের লক্ষ্য ছিল — স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠন, মাতৃভাষায় শিক্ষাদান, জাতপাতহীন প্রতিনিধিত্বের ওপর গুরুত্ব স্থাপন। তিনি মনে করতেন— পার্থক্য ব্রাক্ষ্মণ ও অব্রাক্ষ্মণে নয়, পার্থক্য হল শিক্ষিতে ও অশিক্ষিতে। তিলকের গড়ে তােলা হােমরুল লিগের সম্পাদক ছিলেন এন. সি. কেলকার ও সভাপতি ছিলেন যােসেফ ব্যাপ্তিস্থা। তিলক গ্রামের মানুষের নিকট লােকমান্য নামে পূজিত হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, বেসান্ত ও তিলকের উদ্দেশ্য এক হলেও কোনােদিন দুটি হােমরুল লিগ একত্র হয়ে যায়নি।

হােমরুল আন্দোলনের সরকারি প্রতিক্রিয়া (Government response to the Home Rule Movement): ১৯১৭ খ্রীঃ সরকার অ্যানি বেসান্ত, বি. পি. ওয়াদিয়া ও জর্জ অরুণ্ডেলকে গ্রেপ্তার করায় হােমরুল আন্দোলন অকস্মাৎ জেগে ওঠে। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুলাই তিলককে গ্রেপ্তার করে ২০০০০ টাকা জরিমানা করা হয়। এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে স্যার সুব্রহ্মণ্য আইয়ার তার নাইট (Knight) উপাধি ত্যাগ করেন। এমনকি মডারেটপন্থী মালবী, সুরেন্দ্রনাথ ও জিন্নাহ অ্যানি বেশান্তের পক্ষ সমর্থন করেন। ১৯১৭ খ্রীঃ কংগ্রেসে তিলক প্রস্তাব দেন যে, অ্যানি বেশান্তকে অবিলম্বে মুক্তি না দিলে জাতীয় কংগ্রেস নিস্ক্রিয় প্রতিরােধ আন্দোলন আরম্ভ করবে। গান্ধীজির পরামর্শে শঙ্করলাল ব্যাঙ্গার, যমুনাদাস দ্বারকাদাস বেশান্তের অন্তরীণ অগ্রাহ্য করে পদযাত্রা করার জন্যে এক হাজার লােকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। অ্যানি বেশান্তের গ্রেপ্তারের বিক্ষোভে ভীত হয়ে ভারত সচিব মন্টেগু মন্তব্য করেন যে, “শিব তার পত্নীকে ৫২টি অংশে বিভক্ত করার পর দেখেন যে তার ৫২ জন পত্নী বিদ্যমান হয়েছেন। অ্যানি বেশান্তকে গ্রেপ্তার করায় সরকারের একই দুরবস্থা হয়েছে।" শেষ পর্যন্ত সরকার নমনীয় নীতি নেন। ১৯১৭ খ্রীঃ ভারত সচিব মটেণ্ড তার আসন্ন শাসন সংস্কারের ইঙ্গিত দেন। অ্যানি বেশান্তকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯১৭ খ্রীঃ মন্টফোর্ড আইনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে অ্যানি বেশান্ত সরকার বিরােধিতা ত্যাগ করেন।

হােমরুল আন্দোলনের গুরুত্ব (Home Rule Movement Important): (১) হেমরুল আন্দোলন রাজনৈতিক চেতনাবৃদ্ধিতে দেশের সর্বত্র সকল স্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। নরমপন্থী চরমপন্থী, শিক্ষিত অশিক্ষিত, কৃষক শ্রমিক, উচ্চ নীচ, ছাত্র শিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনে সামিল হয়েছিল। প্রতিটি ভারতীয় স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনের প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করেছিলেন।
(২) হোমরুল আন্দোলন থেকে উদ্ভূত স্বায়ত্তশাসনের দাবি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে প্রভাবিত করেছিল, যার পরিপূর্ণতা লক্ষ করা যায় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে। এই আন্দোলনের ফলেই ভারত সচিব মন্টেগু ঘােষণা করতে বাধ্য হন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থেকে ভারতীয়রা যাতে স্বায়ত্তশাসন লাভ করে, তার জন্য ব্রিটিশ সরকার সেই নীতিই গ্রহণ করবে।
(৩) মূলত হোমরুল আন্দোলনের চাপেই পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু চেমসফোর্ড আইন পাস করে।
(৪) হোমরুল আন্দোলনের সূত্র ধরেই গান্ধিজি ভারতীয় রাজনীতির শিখরে উঠে আসতে পেরেছিলেন। গান্ধিজির জনপ্রিয়তার চালচিত্র তৈরিতে হােমরুল আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। হােমরুল আন্দোলনের ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই গান্ধিজির উত্থানের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। গান্ধিজির জীবনীকার জুডিথ. এম. ব্রাউন বলেছেন, "The Home Rule Leagues began in haulting fashion that Gandhiji was later to do boldly and with far greater success."
Advertisement