PayPal

ইতালির ঐক্য আন্দোলনে বৈদেশিক শক্তির ভূমিকা

author photo
- Wednesday, September 11, 2019
ইতালীর ঐক্য আন্দোলন কেবলমাত্র ইতালীর জাতীয়তাবাদীদের চেষ্টায় সফল হয়নি। ইতালীর মুক্তি আন্দোলনে বৈদেশিক শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ ভূমিকা ছিল। নেপােলিয়ন ইতালীতে যে শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন তার ফলে ইতালীবাসীদের মনে সর্বপ্রথম জাতীয়তাবাদী জেগে ওঠে। নেপােলিয়ন ইতালীতে কোড নেপােলিয়ন ও অন্যান্য আধুনিক সংস্কার চালু করেন। স্যালভেমিনি প্রভৃতি সকল প্রখ্যাত ঐতিহাসিকেরা স্বীকার করেন যে, নেপােলিয়নের ইতালীয় সংগঠনকেই ইতালীয় রিসঅর্গিমেন্টোর প্রথম ধাপ বলা যায়। ইতালীর ঐক্য আন্দোলন বলা যায়। কারণ ইতালীর প্রান্তীয়তা, আঞ্চলিকতার বাধন ভেঙে তিনিই সর্বপ্রথম কেন্দ্রীভূত শাসন ও কেন্দ্রীভূত আইনের প্রবর্তন করেন। ইতালীর বিভিন্ন অঞ্চলকে বিভিন্ন রাস্তার দ্বারা যুক্ত করেন। সামন্তপ্রথা ভেঙে ভূমি সংস্কার করেন। যােগ্যতার ভিত্তিতে পদ লাভের নিয়ম চালু করে তিনি এক বুদ্ধিজীবি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংগঠন করেন। নেপােলিয়নের পতনের পর ইতালীর জাতীয়তাবাদীদের মনে জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক ভাবধারা জাগ্রত হয়।
Cavour meets with Napoleon III 1858
নেপােলিয়নের পতনের পর ভিয়েনা চুক্তির দ্বারা ইতালীতে অষ্টিয়া আধিপত্য স্থাপিত হয়। অষ্ট্রিয়ার প্রতিক্রিয়াশীল শাসনে আসার ফলে ইতালীবাসীদের মনে জাতীয়তাবাদী প্রভাব জাগে। মাৎসিনির ইয়ং ইতালী আন্দোলনের বিফলতার পর ক্যাভুর বৈদেশিক সাহায্য দ্বারা অষ্ট্রিয়াকে ইতালী থেকে বহিষ্কারের পরিকল্পনা করেন। তিনি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের নিকট সাহায্য পাওয়ার আশা করেন। ক্রিমিয়ার যুদ্ধ বাধলে পিডমন্ট দুই শক্তির মিত্রতা লাভের সুযােগ পায়। ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ইতালীর মুক্তি আন্দোলনের পথ তৈরি করে। পিডমন্ট এই যুদ্ধে ইঙ্গ-ফরাসী শক্তির পক্ষে যােগ দেয় এবং এই দুই শক্তির নৈতিক সমর্থন পায়। প্যারিসের সন্ধি বৈঠকে ইতালীর প্রশ্ন আলােচিত হয়। ক্যাভুর এই বৈঠকে ঘােষণা করেন যে, পূর্বাঞ্চল সমস্যার মত, ইতালীর সমস্যা একটি ইওরোপীয় সমস্যা। কিন্তু ব্রিটিশ মন্ত্রী লর্ড পামারস্টন ইতালিকে সাহায্য দানে অস্বীকার করেন, কাজেই ক্যাভুরকে বাধ্য হয়ে ফরাসী সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। প্যারিসের সন্ধি বৈঠকের পর তৃতীয় নেপােলিয়ন ইতালীর সমস্যার প্রতি আগ্রহ দেখান। ১৮৫৮ খ্রীঃ গােড়ার দিকে ইতালীয় বিপ্লবী ওরসিনি সম্রাট তৃতীয় নেপােলিয়ন ও তার পত্নীকে হত্যার চেষ্টা করায়, সম্রাটের বিবেকে আঘাত লাগে। ওরসিনী তার প্রাণদণ্ডের আগে সম্রাটকে সম্বােধন করে ইতালীর ঐক্যে সহায়তা দানের জন্যে যে পত্র লেখেন তা নেপােলিয়নের মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ প্লোমবিয়ারের গােপন চুক্তির দ্বারা তৃতীয় নেপােলিয়ন অষ্টিয়ার বিরুদ্ধে ক্যাভুরকে সাহায্য দিতে সম্মত হন। এই চুক্তির শর্ত থাকে যে, ক্যাভুরকে অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে একটি বৈধ কারণ সৃষ্টি করতে হবে যার ফলে ফ্রান্স বৈধভাবে এই যুদ্ধের সামিল এতে হতে পারে। ফরাসী সামরিক সাহায্যের বিনিময়ে ফ্রান্সকে স্যাভয় ও নিস ছেড়ে দিতে হবে। পিডমন্টের সঙ্গে কেবলমাত্র লম্বার্ডি ও ভিনেসিয়া যুক্ত হবে। মধ্য ইতালীর কিছু অংশ ও পার্মা প্রভৃতি অঞ্চল পিডমন্টের সঙ্গে যুক্ত হবে। টাস্কানী, মডেনা ও পােপের রাজ্যের কিছু অংশ নিয়ে মধা ইতালীয় রাজ্যে পরিণত হবে। বাকি পােপের রাজ্য পােপের হাতেই থাকবে। নেপলস ও সিসিলীতে স্থিতাবস্থা থাকবে। এই শর্তে প্লোমবিয়ারের সন্ধির দ্বারা তৃতীয় নেপােলিয়ন ইতালীর মুক্তিযুদ্ধের দায়িত্ব হাতে নেন। সুতরাং তৃতীয় নেপােলিয়ন প্লোমবিয়ারের সন্ধির দ্বারা সমগ্র ইতালীকে সংযুক্ত করতে প্রতিশ্রুতি দেন একথা বলা যায় না (Ketelbey-History of Modern Times)। তৃতীয় নেপােলিয়ন সম্ভবতঃ শক্তিশালী স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ ইতালী গঠন অপেক্ষা পিডমন্টকে ফরাসী তাবেদার রাজ্যে পরিণত করতে চান। তিনি ইতালী থেকে অষ্ট্রিয়ার প্রভাব দূর করার কথা ভাবেন। তাছাড়া ফ্রান্সের ক্যাথলিকদের জনমতের কথা তিনি ভাবেন। ১৮৪৯ খ্রীঃ ক্যাথলিক জনমতকে সন্তুষ্ট করবার জন্যেই তিনি পােপকে রক্ষার অজুহাতে রােমে সেনাদল পাঠিয়ে ম্যাসিনীর প্রজাতন্ত্র ধ্বংস করেন। কাজেই বৈদেশিক সাহায্য দ্বারা সমগ্র ইতালীর ঐক্য স্থাপনের চিন্তা ১৮৫৮-৫৯ খ্রীঃ ছিল স্বপ্ন মাত্র। কিন্তু যুদ্ধে অষ্ট্রিয়ার পরাজয় হলে, ইতালীর জাতীয়তাবাদ তার নিজস্ব পথে চলতে শুরু করে।

