দিল্লির মামলুক সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন

- October 04, 2019
গিয়াসউদ্দিন বলবন (শাসনকাল: ১২৬৬-১২৮৭ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন দিল্লির মামলুক (দাস বংশ) বংশের নবম সুলতান। তার বাল্যনাম ছিল বাহাউদ্দিন। গিয়াসউদ্দিন বলবন তুর্কিস্তানের বিখ্যাত ইলবারি গােত্রের বংশধর ছিলেন। তার পিতা ১০ হাজার তুর্কি পরিবারের নেতা ছিলেন। কৈশোরে মােঙ্গলরা বন্দি করে গিয়াসউদ্দিন বলবন-কে বাগদাদে খাজা জামালউদ্দিন বুসরা নামে একজন ব্যাক্তির নিকট বিক্রি করেন।খাজা জামালউদ্দিন তাকে দিল্লীতে নিয়ে আসেন এবং সুলতান ইলতুৎমিশের নিকট বিক্রয় করেন। ইলতুৎমিশ তাকে চল্লিশ চক্রে (বন্দেগান-ই-চাহেলাগান) অন্তর্ভূক্ত করেন এবং নিজ কন্যার সঙ্গে বিবাহ দেন। রাজিয়ার আমলে তিনি আমির-ই-শিকার পড়ে অধিষ্ঠিত হন। প্রথমদিকে তিনি রাজিয়ার পার্শ্বচর ছিলেন, কিন্তু ইয়াকুৎ নামক হাবসি ক্রীতদাসের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি রাজিয়ার বিরুদ্ধাচারণ করতে থাকেন। রাজিয়া বিরােধী ষড়যন্ত্রে তিনি উল্লেখযােগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। মুইজউদ্দিন বাহরাম শাহের আমলে রেওয়ার ও হানসীর জায়গীর লাভ করেন। সুলতান আলাউদ্দিন মাসুদ শাহের অপসারণ এবং নাসিরউদ্দিন মামুদ শাহকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তার ভূমিকাই ছিল গুরত্বপূর্ণ। তিনি নাসিরউদ্দিন মামুদ শাহের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১২৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার কন্যার সঙ্গে নাসিরউদ্দিন মামুদ শাহের বিবাহ দিয়ে নিজের মর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন। এ সময়েই তিনি নায়েব-ই-মামলিকাৎ পদ এবং উলুঘ খা উপাধি লাভ করেন। চল্লিশ চক্রের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং নাসিরউদ্দিন মামুদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রভূত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১২৬৬ খ্রিস্টাব্দে নাসিরুদ্দিন মামুদ শাহের মৃত্যু হলে তিনি সিংহাসনে বসেন। তার এই সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই তাকে তথাকথিত দাসবংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতানে পরিণত করে।

গিয়াসউদ্দিন বলবনের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও সমাধান

বলবন সিংহাসনে বসে নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হয় - (১) ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বরনির মতে, আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা ছিল তার সর্বপ্রধান সমস্যা। ইলতুৎমিসের দুর্বল উত্তরাধিকারীদের আমলে শাসনকার্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, দেশের আইন শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং দিল্লির নিকটবর্তী স্থানে মেওয়াটি ও অন্যান্য দস্যুদের উপদ্রবে জনজীবনে নিরাপত্তার অভাব দেখা দেয়। (২) চল্লিশ চক্রের সীমাহীন ঔদ্ধত্য, আমির-ওমরাহদের ক্ষমতালিপ্সা, উদ্ধত ও ষড়যন্ত্রপ্রিয় আচরণ প্রবল সমস্যার সৃষ্টি করে। (৩) এ সময় কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে, দেশে আইন শৃঙ্খলা না থাকায় রাজপদের গুরুত্ব হ্রাস পায়, সাধারণ মানুষ সরকারের প্রতি আস্থা হারায় এবং রাজকীয় মর্যাদা শােচনীয়ভাবে খর্ব হয়। (৪) বহিরাগত উত্তর পশ্চিম সীমান্তে মােঙ্গলদের ধারাবাহিক আক্রমণে সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। এই অবস্থায় বলবন সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করে সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন।

গিয়াসউদ্দিন বলবন সিংহাসনে বসে প্রথমেই তিনি অরাজকতা বন্ধ করে দেশে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হন। এজন্য তিনি প্রথমে মেওয়াটি দস্যুদের দিকে দৃষ্টি দেন। সুলতানি যুগের সূচনা থেকেই রাজপুতানার মেওয়াট নামক স্থানের অধিবাসীরা দিল্লি ও তৎসংলগ্ন স্থানে দস্যুবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। রাজপথে তারা বণিকদের সমস্ত লুঠ করত—এমনকী সুযােগ বুঝে রাজধানী দিল্লির অভ্যন্তরে লুঠপাট চালাত। মানুষের জীবন ও সম্পত্তির কোনও নিরাপত্তা ছিল না। এর অবসানের উদ্দেশ্যে বলবন দিল্লির সন্নিহিত অঞ্চলের সমস্ত বনজঙ্গল কেটে পরিষ্কার করেন, যাতে দস্যুরা কোনওভাবেই সেখানে আশ্রয় না পায়। অতর্কিত আক্রমণ দ্বারা তিনি বহু মেওয়াটিকে হত্যা করেন এবং মেওয়াটি গ্রামগুলি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি গােপালগির নামক স্থানে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন এবং জালালি দুর্গটি সংস্কার করেন। এই অঞ্চলে প্রচুর পুলিশ ও সেনা চৌকি নির্মাণ করে ওইসব স্থানে আফগান সেনা মােতায়েন করা হয়। এর ফলে এই স্থানে শান্তি ফিরে আসে।

এরপর তিনি দিল্লির সুলতানি সাম্রাজ্যের শস্যভাণ্ডার গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চলের দিকে দৃষ্টি দেন। এই অঞ্চলের হিন্দু কৃষক ও জমিদাররা তুর্কি শাসনকে মেনে নিতে পারে নি। তাদের উপদ্রবে এই অঞ্চলের উপর দিয়ে সকল বাণিজ্যপথগুলি বন্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থায় তিনি দোয়াবের বিদ্রোহী গ্রামগুলিতে অত্যাচার চালিয়ে ছারখার করে দেন, সকল সক্ষম পুরুষদের হত্যা করা হয় এবং নারী ও শিশুদের দাস দাসীতে পরিণত করা হয়। এই অঞ্চলের সকল জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করা হয় এবং সমগ্র অঞ্চলটিকে ছােটো ছােটো ইক্তায় বিভক্ত করে সেগুলির শাসনভার তুর্কি সেনাপতিদের দেওয়া হয়।

অযোধ্যার অন্তর্গত কাম্পিল, পাতিয়ালি প্রভৃতি অঞ্চলের দস্যুদের উপদ্রবে সুলতানি সাম্রাজ্যের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। বলবন কাম্পিল, পাতিয়ালি, ভােজপুর ও জালালি-তে দুর্গ নির্মাণ করে ওই অঞ্চলে অর্ধ বর্বর আফগান সেনা নিয়ােগ করেন। এরপর তিনি কাটেহার (বর্তমান রােহিলখণ্ড)-এর বদাউন, আমরাহাে প্রভৃতি অঞ্চলের দস্যুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কঠোর দমননীতি ও নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১২৬৮-১২৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি যুদ বা লবণ পর্বত এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিদ্রোহী খোক্কর উপজাতিদের দমন করেন।