দিল্লির সুলতানি সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

- October 18, 2019
১২০৬ খ্রিস্টাব্দে কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লিতে সুলতানী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে মােগল বীর বাবরের হাতে ইব্রাহিম লােদির পরাজয়ে দিল্লির সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে। তিন শতকের বেশি সময় ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার পর দিল্লির সুলতানী শাসনের পতন ঘটে। ভারতে সুলতানী শাসন ছিল তুর্কী আফগান শক্তির যুগ। সুলতানী সাম্রাজ্যের পতনের পশ্চাতে নানা কারণকে দায়ী করা যায়।
দিল্লির সুলতানি সাম্রাজ্যের পতনের কারণ
নেতৃত্বের দুর্বলতা (Weakness of leadership): স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে সম্রাটের ব্যক্তিগত দক্ষতার উপর নির্ভরশীল। ইলতুৎমিস, বলবন ও আলাউদ্দিন খলজির আমলে সুলতান শক্তির শ্রীবৃদ্ধি ঘটলেও পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালের শেষ দিকে সুলতানী সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রিয় সংহতি শিথিল হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলি মাথা তুলে দাঁড়ায়। ফিরোজ শাহ তুঘলক সুলতানী সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। হাইগ বলেন যে, ফিরোজের বিকেন্দ্রীকরণ নীতি সাম্রাজ্যের শিথিলতা করে। পরবর্তী সুলতানদের অধিকাংশই ছিলেন দুর্বলচিত্ত, বিলাসপ্রিয়, নীতিবােধহীন ও শাসনকার্যে অক্ষম। এর ফলে সুলতানি শাসনের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

সাম্রাজ্যের বিশালতা (Vastness of the empire): সুলতানি সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সাম্রাজ্যের বিশালতা। অপ্রতুল ও অনুন্নত যােগাযােগ ব্যবস্থার ফলে সমগ্র উত্তর ভারত ও দাক্ষিণাত্যের এক বিস্তীর্ণ স্থান নিয়ে গঠিত এই বিশাল সাম্রাজ্যকে দিল্লি থেকে শাসন করা সম্ভব ছিল না। কোথাও কোনও বিদ্রোহ ঘটলে তার সংবাদ পেতে যেমন বিলম্ব হত, তেমনি তা দমনের জন্য ব্যবস্থা নিতেও সময় লাগত। এই কারণে আলাউদ্দিন খলজি দক্ষিণাত্যকে নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করার চেষ্টা করেন নি। তিনি কেবলমাত্র কর আদায় করেই সন্তুষ্ট ছিলেন। মহম্মদ-বিন-তুঘলক দাক্ষিণাত্যকে সুলতানি শাসনের অধীনে আনতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। এছাড়া, আঞ্চলিক ও ভাষাগত বিভিন্নতা সুলতানী সাম্রাজ্যের সংহতি বরে বিনষ্ট করেছিল।

জনসমর্থনের অভাব (Lack of public support): দিল্লি সুলতানি শাসনের মূল ভিত্তি ছিল সামরিক বল এবং সামরিক বলের উপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এর পশ্চাতে কোনও জনসমর্থন বা জনগণের কোনও আনুগত্য ছিল না। সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার ব্যাপারেও জনগণের কোনও আগ্রহ ছিল না। সুলতানি শাসনের প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের সহযােগিতার অভাব সুলতানি সাম্রাজ্যের শক্তিহানি ঘটায়। দিল্লীর সুলতানগণ কোন আদর্শ নীতি গ্রহণ করেননি এর ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের আস্থা শিথিল হতে থাকে। গিয়াসউদ্দিন বলবন, ফিরােজ শাহ তুঘলক প্রভৃতির ইসলামের প্রতি অবাধ অনুরাগ হিন্দুদের বিরাগ সৃষ্টি করে। জনসমর্থনের অভাবে সুলতান শাসনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

ধর্মীয় নীতি (Religious Policy): সুলতানদের অধিকাংশই তাদের অ-মুসলিম প্রজাবৰ্গ সম্পর্কে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার নীতি গ্রহণ করেন। ভারতের মতাে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর দেশে উদার ও নিরপেক্ষ ধর্মীয় নীতি অনুসরণ করার পরিবর্তে, সুলতানদের অনেকেই অ-মুসলিম প্রজাদের সম্পর্কে ধর্মীয় বিদ্বেষের নীতি গ্রহণ করেন। হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর ও নানা ধরনের দমনমূলক করভার আরােপিত হয়। হিন্দু মন্দির ধ্বংস ও ধর্মান্তরিত করা একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়। এর ফলে দেশে বিশালসংখ্যক মানুষ সুলতান শাসন সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে, যা সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

মহম্মদ বিন তুঘলকের দায়িত্ব (Responsibility of Muhammed bin Tughlaq): দিল্লি সালতানাতের পতনে মহম্মদ বিন তুঘলক ও ফিরােজ তুঘলকের দায়িত্ব কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না। মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তরিতকরণ, খােরাসান জয়ের পরিকল্পনা, ব্রোঞ্জের প্রতীকী মুদ্রার প্রবর্তন প্রভৃতির ফলে সাম্রাজ্যের বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয় এবং সম্রাটের মর্যাদা বিনষ্ট হয়। তার আমলে বহু ভারতীয় মুসলিম, নিম্নশ্রেণির মানুষ ও বিদেশি অভিজাত সম্প্রদায়ভুক্ত হয়। এর ফলে অভিজাত শ্রেণির সংহতি বােধ বিনষ্ট হয়। তার নানা পাগলা নীতির ফলে বাংলা, দাক্ষিণাত্য, সিন্ধু প্রভৃতি অঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দেয় যা দমন করা তার পক্ষে সম্ভব হয় নি।

ফিরােজ শাহ তুঘলকের দায়িত্ব (Responsibility of Firuz Shah Tughluq): মহম্মদ বিন তুঘলকের উত্তরাধিকারী ফিরােজ শাহ তুঘলকের দুর্বল শাসনে সাম্রাজ্য দ্রুত পতনের দিকে অগ্রসর হয়। যুদ্ধ-বিগ্রহ অপেক্ষা তিনি ধর্মের প্রতি অধিক আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি ক্রীতদাসদের সংখ্যাবৃদ্ধি করেন, জায়গির প্রথা পুনঃপ্রবর্তন করেন, সেনাবাহিনীর পদ বংশানুক্রমিক করেন এবং সম্রাজ্যে উলেমাদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এর ফলে সুলতানী সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে থাকে।

বৈদেশিক আক্রমণ (Foreign invasion): উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে বারংবার মােঙ্গল আক্রমণ সুলতান শাসনকে নানাভাবে বিপর্যস্ত করে এবং তার প্রাণশক্তি নিঃশেষিত করে দেয়। একমাত্র বলবন ও আলাউদ্দিন খলজি ব্যতীত অপর কোনও সুলতান মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে কোনও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণে সমর্থ হন নি। তৈমুরের ভারত আক্রমণ, হত্যাকাণ্ড ও লুণ্ঠন সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ও মর্যাদার উপর বিরাট আঘাত হানে এবং সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও আর্থিক বুনিয়াদ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর ক্ষয়িষ্ণু সুলতান শাসনের উপর চরম আঘাত হানেন। এর ফলে সুলতানি শাসনের সম্পূর্ণ অবলুপ্তি ঘটে এবং পানিপথের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে জন্ম নেয় এক নতুন ভারত।
Advertisement