PayPal

ভিয়েতনামের যুদ্ধ ১৯৪৫-১৯৭৫

author photo
- Wednesday, September 04, 2019
ভিয়েতনাম দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটি সফল কেন্দ্র ছিল। ভিয়েতনামের যুদ্ধ দুটি পর্বে হয়েছিল প্রথমত, ১৯৪৫-১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন। দ্বিতীয়ত, ১৯৫৬-১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মার্কিন সাহায্যপুষ্ট দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নগুয়েন আইকওক-এর নেতৃত্বে ভিয়েতনামে মুক্তি আন্দোলন সংগঠিত হয়। তিনি হো চি মিন নামে পরিচিত। তিনি মার্কসীয় মতাদর্শে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৯৪১ সালে Vietnam Independence League বা ভিয়েতমিন নামে জাতিয়তাবাদী সংগঠন গড়ে তোলেন।
Vietnam War 1945
ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় আন্দোলন : উনবিংশ শতকের শেষ দিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফরাসিদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কম্বােডিয়া, লাওস, টংকিং, আন্নাম এবং কোচিনকে নিয়ে গড়ে ওঠে ভিয়েতনাম অঞ্চলে ফরাসিদের উপনিবেশ। এই ইন্দোচিনের প্রাচীন নাম ভিয়েতনাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্স জার্মানির কাছে বিপর্যস্ত হয় এবং ইন্দোচীনে জাপানের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। জাপান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করে। জাপান ১৯৪৫ এর মার্চে স্থানীয় ফরাসী প্রশাসনের অবসান ঘটিয়ে আন্নাম, টংকিং ও কোচিনকে একত্রিত করে ভিয়েতনাম রাষ্ট্রের সৃষ্টি করে এবং অন্নামের সম্রাট বাও-দাই এর নেতৃত্বে প্রতীকী স্বাধীনতা প্রদান করা হয়। কিন্তু ১৯৪৫ এর আগস্টে জাপানের পরাজয় হলে, হাে চি মিন-এর নেতৃত্বে ভিয়েতমিন বাহিনী টংকিং-এর রাজধানী হ্যানয়ে প্রবেশ করে এবং উত্তর ভিয়েতনামে Democratic Republic of Vietnam (D.R.V.) গঠন করে। ১৯৪৬ সালে হো চি মিন ভিয়েতনাম-কে একটি গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে।

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েতমিন এর সঙ্গে ফ্রান্সের চুক্তি হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামকে একটি যুক্তরাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এরপরেও ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের স্বাধীন অস্তিত্বকে নানাভাবে বিপন্ন করায় ভিয়েতনামে গেরিলা প্রতিরােধের সূচনা হয়। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে ফ্রান্স হাইফং-এ বােমাবর্ষণ করে ৬০০০ মানুষ হত্যা করে এবং বাও-দাইকে ভিয়েতনামে ফিরিয়ে এনে ভিয়েতমিন-এর প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার গঠন করে। ফ্রান্সের মিত্রদেশ ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাও-দাই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে চিন ও রাশিয়া হাে চি মিন-এর ভিয়েতনাম প্রজাতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেয়। এমনকি ভিয়েতনামের জনগণ ভিয়েতমিনকে সমর্থন করে। অবশেষে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ৭ই মে দিয়েন বিয়েন ফু (Dien-Bien-phu)-র যুদ্ধে ফরাসি বাহিনীর সেনাপতি হেনরি নভারে, হো-চি-মিন বাহিনী ভিয়েতনাম সেনাপতি গিয়াপের কাছে আত্মসমর্পণ করলে ফরাসি শক্তির সম্পূর্ণ বিপর্যয় ঘটে। আট বছর ব্যাপী ভিয়েতনাম যুদ্ধে ফ্রান্সকে অসীম মূল্য দিতে হয়। ৯২০০০ ফরাসি সেনা নিহত এবং ১১৪০০০ আহত হন। দিয়েন বিয়েন ফু-তে ১৫০০০ ফরাসি সেনা আটক হয়।

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে জেনেভা সম্মেলনে ভিয়েতনাম ও ফ্রান্সের মধ্যে যুদ্ধ স্থগিতের সিদ্ধান্ত ঘােষিত হয়। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। (ক) ১৭° অক্ষাংশের ভিত্তিতে ভিয়েতনামকে অস্থায়ীভাবে বিভক্ত করা হয় — উত্তর ভিয়েতনাম এবং দক্ষিণ ভিয়েতনাম। উত্তর ভিয়েতনামের প্রশাসন অর্পিত হয় হো চি মিন-এর কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী ভিয়েতমিনের ওপর। দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রশাসন অর্পিত হয় অকমিউনিস্ট প্রশাসন ফ্রান্সের ওপর। দুই ভিয়েতনামের ঐক্যসাধনের জন্য ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন পরিচালনার কথা বলা হয়। (খ) উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামে কোনাে বিদেশি সেনা অবস্থান করবে না। (গ) শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি তদারকের জন্য একটি আন্তর্জাতিক কন্ট্রোল কমিশন গঠনের কথা বলা হয়। (ঘ) লাওস ও কম্বােডিয়া থেকে ফরাসি শাসনের অবসান ঘটিয়ে পূর্বতন রাজতন্ত্র ক্ষমতাসীন করা হয়।

