Women's Education in Ancient India - প্রাচীন ভারতের নারী শিক্ষা

- October 24, 2019
ভারতবর্ষের ইতিহাসে নারী পুরুষের সমানাধিকারের অবদান প্রায় নেই। হরপ্পা সভ্যতার বিষয়ে সাহিত্যিক উপাদানের অভাবে নিশ্চিত করে এ বিষয়ে কিছু বলা যায় না। তাই বৈদিক যুগ থেকে নারী শিক্ষা নিয়ে আলোচনা শুরু করতে হবে। কিন্তু বৈদিক যুগের সাল তারিখের প্রসঙ্গে পণ্ডিতেরা বিবাদ করেন। সে বিবাদের মধ্যে না গিয়ে আমরা বৈদিক সাহিত্যকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করে নিতে পারি। প্রথম পর্যায়, ঋকবৈদিক যুগে যখন ঋগবেদ রচিত হয়েছিল এবং দ্বিতীয় পর্যায় পরবর্তী বৈদিক যুগ, যখন বেদাঙ্গ ছাড়া অন্যানা সাহিত্যের সৃষ্টি। ঋকবৈদিক যুগে নারী শিক্ষার প্রসারের প্রসঙ্গে বিশ্ববারা, ঘােষা, অপলা, লােপামুদ্রা, বাগাঙ্গুনা ইত্যাদি অন্তত কুড়িজন নারীর নাম সর্বত্রই উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত, উপনিষদের যুগে ব্রহ্মবাদিনী গার্গী যথেষ্ঠ আত্মবিশ্বাস নিয়েই যাজ্ঞবল্ক্যর সঙ্গে বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং ঋষিপত্নী মৈত্রেয়ী পার্থিব সম্পদ উপেক্ষা করে অমৃতা হবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন-এসব তথ্য যুগান্তরিত হয়ে আজও নারীকে উদ্দীপিত ও অনুপ্রাণিত করে। অথর্ববেদের নির্দেশানুযায়ী ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমে যথার্থ শিক্ষা শেষেই একজন কন্যা একটি যুবককে বিবাহ করতে পারে। বৃহদারণ্যক উপনিষদে পরিবারে কাঙ্খিত সুপণ্ডিত ও দীর্ঘজীবী কন্যা লাভের জন্য পিতাকে একটি বিশেষ খাদ্যগ্রহণের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
women education in Ancient India
ঋকবৈদিক যুগে সমাজ ছিল পশুচারণ ভিত্তিক। ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারনাটা এখানে স্পষ্ট নয়। এযুগে মানবজাতির পিতৃপুরুষরা সমবেতভাৰে পুজিত হয়েছেন। পরবর্তী বৈদিক যুগে এই চিত্রটা সর্বাংশে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এ যুগে যজ্ঞকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে সামাজিক জীবনের কেন্দ্রে। ফলে বেড়েছে যজ্ঞ সাহিত্যের কলেবর। এই বিরাট সাহিত্য যার মধ্যে গণিত, জ্যামিতি, জ্যোতিবিদ্যার মত কঠিন সব বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল, তা কেবলমাত্র শুনে মুখস্ত রাখা জটিলতর। ফলে পুরােহিত শ্রেণীকে একাজে নিয়ােজিত হতে হয়। অপরপক্ষে ক্রমশই ব্যবহারিক জীবনের অন্য ধরণের নানা বিষয়ের সঙ্গে এই শাস্ত্রের যােগও ক্ষীণতর হতে থাকে। ফলে সব বর্ণের সকল মানুষ সারাজীবন এই শাস্ত্রকে অবিকৃতভাবে ধরে রাখার চেষ্টায় নিয়ােজিত হলে তাে সমাজই অচল হয়ে যেত। ফলে বেদবিদ্যার রক্ষা ও চর্চার দায়িত্ব পুরােপুরি পুরােহিত শ্রেণীর অধীনস্থ হয়ে যায়। কৌটিল্যের তর্কশাস্ত্রে বেদবিদ্যার পাশাপাশি কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্যকে বিদ্যাচর্চার বিষয় হিসাবে যে উল্লেখ পাওয়া যায় সেগুলির প্রতি আগ্রহী হচ্ছিল অন্য বর্ণের জনগণ। ফলে একদিকে যেমন, পুরােহিত শ্রেণীর প্রচেষ্টার ফলেই প্রাচীনতম সাহিত্য উত্তরকালের মানুষের হাতে এসেছে প্রায় অবিকৃতভাবে অপরদিকে বৈদিক সাহিত্যের জটিল বিস্তৃতির এবং তাকে অবিকৃতভাবে ধরে রাখার প্রচেষ্টায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তৎকালীন শিক্ষা। পরবর্তী বৈদিক যুগে পারিবারিকভাবে পিতৃপূজার রীতি প্রচলিত হয়। শতপথ ব্রাহ্মণ ঘােষণা করে যে মানুষের জন্ম সূত্রে প্রাপ্ত পিতৃঋণ পরিশােধের জন্য পুত্র অনিবার্য। এই তীব্র পুত্রাকাঙ্খই, জটিল বেদবিদ্যার অধ্যয়নে মেয়েদের ব্যাপৃত রেখে সময় নষ্ট করানাের পরিবর্তে তাদের তাড়াতাড়ি বিবাহ দেবার জন্য সমাজের আগ্রহ বেড়ে যায়।