প্লোমবিয়ারের সন্ধির শর্ত অনুসারে অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণার জন্যে বৈধ কারণ সৃষ্টি করা সহজ কাজ ছিল না। ব্রিটেনের হস্তক্ষেপে এক আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে ইতালীর সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। অষ্ট্রিয়া অহমিকা বশতঃ এই কংগ্রেসের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করায়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অষ্ট্রিয়া একঘরে হয়ে পড়ে। তাতে তৃতীয় নেপােলিয়নের হস্তক্ষেপের সুবিধা হয়। নতুবা তিনি হস্তক্ষেপে রাজী হতেন কিনা সন্দেহ ছিল। অষ্ট্রিয়া পিডমন্টের বিরুদ্ধে তার সেনাদল ভেঙে দিতে দাবী করে এক চরমপত্র দিলে পিউমন্ট তা অগ্রাহ্য করলে, অষ্ট্রিয়া যুদ্ধ ঘােষণা করে। এভাবে যুদ্ধের বৈধ কারণ সৃষ্টি হলে তবেই তৃতীয় নেপােলিয়ন ফরাসী সেনা অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে সৈন্য নামান। ফরাসী সেনা ম্যান্টুয়া, সলফেরিনাের যুদ্ধে অষ্ট্রিয়াকে লম্বার্ডি থেকে বিতাড়িত করে। কিন্তু তৃতীয় নেপােলিয়ন সন্ধির শর্ত মত ভিনিসিয়াকে অষ্ট্রিয়ার অধিকারমুক্ত না করে আকস্মাৎ অষ্টিয়ার সঙ্গে ১৮৫৯ সালে ভিল্লাফ্রাঙ্কের সন্ধি স্বাক্ষর করেন। এর ফলে লম্বার্ডি পিডমন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়। বাকি ইতালীতে স্থিতিবস্তা বহাল থাকে। তবে বলা যায় ইতালির ঐক্য আন্দোলনে ফ্রান্সের ভূমিকা ছিল পরোক্ষ মাত্র।