ভিয়েতনাম ও আমেরিকা যুদ্ধ : আইজেনহাওয়ার প্রশাসন অবশ্য জেনেভা সম্মেলনের দরুন উত্তর কোরিয়ায় কমিউনিস্টদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি। জেনেভাতে উপস্থিত আমেরিকার প্রতিনিধি জেনেভার শর্ত সমূহের সঙ্গে একমত হলেও আনুষ্ঠানিক ভাবে আমেরিকা জেনেভা চুক্তিতে স্বাক্ষর প্রদান করেনি। পরিবর্তে আমেরিকার তরফ থেকে এই মর্মে একটি ঘােষণা জারি করা হয় যে, জেনেভা চুক্তির কোন শর্ত লঙ্ঘন করে ইন্দোচীন অঞ্চলে কোন রকম আক্রমণাত্মক কার্যকলাপকে আমেরিকা আন্তজাতিক শান্তি ও সুরক্ষার পক্ষে ক্ষতিকারক একটি বিষয় হিসেবে গণ্য করবে। ইন্দোচিনের ব্যাপারে পূর্বেকার উদাসীনতা বর্জন করে আইজেনহাওয়ার এবং ডালেস ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে কার্যত Cold War-এর সূত্রপাত করেন। এদের ঘােষিত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল Domino Theory বা দক্ষিণ ভিয়েতনামে একটি শক্তিশালী অকমিউনিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কার্যত জেনেভা সম্মেলনের শর্তগুলিকে কার্যকরী করার কোন চষ্টা করেনি। তার আরেকটি কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে যে, আমেরিক ভীত ছিল যে, ১৯৫৬ সালে নির্বাচন হলে কমিউনিস্টদের সাফল্য লাভের এই জাতীয় সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট দুটি লক্ষ্য দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। প্রথমত, জেনেভা সম্মেলনের বাধ্যবাধকতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা এবং দ্বিতীয়ত, সাম্যবাদের প্রসার রােধের জন্য বেষ্টনী নীতিকে শক্তিশালী করে তােলা। ভিয়েতনাম যাতে, কোন বিদেশি শক্তির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর না করতে পারে তার জন্য ১৯৫৪-এ সেপ্টেম্বরে SEATO চুক্তিতে একটি স্বতন্ত শর্ত সংযােজিত করে ভিয়েতনামকে এর সুরক্ষার আওতায় আনা হয়। ১৯৫৬-তে আমেরিকার একটি মিলিটারি মিশন ফরাসি সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে দায়িত্বভার গ্রহণ করে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে। এইভাবে আমেরিকা ভিয়েতনামের যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

দক্ষিণ ভিয়েতনামে রাজনৈতিক শক্তি ও সংহতি দৃঢ় করে তােলার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ন্ দিনদিয়েমের (Ngo Dinhdiem) নেতৃত্বে স্বাধীন ভিয়েতনামী প্রজাতন্ত্র (R. V. N.) প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৫৫-এর অক্টোবর মাসে দিয়েম ঘােষণা করেন যে, যেহেতু দক্ষিণ ভিয়েতনাম জেনেভা চুক্তি স্বাক্ষর করেনি সেহেতু তাদের দিক থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার কোন রকম দায়বদ্ধতা নেই। আমেরিকা দিয়েমের এই জাতীয় ঘােষণার কোন বিরােধিতা করেনি। দক্ষিণ ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে দিয়েম নিজস্ব উদ্যোগে Referendum এর ব্যবস্থা করেন এবং এই নির্বাচনে ৯৮ % ভােট দিয়েম লাভ করেন।