এ. এস. অলটেকার-এর মতে নারী শিক্ষার অবনতির অপর একটি কারণ খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ অব্দ থেকে সমাজে শুদ্ৰাবিবাহ প্রবণতার শুরু এবং খৃষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দের মধ্যে অনার্য স্ত্রীদের সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমাজে নারীর অবস্থানের অবনতি ঘটে। কারণ বৈদিক সাহিত্যের শুদ্ধি রক্ষায় নিবেদিত প্রাণ পুরােহিত সম্প্রদায় কোনভাবেই অশুদ্ধ মন্ত্র উচ্চারণের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। অতএব প্রথমাবস্থায় তারা অনার্য স্ত্রীকে স্বামীর ধর্মসঙ্গিনী হতে নিষেধ করলেন। কিন্তু রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থানকারী নরপতিদের ক্ষেত্রে তাদের কেবলমাত্র অনার্য স্ত্রীদের বাদ দেওয়া সহজ ছিল না। ফলে সকল নারীর জন্যই যজ্ঞে মন্ত্রোচ্চারণ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। যজ্ঞকেন্দ্রিক সমাজে নারীর অগ্রাধিকার চলে যাবার অর্থ শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, শিক্ষাগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারও হারানাে। কারণ সঠিক মন্ত্রোচ্চারণে সক্ষমতার জন্য দীর্ঘদিন ধরে বৈদিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত, সবর্ণ ধর্মপত্নীই তার যক্ষ্মীয় অধিকারের বলে পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হতেন। নারী মন্ত্রণধিকার সংক্রান্ত বিতর্কে তার অথনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটি জৈমিনীয় মীমাংসা গ্রন্থে (খৃষ্টপূর্ব ৫০০ - ২০০) আলােচিত হয়েছে সেখানে স্পষ্ট করেই জৈমিনি রক্ষণশীল ঐতিশায়নের মত নিজস্ব জোরালাে যুক্তি দ্বারা এবং প্রাচীন প্রবক্তা বাদরায়ণের প্রামাণ্য, খণ্ডন করে তার অবিচল সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

জৈমিনি স্পষ্ট করেই দুটি কথা বলেছেন। প্রথমত যজেত স্বৰ্গকামঃ অর্থাৎ স্বর্গকাম ব্যক্তি যজ্ঞ করবে এই বিধিবাক্যটিতে পুংলিঙ্গ যথার্থ নয় কারণ স্বর্গকামনা পুরুষেরই একচেটিয়া নয়, নারীর স্বর্গকামনা স্বাভাবিক। দ্বিতীয় নিজস্ব ধনের প্রশ্নে এ উদাহরণ যথেষ্ট মেলে যে নারীর ধনাধিকার শ্রুতি সিদ্ধ। রামায়ণ ও মহাভারতে বিবাহিত নারীরা সতন্ত্রভাবে মন্ত্রোচ্চারণ ও যজ্ঞ করেছেন এমন বহু উদাহরণ আছে। যদিও দম্পতির এক যজ্ঞানুষ্ঠানই কাম্য। কেীশল্যা থেকে বালিপত্নী তারা পর্যন্ত সকল অংশের নারীই একাকী যজ্ঞানুষ্ঠান করেছেন। সীতা সন্ধ্যাকালে বৈদিকম উচ্ছারণ করতেন। কুন্তী অথর্ববেদে পারদর্শিনী ছিলেন।