জাতীয়তাবাদী গ্যারিবল্ডী দক্ষিণে সিসিলী ও নেপলস বিজয় ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদের দুঃসাহসিক ও শ্রেষ্ঠতম প্রকাশ। গ্যারিবল্ডীর সাফল্য পুনরায় বৈদেশিক শক্তির সমস্যা সৃষ্টি করে। গ্যারিবল্ডীর সমস্যা থেকে মুক্তির জন্যে ক্যাভুরের প্রস্তাব বাধ্য হয়ে তৃতীয় নেপােলিয়ন মেনে নেন। এই প্রস্তাব ছিল যে, রােম ব্যতীত অবশিষ্ট পােপের রাজ্য পিডমন্ডের সেনাদল দখল করলে গ্যারিবল্ডী রােমে আসতে সক্ষম হবেনা। তৃতীয় নেপােলিয়ন অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা থেকে মুক্তি পাবেন। তৃতীয় নেপােলিয়ন শর্ত দেন যে, আমব্রিয়া ও মার্চেস অঞ্চলই একমাত্র পিডমন্ট দখল করতে পারবে। পিডমন্ট সেনাদল পােপের বাহিনীকে পরাস্ত করে এই অঞ্চল দখল করে। এই পর্যায়ে ইতালীর ঐক্যে তৃতীয় নেপােলিয়ন পরােক্ষ ভূমিকা নেন।

এদিকে ভিক্টর ইমানুয়েল গ্যারিবল্ডীর কাছ থেকে সিসিলী ও নেপলস গ্রহণ করলে তৃতীয় নেপোলিয়ন অখুশি হন। কারণ ফরাসী জাতীয় বুরবো বংশের রাজাকে নেপলস থেকে বিতাড়িত করাই তিনি ক্রুদ্ধ হন। তৃতীয় নেপােলিয়ন পুনরায় শর্ত দেন যে, নেপলস ও সিসিলীতে গণভোটের মাধ্যমে সংযুক্ত করতে হবে। গণভোট দ্বারা নেপলস ও সিসিলীর পিডমন্টের সঙ্গে বৈধ ভাবে যুক্ত হয়। ইতিমধ্য ক্যাভুরের মৃত্যু হয়। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে অষ্ট্ৰো-প্রাশিয়া যুদ্ধে ইতালি প্রাশিয়ার পক্ষে যোগ দেন। যুদ্ধ শেষে তৃতীয় নেপোলিয়নের প্রভাবে ভেনেসিয়া ইতালির সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়া যুদ্ধের সময় ফরাসী সেনাদল রোম থেকে চলে যায়। এই সুযোগে ভিক্টর ইমানুয়েল রোম অধিকার করে, রোমকে ইতালির রাজধানী ঘোষণা করলে ইতালির ঐক্য সম্পূর্ণ হয়।

পরিশেষে বলা যায় যে, কেবলমাত্র বৈদেশিক সহায়তাই ইতালীকে ঐক্যবদ্ধ হতে সাহায্য করে এই কথা বলা যায় না। ইতালীর ঐক্য ছিল আংশিক ক্যাভুরের কূটনীতি ও বৈদেশিক সাহায্যকে গঠনমূলকভাবে ব্যবহারের ক্ষমতা, আংশিক মধ্য ইতালীর জাতীয়তাবাদীদের বিদ্রোহ, আংশিক গ্যারিবল্ডীর হঠকারী অভিযান এবং বিশেষভাবে তৃতীয় নেপােলিয়নের প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ সহায়তার ফল। এজন্য ইতালীর ঐক্য আন্দোলনে কোন বিশেষ ব্যক্তির ভূমিকাকে গুরুত্ব দেওয়া যায় না। স্যাভয় ও নিস ফ্রান্সের হাতে থেকে যায়।