আইজেনহাওয়ার প্রশাসন দিয়েম সরকারকে দক্ষিণ ভিয়েতনামের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার জন্য ব্যাপক প্রশংসা করলেও দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমেরিকার কোন সুনির্দিষ্ট ধারণা ছিল না। দিয়েমের জাতীয়তাবাদ এবং কমিউনিস্ট বিরােধী মানসিকতা সম্পর্কে কোন সংশয় ও অবকাশ ছিল না। একই সঙ্গে অবশ্য দিয়েম স্বৈরাচারী, স্বজনপােষণকারী এবং ক্যাথলিক ধর্মের একনিষ্ঠ অনুসরণকারী ছিলেন। এর দরুন ভিয়েতনামে রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে বিভাজনের সূত্রপাত হয়। ১৯৫৭-এর অক্টোবরে গেরিলা আক্রমণ শুরু হয় এবং এই ঘটনা দ্বিতীয় ইন্দো-চিন যুদ্ধের সূত্রপাত করে। ১৯৫৯ নাগাদ উত্তর ভিয়েতনামের সামরিক উপদেষ্টা অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি অরণ্যের একটি গােপন অঞ্চল দিয়ে দক্ষিণ ভিয়েতনামে উপস্থিত হতে শুরু করে। এই গােপন পথটি The Ho-Chi-Mini trail নামে অভিহিত হয়। ১৯৬০ সালে এরা নিজেদের National Liberal Front নামে অভিহিত করে এবং তারা এই মর্মে ঘােষণা করে যে, তাদের লক্ষ্য হল দিয়েম সরকারের ক্ষমতাচ্যুতি এবং ভিয়েতনামের ঐক্যসাধন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি আমেরিকার একজন সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার প্রদান করতে গিয়ে মন্তব্য করেন, Now we have a problem in making our power credible, and Vietnam is the place. ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট গেরিলাদের মােকাবিলা করার জন্য কেনেডি নমনীয় প্রতিক্রিয়া কৌশল প্রয়ােগের চেষ্টা করেন। ১৯৬৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনসন উঃ ভিয়েতনাম এবং ভিয়েত কং এর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি করেন। ১৯৬৪-তে জনসনের উদ্যোগে উত্তর ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে শুরু হয় অপারেশন রোলিং বজ্রপাত. তিন বছর এই অভিযান চলেছিল। এই সময়কালের মধ্যে ৬০০, ০০০ টন বম্ব উত্তর ভিয়েতনামে আমেরিকা ফেলেছিল। আমেরিকান সেনাবাহিনী এই পর্যায়ে search and destroy নীতি গ্রহণ করে এবং ভিয়েতনামে কমিউনিষ্টদের পুরোপুরি আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৬৪ সালে জুলাই মাসে টংকিং উপসাগরের কাছে দক্ষিণ ভিয়েতনামের একটি destroyer-কে উত্তর ভিয়েতনাম আক্রমণ করে, এই অজুহাতে রাষ্ট্রপতি জনসন উত্তর ভিয়েতনামে তেল মত মজুত কেন্দ্র, যােগাযােগ ব্যবস্থা এমনকি হাসপাতালের ওপর আকাশপথে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। শুধু বিমান বাহিনীই নয়, আমেরিকার স্থলবাহিনীকে উত্তর ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে প্রয়ােগ করা হয়। ১৯৬৫ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর ভিয়েতনামের বাহিনী মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপর আক্রমণ চালায়। জনসনের এই জাতীয় কার্যকলাপের দরুন ভিয়েতনামের গৃহযুদ্ধ কার্যত একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়। যার দরুন আন্তর্জাতিক শান্তি ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। আমেরিকার এই জাতীয় কার্যকলাপের পরিপ্রেক্ষিতে সােভিয়েত ইউনিয়ন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চিন উত্তর ভিয়েতনামকে বিপুলভাবে সাহায্য করতে শুরু করে। ১৯৬৮ সাল নাগাদ আমেরিকার সেনাবাহিনীর সংখ্যা ৪ লক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৬৮ সালে Tet-এর মধ্যে দিয়ে ভিয়েত কং আক্রমণ শুরু করলে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সংযােজিত হয়। তবে এই আকস্মিক আক্রমণ প্রতিরােধ করা সম্ভবপর হয়। কিন্তু দূরদর্শন মারফত আমেরিকান বাহিনীর হিংসাত্মক কার্যকলাপের বিষয়টি প্রকট হয়ে উঠলে Tet আমেরিকার মনস্তত্ত্বের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ক্রমশ ভিয়েতনাম যুদ্ধের দরুন অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকলে। জনসন প্রশাসন বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিকসন এর সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধের ক্ষেত্রে পুনরায় পট পরিবর্তন ঘটে। রিচার্ড নিকসন ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে যে নীতি গ্রহণ করেন তা ভিয়েতনামাইজেশন নামে অভিহিত হয়। ভিয়েতনামাইজেশন বলতে বােঝানাে হয়েছিল একটি প্রক্রিয়াকে যার দ্বারা আমেরিকার সেনাবাহিনীর পরিবর্তে ভিয়েতনামের সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানাে হয়। কিন্তু রিচার্ড নিকসন সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারে কোন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেননি। সেই দিক দিয়ে এই ঘােষণা বা প্রচার মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণােদিত ছিল। ১৯৭০ এর পর থেকে আমেরিকা ক্রমশ পিছু হটতে থেকে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার পরাজয় : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের কারণ গুলি হল -