নারী শিক্ষার প্রচলনের প্রমাণ খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০ থেকে ৩০০ অব্দে রচিত পাণিনির ব্যাকরণে মেলে। ছাত্রাদয়ঃ কালায়াম সূত্রে পাণিনী ছাত্ৰীশালা অর্থাৎ ছাত্রীদের বাের্ডিং হাউসের কথা বলেছেন। তাছাড়া আচার্য ও উপাধ্যায় শব্দদুটি পাণিনির ব্যাকরণে উল্লেখ থাকায় স্পষ্টই বােঝা যায়, সে যুগে নারীরা নিজেই শিক্ষকতা করতেন। মন্ত্রোচ্চারণে অশুদ্ধি বিষয়ে পুরােহিতদের ভীতিই যে সাধারণ নারীকে বৈদিক শিক্ষার অঙ্গণ থেকে বহিস্কৃত করেছিল তার প্রমাণ অন্য গ্রন্থ থেকে বােঝা যায়। উত্তরকালীন হারীতস্মৃতি গ্রন্থে ব্ৰহ্মবাদিনী ও সদ্যবধু এই দুধরনের নারীর উল্লেখ তাৎপর্যময়। ব্রহ্মবাদিনী নারীরা অবিবাহিতা কন্যারূপে নিজগৃহে থাকতেন এবং যাবতীয় বিদ্যাচর্চা তথা বেদাধ্যয়ন করতেন। কিন্তু গার্হস্থ্য জীবনের সকল জীবন আবর্তিত হয় এবং গার্হস্থ্য জীবনের সকল কর্তব্যকর্মই গৃহপতি ও গৃহিনী মিলিতভাবে সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করবেন বলেই শাস্ত্রের বিধান ছিল। তবু গৃহিনী সকলের সুখদর্শিকা সম্রাজ্ঞী। সুতরাং এই সম্রাজ্ঞী নারীর পারিবারিক ও সামাজিক কর্তব্য পালনে একনিষ্ঠ অভিনিবেশ অবশ্য প্রয়ােজন। সুতরাং অপর তিনটি আশ্রমের প্রতিপালক এবং প্রাত্যহিক সাংসারিক যাবতীয় কর্তব্য পালনের সঙ্গে বিদ্যার্জনের জন্য যে দীর্ঘ সময়, মনােনিবেশ ও শ্রম স্বীকার প্রয়ােজন তাও করা একজন নারীর পক্ষে অসম্ভব ছিল। অতএব সদ্যবধূদের বিদ্যাচর্চা থেকে অব্যহতি দেওয়া হত।

গৃহস্থশ্রমের সুস্থিতি যাঁদের উপর নির্ভরশীল নয় সেই ব্রহ্মবাদিনী তপস্বিনীর বিদ্যাচর্চায় পুরােপুরি মনােনিবেশ করতেন। এঁরা সামাজিক সম্মানও পেতেন এবং বিদ্যাচর্চার জন্য একা দীর্ঘ পথ ভ্রমণও করতেন। তার জন্য কোন সামাজিক বাধা ছিলনা। সাহিত্যে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন ভবভূতির ‘উত্তররাম চরিত' নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে আত্রেয়ী নামের এক ব্রহ্মচারিণী বাল্মীকি মুনির আশ্রয় ছেড়ে একাই সুদূর অগত্যমুনির আশ্রমে উপস্থিত হয়েছিলেন বেদান্ত শিক্ষার জন্য। কারণ তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন বাল্মীকির আশ্রমে লব ও কুশ নামে দুটি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র আসায় ঋষির মনােযােগ তাদের দিকেই গেছে। ফলে তার পড়াশুনা ভালাে হচ্ছিল না। অষ্টম শতাব্দীর কবি ভবভূতির বল্মীকির আশ্রমে সহশিক্ষার কল্পনা করতে পেরেছিলেন। কেবলমাত্র "উত্তররাম চরিত"ই নয় ভবভূতি তার ‘মালতীমাধব' নাটকেও কামন্দকী নামের বৌদ্ধ শ্ৰমণীর চরিত্র অঙ্কন করেছিলেন যিনি শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষালাভের সময় বিভিন্ন স্থানের ছাত্রদের সাহচর্য পেয়েছিলেন। শ্রমণা কামন্দকী কেবলমাত্র ভবভূতির সৃষ্টিই নয়।
Advertisement