১) ভিয়েতনামের জনগণের মধ্যে ভিয়েত কং বা ভিয়েতনাম ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের প্রতি সমর্থন ও আস্থাশীলতা ছিল।
২) ভিয়েতনামের ভৌগােলিক গঠন ভিয়েত কং এর সেনাদের গেরিলা যুদ্ধে পারদর্শী করে তুলেছিল। অন্যদিকে মার্কিন সেনাদের ভিয়েতনামের প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় তারা পরাজিত হয়েছিল।
৩) ভিয়েত কং এর সেনারা লােকবল ও অস্ত্রবলে সহয়তা লাভ করেছিল চিন ও রাশিয়ার কাছ থেকে। এক্ষেত্রে রাশিয়ার অস্ত্র সাহায্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
৪) উত্তর ভিয়েতনামের জনগণ জয়ের ক্ষেত্রে দৃঢ় ও সংঘবদ্ধ ছিল। এমনকি তারা সমস্তরকমের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভিয়েতনামের ঐক্যবদ্ধতায় বিশ্বাসী ছিল এবং ভিয়েতনামের ঐক্য রক্ষা করতে প্রস্তুত ছিল। তাই ভিয়েতনামবাসীর অদম্য দেশপ্রেম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের কারণ হয়ে দাড়িয়েছিল।
৫) ভৌগােলিক দূরত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল। কোরিয়ার মতাে ভিয়েতনাম ছিল মার্কিন ভূখণ্ড থেকে বহুদূরে অবস্থিত। তাছাড়া ভিয়েতনাম ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শত্রুরাষ্ট্র দ্বারা বেষ্টিত। উপরন্তু স্ববিরােধী ও ভ্রান্ত মার্কিন নীতি সাম্যবাদকে প্রতিহত করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। ভিয়েতনামের সাম্যবাদ নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন নীতির কার্যকারিতা ক্ষুণ্ণ করেছিল।
৬) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল হাে চি মিন। হাে চি মিন-এর বলিষ্ঠ নেতৃতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সর্বত্র মার্কিন প্রভাব খর্ব হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেশির নীতি অপপ্রয়ােগ তার জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হওয়ায় মার্কিন সেনারা যুদ্ধে মনােনিবেশ করতে পারেনি।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের ফলাফল : মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের উপস্থিতিতে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি জানুয়ারিতে প্যারিসের চুক্তির দ্বারা মার্কিন মদতে দক্ষিণ ভিয়েতনামের জেনারেল ভ্যান মিন সায়গন উত্তর ভিয়েতনামের জাতীয় মুক্তিফন্ট (Vietnam National Liberation Front) বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই চুক্তির দ্বারা আমেরিকা দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। মার্কিন জেনারেল ওয়েস্ট মােবল্যান্ড একে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের withdrawal strategy বলে চিহ্নিত করেছেন। ১৯৭৫ সালে ৩০ এপ্রিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম ঐক্যবদ্ধ হয়। ভিয়েতনাম স্বাধীনতা লাভ করে। ভিয়েতনামের নতুন নামকরণ হয় ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন কাম বান দং। এই যুদ্ধে ৫৮০০০ মার্কিন সেনা নিহত হয় এবং ২০ লক্ষ লােকের প্রাণহানি ঘটে। আমেরিকা ভিয়েতনামে এক মিলিয়ন টনের বেশি বােমাবর্ষণ করেও তার উদ্দেশ্য সফল করতে পারেনি। ভিয়েতনামে সাম্যবাদ প্রতিহত করার আমেরিকার স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। সমগ্র পৃথিবীতে আমেরিকার ভাবমুর্তি বিনষ্ট হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনসনের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়। সাম্যবাদ প্রতিহত করার জন্য আমেরিকার বেষ্টনী নীতির শােচনীয় পরিণতি ঘটে। যুদ্ধে ভিয়েতনামের জয় এশিয়া তথা পৃথিবীর মুক্তিকামী জনগনের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

গ্রন্থপঞ্জী:
1. আন্তর্জাতিক ইউরোপের ইতিহাস - গৌতম বসু
2. Vietnam Wars 1945-1990 - Marilyn Young
3. The Vietnam War: A Concise International History - Mark Atwood Lawrence
4. The Vietnam War: An Intimate History - Geoffrey C. Ward, Ken Burns
5. 10,000 Days of Thunder: A History of the Vietnam War - Philip Caputo