বস্তুতপক্ষে মহাপ্রজাপতি গৌতমী ও বুদ্ধ শিষ্য আনন্দের প্রেরণায় এবং বুদ্ধের নিরুৎসাহ সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভিক্ষুণী সংঘ। এই ভিক্ষুণী সংঘ শুধুমাত্র শিক্ষাকেন্দ্রই ছিল না মহত্বপূর্ণ সামাজিক সংস্থায় রূপান্তরিত হয়েছিল। এই সংস্থার আশ্রয়ে কিছু নারী স্বতন্ত্র চিন্তার সুযােগ এবং নিজ মতামত ব্যক্ত করার সুবােগ পেয়েছিল। এদের মধ্যে রাজপরিবারের ও ধনী ব্যাপারী কুলের সাধারণ গৃহিনী, বণিতা, এবং সর্বনিম্নস্তরের দাসীদের সঙ্গে ভিক্ষুণী সংঘের সদস্যরা থাকতেন। এই ভিক্ষুণী সংঘের এই বিশেষ সদস্যদের রচনা সপ্তম শতাব্দীতে সংকলিত হয় 'থেরিকাথা' নামে, তার সঙ্গে ছিল এক ভাষ্য যাতে ভিক্ষুণীদের বিবরণ উদ্ধৃত হয়। এ থেকে জানা যায় যে থেরিয়া ছিল বিভিন্ন শ্রেণীর এবং অনেকেই বুদ্ধের জন্মস্থান শাক্য গণরাজ্যে উপস্থিত ছিল। এই থেরিকাথা সপ্তম শতাব্দীতে সংকলিত হলেও এর অনেক রচনাই যথেষ্ট প্রাচীন। এই রচনাগুলিতে নির্বান লাভের প্রচেষ্টা ও সাফল্যর মত বিষয়ও বর্ণিত হয়েছে সহজ, সরল, স্পষ্ট ও ভাবাবেগ পূর্ণভাবে। উদাহরণ হিসাবে দাসি পুন্নার রচনার উল্লেখ করা যায়। ভাষ্য থেকে জানা যায় যে ভিক্ষুণী হবার আগে পুন্না ছিলেন দাসি। তার রচনাটি সংলাপের আকারে। সংলাপটি ছিল নদী তীরে গার্হস্থ্য কর্মের জন্য জল নিতে আসা পুন্না এবং নদীতে স্নান করে পুণ্য অর্জন করতে আসা ব্রাহ্মণের মধ্যে। পুন্না ব্রাহ্মণকে বিদ্রুপ করে বলেন নদীতে স্নানের দ্বারাই যদি পুণ্য অর্জন সম্ভব হয় তাহলে নদীতে সর্বদা অবস্থানরত মাছ ও কচ্ছপ অনায়াসেই মােক্ষ লাভ করতে পারে। তাছাড়া জলের যদি পাপ ধৌত করার ক্ষমতা থাকে তবে অর্জিত পুণ্যও জলস্রোতে ভেসে যেতে পারে। অতত্রব শীতে শারীরিক ক্লেশ স্বীকার না করে পুণ্য প্রাপ্তি অন্য উপায়ে প্রয়ােজন। নিরুত্তর ব্রাহ্মণ পুন্নার যুক্তি স্বীকার করে বৌদ্ধ সংঘে যােগ দেন। লক্ষ্যণীয়, পুন্নার যুক্তি স্পষ্ট কিন্তু কোন জটিল শাস্ত্র চর্চার প্রচেষ্টা নেই। আছে অনুভব ও বাস্তব সাধারণজ্ঞানের প্রভাব।

বৌদ্ধ ভিক্ষুণী সংঘ স্থাপিত হওয়ার পর নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার, শাস্ত্র চর্চা ও সদধর্মের অনুশীলনে কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠাই শুধু নয় নিজস্ব রচনাশৈলীর উন্নতির সুযােগ সৃষ্টি হয়। এমনকি বিশাখার মত ধনী শ্রেষ্ঠা পরিবারের মেয়েরা নানাবিদ্যায় পারদর্শিনী ছিলেন। বস্তুতপক্ষে বৌদ্ধ হিন্দু নির্বিশেষে রাজকুল ও অভিজাত পরিবারের এবং পণ্ডিত বংশের নারীরা বিদ্যার্জনের সুযােগ পেতেন। বিবাহের পরেও কেউ কেউ বিদ্যাচর্চা বজায় রেখেছিলেন। খৃষ্টীয় প্রথম শতকে হাল রচিত “গাথাসপ্তশতী" থেকে নবম শতকের রাজশেখরের রচনা পর্যন্ত বহু নারী কবির নাম পাওয়া যায়। শীলভট্টারিকাকে রাজশেখর বাণভট্টের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কর্ণাটের মহিলা কবি বিজয়াংকার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে রাজশেখর মন্তব্য করেছেন-শ্যামবর্ণা বিজয়ংকাকে জানতেন না বলেই দন্ডী তার কাব্যদর্শ গ্রন্থে সরস্বতী সর্বশুক্লা বলে বর্ণনা করেছেন। বিবাহিত হয়েও বিদ্যাচর্চা বজায় রেখেছিলেন এমন নারীদের মধ্যে উভয় ভারতীয় নাম অবশ্য উল্লেখ্য। বেদান্ত ও মীমাংসা শাস্ত্রের দুই দিক পাল শংকরাচার্য ও মাশুন মিশ্রের বিতর্কে মাশুন মিশ্রের পত্নী হয়েও উভয় ভারতীয় পক্ষপাতহীনভাবে যোগ্যতার সঙ্গে মধ্যস্থতা করেছিলে। কিন্তু কেবলমাত্র শাস্ত্রচর্চার ক্ষেত্রেই নয়, প্রাচীন ভারতীয় নারীর সাহস, বীর্য ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুদ্ধবিদ্যার প্রয়োগেও পিছপা ছিলেন না। অন্ধ্র, বাকাটক, কাশ্মীর, চালুক্য রাজ্যের রাণীদের অস্ত্রনৈপুণ্য ও শাসনদক্ষতা ছিল।

সাধারণ নারীদের ক্ষেত্রে শিক্ষার দরজা বন্ধ থাকার অন্যতম প্রধান কারণ অবশ্যই বাল্যবিবাহ এবং পুরুষদের বহু বিবাহের প্রথা। সংসারের দায়িত্বে আবদ্ধ নারী, সংসারে প্রত্যক্ষভাবে কাজে লাগে না, এমন বিদ্যাচর্চার সুযােগ পায়নি। অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ পরিবারে বধূর জন্য শিক্ষাখাতে খরচ করার প্রশ্নই ওঠেনি। পুরুষের বহু বিবাহ কেবলমাত্র যে অসবর্ণ বিবাহের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে তাই নয়। অগণিত নিরক্ষর বাল্যবিধবার সৃষ্টি করেছে। এদের সুরক্ষার জন্য এককভাবে নারীর উপরই বর্তেছে, কঠোর ব্রহ্মচর্যের বিধান। পুরুষ শাসিত সমাজ আর্থিকভাবে সক্ষম পুরুষজাতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। সতী শব্দের কোন পুংলিঙ্গ শব্দই কোনদিন তৈরী হয়নি। সুতরাং সহজাত জ্ঞান বুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও কেবলমাত্র শাস্ত্র অধ্যয়নে অধিকার না থাকার জন্য সাধারণ নারীর পক্ষে শাস্ত্র নির্ভর কর্তব্য ও অকর্তব্য নিরূপণ করা সম্ভব নয় বলেই সমাজে তাদের স্বাধীনতার অভাব রয়েছে।

সুতরাং প্রাচীন ভারতে নারীদের সংগঠন হিসাবে আলাদাভাবে কিছু খুজে পাওয়া অসম্ভব। যদিও ঋক বৈদিক যুগে সাধারণ সংগঠন সভা ও সমিতিতে নারীরা অংশগ্রহণ করতেন। সমাজের উচ্চাংশের নারীরা ক্রমেই পুরুষাধীন হয়ে পড়ায় তাদের জীবন ধারণের জন্য অর্থ উপার্জনের পথও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অপেক্ষাকৃত নিম্নাংশের মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভরতা বজায় ছিল। পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট মােচনের জন্যই যেহেতু সেটা প্রয়ােজনীয় ছিল তাই সেখানে সমাজিক বাধা তেমন ছিল না। এছাড়া এই অংশের নারীদের এক বড় অংশ দাসীবৃত্তির সঙ্গেও যুক্ত ছিল যাদের স্বাধীনতা প্রধানতই নির্ভর করত তাদের প্রভুদের দয়া ও মানসিক উৎকর্ষের উপর। এই ধরনের স্বনির্ভর মেয়েরা সংশ্লিষ্ট কর্ম জগতের সংগঠন যেমন গিল্ড ইত্যাদির সঙ্গে অবশ্যই অনিবার্যভাবেই যুক্ত থাকতাে।
Advertisement